Home » , , , » দূষণ ঠেকাবে তিন অণুযোদ্ধা by তৌহিদ এলাহী

দূষণ ঠেকাবে তিন অণুযোদ্ধা by তৌহিদ এলাহী

Written By Unknown on Thursday, February 10, 2011 | 4:39 AM

ট্যানারিগুলোতে চামড়া প্রক্রিয়াজাত করার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে প্রচুর ক্রোমিয়াম। প্রক্রিয়া শেষে এর কিছু উচ্ছিষ্ট চলে যাচ্ছে নদীনালায়, আর কিছু হচ্ছে পশুপাখি ও মাছের খাবার। এভাবে মানুষের দেহে ঢুকে যাচ্ছে বিষাক্ত ক্রোমিয়াম, ঘটাচ্ছে ক্যান্সারসহ অনেক রোগ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীব বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মোজাম্মেল হক ও তাঁর গবেষক দল এমন তিনটি অণুজীব শনাক্ত করেছেন যেগুলো ওই বিষাক্ত ক্রোমিয়ামকে বানিয়ে দেবে পুরোপুরি নির্বিষ।

দেশে প্রায় ৩০০ ট্যানারি আছে। এর মধ্যে বুড়িগঙ্গা নদীর ধারেই শতকরা নব্বই ভাগ চামড়া কারখানা। এগুলোতে প্রতিদিন গড়ে ২২০ মেট্রিক টন চামড়া প্রক্রিয়াজাত হচ্ছে। প্রতিদিন প্রায় ৬০০-১০০০ কেজি উচ্ছিষ্ট পড়ছে নদীতে। কিছু কিছু আবার মুরগি ও মাছের খাদ্য এবং সার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় স্বাভাবিকভাবেই বিক্রিয়ক হিসেবে ব্যবহার করা হয় প্রচুর ক্রোমিয়াম যৌগ, ক্রোম পাউডার, লিকার ইত্যাদি। এখান থেকে কোনোভাবে এই বিষাক্ত ক্রোমিয়াম মানুষের দেহে ঢুকে গেলে বা সংস্পর্শে এলে তৈরি হয় ক্যান্সারসহ বিভিন্ন রোগ। শ্বাস-প্রশ্বাস, খাদ্যদ্রব্য বা পানীয়ের মাধ্যমে মানুষের সংস্পর্শে এলে ত্বকের প্রদাহ, অ্যালার্জি, ক্ষত, অ্যাজমা ঘটায়। নাকের সেপ্টাম পর্দা ছিদ্র করে ফেলতে পারে এই ক্রোমিয়াম। শ্বাসনালি ও পাকস্থলির বিষক্রিয়াও ঘটায়। পাকস্থলি ও অন্ত্রের প্রদাহ, যকৃৎ এবং মূত্রনালির সমস্যা তৈরি করতেও এর জুড়ি নেই।
গবেষণা দলের সহকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীব বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ইফতেখার মো. রফিকুল্লাহ রোমান জানান, ক্রোমিয়াম মানবদেহের ক্রোমোজোমের সঙ্গে বিক্রিয়া করে ক্ষতিকর মিউটেশন বা পরিবর্তন ঘটিয়ে কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি অর্থাৎ ক্যান্সার তৈরি করে। পাশাপাশি ক্রোমিয়ামযুক্ত চামড়া শিল্পের আবর্জনা জলজ পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে সেখানকার বাস্তুসংস্থানও নষ্ট করে। এর কারণে স্বাভাবিক অণুজীবের জীবনও বিপন্ন হয়। আর আমাদের চামড়া শিল্পের উচ্ছিষ্ট থেকে খাদ্য ও জৈবসার তৈরির প্রক্রিয়ায় বিজ্ঞানভিত্তিক পন্থাও অনুসরণ করা হয় না। ক্রোমিয়ামযুক্ত উচ্ছিষ্ট চামড়ার শতকরা ৫৩ ভাগের সঙ্গে কোনো যন্ত্রের সংস্পর্শ ঘটে না। সেগুলো থেকে খালি হাতেই তৈরি হচ্ছে মুরগি-মাছের খাবার। এর ধারাবাহিকতায় ক্রোমিয়াম ঢুকে যাচ্ছে শাকসবজিতে। পরে বিভিন্ন পর্যায়ে খাদ্যদ্রব্যের সঙ্গে মানুষের দেহে ঢুকে বিপর্যয় ঘটাচ্ছে।
আগের এক গবেষণায় দেশের হাঁস-মুরগির খামার ও মাছের খাবারে ২.৪৯ শতাংশ ক্রোমিয়াম উপাদান পাওয়া গেছে। আর চামড়া শিল্প সংলগ্ন খালে ৪.০৬ পার্টস পার মিলিয়ন (পিপিএম) ঘনমাত্রায় এবং নদীতে ০.৪৪৩ পিপিএম ঘনমাত্রায় ক্রোমিয়াম পাওয়া গেছে।
অধঃক্ষেপণ, আয়ন বিনিময় ছাড়াও ক্রোমিয়াম দূষণ রোধে আরো কয়েকটি পদ্ধতি প্রচলিত আছে। তবে এগুলো সাশ্রয়ী নয়। প্রয়োজন প্রচুর রাসায়নিক বিক্রিয়ক ও জ্বালানি। এ কারণেই দেশে এগুলোর ব্যবহার চোখে পড়ে না। আবার পদ্ধতিগুলো অন্যভাবে পরিবেশের ক্ষতি করে। আর এ কাজে ড. মোজাম্মেল হকের গবেষণাপ্রাপ্ত অণুজীব ব্যবহার হবে সাশ্রয়ী ও শতভাগ পরিবেশবান্ধব।
রোমান জানান, চামড়া শিল্পে ব্যবহৃত ক্রোমিয়াম সাধারণত দু'ভাবে দ্রবণে মিশে থাকে। এর একটি ক্ষতিকর ও অন্যটি নিরীহ। এটিই গবেষণার মূল ভিত্তি। আবিষ্কৃত তিনটি অণুজীব হলো ইশেরিকিয়া, স্টেফাইলোকক্কাস অরিয়াস, পেডিয়োকক্কাস পেন্টোসেসিয়াস। এরা ক্রোমিয়াম রিডাকটেজ নামের এক ধরনের এনজাইম বা উৎসেচক তৈরি করে। এই ক্রোমিয়াম রিডাকটেজ এনজাইম ক্ষতিকর ক্রোমিয়ামকে নিরীহ ক্রোমিয়ামে পরিণত করে।
এ গবেষণায় প্রথমে চামড়া শিল্প এলাকা সংলগ্ন খাল ও নদী থেকে পানির নমুনা সংগ্রহ করা হয়। আর উচ্ছিষ্ট চামড়াজাত দ্রব্য থেকে প্রস্তুত খাদ্যের জন্য হাজারীবাগ, নিমতলীর প্রাণী ও মৎস্য খাদ্য তৈরির কারখানাগুলো থেকে নমুনা খাদ্য সংগ্রহ করা হয়। পানির নমুনা থেকে 'লুরিয়া বারটানি আগার' নামের বিশেষ ব্যবস্থায় ইশেরিকিয়া, স্টেফাইলোকক্কাস অরিয়াস এবং পেডিওকক্কাস পেন্টোসেসিয়াস ব্যাকটেরিয়া তিনটি শনাক্ত করা হয়। পরে আরেকটি পরীক্ষার মাধ্যমে অণুজীবগুলোর উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। আর বিভিন্ন পর্যায়ে রাসায়নিক ও শারীরিক প্রক্রিয়াজাতকরণের পর খাদ্য উপাদানগুলো থেকে অ্যাটমিক অ্যাবজর্বশন স্পেকট্রোফটোমিটার (এএএস) যন্ত্রের সাহায্যে ক্রোমিয়ামের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়। পাশাপাশি এতে ক্ষতিকর ক্রোমিয়ামের পরিমাণ ও ঘনমাত্রাও বের করা হয়। এরপর শনাক্ত করা ব্যাকটেরিয়াগুলো ক্রোমিয়ামযুক্ত নমুনায় প্রয়োগের মাধ্যমে এগুলোর কার্যক্ষমতা পরীক্ষা করা হয়। দেখা যায়, অণুজীব নিঃসৃত ক্রোমিয়াম রিডাকটেজ এনজাইমের প্রভাবে বিষাক্ত ক্রোমিয়াম নিরীহ ক্রোমিয়ামে পরিণত হয়েছে। শনাক্তকারী তিনটি ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে পেডিয়োকক্কাস পেন্টোসেসিয়াস সর্বোচ্চ কার্যকারিতা প্রদর্শন করেছে।
গবেষণা দলের প্রধান ড. মো. মোজাম্মেল হক জানান, এটি গবেষণার প্রাথমিক ধাপ। এটি শিল্প পর্যায়ে প্রয়োগের আগে আরো পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন। এ জন্য সরকারের পাশাপাশি চামড়া, খাদ্য ও পরিবেশসংশ্লিষ্ট মহলের ভূমিকা রাখতে হবে।
এই গবেষণাকর্ম নিয়ে ইতিমধ্যে দুটি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। 'বাংলাদেশ জার্নাল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ' এবং বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেস প্রকাশিত তৃতীয় বাংলাদেশ-জাপান জয়েন্ট ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্সের 'ফুড সেফটি অ্যান্ড হাইজিন' নামের বিজ্ঞান সাময়িকীগুলোতে প্রকাশিত প্রবন্ধ দুটি ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। ড. মো. মোজাম্মেল হকের এই গবেষণা দলে আরো ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অণুজীব বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. ইলিয়াস, শিক্ষার্থী শাহনেওয়াজ বিন মান্নান, বিজয়চন্দ্র দেবনাথ ও সফিউল ইসলাম।

0 comments:

Post a Comment

 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. XNews2X - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু