Home » , , , , , , » খোলা হাওয়া- শুধু আবেগ নয়, ভালোবাসাটাও চাই by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

খোলা হাওয়া- শুধু আবেগ নয়, ভালোবাসাটাও চাই by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

Written By Unknown on Friday, February 21, 2014 | 9:00 AM

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইউনুস আলী আকন্দ ১৬ ফেব্রুয়ারি উচ্চ আদালতে জনস্বার্থে বাংলায় একটি রিট করেন, যাতে তিনি ১৯৮৭ সালের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলন আইনটির বাস্তবায়নে আদালতের নির্দেশনা কামনা করেন।
জনাব আকন্দ তাঁর রিটে উল্লেখ করেন, গত ২৭ বছরে সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীরা এ আইনটি ঢালাওভাবে অমান্য করে চলেছেন। উচ্চ আদালত রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে সর্বস্তরে অবিলম্বে বাংলা ভাষা ব্যবহারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে একটি রুল জারি করেন এবং এপ্রিলের মধ্যে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন দাখিল করতে বলেন। দূতাবাস ও বিদেশি প্রতিষ্ঠান ছাড়া সব প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড, নামফলক ও গাড়ির নম্বরপ্লেট এক মাসের মধ্যে লেখার নির্দেশও দিয়েছেন উচ্চ আদালত।

এই নির্দেশকে আমরা সাধুবাদ জানাই এবং বাংলা ভাষার প্রসার ও চর্চা এবং নানাবিধ বিকৃতির হাত থেকে বাংলা ভাষাকে রক্ষার ক্ষেত্রে আদালতের আগ্রহকে আমরা একুশের চেতনার প্রতিফলন হিসেবেই দেখতে চাই। ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভাষার বিকৃতি রোধ করার জন্য উচ্চ আদালত যে নির্দেশনাটি দিয়েছিলেন, তা ছিল সুচিন্তিত ও সময়োপযোগী। একটি ভাষার শরীরে বিভিন্ন ভাষার জল-হাওয়া লাগবে এবং তার বেড়ে ওঠায় এদের একটা প্রভাব থাকবে, সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু জোর করে সেই ভাষার ওপর একটি বা দুটি ভাষার ঝাপটা ক্রমাগত বইয়ে দিলে সেই ভাষাটি তার সুস্থতা হারায়। সদর দরজা দিয়ে যে মেহমান আসবেন, তাঁকে বরণ করে নিতে সবচেয়ে অসামাজিক বাঙালিও তৈরি থাকেন। কিন্তু সিঁধ কেটে যে চোর ঘরে ঢুকবে, তাকে ঘরের মানুষ হিসেবে মেনে নেওয়ার কথাটা তো কেউ কল্পনাও করবে না।
এখন বাংলা ভাষা পড়েছে হিন্দি আর ইংরেজির চোরাগোপ্তা আক্রমণের সামনে, ক্রমাগত সিঁধ কেটে ঢুকছে নানা অপ্রয়োজনীয় শব্দপদ। এই আক্রমণে পর্যুদস্ত হয়ে আমরা বিদেশি ভাষার হাতে আমাদের ক্রিয়াপদগুলোও তুলে দিচ্ছি। দুই বছর আগে উচ্চ আদালত এই আক্রমণ ঠেকানোর জন্য কিছু নির্দেশনা দিয়েছিলেন। তারপর অনেক দিন-মাস চলে গেলেও ভাষার বিকৃতি ঠেকাতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, ১৬ ফেব্রুয়ারি দেওয়া উচ্চ আদালতের নির্দেশটিকেও শেষ পর্যন্ত মান্য করা হবে না। সরকারের কর্তাব্যক্তিরা অবশ্য একটা কৈফিয়ত খাড়া করবেন, কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তারও একটা তালিকা পেশ করবেন। কিন্তু যাকে বলে আস্তিন গুটিয়ে কাজে নেমে পড়া, তা আর হবে না। ফলে আগামী ফেব্রুয়ারিতেও আমরা ভাষার ক্ষেত্রে অরাজকতার পুরোনো ছবিটা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আবার দেখব।
বাংলা ভাষার জন্য তরুণেরা বুকের রক্ত দিয়েছেন। সেই রক্তের রেখা ধরে একটি দেশ স্বাধীন হলো। বাংলা ভাষা পেল রাষ্ট্রভাষার সম্মান। বিশ্বসভায় এই ভাষার প্রতিনিধিত্ব আমরাই করছি। খুব বেশি দিন আমাদের অপেক্ষা করতে হবে না, জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে এই ভাষা স্বীকৃতি পাবে। আমরা যদি ভাষার অগ্রযাত্রাকে একটি রেখা এঁকে বর্ণনা করতে চাই, তাহলে তো সেই রেখা এত দিনে উঁচু থেকে উঁচুতে উঠতে থাকার কথা। কিন্তু বাস্তব চিত্রটা কি তাই? নাকি এই রেখা চলছে ভূমির সমান্তরাল এবং কখন সেটির মাথাটা মাটির দিকে হেলে পড়ে যায়, তা নিয়ে আমরা চিরশঙ্কায় থাকি?
এটি কেন হবে যে ভাষার প্রশ্নে স্বাতন্ত্র্য-অন্বেষী একটি জাতির স্বাধীনতার এত বছর পরও এই ভাষাকে তার পথচলার জন্য আদালতের হাত ধরতে হবে? তবে কি বাংলা ভাষার পায়ে শক্তি নেই, তাকে চলতে হয় ইংরেজি ও পণ্যসংস্কৃতির ভাষার লাঠি ধার করে এবং মাঝেমধ্যে যখন সে হোঁচট খেতে যায়, তা ঠেকানোর জন্য আদালতকে একটা হাত বাড়িয়ে দিতে হয়? এ কাজটি কি আদৌ আদালতের, নাকি পরিবারের, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের, সমাজের? শুরুতে মাননীয় আদালতকে সাধুবাদ জানিয়েছি, কিন্তু একই সঙ্গে একটু কি আত্মগ্লানিতে ভুগতে হয় না আমাদের? উচ্চ আদালত যে উদ্যোগটি নিয়েছেন, সেটি তো ব্যক্তিগত এবং সামষ্টিকভাবে আমাদেরই নেওয়া উচিত ছিল, অনেক আগেই। আমরা কি তাহলে নিজেদের ভাষাটাকেই উদ্ধার করতে পারছি না বিকৃতি আর অবহেলার চোরাবালি থেকে? উচ্চ আদালতের দুই নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ হবে, তেমনটি আশা করা কঠিন কিন্তু এটুকুও যদি হতো যে আমাদের কাজটি আদালতকে করতে দেখে আমরা লজ্জায় জিব কাটলাম, তাতেও একটুখানি ফল পাওয়া যেত। কিন্তু তারও কোনো নিদর্শন তো চোখে পড়ছে না। মাতৃভাষা নিয়ে আমাদের বিশেষ কোনো ভাবনা নেই, শুধু কিছু পার্বণিক আবেগ ছাড়া।
মাতৃভাষার জন্য বুকভর্তি পার্বণিক দরদের প্রয়োজন নেই, একটুখানি সত্যিকার ভালোবাসা থাকলেই যথেষ্ট। সঙ্গে যদি থাকে অল্পখানি আত্মসম্মান এবং এক চিমটি নিষ্ঠা, তাতেই কাজ হয়, বাংলা ভাষা তার সৌন্দর্য নিয়ে বিকশিত হয়। এবং এই বিকাশের এক শটা পথ বেরিয়ে যায়। আমার অভিজ্ঞতায় পাওয়া তিনটি উদাহরণ বিষয়টি প্রতিষ্ঠা করতে পারে। প্রথম উদাহরণটি নিউইয়র্কের কোরীয় জনগোষ্ঠী, দ্বিতীয়টি চীনের একটি শহরে এবং তৃতীয়টি ঘরের কাছের কলকাতা থেকে কুড়ানো। নিউইয়র্কের ফ্লাশিং অঞ্চলে প্রচুর কোরীয়র বাস, ওই এলাকায় আমি কিছুদিন ছিলাম। আমার প্রতিবেশী এক কোরীয় পরিবারের সঙ্গে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা ছিল। সেই পরিবারে একই ছাদের নিচে তিন প্রজন্ম বাস করত। বৃদ্ধ দাদাসাহেব ও তাঁর স্ত্রী, তাঁদের দুই ছেলে, যাঁদের বয়স ৪০ থেকে ৫০ এবং তাঁদের চার সন্তান, যাদের বয়স সাত থেকে আঠারোর মধ্যে। বুড়োবুড়ি কোরিয়া থেকে নিউইয়র্ক এসেছিলেন সেই কবে। দুই ছেলে জন্মেছেন সেই শহরে। ছেলেদের বাচ্চারাও। নিউইয়র্কে (এবং উত্তর আমেরিকা-ইউরোপের নানা শহরে) আমি এ রকম অভিবাসী বাঙালি পরিবার দেখেছি—তিন না হলেও দুই প্রজন্মের তো বটেই। এদের সবার সন্তানকে একটা গড় হিসাবে আনলে বলা যাবে, ১০টির মধ্যে নয়টি সন্তানই বাংলা পড়তে বা লিখতে পারে না, বুঝতে বা বলতে পারলেও। তবে সেই বলতে পারারও দেখা মেলে কদাচিৎ। অথচ কোরীয় পরিবারটির ঘরের ভেতরে একমাত্র ভাষা তাদের মাতৃভাষা। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এটি কী করে সম্ভব? তারা ততোধিক অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছে, কেন নয়?
বটে; কেন নয়। বেশির ভাগ অভিবাসী বাঙালি বাবা-মা নিজেরাই যে বাচ্চাদের সঙ্গে ইংরেজি ছাড়া বাংলায় কথা বলেন না। ‘বাংলা শিখে কী হবে?’ তাঁরা জিজ্ঞেস করেন। কোরীয় পরিবারগুলোকেও এই প্রশ্ন করা যায়; কোরীয় শিখে কী হবে? উত্তরে আমার পরিচিত পরিবারের দাদামশাই ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে এবং ১৪ বছরের এক নাতি চোস্ত ইংরেজিতে জানায়, শিকড়টা মাটিতে থাকবে, সংস্কৃতিটা জাগ্রত থাকবে, মনটা সুন্দর থাকবে আর পূর্বপুরুষের সঙ্গে সম্পর্কটা অটুট থাকবে, সে জন্য।
আর নেহাতই যদি ‘বাংলা বিসর্জিয়া ইংরেজি শিখিয়া আরোহণ করিব সমৃদ্ধি-চূড়ায়’ জাতীয় লজিক থাকে আমাদের মাথায়, তাহলে সেখানেও কোরীয়রা আমাদের লজ্জা দেবে। তাদের কোরীয় ভাষা জানা, বাড়িতে কোরীয় ভাষা বলা, কোরীয় ভাষায় বই পড়া, সিনেমা দেখা, গান শোনা, তর্ক-বিতর্ক-মান-অভিমান-ঠাট্টা-কাজিয়া-তামাশা করা সন্তানেরা বিরাট বিরাট চাকরি করছে আমেরিকায়। সমৃদ্ধির চূড়ায় ওরাই তো উঠে বসেছে।
আমি কান পেতে শুনেছি—না, যখন তারা কোরীয় বলে, একটি ইংরেজি শব্দও তারা ব্যবহার করে না।
আমার দ্বিতীয় উদাহরণেও আছে ভাষার এই অভঙ্গুর অবয়বটির ছবি। চীনের একটি শহরে বেরিয়েছিলাম জাদুঘর দেখতে। শহরে ইংরেজি জানা মানুষের সংখ্যা কম। অনেক খুঁজে পেতে যে একজনকে পাওয়া গেল, তাঁর ইংরেজি খুবই উন্নত। বয়সে তরুণ, পেশায় আইটি বিশেষজ্ঞ, ব্যবহারে অমায়িক। আমাদের আস্ত দুই ঘণ্টা সময় দিলেন সেই তরুণ, সুন্দর ইংরেজিতে সব বোঝালেন। কিন্তু মাঝখানে কফি খেতে বসে যখন জাদুঘরের এক কর্মকর্তার সঙ্গে নিজ ভাষায় কথা জুড়ে দিলেন, আমি কান পেতে রইলাম অন্যান্য ভাষার শব্দ ইত্যাদি শোনার জন্য। হতাশ হতে হলো। পরে তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি ইংরেজি বা অন্যান্য ভাষার শব্দ ব্যবহার করেন কি না তাঁর বলা ভাষায়। তরুণ হেসে জানান, তার প্রয়োজন হয় না, যেহেতু প্রায় প্রতিটি বিদেশি বস্তুকে (অর্থাৎ বিশেষ্যকে) চৈনিক ভাষায় বর্ণনা করার জন্য পর্যাপ্ত পরিভাষা তৈরি
আছে। কম্পিউটার, ইন্টারনেট, মডেম—এসব খটমট আপাত অনুবাদ-অযোগ্য শব্দেরও একটি নয়, একাধিক।
সবচেয়ে অবাক হলাম শুনে, সেই শিশুবেলাতেই তাদের শেখানো হয়, ভাষার পৃথিবীটা এত বড় যে সেখানে অস্থির পরিব্রাজক হয়ে একজীবন কাটিয়ে দিলেও এর অল্পটাই দেখা হয়। চৈনিক তরুণ আমাকে আরও জানান, ভাষার গাঁথুনি একটা গানের মতো। গানের সুরটা কেউ বেসুরো করে গাইলে যেমন সেই গান শুনতে ইচ্ছা করে না, ভাষার ভেতরের গানটাকে ধরে না রাখতে পারলে সেই ভাষার লাবণ্য চলে যায়।
গানের কথায় কলকাতায় যাওয়া যায়। কলকাতায় বাংলা খুব অসহায়। শুধু যে অবহেলা, তা নয়, ইংরেজি-হিন্দির আগ্রাসনে শিক্ষিত বাঙালির ভাষা ক্রমেই যেন অরক্ষিত হয়ে পড়ছে। লেখালেখিতে একটা সতেজ ভাব আছে, সন্দেহ নেই; কিন্তু মুখের ভাষায়, বিশেষ করে তরুণ-তরুণীর, আছে একটা জগাখিচুড়ি ভাব। অথচ কলকাতারই এক এফএম রেডিওর—নামটা ভুলে গেছি—একটা অনুষ্ঠান শুনে মনে হলো, বাংলা ভাষার ভেতরের গানটাকে তার মতো করে জাগাচ্ছে এই রেডিওটি। এই গান ওদের এক রকম, আমাদের আরেক রকম। কিন্তু দুই গানে একটা মিল তো আছে। স্মৃতিচারণার এই অনুষ্ঠানটি, দুই বছরের বেশি আগে শোনা, এখনো মনে আছে, কারণ ঝলমলে, পরিচ্ছন্ন বাংলায় ক্রমাগত কথা বলে গেলেন তিনজন অংশগ্রহণকারী এবং আরজে অথবা কথাবন্ধু। বাংলাকে যদি এভাবে আপন মহিমায় এবং স্বাস্থ্যে তুলে আনতে পারে একটি এফএম রেডিও কেন্দ্র (!), হাতে ইংরেজি স্যালাইনের নল না ঢুকিয়ে অথবা পট্টি না লাগিয়ে, হিন্দির রোজ-পাউডার না ঘষে, তাহলে আমাদের এফএম রেডিও কেন্দ্রগুলো কেন এমন ভাব করে যে বাট-সো-লাইকের পেরেক না ঠুকে দিলে বাংলার কাঠামোটা ভেঙে পড়বে? আর বাংলা ভাষার ভেতরের গান? সে না হয় তোলা থাক আরেক জন্মের জন্য।
অথচ বাংলা ভাষার অবিরাম চর্চা, উৎকর্ষের দিকে তার যাত্রা, তার ভেতরের মনোহর গানটার ক্রমাগত বেজে যাওয়া—সবই সম্ভব হয় এই ভাষার জন্য আমাদের সত্যিকার ভালোবাসাটা জাগাতে পারলে। শুধু বুকভরা ফেব্রুয়ারি-জাত আবেগ নয়, হূদয়ভরা প্রকৃত ভালোবাসা থাকতে হবে, চোখভরা স্বপ্ন থাকতে হবে ভাষাটা নিয়ে।


সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম:
কথাসাহিত্যিক। অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

0 comments:

Post a Comment

 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. XNews2X - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু