Home » , , » সম্প্রীতির মহামিলন ক্ষেত্র by আবদুল হামিদ মাহবুব

সম্প্রীতির মহামিলন ক্ষেত্র by আবদুল হামিদ মাহবুব

Written By Unknown on Monday, February 7, 2011 | 2:53 AM

কদিকে জ্বলছে ৯টি চিতা। তার পাশে সারিবদ্ধ ১২টি কবর। ১২টি লাশের জানাজা পড়াতে দাঁড়িয়েছেন একজন মৌলভী, তাঁর পিছে অস্ত্র হাতে দণ্ডায়মান একদল মুক্তিযোদ্ধা আর কিছু সাহসী মানুষ। ওদিকে চিতায় শব পোড়ানোর কাজটি একজন পুরোহিতের তত্ত্বাবধানে চলছে, তাঁকে সহযোগিতা করছেন হিন্দু-মুসলিম আরেক দল মানুষ।

এই দৃশ্য ১৯৭১ সালের ২০ ডিসেম্বর মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের পূর্ব-দক্ষিণ কোণের। সেই ১৯৭১ সাল থেকে মৌলভীবাজারবাসীর কাছে বেদনাবিধুর একটি দিন ২০ ডিসেম্বর। এ দিনটি স্থানীয় শহীদ দিবস হিসেবে পালন করেন মৌলভীবাজারবাসী। মিত্রবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধারা মৌলভীবাজারের বিভিন্ন স্থানে ক্যাম্প স্থাপন করে অবস্থান নেন। এ ধরনের একটি ক্যাম্প ছিল মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাত্র চার দিন অতিবাহিত হয়েছে। ওই ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধারা দুপুরের খাবার আয়োজনে ব্যস্ত। কেউ ভাতের থালা হাতে নিয়েছেন, কেউ খাবার সংগ্রহের জন্য লঙ্গরখানায় যাচ্ছেন। এ সময়ই প্রচণ্ড বিস্ফোরণে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ক্যাম্প লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। মুহূর্তে প্রায় অর্ধশত মুক্তিযোদ্ধার দেহ খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে এদিক-সেদিক ছড়িয়ে পড়ে। আকস্মিক এ ঘটনায় মৌলভীবাজারবাসী হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। তখন যাঁরা শহরে ছিলেন প্রথম অবস্থায় অনেকেইে বুঝতে পারেননি, কোথায় কী ঘটেছে। পরে খবর ছড়িয়ে পড়ে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ক্যাম্পের হৃদয়বিদারক ঘটনার কথা। দলে দলে মানুষ ছুটে আসে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। ভয়াবহ এ অবস্থা দেখে মানুষজন বুঝে উঠতে পারছিল না তাদের কী করণীয়। অবশেষে মিত্রবাহিনীর লোকজনও এখানে আসেন। তখনো আহতাবস্থায় যাঁরা ছটফট করছিলেন, তাঁদের কয়েকটি ট্রাকে উঠিয়ে চিকিৎসার জন্য ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এদিকে যাঁরা শহীদ হলেন, তাঁদের কারো শরীর থেকে মাথা উড়ে গেছে, কারো বা দেহের মধ্যাংশ ছিন্নভিন্ন হয়ে এদিক-সেদিক ছড়িয়ে পড়েছে। বিধ্বস্ত ক্যাম্প ভবনের পার্শ্ববর্তী গাছের ডালে কারো দেহের কোনো অংশ লেগে ঝুলে আছে। সে এক বীভৎস দৃশ্য। না দেখলে অনুমান করা কঠিন। ছিন্নভিন্ন এই দেহগুলো সৎকারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এসব মৃতের মধ্যে কে মুসলমান, কে হিন্দু_এসব শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। তার পরও যাঁদের পরিচয় কোনোভাবে মিলানো যায় সে অনুযায়ী মুসলমান-হিন্দু আলাদা করে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী কবরস্থ করা ও চিতায় পোড়ানোর উদ্যোগ নেন তৎকালীন গণপরিষদ সদস্য আওয়ামী লীগ নেতা মো. আজিজুর রহমানের নেতৃতে একদল সাহসী মানুষ। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিভিন্ন স্থানে ফেলে যাওয়া ও পুঁতে রাখা মাইন-গ্রেনেড উদ্ধার করে বিদ্যালয়ের ক্যাম্পে এনে জড়ো করে রাখা হয়েছিল। এ বিস্ফোরকগুলোই হঠাৎ বিস্ফোরিত হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। হিন্দু-মুসলিম এই শহীদদের ছিন্নভিন্ন দেহগুলো ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী জাতপাতের ঊধর্ে্ব উঠে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের মৃতদেহ হিসেবে সমাহিত করা হয় মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে। সেই ১৯৭১ সাল থেকে এ স্থানটি হচ্ছে সম্প্রীতির এক মহামিলন ক্ষেত্র।

0 comments:

Post a Comment

 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. XNews2X - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু