Home » , , » উন্নয়নকাজের নামে নৈরাজ্য by এম জেড হোসেন আরজু

উন্নয়নকাজের নামে নৈরাজ্য by এম জেড হোসেন আরজু

Written By Unknown on Monday, February 7, 2011 | 3:02 AM

স্বাধীন জাতিসত্তা বিকাশের (১৯৭১) আগে থেকে বাংলাদেশে রাষ্ট্র উন্নয়নের কার্যক্রমে যত নেতিবাচক প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়েছে, তার মধ্যে সরকারের যেকোনো ভৌত অবকাঠামো ও শিল্পায়ন কর্মসূচির প্রতি প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল এবং সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের গণবিরোধিতা অন্যতম।

আমরা কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ও প্রকল্প উদ্ভূত ঘটনাবলি কমবেশি অবগত আছি। স্থানীয় বাসিন্দারা তীব্র বিরোধিতা করেছিল সমূহ ক্ষতির আশঙ্কায়। সরকারি কিছু পুনর্বাসন কর্মসূচি তাদের জন্য বরাদ্দ হলেও যে শক্তিশালী বিরোধিতা ও উপেক্ষার আচরণে সরকার তাদের বিচ্ছিন্নতাবাদীতে পরিণত করেছিল, তার মাসুল এখন পর্যন্ত দেশ দিয়ে যাচ্ছে, উপজাতীয় স্বায়ত্তশাসনের চুক্তি করেও তারা অবিশ্বাস ও অতৃপ্তিতে ভুগছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গত শতাব্দীর সাত দশকের দিকে জাতীয় সার্বিক প্রগতি ও সামাজিক জীবনে উৎকর্ষ সাধনে তুলনামূলক অনগ্রসরতার জন্য জনপ্রশাসনের বুদ্ধিবৃত্তিক সংকটকে দায়ী করা হয়। প্রোজ্জ্বল রাজনৈতিক প্রতিভা জন এফ কেনেডির (১৯১৭-১৯৬৩) আকস্মিক আততায়ীর হাতে জীবন হারানোর ফলে মার্কিন জনপ্রশাসন ও রাষ্ট্র-উন্নয়নের যথাযথ রাস্তা বাধাগ্রস্ত হয়। প্রতীয়মান, আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশও সে ধরনের রাহুগ্রস্ত। সরকার কর্তৃক আরোপিত প্রকল্প প্রকৃতপক্ষে জনগণকে একটি বিরুদ্ধশক্তি হিসেবে গঠনের সুযোগ করে দেয় এবং সেই সুযোগ ব্যবহার করে স্বার্থলিপ্সু কিছু ব্যক্তি অথবা রাজনৈতিক দল। বিশ্বের উন্নতমানের কয়লা খনি হিসেবে স্বীকৃত আমাদের বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি। নূ্যনতম ১০ লাখ টন বার্ষিক উৎপাদনক্ষম এ কয়লা খনি স্থানীয় অধিবাসীদের অসন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে নিয়মিত কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উপনীত হতে পারছে না। গ্রামবাসীর অভিযোগ ও অসন্তুষ্টি, তারা যে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত তা নিরসনে সরকারি কর্তৃপক্ষের প্রকৃত আন্তরিক উদ্যোগের পরিচয় পেতে প্রায় যুগ অতিক্রম করতে যাচ্ছে। অতি সম্প্রতি অবস্থার যে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন দৃশ্যমান, তা বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি প্রকল্পের কর্তৃপক্ষের একান্ত নিজস্ব আন্তরিক চেষ্টার ফল।
সরকারের ধ্রুপদী যে সংজ্ঞা 'ড়োবৎহসবহঃ ড়ভ ঃযব চবড়ঢ়ষব, ঋড়ৎ ঃযব চবড়ঢ়ষব, ইু ঃযব চবড়ঢ়ষব'_বিশ্বজনীন তা মনে-মননে-বিশ্বাসে-কর্মে সক্রিয় রাখতে পারলে বাংলাদেশে উন্নয়ন প্রকল্পের প্রেক্ষাপটে সরকার ও জনগণের পারস্পরিক প্রতিপক্ষ অবস্থানে দড়ি টানাটানির পরিস্থিতি তৈরি হতো না। বস্তুত এ ধ্রুপদী সংজ্ঞার জ্ঞান স্মরণে না রাখার ব্যর্থতা উত্তরাধুনিক যুগে বড় মাত্রার নৈতিক অপরাধ।
সরকারপ্রধান, রাষ্ট্রপ্রধান ও মন্ত্রিপরিষদকে অবশ্যই ভাবতে হবে, তাঁদের পরামর্শক ও শুভার্থীরা আবেগাপ্লুত হয়ে অথবা স্বার্থতাড়িত হয়ে অথবা প্রজ্ঞার ঘাটতিঘটিত কারণে অথবা জনবিচ্ছিন্নতার কারণে প্রকৃত মাঠপর্যায়ের অবস্থা অনুধাবন না-ও করতে পারেন। সে অবস্থায় তাঁদের পরামর্শে গুরুতর ভবিতব্যের পথ রচিত হতে পারে। জনগণের বন্ধু বঙ্গবন্ধু (১৯২০-১৯৭৫), যাঁর অবিচ্ছেদ্য স্বভাব গভীর গণসম্পৃক্তি এবং নির্বিশেষে প্রত্যেককে বুকের ভালোবাসা দিয়ে সিক্ত করা, তাঁকে পরামর্শ দিয়ে একদলীয় শাসনব্যবস্থা এ দেশে কায়েম করা হয়েছিল ১৯৭৫ সালে। যে ভুলের মর্মান্তিক মাসুল প্রাণের নেতাকে দিতে হয়েছিল নিজের প্রাণ দিয়ে। তাই মুক্তিযুদ্ধের প্রধান ও অভিভাবক শক্তি আওয়ামী লীগ যখন জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার গঠন ও পরিচালনা করছে, ইতিহাসের শিক্ষায় আলোকিত হয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে গণবিরোধিতা প্রশমনের প্রক্রিয়া আজ অনুসন্ধান করা জরুরি। বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু প্রায়ই সরকারি কর্মচারীদের উদ্দেশে বলতেন_জনগণকে ভালোবাসতে হবে, শ্রদ্ধা করতে হবে। এ গুণাবলি সরকারি প্রশাসন এবং রাজনৈতিক নেতাদের মনে নেই বলে সেখানে স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা প্রয়োজন; তোয়াক্কা না করে একতরফা উন্নয়ন প্রকল্প রূপায়ণে অগ্রসর হোন। অথচ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত হয়েছে, প্রজাতন্ত্র বা রাষ্ট্রের মালিক জনগণ।
এ প্রেক্ষাপটে আরেকটি জ্বলন্ত ঘটনা উল্লেখ করা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বর্তমান সরকার চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার মাঝেরচর ও রাঙ্গাদিয়া মৌজায় প্রায় ৫৯৬ একর জমি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র নির্মাণে অধিগ্রহণ ও হুকুমদখলের চূড়ান্ত অনুমোদনে প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এর মধ্যে ২৬৪ একর জমি উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ইস্ট ওয়েস্ট প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট (প্রা.) লিমিটেডের বরাবরে বার্ষিক প্রায় সাড়ে আট কোটি টাকার বিনিময়ে ৩০ বছরের জন্য সরকারি অনুমোদনক্রমে ২০০৬ সালে ইজারা দেওয়া হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, দেশের শীর্ষস্থানীয় ওই প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানটি (ইডাবি্লউপিডি) ওই একই এলাকায় একাধিক বৃহদায়তন ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। এমনকি সরকার যেখানে বিদেশি কম্পানির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র নির্মাণের চিন্তাভাবনা করছে, সেখানে দেশি কম্পানি ইডাবি্লউপিডি একক উদ্যোগে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র নির্মাণের আগ্রহও সরকারের কাছে উত্থাপন করেছে। তথাপি সরকার ভূমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্তে অনড় এবং বিদেশি কম্পানির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে প্রকল্প গ্রহণে মরিয়া। কিন্তু স্থানীয় সচেতন জনগণ সরকারের প্রস্তাবিত প্রকল্পের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে বিরূপ অভিব্যক্তি সুস্পষ্টভাবে প্রদর্শন করেছে। সরকার ও রাষ্ট্র আমাদেরই, আমাদের অবশ্যই অনুধাবন করতে হবে বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতামূলকভাবে টিকে থাকতে আমাদের সরকারের উচিত জরুরিভাবে দেশীয় বুর্জোয়া ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থা বিকাশে পৃষ্ঠপোষকতা করা। মালয়েশিয়ার মাহাথির সরকার (১৯৮২-২০০৩) সে রকম রাজনৈতিক অর্থনীতি প্রয়োগ করে বিশ্বে অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পেরেছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক রাজনীতি ও অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদের প্রধান প্রবণতা ও কৌশল হলো জাতীয় পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট থেকে হাতিয়ে নেওয়া। অধিকন্তু প্রাইভেট করপোরেট হাউসগুলো দেশে সুস্থ ও টেকসই গণতন্ত্র বিকাশের জন্যও যথেষ্ট কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারঙ্গম_সরকার সম্ভবত এ ধরনের ধারণা পাত্তা দিতে অনিচ্ছুক। তবে কি বাংলাদেশ সর্বাত্মক (টোটালিট্যারিয়ান) রাষ্ট্র হিসেবে নিজের বিকাশকে এগিয়ে নিতে চায়? আমরা টোটালিট্যারিয়ান রাষ্ট্রের পরিণতি দেখেছি ইতালিতে, যার পরিসমাপ্তি ফ্যাসিস্ট সরকারপ্রধান মুসোলিনির (১৮৮৩-১৯৪৫) মর্মান্তিক হত্যাজনিত মৃত্যুতে। রাষ্ট্রের জনগণ যন্ত্রের মতো সক্রিয় থাকবে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির স্বার্থে_এমন রাষ্ট্রীয় নির্দেশনায় জনগণের সহিষ্ণুতার ভিত ভেঙে সোভিয়েত ইউনিয়ন টুকরো টুকরো হয়ে গেছে।
সরকার বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে প্রত্যয়ী হতে পারে, গণবিরোধিতা (জমি অধিগ্রহণ অথবা যেকোনো কারণে হতে পারে) একটি মামুলি ও ক্ষণস্থায়ী বিষয় এবং রাষ্ট্রের স্বার্থে যেকোনোভাবে যেকোনো অঞ্চলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব। তাই চট্টগ্রামের মাঝেরচর ও রাঙ্গাদিয়া মৌজায় সরকারের ভূমি অধিগ্রহণ ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের নীতিগত সিদ্ধান্ত সম্পর্কে পুনর্বিবেচনা ও প্রতিকারের সম্ভাব্য পথ পাওয়া যেতে পারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা থেকে। ১৯৯২ সালে একটি আন্তদেশীয় (কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও মেঙ্েিকা) কর্মপরিকল্পনা গৃহীত হয় ডাহুক (ধিঃবৎভড়ষি) প্রজাতির এক ধরনের দৃষ্টিনন্দন পক্ষির আবাস সংরক্ষণ এবং জীববৈচিত্র্য কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে। ফলে আট লাখ ৮০ হাজার একর জলাভূমি ও প্লাবনমুক্ত উঁচু জমি অধিগ্রহণ ও সংরক্ষণের প্রয়োজন দেখা দেয়। পরিকল্পনাধীন ভূমির ৩০ শতাংশ বেসরকারি ব্যক্তি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন ছিল। এই এসিই বেসিন প্রকল্পটি সরকার ও জনসাধারণের ঐক্যবদ্ধ কর্মপ্রয়াস ও পরিকল্পিত প্রকল্প বাস্তবায়নের একটি চমৎকার উদাহরণ। প্রকল্পের মৌলিক লক্ষ্যকে সামান্যতম বিঘি্নত না করেও বেসরকারি ভূমি মালিকরা তাদের অভ্যস্ত কর্মসূচি ও ব্যবহার ওই জমিতে চালিয়ে যেতে থাকে, যা থেকে আর্থিক সুবিধা অর্জনও সম্ভব হয়। ভূমির ব্যক্তিগত মালিকানা অক্ষুণ্ন রেখেও সরকারি ও বেসরকারি উভয় পক্ষ ওই একই প্রকল্প থেকে সন্তুষ্ট মাত্রায় সুযোগ-সুবিধা অর্জন করতে থাকে। প্রাণিজীবন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের উদ্দেশ্যমুখী এ অনুভূতিকাতর প্রকল্পের ভেতরে ওয়েস্ট ভ্যাকো করপোরেশন নামে একটি শিল্পকারখানা আছে, যেটি বেসরকারি ভূমি মালিকদের মধ্যে এককভাবে বৃহত্তম। শিল্পকারখানাটির ব্যক্তিগত ভূমি রয়েছে প্রায় ১৮ হাজার একর। বেসরকারি খাতের ওয়েস্ট ভ্যাকো করপোরেশন ১৯৯১ সালে সরকারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এক সমঝোতামূলক চুক্তিতে তার মুদ্রণ, কাগজ উৎপাদন, প্যাকেজিং এবং সংশ্লিষ্ট রাসায়নিকসহ বিশাল কর্মযজ্ঞ সেখানে পুরোপুরি চালিয়ে যাচ্ছে। পক্ষান্তরে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশে সরকার সব সময় স্থানীয় জনগণকে পীড়নমূলক পদ্ধতিতে যেকোনো শিল্প প্রকল্প বাস্তবায়নে অগ্রসর হওয়ার পথ বেছে নেয়। বিবৃত তথ্যালোকে বিনয়ের সঙ্গে জনপ্রতিনিধিদের সমীপে ব্যক্ত করা প্রয়োজন মনে করছি, বাংলাদেশে বিকাশমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থা তথা বিজনেস করপোরেট হাউসগুলোকে মিত্র ও সহায়ক উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে বিশ্বাসপূর্বক সার্বিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করলেই গণতান্ত্রিক দেশ গঠনের সাধনা পূর্ণ হয়ে যায় না। বরং এখানে রাষ্ট্রীয় পদ্ধতি যখন লুণ্ঠনকারীর মতো আচরণে অভ্যস্ত, স্বদেশি শিল্পোদ্যোক্তারা যখন নিরাশার আঁধারে বেদনা-ক্লান্ত, তখন দিনবদলের প্রতিশ্রুতিশীল জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতাসীন হয়ে নতুনভাবে জনগণের হৃদয়ের ধ্বনি ও অনুভূতিসম্ভারকে গভীরভাবে অনুধাবনের নিবিড় প্রচেষ্টা থাকা দরকার।

0 comments:

Post a Comment

 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. XNews2X - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু