গোলাগুলি শুরু হয় আমি আর আমার বোন গ্রেনেড ছুড়ি

Thursday, February 17, 2011

রাজনৈতিক পরিবারে আমার জন্ম। আমার নানা মরহুম উকিল সেকান্দার মিয়া নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। মামা শাহাব উদ্দিন ইস্কান্দার কচি এমসিএ ছিলেন। মামীও এমপি হয়েছিলেন। আমার বাবা ছিলেন সরকারি চাকরিজীবী। দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকতে হয়েছে আমাকে।
১৯৬৫ সালে মেট্রিক পাস করার পর নোয়াখালী কলেজে ভর্তি হই। তখন থেকেই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি। '৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির সদস্য হই। '৬৯-এর আন্দোলনের সময় প্রতিটি মিছিল-মিটিংয়ে আমাদের উপস্থিতি ছিল। প্রতি মিটিংয়েই আমাদের বলা হতো যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে। তখন থেকেই যুদ্ধের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিই। '৭০-এর নির্বাচনে সক্রিয় ছিলাম।
১৯৭১-এর ফেব্রুয়ারিতে ছাত্রলীগের উদ্যোগে আমাদের ট্রেনিং করানো হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেসিয়ামে। দুজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা আমাদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিতেন। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার জন্য রোকেয়া হল থেকে দল বেঁধে রেসকোর্সে ছুটে যাই। সে ভাষণ শুনে প্রতিটি মানুষের মতো আমরাও উজ্জীবিত হই।
আমরা রোকেয়া হলে থাকতাম। মমতাজ আপা এবং আমার ওপর নির্দেশ ছিল যেন রোকেয়া হল না ছাড়ি। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি আর্মিরা যখন হল আক্রমণ করল, আমরা দৌড়ে গিয়ে আশ্রয় নিলাম হাউস টিউটরের বাসায়। ওই বাসার একটা স্টোররুমে সাত-আটজন মেয়ে সারা রাত ছিলাম। ২৬ মার্চ মেহেরুন্নেসা আপা আমাকে আর মমতাজ আপাকে শায়রা আপার বাসায় পেঁৗছে দেন। ২৭ মার্চ কিছু সময়ের জন্য কারফিউ তুলে নিলে খালেদ মোহাম্মদ আলী, একরামুল হকসহ অন্য নেতারা রোকেয়া হলে যান। তাঁদের ধারণা ছিল, আমরা আর বেঁচে নেই। কিন্তু পথেই তাঁদের সঙ্গে দেখা হয়। তাঁরা আমাকে ওয়ারীতে ফুপা খান বাহাদুর নুরুল আমিনের বাসায় পেঁৗছে দেন। পরে রাজশাহী থেকে বাবাও আসেন।
১ এপ্রিল বাবার সঙ্গে নোয়াখালী রওনা হই। অনেক কষ্টে দুদিন পর মাইজদীতে নানাবাড়ি পেঁৗছাই। সেখানে যাওয়ার পর স্থানীয় আওয়ামী লীগ এবং ছাত্রলীগের নেতাদের সঙ্গে সংগঠনের কাজ শুরু করি। মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতে ট্রেনিংয়ে পাঠানোর কাজ করতাম। তাঁদের জন্য টাকা-পয়সা, কাপড়-চোপড় সংগ্রহ ও তাঁদের উৎসাহ দিতাম। তখনো পাকিস্তানি বাহিনী মাইজদী ঢোকেনি। এপ্রিলের শেষে ওরা মাইজদী আসে। প্রথমেই আমার নানাবাড়ি পুড়িয়ে দেয়। সেখানে থাকতে না পেরে নানার গ্রামের বাড়ি কাদিরপুরে চলে যাই। ওই বাড়িটি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি। আমার কাজ ছিল খবরাখবর আদান-প্রদান করা। পাকিস্তানি আর্মিরা মামাকে মেরে ফেলে। এরপর রাজাকারদের অত্যাচারে আর সেখানে থাকতে পারিনি। চলে যাই মামির বাবার বাড়ি মনিনগরে।
সেখানে থাকার সময়ই শেখ ফজলুল হক মনি, আ স ম রব ভাইয়ের চিঠি পাই_আমি যেন ভারতে চলে যাই। সঙ্গে সঙ্গে ছোট বোন শিরিন জাহান দিলরুবা, ছোট ভাই তাহের জামিলকে নিয়ে রওনা হই। তাহের তখন ক্লাস এইটে পড়ত। ফেনীর বিলোনিয়া হয়ে জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহে আগরতলা পেঁৗছাই। সেখানে আমাদের আটজন মেয়েকে আলাদা করে একটা বাড়িতে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। আমাদের দেখাশোনা করতেন অ্যাডভোকেট আমিনুল হক। জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ থেকে লেম্বুছড়া ক্যাম্পে আমাদের সশস্ত্র ট্রেনিং শুরু হয়। ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর কে বি সিং এবং মেজর শর্মা আমাদের ট্রেনিং দিতেন। দেড় মাস ট্রেনিং নিই। অস্ত্র চালানো, গ্রেনেড ছোড়া, গোয়েন্দাগিরিসহ সব ধরনের ট্রেনিং আমাদের দেওয়া হয়েছিল।
ট্রেনিং শেষে মুক্তিযোদ্ধারা কোনো অপারেশনে গেলে আমাদের তাঁদের সঙ্গে পাঠানো হতো। আমাদের কাজ ছিল রেকি করা। রেকি করে খবর নিতাম। এসব তথ্য মুক্তিযোদ্ধাদের দিতাম।
এর পর সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিই আগস্টের শেষের দিকে। আমরা সেনবাগের দিতে যাচ্ছিলাম। ঠিক সন্ধ্যায় সেনবাগের কাছাকাছি আসার পর আমরা পাকিস্তানি সেনাদের মুখোমুখি পড়ে যাই। তারাই আমাদের ওপর প্রথম গুলি ছোড়ে। আমরা সবাই মাটিতে শুয়ে পড়ি। গোলাগুলি শুরু হয়। আমি আর আমার বোন গ্রেনেড ছুড়ে ছুড়ে মারি। ওই যুদ্ধে সাতজন পাকিস্তানি আর্মি ও চারজন রাজাকার মারা পড়েছিল। বাকিরা পালিয়ে যায়। তাদের ফেলে যাওয়া অস্ত্রগুলো আমরা নিয়েছি। এরপর আমাকে আর বাংলাদেশে ঢুকতে দেয়নি। সিদ্ধান্ত হয়েছিল মিত্রবাহিনী ঢুকবে।
মনে আছে, ট্রেনিং শেষ করে মুক্তিযোদ্ধারা যখন বাংলাদেশে ঢুকতেন, তখন রাস্তার আশপাশের বাড়ির নারীরা দাঁড়িয়ে থাকতেন। চোখের জল মুছতেন অনেকে। প্রায় সবার হাতেই থাকত একটা পোঁটলা। তাতে কিছু না কিছু থাকতই। এগুলো তাঁরা গুঁজে দিতেন মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে। এ দৃশ্য এখনো মনে পড়ে।
৭ ডিসেম্বর নোয়াখালী মুক্ত হলে আমরা বাংলাদেশে চলে আসি। আমার ভাই যুদ্ধ করেছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে। যুদ্ধ শেষ হওয়ার তিন মাস পর সে দেশে আসে। আমরা ভেবেছিলাম, সে হয়তো মারা গেছে।
আমরা যে লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধ করেছিলাম, সে লক্ষ্য আংশিক পূরণ হয়েছে। পুরোপুরি হয়নি। যে বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিলাম, সে বাংলাদেশ গড়তে পারিনি। কিছু কিছু মুক্তিযোদ্ধাও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বিসর্জন দিয়ে দেশের সঙ্গে, স্বাধীনতার সঙ্গে বেইমানি করেছে। আর এ দেশে নারী মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানকে তেমনভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি কখনোই। এখনো পুরোপুরি দেওয়া হচ্ছে না।
পরিচিতি : ফরিদা খানম সাকীর জন্ম ১৯৪৯ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর বরগুনায়। মা লুৎফুন নাহার বেগম, বাবা আবদুল আলীম। বর্তমানে তিনি জাতীয় মহিলা সংস্থার পরিচালনা পরিষদের ও মহিলা সমিতির কার্যকরী পরিষদের সদস্য। এ ছাড়া নারী মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন বাংলাদেশ মহিলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ। এ সংসদের যুগ্ম সম্পাদক তিনি। মুক্তিযোদ্ধা সনদ নেওয়ার কথা তেমন ভাবেননি। সম্প্রতি নোয়াখালী জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ড তাঁদের তিন ভাইবোনের মুক্তিযোদ্ধা সনদ তুলে দেন। ফরিদা খানম সাকীর মুক্তিযোদ্ধা সনদ নম্বর ১২৭৬৯১।
অনুলিখন: ওবায়দুর রহমান মাসুম।

যুদ্ধাপরাধের বিচার, অবস্থান পাল্টাচ্ছে বিএনপি!

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির অবস্থান। এই বিচারের পক্ষে দলটি কখনো সোচ্চার না থাকলেও সরাসরি বিপক্ষে অবস্থান নেয়নি। কিন্তু ইদানীং দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বক্তব্য যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিরুদ্ধে যাচ্ছে।

এ নিয়ে দলের ভেতরেও দেখা দিচ্ছে ব্যাপক মতবিরোধ। বিশেষ করে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী গ্রেপ্তার হওয়ার পর এই বিরোধ জোরদার হয়েছে। বিএনপির মধ্যে অনেকেই মনে করছেন, সরকার বিএনপিকে যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে ফাঁদ পেতেছে। আর সেই ফাঁদে পা দিচ্ছে বিএনপি।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি ক্ষমতায় আসার পর একাত্তরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের উদ্যোগ নেয়। সরকারের এই উদ্যোগে প্রথমেই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে বিএনপি। এ নিয়ে অনেক আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, বিএনপি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরোধিতা করবে না। তবে দল থেকে দাবি তোলা হয়, এই বিচার হতে হবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। বিএনপি মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনসহ দলের প্রায় সব নেতাই এ ধরনের অভিমত দিয়ে বক্তব্য দেন। এমনকি চারদলীয় জোটের অন্যতম শরিক জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদসহ সিনিয়র পাঁচ নেতা গ্রেপ্তার হওয়ার পরও বিএনপি নীরব ছিল। কিন্তু গত ১৬ ডিসেম্বর ভোররাতে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী গ্রেপ্তার হওয়ার পর বিএনপি মহাসচিবসহ দলের কোনো কোনো নেতার বক্তব্যের ধরন পাল্টে গেছে। খোন্দকার দেলোয়ার বলেছেন, '৪০ বছর পর কেন এ বিচার? এর আগেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল, তখন বিচার করেনি। তারাই ১৯৫ জন মূল যুদ্ধাপরাধীকে মুক্তি দিয়েছিল। এখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে বিরোধী দলকে ধ্বংসের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে তারা। বিরোধী দলের নেতাদের মেরে ফেলার জন্য এই কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে।' তাঁর এই বক্তব্য বিএনপির অবস্থান পরিবর্তনের ইঙ্গিতবহ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
খোন্দকার দেলোয়ারের ওই বক্তব্যের পর গত শুক্রবার দুপুরে তাঁরই সভাপতিত্বে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জরুরি ভিত্তিতে একটি যৌথ সভা করা হয়। সাকা চৌধুরীকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে সেই সভা থেকে চট্টগ্রামে ডাকা অর্ধদিবস হরতালকে পূর্ণদিবসে রূপ দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, ঢাকাসহ সারা দেশে দুদিনের বিক্ষোভ সমাবেশের কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়।
সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের মহাসচিব লে. জেনারেল (অব.) হারুন অর রশিদকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, বিএনপির বর্তমান অবস্থানকে তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধে মনে করেন কি না। জবাবে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, 'অবশ্যই তিনি মনে করেন, বিএনপি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হতে হবে। না হলে আইনের শাসন কায়েম হবে না। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী আদালতে দাঁড়িয়ে বলেছেন, তিনি রাজাকার। তিনি আত্মস্বীকৃত যুদ্ধাপরাধী। বিএনপি যদি তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করে, হরতাল-বিক্ষোভ করে, তাহলে তো তাদের রাজনৈতিক দর্শন নিয়েও প্রশ্ন তুলতে পারি।'
ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির আহ্বায়ক ডা. এম এ হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, 'সাকা চৌধুরীর মতো একজন আত্মস্বীকৃত যুদ্ধাপরাধীর পক্ষ নিয়ে বিএনপি প্রমাণ করেছে, তারা যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষ নিচ্ছে। এ ছাড়া বিএনপি বিচারের আগেই ট্রাইব্যুনাল ও বিচারকদের প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এতেও স্পষ্ট হয়, তারা এই বিচারপ্রক্রিয়াকে মানতে চাইছে না।' তিনি আরো বলেন, 'গোলাম আযম অনেক বড় রাজাকার। কিন্তু সেই সময় সাকা চৌধুরী ও তাঁর বাবা ফকা চৌধুরী গং অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিল। তারাই শান্তি কমিটি গঠন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে বড় ভূমিকা পালন করেছে। বিএনপি এসব অস্বীকার করে তার পক্ষ নিয়ে নিজেরাই বিচারক সাজছে।'
জানা গেছে, সাকা চৌধুরী গ্রেপ্তার হওয়ার পর বিএনপির একাংশের তৎপরতা নিয়ে দলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। সমালোচক অংশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিএনপি যদি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধে না যায়, তাহলে সাকা চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করার পর এমন প্রতিক্রিয়া দেখানো হচ্ছে কেন? জবাবে সাকা চৌধুরীর পক্ষের অংশটি বলছে, তাঁকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে নয়, রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং নির্যাতন চালানো হচ্ছে।
বিএনপির একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, মহাসচিবসহ একদল নেতা অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধী সাকা চৌধুরীকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে ঢাকায়ও হরতাল ডাকার চেষ্টা করেন। কিন্তু দলের বড় একটি অংশ এর বিরোধিতা করায় সে চেষ্টা সফল হয়নি। এমনকি ওই নেতাদের চাপে পড়ে যাতে হরতাল ডাকতে না হয়, সে জন্য দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও চীন সফরে যাওয়ার আগে দুদিন গুলশানে তাঁর অফিসে যাননি। এ ক্ষেত্রেও সাকাবিরোধী গ্রুপের চেষ্টা ছিল।
এদিকে সাকা চৌধুরীকে গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের প্রতিবাদে গত রবিবার ঢাকার মুক্তাঙ্গনে যে সমাবেশ করা হয়েছে, সেখানে অনেক নেতা অংশ নেননি। অনেকে সমাবেশে এসে হাজিরা অথবা বক্তব্য দিয়েই চলে যান। বিএনপির এটা কেন্দ্রীয় কর্মসূচি হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হলেও স্থায়ী কমিটির ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনসহ প্রভাবশালী নেতারা অনুপস্থিত থাকেন। ঢাকার মেয়র সাদেক হোসেন খোকাসহ মহানগর নেতাদের অধিকাংশও ওই সমাবেশে ছিলেন না।
সূত্র জানায়, সাকা চৌধুরীকে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য করা নিয়েও প্রশ্ন আছে দলের ভেতরে। তাঁকে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য করার আগে অনেকে আপত্তি করেছিলেন। তাঁরা বলেছিলেন, যুদ্ধাপরাধী হিসেবে তাঁর বিরুদ্ধে কথা আসবে। তাঁকে গ্রেপ্তারও করা হতে পারে। তখন দলের চেয়ারপারসন বলেছিলেন, তাঁকে স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হবে না। কিন্তু রহস্যজনক কারণে হঠাৎ করেই তাঁকে সদস্য করা হয়। এর আগে তিনি দলের কোনো পদে ছিলেন না। দলের অনেকে মনে করেন, অদৃশ্য চাপে তাঁকে স্থায়ী কমিটির সদস্য বানানো হয়েছে।
এ ছাড়া বিএনপির গঠনতন্ত্রেও উল্লেখ আছে 'বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার বিরোধী কোনো ব্যক্তিকে' সদস্যপদ দেওয়া হবে না।
বিএনপির বর্তমান অবস্থানকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধে বলে ব্যাখ্যা করছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। দলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ কালের কণ্ঠকে বলেন, 'যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে জাতিকে বিভক্ত করার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে বলে বিএনপি মহাসচিব যে কথা বলেছেন, তাতে প্রমাণিত হয় তারা প্রকাশ্যে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষ নিয়েছে। বিচারপ্রক্রিয়া ভণ্ডুল করতে তারা ষড়যন্ত্র করছে।'
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবসের আলোচনা সভায় বলেন, বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী এবং স্বাধীনতাবিরোধী চক্রকে প্রতিষ্ঠা করাই বিরোধী দল বিএনপির প্রধান কাজ। তিনি বলেন, জিয়ার পদাঙ্ক অনুসরণ করে তাঁর স্ত্রী খালেদা জিয়া যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে নিয়ে রাজনীতি করছেন। তাদের দিয়ে খালেদা জিয়া হরতাল ডাকাচ্ছেন এবং তাতে সমর্থন দিচ্ছেন।
সাবেক প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের কাছে এ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'স্পর্শকাতর এ বিষয় নিয়ে কিছু বলতে চাই না। কী ঘটছে তা সবাই দেখছেন।' তবে একটি রাজনৈতিক দলের নেতার সৌদি আরব ভ্রমণের পর থেকে তাঁর কাছে পরিস্থিতি ধোঁয়াশা মনে হচ্ছে। এই বিচার আদৌ হবে কি না, তা নিয়ে তাঁর সংশয় দেখা দিচ্ছে। তিনি বলেন, 'যুদ্ধাপরাধীদের বিচার যত দ্রুত সম্ভব শেষ করা উচিত। কারণ এসব স্পর্শকাতর বিষয়ে মানুষের মনোভাব খুব দ্রুত বদলায়।'
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান বলেন, 'বিএনপির অবস্থান সম্পর্কে তাঁরাই বলবেন। তবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সব দলেরই মেনে নেওয়া এবং সরকারকে সহায়তা করা উচিত।'
যুদ্ধাপরাধের বিচারের ব্যাপারে বিএনপির অবস্থান পরিবর্তন হয়েছে কি না বা সরকারের পাতা ফাঁদে বিএনপি পা দিচ্ছে কি না, জানতে চাওয়া হলে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, 'বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তাঁর গঠিত দল বিএনপি। এ দল যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে নয়। এর পরও আওয়ামী লীগের নেতারা বলে যাচ্ছেন, বিএনপি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায় না। তাঁদের এ ধরনের কথা থেকেই বোঝা যায়, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে চায়। বিরোধী দলকে ধ্বংস করতে একের পর এক ষড়যন্ত্র চলছে। আমরা শুরু থেকেই বলে আসছি, বিএনপি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায়। তথ্য-প্রমাণ সাপেক্ষে প্রকৃত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করলে তাতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। তবে আমাদের কথা, এ বিচার যাতে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত না হয়।'

যুদ্ধাপরাধ : দালাল আইনে বন্দির তালিকা মন্ত্রণালয়ে

Monday, February 14, 2011

১৯৭২ সালে দালাল আইনের আওতায় গ্রেপ্তার হয়ে যারা কারাগারে ছিল, তাদের নাম-ঠিকানা খুঁজে বের করা হচ্ছে। এরই মধ্যে এ রকম ৭৭৫ জন যুদ্ধাপরাধীর নাম-ঠিকানা পাওয়া গেছে। সেগুলো কারা কর্তৃপক্ষ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েও দিয়েছে।

সূত্র জানায়, ওই সময় দেশে মোট ২৩টি কারাগার ছিল। এর মধ্যে চারটি ছিল কেন্দ্রীয় কারাগার, বাকি ১৯টি জেলা করাগার। মূলত এই ২৩টি কারাগারেই সে সময় রাজাকার, আলবদর, আলশামসসহ প্রায় ৩৭ হাজার যুদ্ধাপরাধীকে বন্দি করা হয়েছিল। তবে এদের অধিকাংশই ছিল জেলা (বৃহত্তর জেলা) কারাগারগুলোতে। এখন পর্যন্ত আটটি কারাগারে বন্দি করে রাখাদের মধ্য থেকে ওই ৭৭৫ জনের নাম-ঠিকানা জোগাড় করেছে কারা কর্তৃপক্ষ। যথেষ্ট কাগজপত্রের অভাবে বাকি কারাগারগুলোর তালিকা এখনো পাওয়া যায়নি।
তবে কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আশরাফুল ইসলাম খান কালের কণ্ঠকে বলেন, বাকি কারাগারগুলোতে থাকা যুদ্ধাপরাধের আসামিদের নামও খুঁজে বের করার চেষ্টা অব্যাহত আছে।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কারা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কারা সদর দপ্তর থেকে ২০১০ সালের জুন মাসে তাঁরা নির্দেশ পান ১৯৭২ সালে দালাল আইনে আটক বন্দিদের তালিকা খুঁজে বের করার। এ নির্দেশের পর তাঁরা সর্বোচ্চ গুরুত
্ব দিয়ে ওই তালিকা খোঁজা শুরু করেন। কিন্তু এই কারাগারে সে রকম কোনো রেকর্ড খুঁজে পাওয়া যায়নি। সেই বিষয়টি তাঁরা সদর দপ্তরে লিখে জানিয়েছেন। তবে তিনি বলেন, এখনো নানাভাবে খোঁজার চেষ্টা চলছে। পাওয়া গেলে সদর দপ্তরে তালিকা পাঠানো হবে।
কারা সূত্রে জানা যায়, এ পর্যন্ত বাহাত্তরের দালাল আইনে বন্দি যে ৭৭৫ জনের নাম-ঠিকানা পাওয়া গেছে, তাদের মধ্যে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের ৩০৯ জন, নওগাঁ কারাগারের ২৮৬ জন, পাবনা কারাগারের ১০, কুমিল্লা কারাগারের ৮৩, পটুয়াখালী কারাগারের ৮, ময়মনসিংহ কারাগারের ২৪, জামালপুর কারাগারের ৩২ ও মুন্সীগঞ্জ কারাগারের ২৩ জন। এসব নাম পাওয়ার পর গত বছর জুলাই মাসে কারা সদর দপ্তর থেকে ওই তালিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নির্বাহী সভাপতি বিশিষ্ট লেখক-সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির কালের কণ্ঠকে বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সহযোগিতার দায়ে রাজাকার, আলবদর, আলশামসসহ স্বাধীনতাবিরোধী বিভিন্ন বাহিনীর প্রায় ৩৭ হাজার সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৭২ সালে দালাল আইন প্রণয়ন করা হয়। তবে বঙ্গবন্ধুর সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পর দালাল আইনে আটক ২৬ হাজার কারাবন্দি মুক্তি পায়। আর হত্যা, ধর্ষণ, হত্যাচেষ্টা, অগি্নসংযোগ, নির্যাতনসহ ১৮টি অপরাধের সঙ্গে জড়িত বাকি ১১ হাজার বন্দি ওই সাধারণ ক্ষমার আওতায় না আসায় তারা সে সময় মুক্তি পায়নি। পরে তাদের বিচারের জন্য ৭৩টি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। ওইসব ট্রাইব্যুনালে কিছু আসামির বিচার সম্পন্ন হয়। এর মধ্যে ৭৫২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তিও দেওয়া হয়েছিল। বাকিদের বিচার চলছিল। পরে তৎকালীন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জিয়াউর রহমান ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর দালাল আইন বাতিল করে দিলে বিচার হওয়া ও বিচারাধীন সব আসামিই মুক্তি পেয়ে যায়।
একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির পুস্তিকা 'যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া বানচালের ষড়যন্ত্র : সরকার ও নাগরিক সমাজের করণীয়' থেকে জানা যায়, ১৯৭৫ সালে দালাল আইন বাতিল হলেও ১৯৭৩-এর আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনটি বহাল আছে। এই আইনের আওতায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হওয়া সম্ভব।
সূত্র জানায়, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর নতুন করে যুদ্ধাপরাধের বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়। এরই অংশ হিসেবে গত বছর ২৫ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। পরে দালাল আইনে বন্দিদের নাম-ঠিকানা খুঁজে বের করার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়। কারা অধিদপ্তর থেকে সেই নির্দেশনা পাঠানো হয় দেশের সব কটি কারাগারে। বর্তমানে দেশে ৬৮টি কারাগার থাকলেও ওই সময় বৃহত্তর জেলাগুলোতে একটি করে কারাগার ছিল।
একটি কারাগারের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জেলার কালের কণ্ঠকে বলেন, 'হেড কোয়ার্টারের নির্দেশ পাওয়ার পরই আমরা কাজ শুরু করে দেই। কিন্তু কাগজপত্র পাওয়া বেশ কষ্টকর। অনেক খুঁজে যাদের নাম পেয়েছি তা পাঠিয়ে দিয়েছি সদর দপ্তরে।'
কারা মহাপরিদর্শক মো. আশরাফুল ইসলাম খান বলেন, 'মন্ত্রণালয় দালাল আইনে বন্দিদের নাম-ঠিকানা চাওয়ার পর আমরা যদ্দূর পারি কালেক্ট করে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিয়েছি। আরো পাওয়া যায় কি না তার চেষ্টা চলছে।'
যাদের তালিকা পাওয়া গেছে তাদের যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন শাহরিয়ার কবির। তিনি বলেন, 'বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লাহ কায়সারকে হত্যার অভিযোগে ১৯৭২ সালে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন ঢাকা সিটি আমির ও একাত্তরে আলবদর বাহিনীর নেতা খালেক মজুমদারকে সাত বছর কারাদণ্ড দিয়েছিলেন। দালাল আইনের সীমাবদ্ধতার কারণে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যায়নি। আমি মনে করি, এখন যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার বিচার হওয়া দরকার।'
একজন সাবেক কারা কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পর হাজার হাজার রাজাকারকে ফৌজদারি আইনে গ্রেপ্তার করে কারাগারে রাখা হয়েছিল। পরে তাদের দালাল আইনে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ওই আইনে বিচারও হয় অনেকের। অনেকে সাজাও পায়। তিনি বলেন, ১৯৭৪ সালে একটি অর্ডার হয়_যেসব রাজাকার সাজার অর্ধেক ভোগ করেছে, তাদেরকে মুক্তি দেওয়া হোক। এভাবে ১৯৭৪ সালের মার্চ মাসে অনেকে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে চলে যায়।
কারা সূত্র জানায়, ওই সময় দেশে যে ২৩টি কারাগার ছিল, তার মধ্যে ঢাকা, কুমিল্লা, রাজশাহী ও যশোরে চারটি কেন্দ্রীয় ও বাকি ১৯টি ছিল জেলা কারাগার। মহকুমাগুলোতেও কিছু সাব-জেল ছিল। তবে যুদ্ধাপরাধীদের জেলা কারাগারগুলোতেই বেশি রাখা হয়েছিল।

বিধবার ৬০ কোটি টাকার জমি সাকার দখলে

Thursday, February 10, 2011

যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর বিরুদ্ধে এবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অসহায় এক বিধবার ৩০ কাঠা জমি দখলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ জমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৬০ কোটি টাকা। বিগত জোট সরকারের সময় দলীয় ক্যাডার ও সন্ত্রাসী দিয়ে জমির মালিক ও তাঁর লোকদের উচ্ছেদ করে তাতে কিউসি প্রপার্টিজ লিমিটেডের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেন সাকা চৌধুরী।

দখলে সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি আনসার বাহিনী ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন জমির মালিক নাজমা বেগম। বর্তমানে ওই জমির একাংশে আনসারের তেজগাঁও থানা অফিস স্থাপন করা হয়েছে। দখল করা জমির নিরাপত্তা দিচ্ছেন ১০ জন আনসার সদস্য। সাকার অবৈধ স্বত্ব টিকিয়ে রাখতে সশস্ত্র আনসার বাহিনীর সম্পৃক্ততা নিয়ে স্থানীয় লোকজনের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানাধীন ১/ই ও ৩/৩, দক্ষিণ বেগুনবাড়ী (এফডিসি-সংলগ্ন পূর্ব পান্থপথ) নামক স্থানে ৩০ কাঠা জমির মালিক নাজমা বেগম। তিনি এই জমি সিএস, এসএ ও আরএস রেকর্ডে মালিক আব্দুস সোহবান বেপারীর কাছ থেকে সাফ কবলা দলিলমূলে প্রায় ৩০ বছর আগে কিনেছিলেন। যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৬০ কোটি টাকা। সর্বশেষ মহানগর জরিপেও জমির মালিক হিসেবে নাজমা বেগমের নাম রেকর্ডভুক্ত হয়েছে। সেখানে দোকানপাট ও গাড়ির শোরুম নির্মাণ করে দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখল করে আসছিলেন তিনি। বিগত জোট সরকারের সময় জাল দলিল করে সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে সাকা চৌধুরী জমিটি দখল করে নেন বলে অভিযোগ করেন নাজমা বেগম। সে সময় থানা-পুলিশ, আদালত ও প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোনো প্রতিকার পাননি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। এ ব্যাপারে ঢাকা জেলা আনসার কর্মকর্তা আলীম জানান, আনসার হেডকোয়ার্টার ও মহানগর পুলিশ কমিশনারের নির্দেশেই যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত সাকা চৌধুরীর দাবি করা জমির নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ওই জমি দখলে নিলেও সাকা চৌধুরী সেখানে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করতে পারেননি। এমনকি সীমানা-প্রাচীরও নয়। প্রয়োজনীয় পানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে না পারায় আনসারের পক্ষ থেকে কিউসি প্রপার্টিজকে একাধিকবার নোটিশ দেন জেলা কমান্ড্যান্ট। এ ছাড়া গত বছরের ১৯ এপ্রিল আনসারের পক্ষে প্লাটুন কমান্ডার মো. আব্দুল খালেক এ সম্পত্তি থেকে ফোর্স প্রত্যাহারে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারকে চিঠি দিলেও তা কার্যকর হয়নি। ওই চিঠিতে আনসারের অস্ত্র নিরাপদ নয়_এমন কথাও বলা হয়েছে।
পাহারারত ১০ সদস্যের আনসার দলের প্লাটুন কমান্ডার (পিসি) আবদুস সাত্তার জানান, জমির মালিকানা-স্বত্ব সম্পর্কে তাঁরা কিছুই জানেন না। তবে শুনেছেন, চট্টগ্রামের সাকা চৌধুরীর পারিবারিক কম্পানি কিউসি প্রপার্টিজ এ জমি গণপূর্ত অধিদপ্তর থেকে দীর্ঘমেয়াদি লিজ নিয়েছে। যদিও লিজের জমিতে বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস লাইনের ব্যবস্থা করতে পারেনি তারা। তিনি বলেন, কম্পানি আনসারদের জেনারেটর, এলপি গ্যাস ও পানি কেনার টাকা দিয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আনসার সদস্য জানান, সঠিক দলিলপত্র ও জমির স্বত্ব না থাকার কারণে কিউসি প্রপার্টিজের পক্ষে এসব সংযোগ নেওয়া সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া ২০১০ সালের ১ ডিসেম্বর ঢাকা জেলা আনসার কমান্ড্যান্ট মো. ঈশান আলী রাজা কিউসি প্রপার্টিজের কম্পানি সেক্রেটারি বরাবর লেখা এক চিঠিতে সেখানে আনসার ক্যাম্প রাখা আনসারের নীতিমালা পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেন। পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সমস্যার কথা উল্লেখ করে গত ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে এসব সমস্যা সমাধান না হলে ১১ ডিসেম্বর আনসার প্রত্যাহার করা হবে বলে ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত আনসার প্রত্যাহার করা হয়নি।
নাজমা বেগমের পরিবারের লোকজন বলেন, একটি অসহায় পরিবারের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধী সাকা চৌধুরীর পক্ষে আনসারের সরকারি অস্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে। অথচ বর্তমানে সরকারের নির্দেশে দেশের সব বিরোধপূর্ণ জমির নিরাপত্তায় থাকা আনসার বাহিনীর অস্ত্র প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে খোদ আনসার কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন। তাঁরা আরো জানান, দখলের আগে ওই জমিতে নাজমা বেগমের নামে বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের লাইন ছিল। পরে তাঁর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দখল হয়ে যাওয়া জমি থেকে এসব লাইন বিচ্ছিন্ন করা হয়।
নাজমা বেগমের ভাতিজা বাহার অভিযোগ করেন, প্রশাসনের কেউ কেউ এখনো যুদ্ধাপরাধী সাকা চৌধুরীর পক্ষে কাজ করছেন। জমি দখলে নেওয়ার জন্য সাকা চৌধুরীর লোকজন নাজমা বেগমের বিরুদ্ধে অন্তত ১৫টি মিথ্যা মামলা করেছে। এর মধ্যে জমির সঠিক দলিল উপস্থাপন ও আদালতে হাজির না হওয়ার কারণে ছয়টি মামলা খারিজ হয়ে গেছে। বর্তমানে ৯টি মামলা বিচারাধীন।
নাজমা বেগম অভিযোগ করেন, বিগত জোট সরকারের সময় সাকা চৌধুরী একবার তাঁকে মতিঝিলের অফিসে ডেকে এ নিয়ে বাড়াবাড়ি না করার হুমকি দিয়ে বলেন, 'কিছু টাকা-পয়সা দিয়ে দিই, জমির দাবি থেকে সরে যান।'
তেজগাঁওয়ের কিউসি প্রপার্টিজের দখলে থাকা এ জমি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে আছেন কম্পানির মহাব্যবস্থাপক মানিক রতন রায় ও ব্যবস্থাপক এমদাদুল হক। দখলে থাকা জমির স্বত্ব-মালিকানা প্রসঙ্গে তাঁরা জানান, ক্রয়সূত্রে এ জমির মালিক সাকা চৌধুরীর প্রতিষ্ঠান কিউসি প্রপার্টিজ। কিন্তু জমি কিভাবে কেনা হয়েছে, সেই দলিলপত্র ও রেকর্ড-পর্চা দেখতে চাইলে পরে দেওয়া হবে বলে জানানো হয়। পরে একাধিকবার যোগাযোগ করেও সেসব কাগজপত্র পাওয়া যায়নি।
গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিগত জোট সরকারের সময় সাকা চৌধুরী প্রভাব খাটিয়ে জমিটি দখল করার পর প্রচার করেন, গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে শিল্প প্লট হিসেবে তা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পরে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সেখানে ফ্ল্যাট নির্মাণের সাইনবোর্ড টাঙানোর বিষয়টি জানতে চাইলে কিউসির কর্মকর্তারা কোনো জবাব দিতে পারেননি।
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দিন আহমেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'একজন যুদ্ধাপরাধীর দখল করা জমিতে তেজগাঁও থানা আনসার অফিস স্থাপনের বিষয়টি রীতিমতো বিস্ময়কর। একদিকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে আদালতে সাকা চৌধুরীর বিচার হচ্ছে, অপরদিকে তাঁরই দখল করা সম্পত্তি রক্ষায় কাজ করছে আনসার!'
তেজগাঁও থানা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা শরীফ রেজানুল হক বলেন, বারবার চিঠি দিয়ে জানানো সত্ত্বেও ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের অফিস থেকে আনসার প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে না। বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস সুবিধা না থাকায় বর্তমানে তাঁদের মানবেতর অবস্থায় দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে বলে আনসার সদস্যরা জানান।
কিউসি প্রপার্টিজের মহাব্যবস্থাপক রতন মানিক রায় বলেন, জমিটি সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পারিবারিক কম্পানির জন্য মিজানুর রহমান নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে কেনা হয়েছে। তিনি এরশাদ সরকারের সময় গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে জমিটি দীর্ঘ মেয়াদে বরাদ্দ নিয়েছিলেন। জমির রেকর্ড সূত্রে মালিক সম্পর্কে তাঁদের কোনো ধারণা নেই। এটি সরকারের অধিগ্রহণ করা জমি বলে তিনি দাবি করেন। ব্যক্তিমালিকানা সম্পত্তি কিভাবে অধিগ্রহণ হলো এবং অধিগ্রহণের মামলা নম্বর কত, জানতে চাইলে তিনি এ-সংক্রান্ত কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি।
গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, বেগুনবাড়ী মৌজার বেশ কিছু জমি নিচু এলাকার অন্তর্ভুর্ক্ত ছিল। একসময় সেখানে ধান ও মাছের চাষ হতো, যার সঙ্গে তেজগাঁও শিল্প এলাকার কোনো সম্পর্ক নেই। বিগত এরশাদ সরকারের সময় নিচু জমিগুলো ভরাট করে বরাদ্দের নামে কিছু প্রভাবশালী লোক দখল করে নেয়।

সম্প্রীতির মহামিলন ক্ষেত্র by আবদুল হামিদ মাহবুব

Monday, February 7, 2011

একদিকে জ্বলছে ৯টি চিতা। তার পাশে সারিবদ্ধ ১২টি কবর। ১২টি লাশের জানাজা পড়াতে দাঁড়িয়েছেন একজন মৌলভী, তাঁর পিছে অস্ত্র হাতে দণ্ডায়মান একদল মুক্তিযোদ্ধা আর কিছু সাহসী মানুষ। ওদিকে চিতায় শব পোড়ানোর কাজটি একজন পুরোহিতের তত্ত্বাবধানে চলছে, তাঁকে সহযোগিতা করছেন হিন্দু-মুসলিম আরেক দল মানুষ।

এই দৃশ্য ১৯৭১ সালের ২০ ডিসেম্বর মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের পূর্ব-দক্ষিণ কোণের। সেই ১৯৭১ সাল থেকে মৌলভীবাজারবাসীর কাছে বেদনাবিধুর একটি দিন ২০ ডিসেম্বর। এ দিনটি স্থানীয় শহীদ দিবস হিসেবে পালন করেন মৌলভীবাজারবাসী। মিত্রবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধারা মৌলভীবাজারের বিভিন্ন স্থানে ক্যাম্প স্থাপন করে অবস্থান নেন। এ ধরনের একটি ক্যাম্প ছিল মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাত্র চার দিন অতিবাহিত হয়েছে। ওই ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধারা দুপুরের খাবার আয়োজনে ব্যস্ত। কেউ ভাতের থালা হাতে নিয়েছেন, কেউ খাবার সংগ্রহের জন্য লঙ্গরখানায় যাচ্ছেন। এ সময়ই প্রচণ্ড বিস্ফোরণে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ক্যাম্প লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। মুহূর্তে প্রায় অর্ধশত মুক্তিযোদ্ধার দেহ খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে এদিক-সেদিক ছড়িয়ে পড়ে। আকস্মিক এ ঘটনায় মৌলভীবাজারবাসী হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। তখন যাঁরা শহরে ছিলেন প্রথম অবস্থায় অনেকেইে বুঝতে পারেননি, কোথায় কী ঘটেছে। পরে খবর ছড়িয়ে পড়ে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ক্যাম্পের হৃদয়বিদারক ঘটনার কথা। দলে দলে মানুষ ছুটে আসে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। ভয়াবহ এ অবস্থা দেখে মানুষজন বুঝে উঠতে পারছিল না তাদের কী করণীয়। অবশেষে মিত্রবাহিনীর লোকজনও এখানে আসেন। তখনো আহতাবস্থায় যাঁরা ছটফট করছিলেন, তাঁদের কয়েকটি ট্রাকে উঠিয়ে চিকিৎসার জন্য ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এদিকে যাঁরা শহীদ হলেন, তাঁদের কারো শরীর থেকে মাথা উড়ে গেছে, কারো বা দেহের মধ্যাংশ ছিন্নভিন্ন হয়ে এদিক-সেদিক ছড়িয়ে পড়েছে। বিধ্বস্ত ক্যাম্প ভবনের পার্শ্ববর্তী গাছের ডালে কারো দেহের কোনো অংশ লেগে ঝুলে আছে। সে এক বীভৎস দৃশ্য। না দেখলে অনুমান করা কঠিন। ছিন্নভিন্ন এই দেহগুলো সৎকারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এসব মৃতের মধ্যে কে মুসলমান, কে হিন্দু_এসব শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। তার পরও যাঁদের পরিচয় কোনোভাবে মিলানো যায় সে অনুযায়ী মুসলমান-হিন্দু আলাদা করে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী কবরস্থ করা ও চিতায় পোড়ানোর উদ্যোগ নেন তৎকালীন গণপরিষদ সদস্য আওয়ামী লীগ নেতা মো. আজিজুর রহমানের নেতৃতে একদল সাহসী মানুষ। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিভিন্ন স্থানে ফেলে যাওয়া ও পুঁতে রাখা মাইন-গ্রেনেড উদ্ধার করে বিদ্যালয়ের ক্যাম্পে এনে জড়ো করে রাখা হয়েছিল। এ বিস্ফোরকগুলোই হঠাৎ বিস্ফোরিত হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। হিন্দু-মুসলিম এই শহীদদের ছিন্নভিন্ন দেহগুলো ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী জাতপাতের ঊধর্ে্ব উঠে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের মৃতদেহ হিসেবে সমাহিত করা হয় মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে। সেই ১৯৭১ সাল থেকে এ স্থানটি হচ্ছে সম্প্রীতির এক মহামিলন ক্ষেত্র।

কিশোরী মেয়েটা কখন যে সৈনিক হয়ে গেলাম! by তারামন বিবি বীরপ্রতীক

ইংরেজি তারিখ জানি না। তখন চৈত্র মাস। চারদিকে খালি গুলির শব্দ পাই। সাত ভাইবোন নিয়ে আমাদের অভাবী সংসার। বাবা মারা গেছেন অনেক আগে। আমার বয়স কত হবে? ১৩ কি ১৪। মানুষের বাড়িতে কাজ করি। কাজ জুটলে খাবার জোটে। না হলে উপোস। কিন্তু কাজ নেই গ্রামে। মিলিটারির ভয়ে পালাচ্ছে সবাই।

সেদিন সোমবার হবে, কাজের সন্ধানে বেরিয়েছি। কাজ পাইনি। বাধ্য হয়ে জঙ্গলে মুখিকচু তোলার চেষ্টা করছি। সেখানে উপস্থিত হন দুজন মানুষ। তাঁদের একজন পরিচিত। তাঁর নাম আজিজ মাস্টার, অপরজনকে চিনি না। আজিজ মাস্টার পরিচয় করিয়ে দেন তাঁর সঙ্গের মানুষটি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন মুক্তিযোদ্ধা, নাম হাবিলদার মুহিব। তিনি তাঁর ক্যাম্পে একজন রান্না করার জন্য লোক খুঁজছেন। আমি রাজি হই না। তখন তিনি আমাকে আমার মায়ের কাছে নিয়ে যান। ক্যাম্পে কাজ করার কথা শুনে মা প্রথমে আমাকে যেতে দেন না। এরপর অনেক কথাবার্তার মাঝে মুহিব সাহেব ধর্ম মেয়ে হিসেবে গ্রহণ করার কথা জানালে মা অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজি হন। পরদিন আমি চলে যাই দশঘরিয়া মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে। সেখানে রান্নার কাজ করতে থাকি। এরই ফাঁকে একদিন আমাকে এসএমজি ফায়ার করা শেখালেন আমার ধর্ম পিতা মুহিব হাবিলদার। টার্গেট প্র্যাকটিস করার জন্য গাছের উঁচু ডালে একটা ঘুঘু পাখিকে দেখিয়ে ফায়ার করার নির্দেশ দিলেন। প্রথম দিনেই সফল হলাম।
যেভাবে মুক্তিযোদ্ধা : ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকদের সঙ্গে কাজ করতে করতে ১৪ বছরের কিশোরী তারামন কখন যে সৈনিক হয়ে গেল, তা জানতে পারিনি। জানলাম সেদিন, যেদিন পাকিস্তানি বাহিনী গানবোটে এসে আমাদের ক্যাম্প আক্রমণ করল।
শ্রাবণের দুপুর, প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিল। ক্যাম্পের সবাই ভাত খাচ্ছিলাম। এমন সময় মুক্তিযোদ্ধা আজিজ মাস্টার আমাকে একটা ভেজা সুপারির গাছে উঠে পাকিস্তানি বাহিনীর কোথাও অবস্থান আছে কিনা, তা দেখার জন্য বললেন। আমি সেই গাছে উঠে দুরবিন দিয়ে নদীর দিকে দেখলাম। ইতিউতি দুরবিন ঘোরাতেই নজর আটকে যায় একটি লঞ্চের দিকে। একটু একটু করে আরো পরিষ্কার নজর এলে বুঝতে পারি এটা শত্রুর গানবোট। এই গানবোটে পাকিস্তানি বাহিনী এগিয়ে আসছে আমাদের ক্যাম্পের দিকে।
সর্বনাশ! চিৎকার করে উঠি_সাবধান পাকিস্তানিরা আসছে...। সবাই ভাত খাওয়া ছেড়ে অস্ত্র হাতে পজিশন নিল। দ্রুত গাছ থেকে নেমেই তাঁদের সঙ্গে আমিও চায়নিজ এসএমজি নিয়ে পজিশনে শুয়ে পড়লাম। শুরু হলো প্রচণ্ড লড়াই। গুলি চালাচ্ছি। ওদের গুলি এসে আমাদের পাশের গাছে লাগছে। গাছের ছোট ছোট ডাল আর পাতা আমার গায়ের ওপড় পড়ছে। আমার ছোড়া একটি গুলি লাগল এক পাকিস্তানি হানাদারের গায়ে। আরো উৎসাহে ম্যাগাজিন লোড করি। ব্রাশফায়ার করি। কাপড় ছেঁড়ার শব্দের মতো গুলি অবিরাম বের হতে থাকে। মাঝে মধ্যে কলজে কাঁপানো হেভি মেশিনগানের আওয়াজ কানে আসছে। এভাবে সন্ধ্যা পর্যন্ত লড়াই চলার পর পাকিস্তানি বাহিনী ফিরে যায়। বিজয়ের উল্লাস আর জয়বাংলা ধ্বনিতে প্রকম্পিত হয় আমাদের ক্যাম্প এলাকা।
আমার আমিকে সেদিন আবিষ্কার করলাম, কাজের মেয়ে থেকে একজন সৈনিক হিসেবে।
এরপর আমরা আর এখানে ক্যাম্প রাখা নিরাপদ মনে করলাম না। দশঘরিয়া থেকে চলে এলাম কেতনটারীতে। সেখানে আসার পর শুরু হলো পাকিস্তানিদের বিমান হামলা। ১০-১২টি করে বোমা ফেলে চলে যায় বিমানগুলো। গোটা গ্রাম প্রায় পুড়ে শেষ। মারা যায় অনেক মানুষ। নির্দেশ দেওয়া হলো বাংকার খোঁড়ার। এক রাতেই ১৫ বাই ১২ ফুট কেটে ফেললাম আমরা। বিমানের শব্দ পেলেই আমরা বাংকারে অবস্থান নিই। সুযোগ পেলেই বিমান লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ি। শুরু হয় এক অন্যজীবন।
আমার দুচোখে তখন স্বপ্ন বাসা বাঁধে। দেশ শত্রুমুক্ত হবে, স্বাধীন হবে। আমরা আমাদের সব ভাইবোনসহ গোটা পরিবার পেটপুরে ভাত খেতে পারব।
একদিন দুপুরের দিকে একটা জঙ্গি বিমান এল। এই বিমানটা আগের বিমানগুলোর মতো নয়। এটা থেকে কোনো বোমা ফেলা হলো না। শুধু একটা চক্কর দিয়ে যখন ফিরে যাচ্ছিল তখন আমরা গুলি ছুড়তে চাই। কিন্তু বাধা দেন আজিজ মাস্টার। ক্যাম্প থেকে আমাদের জানানো হলো তাঁদের কাছে খবর এসেছে দেশ স্বাধীন হয়েছে। পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে। আনন্দে আমার দুচোখ দিয়ে পানি আসতে শুরু করল। ক্যাম্পে মুহুর্মুহু স্লোগান উঠছে জয় বাংলা। কণ্ঠ মেলাই আমি...।
আরেক জীবন : অনেক স্বপ্ন নিয়ে দেশ স্বাধীন হলো। শুরু হলো আরেক জীবন। রাজীবপুর ফিরে এলাম। আম্মা ভাইবোনদের ফিরে পেলাম। অভাব আবার আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলল। কাজ নিলাম অন্যের বাড়িতে। আমার বড় বোনটার বিয়ে হচ্ছিল না। কারণ আমি ক্যাম্পে ছিলাম বলে। সবাই বলে আমি ভালো মেয়ে নই। একদিন এই গ্রামেরই আবদুল মজিদ নামে একজন আমাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেন। ১৯৭৫ সাল। ১০১ টাকা দেনমোহরে বিয়ে হয় মজিদের সঙ্গে। অভাব আর নদীভাঙনের শিকার হই বারবার। জীবন যেন আর চলে না। এরই মধ্যে যক্ষ্মা আমার শরীরে বাসা বাঁধে। ওষুধ কেনার টাকা নেই।
শেষ হয় দুঃখের দিন : ১৯৯৫ সাল। এভাবেই কষ্টের জীবন চলার ফাঁকে একদিন ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজের প্রভাষক বিমল কান্তি দে এসে আমার খবর নেন। আমাকে অনেক প্রশ্ন করার ফাঁকে জানতে পারি, আমি একজন বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। এরপর ভোরের কাগজে ছাপা হয় আমাকে খুঁজে পাওয়ার রিপোর্ট। ঢাকায় নিয়ে যায় উবিনীগ নামের একটি এনজিও। সংবর্ধনা দেয় তারা। ভোরের কাগজ তহবিল গঠন করে আমার জন্য। তারা আমাকে একটি বাড়ি করার জন্য জায়গা ও আবাদি জমি কিনে দেয়। এ জমিতে আরডিআরএস নামের একটি সংস্থা গড়ে দেয় বাড়ি। এরপর একের পর এক আমাকে সংবর্ধনা দেয় বিভিন্ন সংগঠন। সরকার কুড়িগ্রাম শহরের উপকণ্ঠে আরাজী পলাশবাড়ীতে জমি দেয়। ২০০৭ সালে সেখানে একটি আধাপাকা বাড়ি তৈরি করেন কুড়িগ্রাম বিডিআরের তৎকালীন কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল সুমন বড়ুয়া।
স্বপ্নই থেকে যায় : এখন অভাব আমাকে আর ছুঁতে পায় না ঠিকই, কিন্তু যেভাবে দেশটিকে দেখতে চেয়েছিলাম সেভাবে এখনো দেশটিকে পাইনি। অনেক রক্ত আর আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত পতাকা যখন রাজাকারের গাড়িতে ওড়ে তখন আক্রোশ আর অপমানে ক্ষুব্ধ হই। এখনো মুক্তিযোদ্ধারা অনাহারে থাকেন। বিনা চিকিৎসায় মারা যান। আমি এই বাংলাদেশ দেখতে চাইনি। চেয়েছিলাম শত্রুমুক্ত সুন্দর একটি বাংলাদেশ। যেখানে সবাই সুখে থাকবে।
পরিচিতি : তারামন বিবির জন্ম ১৯৫৭ সালে কুড়িগ্রামের রাজীবপুর উপজেলার কোদালকাটি ইউনিয়নের শংকর মাধবপুর গ্রামে। স্বামী আবদুল মজিদ, পেশায় কৃষক। বাবা মৃত আবদুস সোবাহান, মা কুলসুম বেওয়া। তাঁর এক ছেলে এক মেয়ে।
তারামন বিবি বর্তমানে রাজীবপুর সদরের কাচারিপাড়ায় বাস করছেন। এই বাড়ির ভিটে ও আবাদি জমিসহ প্রায় এক একর জমি ভোরের কাগজ কিনে দেয়। তারপর সেখানে বেসরকারি সংস্থা আরডিআরএস বাড়ি তৈরি করে দেয়। এ ছাড়া কুড়িগ্রাম শহরের উপকণ্ঠে সরকার তাঁকে একটি জমি দান করে। এই জমির ওপর কুড়িগ্রাম বিডিআরের তৎকালীন কমান্ডিং অফিসার সুমন বডুয়া একটি আধাপাকা বাড়ি তৈরি করে দেন।
তারামন বিবি বীরপ্রতীক বর্তমানে অসুস্থ। শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। প্রতিদিনই তাঁকে ডাক্তারের কাছে যেতে হয়।

অনুলিখন : পরিমল মজুমদার।

১৬ ডিসেম্বরের শিক্ষা by আই এ রেহমান

Tuesday, January 25, 2011

পাকিস্তানের নীতিনির্ধারকেরা ১৬ ডিসেম্বর এলেই উপলক্ষকেন্দ্রিক আলাপ-আলোচনায় মেতে ওঠেন। অবশ্য এর সারবত্তা সম্পর্কে কেউই সন্তুষ্ট হন না। পাকিস্তানের স্থপতিরা সমগ্র উপমহাদেশে ১৯৪৫-৪৬ সালে মুসলিম লীগের বিরাট নির্বাচনী বিজয় ও এক বছর বাদের দেশভাগে বড় বেশি আপ্লুত ছিলেন।
তাঁদের কাছে স্বায়ত্তশাসনের জন্য প্রাদেশিক ইউনিটগুলোর আকাঙ্ক্ষার তীব্রতা উপেক্ষিত হলো। ১৯১৯ সালের দ্বৈতশাসন-ব্যবস্থায় প্রাদেশিক কর্তৃপক্ষকে কৃষি, শিক্ষা, গণপূর্ত ও স্থানীয় সরকার নিয়ন্ত্রণের এখতিয়ার দেওয়া হয়েছিল। এর কারণ ছিল জনসংখ্যার বৃহত্তর অংশের সঙ্গে এসব বিভাগের ব্যাপক সংশ্লিষ্টতা। সে কারণেই ফজল-ই-হুসেইন কায়েদে আযমকে পাঞ্জাব ও সিকান্দার হায়াত থেকে শতভাগ দূরে থাকতে বলেছিলেন। আর সেটা ছিল লাহোর প্রস্তাবে বর্ণিত পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অন্যান্য প্রদেশে ছিল একই অনুভূতি। লাহোর প্রস্তাবের রূপকারেরা কিন্তু ভাষা-বিষয়ে প্রকৃত সত্য স্বীকার করেছিলেন। আর পরিহাস হলো, সেই একই সত্য পাকিস্তানি শাসকদের পুরো ৬৩ বছর ধরে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে।
প্রাদেশিক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ক্ষমতা লাভে পূর্ব বাংলার মানুষের আকাঙ্ক্ষা ছিল শুধুই একটি বাড়তি মাত্রাগত ভিন্নতা। ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৭—এই এক দশক বাংলার জনগণ ক্ষমতার অংশীদারি পেয়েছিল। বাংলার সরকারগুলোর নেতৃত্বে ছিলেন মুসলিম প্রধানমন্ত্রীরা। কিন্তু তাঁরা এ কথা ভুলে যাননি, ১৯০৫ সালে প্রথম বাংলা ভাগের সময় তাঁরা কী করে অধিকতর ক্ষমতার স্বাদ পেয়েছিলেন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ তাঁদের এমন একটি প্রদেশ দিয়েছিল, যেমনটা তাঁদের ১৯০৫ সালেই ছিল। পশ্চিমবঙ্গ, বিশেষ করে, কলকাতার ওপর তাঁদের যে কর্তৃত্ব ছিল, সেটা হারানোর একটা বেদনা ছিল তাঁদের। শুধু পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দিলে তাঁদের সেই বেদনা প্রশমিত হতে পারত।
পাকিস্তান একটি সাফল্যের গল্প হোক—সেটা বাঙালিরা দেখতে চেয়েছিল। সে কারণে তারা ক্ষমতার প্রশ্নে তাদের ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে সংযমের পরিচয় দিয়েছিল। গণপরিষদে তারা সংখ্যালঘু প্রদেশ থেকে মুসলিম লীগের নেতাদের নির্বাচিত করতে রাজি হয়েছিল। আমলাদের পদোন্নতি প্রদানের ফর্মুলা তারা গ্রহণ করেছিল, যদিও একজন বাদে সেই পদোন্নতির সুবিধা যাঁরা পেয়েছিলেন, তাঁরা সবাই ছিলেন অবাঙালি। নতুন দেশের রাজধানী হিসেবে তারা করাচিকে মেনে নেয়; এমনকি গভর্নর জেনারেল, প্রধানমন্ত্রী, গণপরিষদের সভাপতি এবং পূর্ব বাংলার গভর্নর পদে অবাঙালিদেরও তারা মেনে নেয়। অথচ বাঙালিদের এই মহানুভবতার প্রশংসা পশ্চিম পাকিস্তানিরা করতে পারেনি। এর পরিবর্তে পূর্ব বাংলার জনগণকে তাদের জাতিসত্তার শেকড়-সন্ধানের দিকে ঠেলে দেওয়ার প্রবণতা দেখানো হলো।
দেশভাগের আগেই কায়েদে আযম পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের আকাঙ্ক্ষা সংক্ষেপে স্বীকার করেছিলেন। বাংলাকে অবিভক্ত রাখতে সোহরাওয়ার্দীর নেওয়া উদ্যোগের প্রতি সমর্থনের মধ্য দিয়ে আমরা তার বহিঃপ্রকাশ দেখি। কিন্তু পরবর্তীকালে পাকিস্তানের নেতারা বাঙালিদের স্বায়ত্তশাসনের দাবির প্রতি তাঁদের কর্ণকুহর রুদ্ধ করে রেখেছিলেন। এর শুরুটা ঘটেছিল অপরিপক্ব ভাষানীতির মধ্য দিয়ে। মুজিবের কথায় হয়তো অতিরঞ্জন ছিল। তিনি বলেছিলেন, গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে একজন বাঙালি সদস্যকে তাঁর মাতৃভাষায় শপথ গ্রহণের অধিকার প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল, সেটাই ছিল পাকিস্তান থেকে বাঙালিদের দূরে সরে যাওয়ার সূচনা। কিন্তু সত্য হলো, দেশের শাসকগোষ্ঠী এটা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন যে তাঁদের ভাষার অধিকার ক্ষুণ্ন করার মধ্য দিয়ে তাঁদের পরিচয় ও সার্বভৌমত্ব হুমকি-কবলিত হওয়া ছিল প্রথম সতর্কবার্তা।
কেন্দ্রীয় সরকারের নীতিগুলোর কারণে পূর্ব বাংলার জনগণের বুঝতে অল্প সময় লেগেছিল যে তাদের মর্যাদা হলো একটি উপনিবেশের। পশ্চিম পাকিস্তানের প্রদেশগুলোতে নির্বাচন সম্পন্ন হলো ১৯৫১-৫২ সালে। আর বাঙালিদের অপেক্ষায় রাখা হলো ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত এবং তারপর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শান্তিতে শাসন করতে দেওয়া হলো না। ইস্কান্দার মির্জাকে পাঠানো হয়েছিল তাদের দমিয়ে রাখার কাজে। এভাবে পূর্ব বাংলার মানুষ ধীরে ধীরে তাদের বঞ্চনার স্বরূপ বুঝতে পারল। আইয়ুব খান বাঙালিদের অধিকার এবং বড় বড় প্রকল্প হাতে নেওয়ার মধ্য দিয়ে একটা সামঞ্জস্য আনার চেষ্টা করেছিলেন। তবে তিনি তাদের পেছনে লাগিয়ে দিলেন মোনেম খানকে। একই সঙ্গে লাহোরে প্রতিরক্ষা বহুগুণে শক্তিশালী করে পূর্ব বাংলাকে অরক্ষিত রাখার মনোভাব প্রকাশ পেল। এটা ছিল একটা মধ্যযুগীয় কৌশল, যখন সামরিক বিষয় ছিল একান্তভাবে রাষ্ট্রীয় বিষয়; প্রতিরক্ষার সঙ্গে জনগণের কোনো সম্পর্কই বিবেচনায় নেওয়া হতো না।
ইয়াহিয়া খান পাকিস্তান অবলোপনের সভাপতিত্ব করতে দৃশ্যত সংকল্পবদ্ধ ছিলেন। তিনি তাঁর সাধারণ নির্বাচনের ‘উপঢৌকন’ ব্যবহার করতে চেষ্টা করলেন। সংবিধান তৈরির প্রক্রিয়ায় তিনি ও তাঁর শ্রেণীস্বার্থ সুরক্ষার কাজে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিদের বাগে আনতে চেষ্টা করলেন। তাঁর এই কৌশল ব্যর্থ হলো। চাপালেন যুদ্ধ, যে যুদ্ধে জয়ের কোনো সম্ভাবনা ছিল না। স্বাধীনতার সংগ্রাম পরিচালনায় বাঙালিদের সাহস ও সহিষ্ণুতা ধারণার চেয়ে দ্রুততম সময়ে সাফল্য এনে দিল।
কোনো রাজনৈতিক বিপর্যয়ের বিশ্লেষণ চার দশক পরে সহজ ও একপেশে মনে হতে পারে, যতটা উল্লিখিত বিবরণ দিকনির্দেশক ছিল। সত্য বটে, একটি অনভিজ্ঞ, সম্পদের সংকটে ভুগতে থাকা এবং কেন্দ্রের অপ্রতুল নেতৃত্ব পূর্ব বাংলার আকাঙ্ক্ষা পূরণে সক্ষম ছিল না। নিরাপত্তা-সমস্যার পূর্বজটিলতা এবং বৈদেশিক ফ্যাক্টরগুলো পরিস্থিতিকে জটিল করেছিল।
ঐতিহাসিক ও বিশ্লেষকেরা পূর্ব বাংলার উপাখ্যানে কে নায়ক এবং কে খলনায়ক, তা চিহ্নিত করার প্রচেষ্টা এবং ঠিক কোন ঘটনায় পাকিস্তান ভাঙতে শুরু করেছিল, তা নিরূপণে নিজেদের বিরত রাখতে অনিচ্ছুক হতেই পারেন। সম্ভবত এটা উপলব্ধি করার সময় এসেছে যে প্রথম দিন থেকে পূর্ব বাংলার প্রতি ভ্রান্ত নীতি অনুসরণ করার পরিণতিতে পাকিস্তানকে তীব্র বেদনা সইতে হয়েছে।
কারণ যা-ই হোক না কেন, আমাদের রাষ্ট্রের স্থপতিরা প্রাদেশিক রাজনীতির চড়াই-উতরাই সম্পর্কে দূরদর্শী হতে পারেননি। গোলাম মোহাম্মদ যখন নাজিমউদ্দিনকে অপসারিত করলেন, গণপরিষদ বিলুপ্ত করলেন, তখন তিনি আসলে সাংবিধানিকতার প্রতি শাসকদের অঙ্গীকারের বিষয়ে পূর্ব বাংলার আস্থার জায়গাটিকে ধ্বংস করেছিলেন। উন্নয়ন ঘুষ এবং দালাল সৃষ্টি করে নিয়ন্ত্রণ করার মধ্য দিয়ে বাঙালি জনগণের হূদয় জয়ের কোনো চেষ্টা সফল হয়নি। জনগণ কখনোই রাজনৈতিক ক্ষমতা, সামাজিক অগ্রগতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতি তাঁদের অধিকার সমর্পণ করেনি, করবে না। পাকিস্তান রাষ্ট্রের অখণ্ডতা রক্ষায় দুই দশক ধরে ধর্ম ব্যবহারের প্রয়াসকে বাঙালিরা লক্ষ করেছে। বাঙালিরা তাদের পশ্চিম পাকিস্তানি ভাইদের তুলনায় অনেক বেশি ধর্মপরায়ণ। কিন্তু জবরদখল ও নিপীড়নের কাজে তারা ধর্মকে কখনো ব্যবহার করেনি। পাকিস্তান মানবজাতির (আরবসহ) ইতিহাসের পাঠ থেকে শিক্ষা না নেওয়ার মূল্য দিয়েছিল। ধর্ম ইতিহাসের কোনো পর্বেই ধেয়ে আসা জাতীয়তাবাদের স্রোতকে পরাস্ত করতে পারেনি।
১৬ ডিসেম্বর হলো এমন একটি জুতসই উপলক্ষ, যখন এটা উপলব্ধি করার সময়, ইতিহাসের বিধান মোটেই বদলে যায়নি।
আই এ রেহমান: পাকিস্তানি সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী।

ডিসেম্বর '৭১-এর কিছু স্মৃতি by জাফর আলম

Sunday, January 23, 2011

আমি ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর চট্টগ্রামে। সঙ্গে আমার স্ত্রী রহিমা, দুই কন্যা পারভীন ও জাবীন। উঠেছি ছোট ভাই বদিওলের আন্দরকিল্লার ঘাট ফরহাদবেগের বাসায়। আমার ভাই বদিওল তখন কঙ্বাজারে। ছোট বোন প্রয়াত জহুরা ছিল। আমাদের জন্য রাতে জহুরা খিচুড়ি রেঁধেছিল।

ওদিকে সেদিন বিকেলে চট্টগ্রাম লালদীঘির ময়দানে মুসলিম লীগ আয়োজিত জনসভায় মুক্তিযোদ্ধারা বোমা ফাটিয়েছে। জনসভা পণ্ড। অখণ্ড পাকিস্তান রক্ষার জন্য এ জনসভার আয়োজন করা হয়। সন্ধ্যা থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত চট্টগ্রামে কারফিউ জারি করা হয়েছে। আমার শ্বশুর মরহুম মকবুল আহামদ নাজির এসডিও কোর্টের পিয়ন রশীদকে কঙ্বাজার থেকে চট্টগ্রাম পাঠিয়েছে আমাদের নেওয়ার জন্য। কারফিউর কারণে বেচারি আমাদের বাসায় আসতে পারেনি, টেলিফোনে যোগাযোগ করেছিল। তার সঙ্গে সাব্যস্ত হলো, ৪ ডিসেম্বর সকালে কারফিউ প্রত্যাহৃত হলে আমাদের বাসায় এসে নিয়ে যাবে। হোটেল সফিনার সামনে চট্টগ্রাম থেকে কঙ্বাজারগামী বাস ছাড়বে।
৩ ডিসেম্বর রাত ৩টায় দেখলাম, কর্ণফুলী নদীর মোহনা থেকে পাকিস্তান নৌবাহিনীর জাহাজ থেকে শেলিং হচ্ছে। জাহাজের গোলা এসে পড়ছে কোর্ট বিল্ডিংয়ে। আর আগুনের ফুলকি বাসার ছাদ থেকে দেখা যাচ্ছে। আর আকাশে ভারতীয় বিমানের সঙ্গে পাকিস্তানি মিগ বিমানের কক ফাইট হচ্ছে। ঘুম থেকে ওঠে আমরা সবাই ছাদের ওপর গিয়ে এ দৃশ্য উপভোগ করেছি।
সকালে রশীদ বাসায় এসে আমাদের চট্টগ্রামের সফিনা হোটেলের সামনে নিয়ে গেল। কঙ্বাজারে যাওয়ার কোনো গাড়ি ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের কারণে তখন যোগাযোগব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক। সকাল ১০টা পর্যন্ত অপেক্ষার পর আমরা কাশিমবাজার হোটেলে গিয়ে দুপুরের আহার সেরে নিই। ১১টায় কো-অপারেট ও বুক সোসাইটির সামনে একটি কঙ্বাজারগামী কোস্টার পাওয়া গেল। আমরা এ কোস্টারে উঠেছি। আমার স্ত্রী ও দুই কন্যাকে গাড়িতে বসিয়ে আমি নিচে দাঁড়িয়েছিলাম। আমরা সবাই গাড়ি ছাড়ার অপেক্ষায়। একজন স্বাস্থ্যবান তরুণ পরনে প্যান্ট, গায়ে হাফ শার্ট আর পায়ে চামড়ার স্যান্ডেল পরা দোকানের সামনে দাঁড়িয়েছিল। বয়স হবে ১৮ থেকে ১৯। হঠাৎ পাকিস্তান আর্মির একটি পিকআপ ভ্যান এসে হাজির। পেছনে ত্রিপলে ঢাকা। সামনে সিট থেকে একজন সাদা পোশাকধারী পাকিস্তানি সামরিক অফিসার আমেরিকান পিস্তল হাতে নিয়ে নেমেই হাঁক দিল। 'কুই নেহি হিনেগা' অর্থাৎ কেউ নড়বে না। তারপর পিকআপ গাড়ির পেছনের ত্রিপল তুলল। আমি পাশে দাঁড়িয়ে এ দৃশ্য দেখছিলাম।সামরিক অফিসারটি যখন পিকআপ ভ্যানের পেছনের ত্রিপল তুলল, দেখলাম, বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা লুঙ্গি ও প্যান্ট পরা, পেছনে দড়ি দিয়ে মোড়ানো হাত দুটি বাঁধা। ওরা সবাই কাঁদছে। অফিসারটি বলল, 'কউন হ্যায় দেখা দো' অর্থাৎ কে সে দেখিয়ে দাও। পিকআপের ভেতর থেকে একজন ইশারায় আমাদের পাশে দাঁড়ান মুক্তিযোদ্ধা তরুণকে দেখিয়ে দেয়। চিলে যেমন ছোঁ মেরে মুরগি নিয়ে যায়, তেমনি পাকিস্তানি সামরিক অফিসারটি তরুণটিকে ধরে নিয়ে পিকআপ ভ্যানে তুলে নিল আর ত্রিপল ঢেকে দ্রুত চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টের দিকে চলে যায়। এসব তরুণ মুক্তিযোদ্ধা আর ফিরে আসেননি, আর বর্বর হানাদার বাহিনী তাঁদের হত্যা করেছিল নিশ্চয়। তাঁদের কান্না দেখে আমার চোখেও অশ্রু দেখা দিয়েছিল।
৪ ডিসেম্বর সকাল ১১টায় রওনা দিয়ে আমরা সন্ধ্যায় কঙ্বাজার পেঁৗছি। দোহাজারী-চিরিঙ্গা আর রামু বাসস্টেশনে আমাদের গাড়ি চেক হয়। তবে রক্ষা পেয়েছি, গাড়িতে দুজন ইপিআর বাহিনীর সদস্য যাত্রী ছিল। গাড়ি চেক করতে এলেই ওরা বলত, 'এ্যাঁহা কুই মুক্তি নেহি হ্যায়' অর্থাৎ এখানে কোনো মুক্তিযোদ্ধা নেই। দ্রুত গাড়ি স্টেশন ত্যাগ করে।
সন্ধ্যায় বাহারছড়ায় আমাদের বাড়িতে পেঁৗছে দেখি, সারা শহর অন্ধকার, নিষ্প্র্রদীপ মহড়া চলছে। কঙ্বাজার বিমানবন্দরে ভারতীয় জঙ্গি বিমান রকেট হামলা করেছে। টার্গেট ছিল বিমানবন্দরের অফিস ও বিমানবন্দর। আমরা জেনেছি, এই বিমান হামলায় কঙ্বাজার বিমানবন্দরে অ্যাডভোকেট মঈদুর রহমান চৌধুরী নিহত এবং বাহারছড়ার বিমানবন্দরের কর্মচারী মঞ্জুর গুরুতর আহত। পরে সে মারা যায়। আমার ফুফাতো ভাই কাদের বিমানবন্দরের কর্মচারী। সে কোনোমতে পরিখায় লুকিয়ে জীবনে রক্ষা পায়। ৫ ডিসেম্বর রাতে ভারতীয় জঙ্গি বিমান কঙ্বাজার বিমানবন্দরে বোমাবর্ষণ করে। আমি তখন সপরিবারে আমার শ্বশুর মকবুল আহামদ নাজিরের বাসায় অবস্থান করছি। এ বোমাবর্ষণে বাহারছড়াসহ আশপাশের বাড়িঘর কেঁপে ওঠে। আমরা ৬ ডিসেম্বর বাহারছড়ার বাড়ি ছেড়ে সদলবলে কলাতলীতে নিরাপদ স্থানে চলে যাই আমার শাশুড়ির পৈতৃক বাড়িতে। সে আরেক কাহিনী। স্বাধীনতার ৩৯ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু প্রতিবছর যখন বিজয়ের মাস ডিসেম্বর আসে তখন আমার চোখে একাত্তরের ৪ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের বাসস্ট্যান্ড থেকে একজন তরুণ মুক্তিযোদ্ধাকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক ধরে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য চোখে ভেসে ওঠে। আমি আবেগাপ্লুত হই, উদ্বেলিত হই আর আমার দুচোখে দেখা যায় বেদনার অশ্রু। শুধু মনে প্রশ্ন জাগে, স্বাধীনতার ৩৯ বছর কেটে গেছে, কিন্তু আমরা কী এখনো পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসরদের রাহু থেকে মুক্ত হতে পেরেছি? নাকি রাজনীতির ঘূর্ণাবর্তে ওরা এখনো সক্রিয়?

অপরাজেয় সেই ট্যাংক

একাত্তরের রণাঙ্গনে মিত্র বাহিনীর অপরাজেয় সেই ঐতিহাসিক ট্যাংকটি কলকাতার ব্রিগেড মাঠে সংরক্ষিত রয়েছে। যুদ্ধজয়ী এ ট্যাংকটি দেখতে অনেকেই সেখানে যান।

রেইনট্রির ছায়ায় দাঁড়িয়ে ট্যাংক দেখেন, আর বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাস জানার চেষ্টা করেন। ভারতের ইস্টার্ন কমান্ড এ ট্যাংকটি পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে উপহার দিয়েছিল। এর পর থেকে যত্ন করে ট্যাংকটি ঐতিহাসিক গড়ের মাঠের পাশে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রদর্শনীর জন্য রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে ভারতের অবদান কম নয়। এক কোটি শরণার্থীর খাবারের পাশাপাশি ভারত সরকার তাদের সেনাবাহিনীকে রণাঙ্গনে পাঠায়। অনেক ভারতীয় সৈন্য বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে জীবন উৎসর্গ করেছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী মার্চ মাসেই বাঙালিদের সংগ্রামের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেন। বিএসএফ সীমান্ত বন্ধ করে দেয়। পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা রাজ্যে শরণার্থী শিবির চালু করা হয়। এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়। ওই শরণার্থীর পেছনে যুদ্ধকালীন ৯ মাসে ভারত সরকারের খরচ প্রায় হয় ৩৭২ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিদেশি সাহায্য পাওয়া যায় ২৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। (সূত্র : আনন্দ বাজার)। ভারতের সেনাবাহিনী গেরিলা যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ মেজর জেনারেল ওবানের সহযোগিতায় গড়ে তোলা হয় মুজিব বাহিনী। ১৯৭১ সালের নভেম্বরে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর যৌথ কমান্ড গঠনের পর এর অধিনায়ক করা হয় লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরাকে। এর পর যৌথ বাহিনী সীমান্ত অতিক্রম করে পূর্ব পাকিস্তানের ভূখণ্ডে ঢুকে পড়ে। ৬ ডিসেম্বর যশোর জেলাকে শত্রুমুক্ত করে যৌথ বাহিনী ঢাকার দিকে এগোতে থাকে। ১৬ ডিসেম্বর সকালে যৌথ বাহিনী রাজধানী ঢাকায় প্রবেশ করে। বিকেলে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে যৌথ বাহিনীর কমান্ডার লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে পাকিস্তানি বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের পক্ষে লে. জে. নিয়াজি আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন। পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নেয় নতুন দেশ বাংলাদেশ। কলকাতার সংরক্ষিত সেই ঐতিহাসিক অপরাজেয় ট্যাংকের মতো একাত্তরের রণাঙ্গনের কোনো ট্যাংক, বিমান, কামান দেশে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

গুলি চালানো শিখতে লেগেছিল মাত্র আধঘণ্টাঃ শিরিন বানু মিতিল

আমি তখন পাবনা জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সভানেত্রী। আমার মা সেলিনা বানু বামপন্থী আন্দোলনের প্রথম সারির নেত্রী ছিলেন। আমার নানার বাড়ি ছিল এককালে বামপন্থীদের শক্ত ঘাঁটি। সুতরাং এই বাড়ির সবাই আমরা রাজনৈতিকভাবে বিশেষ সচেতন ছিলাম।

একাত্তরের মার্চের সেই দিনগুলোতে রাজনৈতিক উত্তাপে বাইরের অঙ্গন ও আমাদের গৃহের প্রাঙ্গণ এক হয়ে গিয়েছিল। পাবনার প্রাথমিক প্রতিরোধ পর্ব হয় একাত্তরের ২৫ মার্চ থেকেই। চলে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনারা পাবনা শহরে ঢোকে। জারি হয় কারফিউ। ২৬ মার্চ তারা রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেপ্তার শুরু করে। সাধারণ মানুষের ওপরও নেমে আসে অত্যাচার। জেলা প্রশাসন সিদ্ধান্ত নেয় পাল্টা আঘাত হানার। ২৭ মার্চ রাতে পুলিশ লাইনের যুদ্ধ শুরু হয়। সেই যুদ্ধ রূপ নেয় জনযুদ্ধে। ঘরে ঘরে মেয়েরাও যুদ্ধে নামার কথা ভাবতে শুরু করে। তাদের অস্ত্র ছিল গরম পানি, এসিড বাল্ব, বঁটি ও দা। আমাদের মানসিকতা ছিল 'মেরে মরো'। পুরুষরা বঙ্গবন্ধুর আহ্বান অনুযায়ী যার যা কিছু আছে_দা, বল্লম, মাছ মারার কোচ, মাছ কাটার বঁটি, লাঙলের ফলা এসব নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। পরে আমাদের হাতেও অস্ত্র চলে আসে।
আমার মনে পড়ে, মাত্র আধাঘণ্টা লেগেছিল গুলি চালানো শিখতে। সে ছিল এক অদ্ভুত দিন। আমার দুই কাজিন জিন্দান ও জিঞ্জির যুদ্ধের ময়দানে রওনা হয় তাদের মায়ের নির্দেশে। এই মায়ের কথা না বললেই নয়। তিনি তাঁর ছেলেদের বলতেন, 'তোমাদের কি মানুষ করেছি ঘরে থেকে অসহায়ভাবে মরার জন্য? মরতে হলে যুদ্ধ করতে করতে মরো।' তিনি ছিলেন পাবনা মহিলা পরিষদের আহ্বায়ক কমিটির সভানেত্রী রাকিবা বেগম। এমন পরিস্থিতিতে আমার ঘরে থাকাটা কষ্টকরই ছিল।
আমার ভাই জিঞ্জির বলল, 'বুজি, প্রীতিলতার মতো তুমিও পারো ছেলেদের পোশাক পরে যুদ্ধে যেতে।' ওর এই কথাটা আমাকে উদ্বুদ্ধ করে। আমার বড় খালা রাফিয়া বানুর কাছে আমি থাকতাম। তিনি আমাকে শার্ট-প্যান্ট পরা দেখে বললেন, 'হ্যাঁ, এখন তুমি নিশ্চিন্তে যুদ্ধে যেতে পারো।'
২৮ মার্চ শহরের জেল রোডে টেলিফোন একচেঞ্জ ভবনে দখলদার ৩৬ জন পাকিস্তানি সেনার সঙ্গে আমাদের যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে ওরা সবাই মারা পড়ে। আমাদের দুজন শহীদ হয়। এভাবে খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ চলতেই থাকে। ৩০ মার্চ পাবনা শহর স্বাধীন হয়।
তখন যুদ্ধ চলছিল নগরবাড়ী ঘাট, আতাইকুলা ও কাশীনাথপুরে। পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ শুরু হয় আকাশপথে। পাশের জেলা কুষ্টিয়ার প্রতিরোধ ভেঙে পড়ছে। তাদের বিভিন্ন দল পিছিয়ে যাচ্ছে চুয়াডাঙ্গার দিকে।
পাবনার ছাত্রনেতা ইকবালের দল একটি গাড়িতে করে কুষ্টিয়া হয়ে চুয়াডাঙ্গার দিকে রওনা হলো। গাড়িতে স্থান সংকুলান না হওয়ায় আমি ও আমার এক ভাই থেকে যাই কুষ্টিয়ায়। কুষ্টিয়ার ক্যাম্পে দেখা হয় পাবনার পুলিশ ইনচার্জ ও রাজনৈতিক নেতা আমিনুল ইসলাম বাদশার সঙ্গে। ভারতীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে তাঁদের জিপে করে আমরা চুয়াডাঙ্গার ক্যাম্পে যাই। তখন গোলাবারুদের অভাবে প্রাথমিক প্রতিরোধ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এক দলকে পাঠানো হলো গোলাবারুদ সংগ্রহের জন্য। সেই দলের সদস্য হয়ে আমিও মুক্তিযুদ্ধ সহায়ক কমিটিতে পেঁৗছাই। সেখানে দেখা হলো আবদুল কুদ্দুস মাখন ও নূরে আলম সিদ্দিকীর সঙ্গে। এখানে এসে জানতে পারি, পাবনায় যে সাংবাদিকের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল, তিনি আমার ছবিসহ সাক্ষাৎকার ছেপে দিয়েছেন বিভিন্ন পত্রিকায়। ছেলে সেজে যুদ্ধ করার যে সুযোগ ছিল, তা আর আমি পেলাম না।
আমার সঙ্গীদের বিভিন্ন ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। আমি চলে গেলাম কলকাতার উপকণ্ঠে গোবরা ক্যাম্পে আরো প্রশিক্ষণের জন্য। সেখানে আমাকে আশ্রয় দিলেন নাচোল বিদ্রোহের নেত্রী ইলা মিত্র। তাঁর স্বামী রমেন মিত্র আমার বাবা খন্দকার শাহজাহান মোহাম্মদকে চিনতেন ট্রেড ইউনিয়নের নেতা হিসেবে। এখান থেকে আমি যোগাযোগ করি আমাদের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে। তিনি আশ্বাস দিলেন মেয়েদের নিয়ে আলাদা মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প গঠনের।
প্রথমে কয়েকজন নারী বিভিন্ন আশ্রয় ক্যাম্পে ঘুরে ঘুরে মেয়েদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দল গঠন শুরু করেন। আমি তাঁদের সঙ্গে যোগ দিই। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে কলকাতায় বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বক্তব্য দিতে থাকি। আমাদের প্রচেষ্টা ও বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতায় অবশেষে ৩৬ জন নারী নিয়ে আমাদের ক্যাম্প শুরু হয়। এ ক্ষেত্রে বিভা সরকারের কথা বলতেই হয়। তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কমার্সের ছাত্রী তিনি। তিনিসহ পাঁচজনের একটি সাংগঠনিক কমিটি গঠন করা হয়। জিন্নাত আরা, লায়লা, লীনা চক্রবর্তী, কৃষ্ণা ও আমি ছিলাম ওই কমিটিতে। আমাদের কাজ ছিল ক্যাম্পে ক্যাম্পে ঘুরে আগ্রহী মেয়েদের সংগ্রহ করা। তাদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা গড়ে তোলা। ক্যাম্পের দেখাশোনার জন্য বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে সাজেদা চৌধুরীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি প্রতিদিন আমাদের ক্যাম্পে আসতেন। আমাদের অস্ত্র ও অন্যান্য প্রশিক্ষণের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগ শুরু করেন খুলনার হাসিনা শিরিন। আস্তে আস্তে সদস্যসংখ্যা বেড়ে যায়। আমরা যখন ক্যাম্প ছাড়ি তখন সদস্যসংখ্যা ছিল ২৪০-এর ওপরে। অস্ত্রের অভাব থাকায় মহিলা গ্রুপের হাতে অস্ত্র সরবরাহ করা সম্ভব ছিল না। আমাদের প্রথম দলের একটি অংশ আগরতলায় যায় মেডিক্যাল কোরের সদস্য হিসেবে। বাকিরা মেজর জলিলের সঙ্গে যোগাযোগ করি তাঁর দলে কাজ করার জন্য। তিনি রাজি হন, কিন্তু সমস্যা ছিল অস্ত্রের অভাব। তবু যুদ্ধ থেমে থাকেনি আমাদের।
বিজয়ের পর আসে দেশে ফেরার পালা। সেই ক্যাম্পের সহযোদ্ধাদের অনেকের সঙ্গে আর দেখা হয়নি। জানি না কোথায় আছে বিভা সরকার, তুষার কন্যা, নাজমা মাজেদা কিংবা লায়লা। মনে পড়ে একেকটি নাম_তৃপ্তি, সন্ধ্যা, গীতা, শাহীন, মুক্তি, ইরা, গীতা (২) ও সালমা। এখনো মনে পড়ে জোবেদা, মিরা, কমলা, জিনাত, যুথিকা, মণিকা, ভক্তিসহ অনেকের কথা। নাম না জানা অনেকের ছবি ভাসে চোখে। এখনো কান পাতলে শুনি সেই সমবেত সংগীত_'মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি...'।
মাঝেমধ্যে ভাবি কুষ্টিয়ার পথে রাতে দেখা হওয়া সেই ভাইদের কথা। আর সেই বৃদ্ধ পিতার কথা, যিনি আমাকে ছেলের পোশাক পরা মেয়েযোদ্ধা জেনে মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করে বলেছিলেন, 'আর আমাদের ভয় নেই। আমাদের মেয়েরা যেখানে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করতে নেমেছে, আমাদের আর কেউই দমাতে পারবে না।'
এখনো ভাবি, বাংলাদেশের মানুষের আছে অশেষ প্রাণশক্তি, যাকে জাগিয়ে তুলতে পারলে কোনো সমস্যাই আর থাকে না। প্রয়োজন শুধু সেই মুক্তিযুদ্ধের সময়কে ফিরিয়ে এনে প্রাণের আবাহন করা।
পরিচিতি: পাবনা শহরের দিলালপুর মহল্লার খান বাহাদুর লজ-এ ১৯৫০ সালের ২ সেপ্টেম্বর শিরিন বানু মিতিল জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মা প্রখ্যাত বামনেত্রী সেলিনা বানু ও বাবা খন্দকার শাহজাহান মোহাম্মদ। ৭ নম্বর সেক্টরে তিনি সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নেন। যুদ্ধের পর তিনি মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট বা সনদের জন্য কোনো আবেদন না করায় তাঁর কোনো সনদ নেই।

কালের কণ্ঠের প্রথম বর্ষপূর্তিঃ জীবনে কিছুই পাইনি আজ পেলাম...

Monday, January 10, 2011

‘জীবনে কিছুই পাইনি, আজ পেলাম। আপনারা আমাকে যে সম্মান দিলেন...।’ আর কিছু বলতে পারলেন না আয়েশা বেগম। রুদ্ধশ্বাসে ফুঁপিয়ে উঠলেন। তারপর আকুল কান্নায় ভেঙে পড়লেন ৭০ বছার বয়সী এই মুক্তিযোদ্ধা। হলভর্তি মানুষ স্তব্ধ। পিনপতন নীরবতা। সবার চোখে অশ্রু। মন্ত্রীরাও চোখ মুছলেন। কান্না থামানোর চেষ্টা অতিথিদের। আয়েশা বেগম যেন হাজারো মুক্তিযোদ্ধার হৃদয়ের সমস্ত দুঃখ-কষ্ট-বেদনা ঢেলে দিয়েছেন এখানে।
এখানে বসেছিল নারী মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠান। কালের কণ্ঠের প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ছিল গতকাল ১০ জানুয়ারি, সোমবার। এ উপলক্ষে কালের কণ্ঠ আয়োজন করেছিল ‘একাত্তরের বিজয়িনী বিশেষ সম্মাননা’ অনুষ্ঠান। এবারের বিজয়ের মাস ডিসেম্বরজুড়ে ‘একাত্তরের বিজয়িনী’ শিরোনামে যে ৩০ জন নারী মুক্তিযোদ্ধার কাহিনী ছাপা হয় কালের কণ্ঠে, তাঁদের মধ্য থেকে তৃণমূলের ১২ জনকে দেওয়া হয় এই সম্মাননা।
এই হƒদয়গ্রাহী সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানের পাশাপাশি গতকাল দিনভর ঢাকার পান্থপথে বসুন্ধরা সিটিতে কালের কণ্ঠের কার্যালয় ছিল আনন্দ-উৎসবে সরগরম। দেশের পত্রিকাজগতের ইতিহাসে নজিরবিহীন সাফল্য দেখিয়ে একটি বছর পার করে কালের কণ্ঠ যে মাইলফলক রচনা করেছে, একে অভিনন্দিত করতে এসেছিলেন সব ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তি থেকে শুরু করে মুগ্ধ পাঠকরা। তাঁদের পদচারণ আর কলকাকলিতে যেন একটি ধ্বনিই প্রতিধ্বনিত হয়েছে বারবারÑ‘কালের কণ্ঠ এগিয়ে চলো।’
একাত্তরের বিজয়িনীদের সম্মাননা : যে আয়েশা বেগম সম্মাননা গ্রহণ করতে এসে কাঁদিয়েছেন সবাইকে, একাত্তরে তিনি যুদ্ধ করেছেন বাগেরহাটের শরণখোলা এলাকায়। পাকিস্তানি হানাদার আর রাজাকারদের হাতে স্বামী ও মেয়েকে হারিয়ে মাত্র ছয় মাসের ছেলেটিকে ঘরে রেখে তিনি যুদ্ধে যান প্রতিশোধ নিতে। অস্ত্রহাতে ঝাঁপিয়ে পড়েন শত্র“সেনার ওপর। একদিন খবর আসে, তাঁর শিশুপুত্রটিও মারা গেছে; কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্র থেকে তিনি আসতে পারেন না। তিনি বাড়ি ফেরেন বিজয় ছিনিয়ে নিয়ে; কিন্তু সব হারিয়ে।
১২ জন নারী মুক্তিযোদ্ধার সবারই এ ধরনের মর্মস্পর্শী কাহিনী সংক্ষেপে তুলে ধরা হয় সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠানে আগত ব্যক্তিরা রুদ্ধশ্বাসে শোনেন যুদ্ধদিনের সেই সব গল্প। এরই মধ্যে একে একে ১২ জন মুক্তিযোদ্ধার প্রত্যেকের হাতে তুলে দেওয়া হয় সম্মাননার ক্রেস্ট, সনদ আর এক লাখ টাকার চেক। তাঁদের গায়ে জড়িয়ে দেওয়া হয় উত্তরীয়।
সম্মাননা পাওয়া নারী মুক্তিযোদ্ধারা হলেন কুড়িগ্রামের তারামন বিবি বীরপ্রতীক, সুনামগঞ্জের কাকন বিবি, কিশোরগঞ্জের মনোয়ারা বেগম, সিলেটের ছায়ারুন, গোপালগঞ্জের মোমেলা খাতুন ও নাজমা বেগম, বাগেরহাটের আয়েশা খানম, যশোরের ফাতেমা খাতুন, দিনাজপুরের মমতাজ বেগম বেলী, টাঙ্গাইলের জয়নাব বেগম, সিরাজগঞ্জের আমিনা বেগম মিনা এবং চট্টগ্রামের মধুমিতা বৈদ্য। তাঁদের পাশাপাশি বিকেলে বিশেষভাবে সম্মাননা প্রদান করা হয় বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীকে। একই সম্মাননা স্মারক তুলে দেওয়া হয় তাঁর হাতে।
সম্মাননার জবাবে নারী মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে তারামন বিবি বীরপ্রতীক বলেন, ‘কালের কণ্ঠ আমাদের লড়াই করার সাহস দিয়েছে। সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। এ সম্মান শুধু আমাদের একার নয়, দেশের সব নারী মুক্তিযোদ্ধার।’
কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেন, ‘বাধ্য হয়ে কিংবা ঘটনাক্রমে আমরা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিইনি। বঙ্গবন্ধুর দীক্ষায় দীক্ষিত হয়ে তাঁরই নির্দেশনায় আমরা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু বলতেনÑযে জাতি রক্ত দিয়ে দেশ স্বাধীন করতে পারে, তাদের কেউ দাবাতে পারবে না। বহু মানুষের রক্তের বিনিময়ে শেখ হাসিনা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মানুষের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করেছেন। এখন কেউ আমাদের দাবিয়ে রাখতে পারবে না, বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। কৃষি ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সূচকেও বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।’
সাফল্যের বিস্ময় উৎসবে প্রকাশ : ২০১০ সালের ১০ জানুয়ারি অনেকটা অনাড়ম্বরেই আÍপ্রকাশ করেছিল কালের কণ্ঠ। প্রকাশনার মাত্র তিন মাসের ব্যবধানেই পত্রিকাটির প্রচারসংখ্যা দুই লাখ ছাড়িয়ে যায়।
এ অনন্য সাফল্যকে অভিনন্দন জানাতে গতকাল সরকারি দল ও বিরোধী দলের রাজনীতিক, লেখক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, মুক্তিযোদ্ধা, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, অভিনেতা-অভিনেত্রী-শিল্পী, সরকারি কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের মিলনমেলা বসেছিল কালের কণ্ঠ কার্যালয়ে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আসতে থাকে ফুলেল শুভেচ্ছা। কালের কণ্ঠের কাছে তাঁদের প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন সবাই।
রঙিন সাজে সজ্জিত করা হয় পুরো কার্যালয়। সকাল সাড়ে ১১টায় কয়েক গুচ্ছ বেলুন উড়িয়ে কালের কণ্ঠের সম্পাদক আবেদ খান প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর উৎসব শুরু করেন। দুপুর ১২টায় ছিল কেক কাটার পর্ব। শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া, কালের কণ্ঠের সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি ও প্রকাশক মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন, সম্পাদক আবেদ খানসহ একাত্তরের বিজয়িনীরা অংশ নেন কেক কাটায়। বিশাল কেকের এক টুকরো আবেদ খানের মুখে তুলে দেন তথ্যমন্ত্রী। এরপর মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো কার্যালয়।
শুরু হয় একাত্তরের বিজয়িনীদের সম্মাননা প্রদান। তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ, নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম ও ড. মশিউর রহমান, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব.) তাজুল ইসলাম নারী মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন। পুরো অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন কালের কণ্ঠের যুগ্ম সম্পাদক কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন।
কালের কণ্ঠের কাছে প্রত্যাশা অনেক : প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপন অনুষ্ঠানের বক্তব্যে তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ বলেন, কালের কণ্ঠ যেমন বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে, বর্তমান সরকারও তেমনটিই চায়। সরকারও সঠিক সংবাদ পরিবেশনা ও অবাধ তথ্যপ্রবাহে বিশ্বাসী।
শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া বলেন, ‘সংবাদপত্র এখন স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করছে। মানুষের সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসছে। আমার চাওয়া, এখনো যেসব অসভ্যতা ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী জঞ্জাল রয়ে গেছে, সেগুলোকে মুক্ত করতে কালের কণ্ঠ এগিয়ে যাবে।’
নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান বলেন, একটি ঐতিহাসিক দিনে কালের কণ্ঠের জন্ম। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু বাংলার মাটিতে পা রেখেছিলেন। কালের কণ্ঠ সেই দিনে জন্ম নিয়ে এর তাৎপর্য রেখেছে।
এইচ টি ইমাম বলেন, ‘বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে অনেক নাম না-জানা মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন। তাঁদের অনেককেই আমরা এখনো মূল্যায়ন করতে পারিনি। তবে আজকের এ অনুষ্ঠানে এসে নিজেকে গর্বিত মনে করছি। কালের কণ্ঠ যেভাবে বিজয়িনী মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানে এগিয়ে এসেছে, সেভাবে ভিশন-২০২১ বাস্তবায়নেও এগিয়ে আসবে বলে আশা করি।’
ড. মশিউর রহমান বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রনীতি ও আদর্শ বাস্তবায়নের সময় এসেছে। এখন কালের কণ্ঠ সেই আদর্শ বাস্তবায়নে সহযোগিতা করবেÑএমনটাই আমাদের প্রত্যাশা।’
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব.) তাজুল ইসলাম বলেন, কালের কণ্ঠের মতো আরো যদি অনেকে এভাবে এগিয়ে আসে, তাহলে অনেক মুক্তিযোদ্ধা কিছুটা হলেও তাঁদের কর্মের স্বীকৃতি পাবেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ার বলেন, ‘কালের কণ্ঠ শুরু থেকেই নিরপেক্ষতা বজায় রেখে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করে আসছে। এই ধারা অব্যাহত রাখবে, এমনটাই আশা করি।’
ঢাকার মেয়র সাদেক হোসেন খোকা বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানিত করছে কালের কণ্ঠ। এটা দেখে ভালো লেগেছে।’
সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক বলেন, ‘দেশে আইনশৃঙ্খলার এখন এমন অবনতি হয়েছে যে সরকারদলীয় সংসদ সদস্যের বাসায়ও ডাকাতি হচ্ছে। অথচ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো। দেশের এমন অবস্থায় কালের কণ্ঠ নিরপেক্ষভাবে এগিয়ে যাবে-এমনটাই প্রত্যাশা।’
কালের কণ্ঠের সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন সবাইকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ‘বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানের দিকনির্দেশনায় ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্র“পের পক্ষ থেকে কালের কণ্ঠসহ যেসব মিডিয়া হাউস গড়ে উঠেছে, এর মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশের অর্থনীতির উন্নয়ন, গণতন্ত্র রক্ষা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা। আমরা মানুষের মধ্যেও এগুলো ছড়িয়ে দিতে চাই।’
নারী মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান জানিয়ে এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানমালা উৎসর্গ করা হয়েছে জানিয়ে কালের কণ্ঠের সম্পাদক আবেদ খান বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা কিছু পাওয়ার আশায় যুদ্ধে যাননি। কালের কণ্ঠ তাঁদের জন্য কিছুটা হলেও কৃতজ্ঞতা জানাতে পেরে খুশি। কালের কণ্ঠ উন্নয়নের কথা বলতে চায়। সাধারণ মানুষের কল্যাণচিন্তায় নিজেকে নিবেদন করতে চায়। বসুন্ধরা গ্রুপ একটি দলনিরপেক্ষ পত্রিকা তৈরি করতে এগিয়ে এসেছে, যেটা হবে গণপ্রতিনিধিত্বমূলক। সাংবাদিকতার মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখার জন্যই তারা মিডিয়া জগতে এসেছে। তারা তাদের কথা রেখেছে।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আবদুল মান্নান খান সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠ কার্যালয়ে আসেন শুভেচ্ছা জানাতে। এ সময় তিনি পত্রিকাটির উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করেন।
শুভেচ্ছার বন্যা
নানা শ্রেণী-পেশার প্রতিনিধিত্বশীল মানুষের মুখরিত উপস্থিতিতে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিল কালের কণ্ঠের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজন। তাঁরা নবপ্রতিষ্ঠিত দৈনিকটির গুণ ও মানের ভূয়সী প্রশংসা করেন। কামনা করেন সাফল্য।
উপদেষ্টা, মন্ত্রী, সচিব ও কর্মকর্তাদের শুভেচ্ছা : প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. মোদাচ্ছের আলী এসেছিলেন শুভেচ্ছা জানাতে। বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী জি এম কাদের, খাদ্যমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক এসে শুভেচ্ছা জানান। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আবদুল লতিফ বিশ্বাসের পক্ষে শুভেচ্ছা পৌঁছে দেন মন্ত্রণালয়ের উপপরিচালক ডা. মোসাদ্দেক হোসেন। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব মো. আবদুল করিম, তথ্যসচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান, পর্যটনসচিব শফিক আলম মেহেদী, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক সচিব ও কথাসাহিত্যিক মাসুদ আহমেদ এসে শুভেচ্ছা জানান। পুলিশের মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার রাতে এসে শুভেচ্ছা জানান। আরো আসেন বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) জিয়া আহমেদ, ডিজিএফআইয়ের ডিজি লে. জেনারেল মোল্লা ফজল আকবর, ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার বেনজীর আহমেদ, র‌্যাবের মহাপরিচালক মোখলেসুর রহমান, আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মো. সোহায়েল, গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান ও মেজর সাখাওয়াত। এসেছিলেন পুলিশের ডিসি ট্রাফিক (পশ্চিম) সেলিম মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, ডিসি (সদর দপ্তর) হাবিবুর রহমান, এডিসি মাসুদুর রহমান, এসি সাদিরা খাতুন ও রাসেল শেখ। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে আসেন উপপরিচালক ফজলুর রহমান ও মজিবুর রহমান পাটোয়ারী।
বিরোধীদলীয় নেতাদের শুভেচ্ছা : এসেছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ এমপি, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি এমপি, যুবদলের সভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, সাধারণ সম্পাদক আমিরুল ইসলাম আলিম, সহসভাপতি বজলুল করীম আবেদ, সাংগঠনিক সম্পাদক আনিসুর রহমান খোকন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ওবায়দুল হক নাসির ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার খলিলুর রহমান খলিল।
এ ছাড়া রাজনীতিবিদদের মধ্যে শুভেচ্ছা জানাতে আসেন হায়দার আকবর খান রনো, জাসদ নেত্রী শিরীন আক্তার, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) সালাউদ্দিন মতিন প্রকাশ প্রমুখ।
বিশিষ্টজনদের শুভ কামনা : যাঁদের উপস্থিতিতে কালের কণ্ঠের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল, তাঁদের মধ্যে ছিলেন কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হক, ভাষাসৈনিক ও গবেষক ডা. আহমদ রফিক, বিচারপতি গোলাম রব্বানী, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আকবর আলি খান, সাবেক উপদেষ্টা এ এম এম শওকত আলী, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক হারুন হাবীব, লেখক মোহিত উল আলম, অর্থনীতিবিদ সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ, অ্যাডভোকেট এলিনা খান, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম, প্রফেসর এ এন রাশেদা, ব্যাংকার ও লেখক মামুন রশিদ, অধ্যাপক সানজীদা আখতার, কবি নাসির আহমেদ, অধ্যাপক খালেদ হোসাইন, শিল্পী বুলবুল মহলানবীশ, মুক্তিযোদ্ধা বৈমানিক ক্যাপ্টেন (অব.) আলমগীর সাত্তার, এফবিসিসিআইয়ের প্রেসিডেন্ট এ কে আজাদ, নারী উদ্যোক্তা নাসরীন আউয়াল মিন্টু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিঞা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, উপ-উপাচার্য অধ্যাপক হারুন অর রশীদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক শরীফ এনামুল কবির, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক নোমান উর রশীদ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পক্ষে ড. আতিয়ার রহমান, প্রভাষক মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ, ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. আমিনুল ইসলাম, ক্রিকেটার হাবিবুল বাশার সুমন, সাবেক ফুটবল তারকা কায়সার হামিদ, সাবেক হকি তারকা রফিকুল ইসলাম কামাল, ক্রিকেটার জাভেদ ওমর বেলিম, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. শিফায়েত উল্লাহ, নারীনেত্রী রোকেয়া কবীর ও সালমা খান, কর্মজীবী নারীর সাধারণ সম্পাদক শারমিন কবীর, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সহসভাপতি গোলাম কুদ্দুছ, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ঝুনা চৌধুরী, যুগ্ম সম্পাদক আখতারুজ্জামান, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমেদ গিয়াস প্রমুখ।
মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের শুভেচ্ছা : এসেছিলেন ইত্তেফাক সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক শাজাহান সরদার, প্রকাশিতব্য দৈনিক সকালের খবরের সম্পাদক রাশীদ উন নবী বাবু, বৈশাখী টেলিভিশনের প্রধান সম্পাদক মনজুরুল আহসান বুলবুল, ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত, একপক্ষ সম্পাদক মাসুদা ভাট্টি প্রমুখ। আরো এসেছিলেন বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম, ডেইলি সান, বাংলাভিশন, আজকালের খবর, ফোকাস বাংলা, সংবাদপত্র হকার্স কল্যাণ সমিতি প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা।
তারকাদের মুখরিত পদচারণ : এসেছিলেন চলচ্চিত্র পরিচালক আমজাদ হোসেন, পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম, পরিচালক কাজী হায়াৎ, পরিচালক সমিতির মহাসচিব এফ আই মানিক, পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান মানিক, পরিচালক আবু সাঈদ, পরিচালক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হান্নান, পরিচালক গোলাম রব্বানী বিপ্লব, সুরকার আলাউদ্দিন আলী, গীতিকার ও পরিচালক গাজী মাজহারুল আনোয়ার, কণ্ঠশিল্পী ফেরদৌস ওয়াহিদ, তপন চৌধুরী, এন্ড্রু কিশোর, সামিনা চৌধুরী, ফাহমিদা নবী, চন্দনা মজুমদার, পরিচালক আফজাল হোসেন, অভিনেতা পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, নাট্য নির্মাতা শাকুর মজিদ, নাট্যকার বৃন্দাবন দাশ, চিত্রশিল্পী ও পরিচালক খালিদ মাহমুদ মিঠু, পরিচালক গিয়াসউদ্দিন সেলিম, পরিচালক মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, নাট্য নির্মাতা চয়নিকা চৌধুরী, অভিনেতা ও মডেল মুকিত, কণ্ঠশিল্পী বিপ্লব, অভিনেতা হাসান মাসুদ, আরেফিন শুভ, সিদ্দিকুর রহমান, নাট্য নির্মাতা নেয়ামুল, অভিনেতা নাদের চৌধুরী, নাট্য নির্মাতা নোমান রবিন, ফেরদৌস হাসান, অভিনেতা আমিন আজাদ, ফ্যাশন কোরিওগ্রাফার গালিব, অভিনেতা ও পরিচালক শামীম শাহেদ, অভিনেতা সাইদ বাবু, কণ্ঠশিল্পী বেলাল, বিএফডিসির এমডি মমতাজ আলী শাকুর, শিশুশিল্পী দীঘি, আরজে নিরব, অভিনেতা নীরব, নাট্য নির্মাতা এজাজ মুন্না, অভিনেত্রী মম, অভিনেতা উজ্জ্বল, অভিনেত্রী বর্ষা, কণ্ঠশিল্পী পলাশ, অভিনেতা মারজুক রাসেল, ক্লোজআপ ওয়ান তারকা সালমা, পরিচালক অরণ্য আনোয়ার, আবৃত্তিশিল্পী রবি শঙ্কর মৈত্রী, কণ্ঠশিল্পী আরেফিন রুমি, অভিনেত্রী মীম, নাট্য নির্মাতা মোস্তফা কামাল রাজ, কণ্ঠশিল্পী তপু, কণ্ঠশিল্পী কণা, কণ্ঠশিল্পী আবিদ, উপস্থাপক খন্দকার ইসমাইল, অভিনেতা সম্রাট, অভিনেত্রী হুমায়রা হিমু, কণ্ঠশিল্পী মাসুদ কোরাইশি, কণ্ঠশিল্পী রাজীব, মুহিন, নৃত্যশিল্পী ফারহানা চৌধুরী বেবী, নৃত্যশিল্পী ইশা, কণ্ঠশিল্পী কোনাল, আনিক, মুগ্ধ, নৃত্যশিল্পী আমিনুল ইসলাম মণি, ফারজানা খান ইলা, অভিনেত্রী স্বাগতা, শাহনাজ খুশী, তামান্না, যাত্রাশিল্পী উন্নয়ন পরিষদের মিলন কান্তি দে, অভিনেতা নিলয়, রওনক হাসান, নাট্য নির্মাতা মানিক মানবিক, কৌশিক শঙ্কর দাশ, অভিনেতা সজল, কণ্ঠশিল্পী বালাম, পরিচালক শারাফ আহমেদ জীবন, অভিনেতা আজিজুল হাকিম, পরিচালক জিনাত হাকিম, পরিচালক শাহনেওয়াজ কাকলি ও অভিনেতা প্রাণ।
বসুন্ধরা গ্রুপ চেয়ারম্যানের শুভেচ্ছা : বসুন্ধরা গ্র“পের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানের পক্ষ থেকে কালের কণ্ঠের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সম্পাদক ও সংবাদকর্মীদের শুভেচ্ছা জানানো হয়। বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যানের পক্ষে ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক বিদ্যুৎ কুমার ভৌমিক, নির্বাহী পরিচালক (হিসাব-ইডাব্লিউপিডি) ইমরুল হাসান, সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার (বিসিডিএল) মেজর (অব.) মেহেদী হাসান, সমন্বয়ক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ শুভেচ্ছা পৌঁছে দেন সম্পাদক আবেদ খান ও ব্যবস্থাপনা সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিনকে।
আরো যাঁরা অভিনন্দন জানিয়েছেন : আশিয়ান সিটি, গণসাক্ষরতা অভিযান, যাত্রী, প্রাইম ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, অ্যাডভারটাইজিং কম্পানি প্রচিত, পপুলার, সাঈদ বাবু, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি, মিডোরি কমিউনিকেশন লি., আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ, এক কাপ চা চলচ্চিত্র, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক লি., এশিয়ান ট্রাভেলস নেটওয়ার্ক লি., যুব কর্মসংস্থান সোসাইটি, আখতার ফার্নিচার ও রঙ ফ্যাশন হাউস অভিনন্দনবার্তা পাঠায়।
 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. XNews2X - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু