Home » » ভারতের লোকসভা নির্বাচন- আমেথি এখনো গান্ধীদের! by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় @প্রথম আলো

ভারতের লোকসভা নির্বাচন- আমেথি এখনো গান্ধীদের! by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় @প্রথম আলো

Written By setara on Sunday, May 4, 2014 | 4:05 AM

শোলে-র গব্বর সিংয়ের 'অব আয়েগা মজা'-র মতো শোনাল জগদীশ পীযূষের বলা কথাটা: 'এবার ওঁরা হাড়ে হাড়ে টের পাবেন আমেথি কেন গান্ধী পরিবারের খাসতালুক।' জগদীশ পীযূষের পরিচয়টা আগে দেওয়া যাক। ১৯৮৯ সালে রাজীব গান্ধী যখন তৃতীয়বারের জন্য আমেথি থেকে লোকসভা ভোটে দাঁড়াচ্ছেন, সেই সময় জগদীশ হঠাৎই একটা স্লোগান দিলেন, 'আমেথি কা ডঙ্কা, বিটি প্রিয়াঙ্কা'। ভোটে দাঁড়িয়েছেন রাজীব, অথচ স্লোগান উঠছে মেয়ের নামে! রাজীব নিজেই বিস্মিত। খোঁজ নিয়ে জানলেন, জগদীশ নামের এক স্থানীয় ছোকরা, একটু-আধটু কবিতা লেখেন আর মনপ্রাণ দিয়ে কংগ্রেস করেন, তাঁর সঙ্গে প্রিয়াঙ্কাকে দেখে এই স্লোগানটি বানিয়েছেন। জগদীশের সঙ্গে কথা বলে রাজীব জানলেন, তাঁকে নিয়েও বহু স্লোগান তৈরি করেছেন ওই যুবক। যেমন, 'রাজীব গান্ধী আয়ে হ্যায়, নই রোশনি লায়ে হ্যায়' কিংবা 'লেঙ্গে বদলা দেঙ্গে খুন, ভাইয়া বিনা আমেথি সুন'। অতঃপর জগদীশের কদর বাড়ল। স্থানীয় কংগ্রেস হয়ে ক্রমে রাজ্য কংগ্রেসে জায়গা হলো, আমেথি আসনের গৌরীগঞ্জে একটা পেট্রলপাম্পের মালিক হলেন এবং আমেথি সমাচার নামে একটা পাক্ষিক পত্রিকা পর্যন্ত বের করলেন। অনেক ঘোরাঘুরির পর গৌরীগঞ্জ বাজারে জগদীশের দেখা মিলল। আম আদমি পার্টির একটা মাঝারি মাপের মিছিলের বাজার পরিক্রমা মন দিয়ে নিরীক্ষণ করছেন।
আম আদমি পার্টি আমেথিতে ২৫ হাজারের মতো স্বেচ্ছাসেবী জোগাড় করেছে বলে লক্ষেৗয়ে খবর শুনেছিলাম। কথাটা পাড়তে জগদীশ বললেন, 'সংখ্যাটা একটু বাড়াবাড়ি হলো। তবে ওরা খুবই সিরিয়াসলি এই ভোটটা লড়ছে। ওদের প্রার্থী কুমার বিশ্বাস, ওর সঙ্গে আমি আলাপ করেছি। কবিতা লেখে, কোনো হম্বিতম্বি নেই, খুব সহজে মিশতে পারে, গ্রামে গ্রামে গিয়ে কথা বলছে। কংগ্রেসের নিন্দেমন্দও করছে। কিন্তু ভোট পাবে না।' জগদীশের মতে, আমেথির মানুষের সঙ্গে গান্ধী পরিবারের একাত্মতা এমনই যে, রাহুলকে বঞ্চিত করে অন্য কাউকে সমর্থন করার কথা তাঁরা এখনো মনেই আনতে পারবেন না। আম আদমি পার্টি সবার আগে ময়দানে নেমেছে। চেষ্টার কোনো ত্রুটি তারা রাখছে না। কিন্তু আমেথির মানুষ রাহুলকে ছেড়ে কেন ওদের ভরসা করবে, সেই উত্তরটাই খুঁজে পাচ্ছে না।
বছরের পর বছর ক্ষমতার সঙ্গে থাকাটাও আমেথির বাসিন্দাদের কাছে একরকম অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন, জগদীশপুরের প্রাথমিক স্কুলশিক্ষক সৈয়দ আবদুর রহমান বললেন, 'ভিআইপি কেন্দ্রের ভোটার হওয়ার একটা লাভ এই যে, চাওয়া-পাওয়া বা ক্ষোভ-বিক্ষোভের আঁচটা আসল জায়গায় পৌঁছতে বেশি সময় নেয় না। ভোটে জেতার পর রাহুল গান্ধী আমেথির নাম মনে আনেন না, এমনও নয়। তাঁর দিক থেকে তিনি অনেক সচেষ্ট। মুশকিলটা অন্যত্র।' মুশকিলটা পুরোপুরি রাজনৈতিক। কী রকম? লক্ষেৗ থেকে রায়বেরিলি ৮০ কিলোমিটার রাস্তা ইদানীং শুধু আট লেনই হচ্ছে না, সেটা জাতীয় সড়কের মর্যাদাও পেয়েছে। রাহুলের মা কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী এই কাজটা করেছেন। টাকাও দিচ্ছে কেন্দ্র। কিন্তু রায়বেরিলি থেকে আমেথি হয়ে সুলতানপুরের রাস্তা জাতীয় সড়ক নয় বলে সে পথে চলতে শরীরের হাড়গোড় ভেঙে যাওয়ার জোগাড়। কেন? স্থানীয় কংগ্রেসিরা মনে করেন, কারণটা পুরোপুরি রাজনৈতিক। উত্তর প্রদেশে কংগ্রেস ক্ষমতায় নেই আজ বহু বছর। ক্ষমতায় থেকেছে হয় সমাজবাদী পার্টি নতুবা বহুজন সমাজ পার্টি। তারা আমেথির রাস্তা সারাইয়ে আন্তরিক নয়, যেহেতু আমেথির ভোট পায় না। 'মুলায়ম-মায়াবতীদের কেন্দ্রগুলো দেখলেই পার্থক্যটা বোঝা যাবে, বললেন জগদীশ পীযূষ। তারকা স্মৃতি ইরানি ঠিক এই জায়গাতেই ঘা মারছেন। জনসংযোগের জন্য তিনিও প্রিয়াঙ্কার মতো গ্রামে গ্রামে যাচ্ছেন। খাটিয়ায় বসে আড্ডা দিচ্ছেন আর হাতপাখায় বাতাস খেতে খেতে বলছেন, 'ঘরে ঘরে আলো পাখা থেকেই বা কী লাভ, যদি বিদ্যুৎই না থাকে? কংগ্রেসকে ভোট দিয়ে লাভ নেই। ওরা সরকার গড়তে পারবে না। আমরা এবার দিল্লিতে ক্ষমতায় আসছি। নরেন্দ্র মোদির সরকার হবে। বিদ্যুতের অভাবে ডিজেলের পাম্প চালানো বন্ধ হবে।'
প্রতিশ্রুতির হিমালয় গড়ছেন স্মৃতি ইরানি। আর সেই সঙ্গে চলছে কংগ্রেসের চূড়ান্ত গালমন্দ। ১০ বছরের কংগ্রেস শাসনের যাবতীয় দুর্নীতি তুলে গান্ধী পরিবারকে তুলাধোনা করছেন যখন, আমেথির গ্রামীণ মানুষের চোখেমুখে তখন এক বিচিত্র প্রতিক্রিয়া। সে যেন বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দ্বন্দ্ব! কেলেঙ্কারির পর কেলেঙ্কারিকে যেমন তাঁরা অস্বীকার করতে পারছেন না, তেমনই গান্ধী পরিবারকে দুর্নীতিগ্রস্ত ভাবতেও তাঁদের মন সায় দিচ্ছে না। কী করেই বা হবে? এই গান্ধী পরিবারকেই তো তাঁরা সেই ১৯৮০ সাল থেকে একান্ত আপন বলে মনে করেছেন! কী করে ছিন্ন করেন সেই ধারাবাহিকতা? শীতলাপ্রসাদ মিশ্র আমেথি প্রেসক্লাবের সভাপতি। মোদি হাওয়ায় ভর দিয়ে স্মৃতি ইরানি এবং ধূমকেতুর মতো উদয় হওয়া আম আদমি পার্টির প্রভাব স্বীকার করেও তাঁর যুক্তি, আমেথিতে এখন আর উন্নয়নের প্রশ্নে ভোট হয় না। এখানে ভোট হয় বিশ্বাসের প্রশ্নে। আমেথি দেখেছে, হারুক আর জিতুক—একমাত্র গান্ধী পরিবারই সারা বছর পাশে থেকেছে। একমাত্র তারাই বিশ্বস্ত। ১৯৮০ সালে সঞ্জয় গান্ধী ভোটে জিতলেও মারা গেলেন। '৮১ সালে রাজীব এলেন ভাইয়ের জায়গায়। '৯১ সালে রাজীব সন্ত্রাসবাদী হামলায় প্রাণ হারালে জেতেন তাঁরই বন্ধু সতীশ শর্মা। কিন্তু রাহুল-সোনিয়া-প্রিয়াঙ্কা নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। '৯৮-৯৯ সালে আমেথির রাজা সঞ্জয় সিংয়ের সঙ্গে মনোমালিন্যের দরুন সতীশ হেরে যান। সোনিয়া আর অপেক্ষায় থাকেননি। '৯৯ সালে নিজে প্রার্থী হন। জিতে এসে আমেথির সঙ্গে তাঁর পারিবারিক বন্ধনকে আবার দৃঢ় করেন। ২০০৪ সালে রায়বেরিলি সরে গিয়ে ছেলে রাহুলকে সঁপে দেন আমেথির ভার। সাংবাদিক শীতলাপ্রসাদ বললেন, 'এই কেন্দ্রে রাজমোহন গান্ধী, মেনকা গান্ধী, কাশীরাম, ভীম সিং, শারদ যাদবরাও লড়ে হেরেছেন। হারের পর এঁদের কেউই একবারের জন্যও আমেথির মাটি মাড়াননি। ব্যতিক্রম গান্ধী পরিবার। প্রিয়াংকা এ বন্ধনকে দৃঢ়তর করেছেন। আমেথি তাই উন্নয়ন-অনুন্নয়নের রাজনীতির চেয়েও সম্পর্ক ও ভাবাবেগকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে।'
এবারেও তারই পুনরাবৃত্তি ঘটবে বলে জগদীশ, আবদুর রহমান আর শীতলাপ্রসাদের বিশ্বাস। তবে এবারে নাটকীয় উপাদানের আধিক্য একটা ব্যতিক্রম। সেই ১৯৮০ সাল থেকে গান্ধী পরিবারের বিরুদ্ধে লড়াইটা সব সময় একপেশে হয়ে এসেছে। বিপক্ষের জামানত জব্দ হয়েছে সব সময়। সেই তুলনায় এবারের লড়াই একপেশে হবে না। সাংবাদিকতার ঢঙে জগদীশ পীযূষ বললেন, 'আমেথি হলো রাজনীতির শ্রীহরিকোটা। রাজনৈতিক ক্ষেপণাস্ত্র এখান থেকেই ছোড়া হয়। এবারের ভোটেও তার ব্যতিক্রম ঘটবে না। এত দিন ফাঁকা মাঠে গোল হয়েছে, এবার অন্তত খেলোয়াড়েরা রয়েছে। শোনা যাচ্ছে, মোদি আসছেন প্রচারে। আসুন, বুঝবেন আমেথি কেন গান্ধী পরিবারের খাসতালুক।'

0 comments:

Post a Comment

 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. XNews2X - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু