শিল্পসমৃদ্ধ দেশ গড়তে দরকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা

Sunday, January 23, 2011

শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া বলেছেন, শিল্পসমৃদ্ধ দেশ গড়তে সবার আগে দরকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি। স্বচ্ছ প্রশাসন ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

এর জন্য সরকারের ধারাবাহিকতারও প্রয়োজন রয়েছে। তিনি বলেন, এবারের বিজয় দিবসে জাতির জন্য সবচেয়ে বড় উপহার হচ্ছে সাকা চৌধুরীর গ্রেপ্তার। এই গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে একটি মহল দেশকে পরিকল্পিতভাবে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। মৌলভীবাজারের রাজনগরে যুক্তরাজ্য প্রবাসী বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ড. এম জি মৌলা মিয়ার প্রতিষ্ঠিত এমবিএম বিল্ডার্স মার্ট বিডি-ইউকে লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিল্পমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী আরো বলেন, 'পৃথিবীর অনেক বিত্তশালী ও শিল্পোন্নত দেশ অর্থনৈতিক মন্দার ফলে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। তাদের অর্থনীতি কুঁজো হয়ে গেছে। এ অবস্থায় প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স প্রবাহের ওপর ভর করে আমাদের অর্থনীতি সটান দাঁড়িয়ে আছে। বাংলাদেশে রেমিটেন্স প্রেরণকারীদের একটি বড় অংশ সিলেটের অধিবাসী। তাদের কষ্টার্জিত টাকায় এ দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হচ্ছে। এমবিএম বিল্ডার্স মার্ট বিডি-ইউকে লিমিটেড প্রতিষ্ঠার মতো ব্যতিক্রমী উদ্যোগ দেশের অন্যান্য এলাকার উদ্যোক্তাদেরও উৎসাহিত করবে।' এমবিএম বিল্ডার্স মার্ট বিডি-ইউকে লিমিটেডের চেয়ারম্যান ড. এম জি মৌলা মিয়ার সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক মোস্তাফিজুর রহমান, পুলিশ সুপার হারুন-অর রশীদ, শিল্পমন্ত্রীর একান্ত সচিব জাহেদ মোস্তাক, রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোখলেসুর রহমান সরকার, সাবেক উপসচিব অজিত কুমার পাল ও এমবিএম বিল্ডার্স মার্ট বিডি-ইউকে লিমিটেডের ভাইস চেয়ারম্যান ফারহানা মৌলা।
অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন দৈনিক বাংলার দিন সম্পাদক বকসি ইকবাল আহমদ। আগে মন্ত্রী মৌলভীবাজার সার্কিট হাউসে স্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
এদিকে গত শনিবার সকালে নরসিংদী বিসিক শিল্পনগরীর বিভিন্ন কারখানা পরিদর্শনকালে শিল্পমন্ত্রী বলেন, দেশকে শিল্পসমৃদ্ধ করা বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য। শিল্পসমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে শিল্পোন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণেও গুরুত্ব দিতে হবে এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। এসময় পুলিশ সুপার ড. মো. আক্কাস উদ্দিন ভূঞা ও বিসিক শিল্পনগরীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন।

হালকা প্রকৌশল শিল্পঃ কারিগরির বিস্ময় ধোলাইখালে

Wednesday, January 12, 2011

পুরান ঢাকার ধোলাইখালের দিদার ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড গাড়ির নানান যন্ত্রাংশ তৈরি করে। ২০০৯ সালের ডিসেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মিলবার্ট ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি প্রতিষ্ঠান এই দিদার ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে যন্ত্রাংশ আমদানির চুক্তি করে। চুক্তি অনুযায়ী যন্ত্রাংশ তৈরিও করেছে তারা। নমুনা পরীক্ষা করে সনদও দিয়েছে বাংলাদেশ শিল্প কারিগরি সহায়তা কেন্দ্র (বিটাক)।

নিউ মিলবার্ট ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী নিশান রহিম কালের কণ্ঠকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় খুচরা ক্রেতাদের কাছ থেকে ভালো সাড়া পেলে তাঁরা প্রতি মাসে ৫০ হাজার ডলারের যন্ত্রাংশ কিনবেন বাংলাদেশ থেকে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের জেনারেল ইলেকট্রিক কম্পানিসহ তিনটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ থেকে গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানির ইচ্ছা জানিয়ে ই-মেইল
পাঠিয়েছে বিটাকের অতিরিক্ত পরিচালক ড. ইহসানুল করিমের কাছে।
শুধু তাই নয়, ধোলাইখালের এই দিদার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের উৎপাদিত যন্ত্রাংশের নমুনা সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে পাঠানো হয়েছিল। সৌদি আরবের ব্যবসায়ীরা নমুনা দেখে পছন্দ করে ৪৫ দিনের মধ্যে বিপুল পরিমাণ যন্ত্র কেনার প্রস্তাব করেছেন। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার মো. বাচ্চু মিয়া বলেন, ‘আমাদের পুরনো প্রযুক্তি দিয়ে এত কম সময়ে বিপুল পরিমাণ যন্ত্রাংশ উৎপাদন সম্ভব কি না, তা ভেবে বেকায়দায় আছি।’
এ রকম সাফল্য হালকা প্রকৌশল শিল্পের অনেকেরই রয়েছে। যশোরের একটি প্রতিষ্ঠান লোহা দিয়ে তৈরি করেছে গম থেকে আটা তৈরির মেশিন। এ মেশিন তারা অস্ট্রেলিয়ায় রপ্তানিও করছে। চীন থেকে ইঞ্জিন আমদানি করে ব্যাটারিচালিত গাড়ি তৈরি করেছে বগুড়ার রহিম ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ। গাড়ির নিজস্ব শক্তি থেকে চার্জ করা ব্যাটারিচালিত এ গাড়ি ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার গতিতে চলতে পারে। এইচটি ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস নামের অন্য একটি প্রতিষ্ঠান ১৭ বছর আগেই নিফ ভালভ তৈরি করেছে। এটি এখন কাগজ কলের পাল্পের ফ্লো নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করা হচ্ছে। রাজধানীর লালবাগের মাফিয়া ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস নানা ধরনের কমপ্লিট মেশিনারি তৈরি করছে। এর মধ্যে রয়েছে সিলিং অ্যান্ড কাটিং মেশিন, পিপিপিই ফিল্ম মেকিং মেশিন, রোটারি ডাই সিস্টেম, হিপস অ্যান্ড পিপিসেট মেকিং মেশিন, পেলু প্যাক মেশিন, পাউন্স কাটিং মেশিন।
সফটওয়্যার ছাড়া সাধারণ প্রযুক্তিতে সম্ভব এমন সব ধরনের যন্ত্র ও যন্ত্রাংশই তৈরি করতে পারেন হালকা প্রকৌশল শিল্পের উদ্যোক্তারা। পাটকলের সব যন্ত্রাংশ, চা প্রক্রিয়াকরণে ব্যবহƒত সিটিসি মেশিন বাদে সব যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ, সমিলের ব্লেড বাদে সব যন্ত্র তৈরি হয় ধোলাইখালে। ইস্পাহানি চায়ের সব যন্ত্র ও মেশিন দেশি উদ্যোক্তাদের তৈরি। ধোলাইখালেই তৈরি হচ্ছে ব্যাংকের এটিএম বুথের ঘর। এ ছাড়া পরিবহন সেক্টরের প্রায় সব যন্ত্রই পাওয়া যায় এখানে। আর সেচপাম্প, পাওয়ার পাম্প, পাওয়ার টিলারসহ নানা ধরনের কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরি হচ্ছে বগুড়ায়। দেশের চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ মিটিয়ে এগুলো ভারতসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানিও করা হচ্ছে।
ধোলাইখালের নিপুণ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মালিক আবুল হাশিম বলেন, ‘কয়েক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্র থেকে চোখের কন্টাক্ট লেন্স আমদানি করে ঢাকার এক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু সঙ্গে দেওয়া টু ওয়ে কাটার দিয়ে লেন্স কাটার পরই তা ভেঙে যাচ্ছিল। আমদানিকারকরা বেকায়দায় পড়ে যান। তাঁরা আলোচনা করেন আমার সঙ্গে। আমি লেন্স আমদানিকারকদের আশ্বস্ত করে কয়েক দিন সময় নিয়ে ফোর ওয়ে কাটার তৈরি করে দিই। মহাখুশি হন আমদানিকারকরা। তাঁরা আমাকে বলেন, আপনি নিশ্চয়ই যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের কাটার তৈরি করতে দেখেছেন; না হলে কিভাবে ধোলাইখালে বসে এ রকম যন্ত্র তৈরি করলেন আপনি?’
আশির দশকে সরকার শুল্কমুক্তভাবে ডিজেল ইঞ্জিন আমদানির সুযোগ দেয়। স্থানীয় উদ্যোক্তারা ওই ডিজেল ইঞ্জিনকে নৌ (বোট) ইঞ্জিনে রূপান্তর করেন। সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সফলতা দেখান হালকা প্রকৌশল শিল্পের উদ্যোক্তারা। তাঁরা সেচপাম্পের ডিজেল ইঞ্জিন দিয়ে থ্রি হুইলার যান তৈরি করেন।
বিইআইওএর সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক জানান, এ শিল্পের মালিকরা যেকোনো যন্ত্র একবার মাত্র দেখেই তৈরি করতে পারেন। বর্তমানে এ শিল্পের উদ্যোক্তারা প্রায় ৩৮ হাজার রকমের যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ তৈরি করছেন। এসব যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ শিল্প, গৃহস্থালি, কৃষি, বৈদ্যুতিক, যানবাহন, খেলনা ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে ব্যবহƒত হচ্ছে। এসবের মধ্যে কাগজ ও সিমেন্ট কারখানার যন্ত্রাংশ, বাইসাইকেল, ফ্যান্সি লাইট ফিটিং, নির্মাণ যন্ত্র, ভোল্টেজ স্ট্যাবিলাইজার, আয়রন চেইন, কার্বন রড, অটোমোবাইল পার্টস, বৈদ্যুতিক ও স্টেনলেস স্টিল ওয়্যার রপ্তানি হচ্ছে। মূলত ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হচ্ছে এসব পণ্য।
বিটাক আশা করছে, দেশের হালকা ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পকে উপযুক্ত প্রণোদনা দিতে পারলে এক দশকের মধ্যেই এটি দেশের প্রধান রপ্তানি খাতে পরিণত হবে। জাহাজ ভাঙা লোহা থেকে তৈরি গাড়ির যন্ত্রাংশ, ইলেকট্রিক পণ্য ও কৃষি খাতের যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ তৈরির পর তা রপ্তানি করলে মুনাফাও হবে অনেক বেশি।
বিটাকের অতিরিক্ত পরিচালক ড. ইহসানুল করিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিউ মিলবার্টের সঙ্গে রপ্তানি চুক্তি স্বাক্ষরের পাঁচ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জেনারেল ইলেকট্রিক কম্পানিসহ মোট তিনটি প্রতিষ্ঠান টেলিফোন ও ই-মেইলে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে বাংলাদেশ থেকে গাড়ির পার্টস আমদানির আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এসব দেশ এখন গাড়ির যন্ত্রাংশ উৎপাদন করে না। তারা মূলত চীন, তাইওয়ান ও ভারত থেকে এসব যন্ত্রাংশ আমদানি করে থাকে। কিন্তু ওই সব দেশের চেয়ে বাংলাদেশ তুলনামূলক কম দামে যন্ত্রাংশ রপ্তানি করতে পারবে।’ তিনি আরো জানান, জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) কর্মকর্তারাও বাংলাদেশ থেকে গাড়ির পার্টস আমদানির প্রস্তাব করেছেন। কানাডার বেশ কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও এ ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
ড. ইহসানুল করিম বলেন, ‘এসব দেশে যন্ত্রাংশ রপ্তানি করতে পারলে আমাদের আর বাজার খুঁজতে হবে না। ১০ বছরের মধ্যেই গার্মেন্টকে পেছনে ফেলে প্রধান রপ্তানি পণ্যে পরিণত হবে হালকা ইঞ্জিনিয়ারিং খাত।’
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) দুই ঊর্ধ্বতন গবেষক নাজনিন আহমেদ ও জায়েদ বখতের ২০১০ সালের জুন মাসে করা ‘লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্ডাস্ট্রি ইন বাংলাদেশ : এ কেস স্টাডি’-এর তথ্য অনুযায়ী, এ শিল্পের বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ ছয় লাখ টাকা থেকে ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত। তারা মাত্র দুই থেকে তিন লাখ টাকা পুঁজি নিয়ে এ ব্যবসা শুরু করে। ফলে এ শিল্পে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি করাও সহজ।

৪০ হাজারের বেশি কারখানাঃ বিপুল সম্ভাবনার হাতছানি

নষ্ট যন্ত্র বা যন্ত্রাংশের মতো হুবহু আরেকটি যন্ত্র বা যন্ত্রাংশ তৈরিতে প্রয়োজন একই গুণাগুণসম্পন্ন লোহা। লোহায় কার্বন বা অন্যান্য উপাদানের পরিমাণ কত, তা জানতে প্রয়োজন হয় গবেষণাগারে পরীক্ষার। কিন্তু ধোলাইখালের কারিগরদের কোনো গবেষণাগার নেই।

তাঁরা লোহার টুকরোটা ওপরে ছুড়ে মারেন। সেটা নিচে পড়ার পর শব্দ শুনেই 'স্বশিক্ষিত' দক্ষ কারিগররা বুঝে ফেলেন লোহার গুণাগুণ। আবার নমুনা যন্ত্র কাটার সময় আগুনের যে স্ফুলিঙ্গ তৈরি হয়, তার লাল-নীল রং দেখেই বুঝে নেন তাতে কার্বনের মাত্রা কত।
এভাবেই অভিজ্ঞতা, দক্ষতা আর মেধাকে পুঁজি করে শূন্য থেকে মহীরুহে পরিণত হয়েছে দেশের 'হালকা প্রকৌশল শিল্প' খাত। ভাঙা জাহাজের পুরনো লোহা দিয়ে তারা তৈরি করছে দামি সব যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ। সেসব যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ সংযোজন করেই চলছে দেশের ছোট-বড় বিভিন্ন ধরনের কলকারখানা, বাইসাইকেল থেকে রেলগাড়ি পর্যন্ত।
পুরান ঢাকার ধোলাইখালসহ দেশের কয়েকটি জায়গার উদ্যোক্তা ও কারিগরদের এমন অভিনব উদ্ভাবনী ক্ষমতার বহু নজির রয়েছে।
কিন্তু খরচ বেশি হওয়ায় গবেষণা ও উন্নয়নের (আরঅ্যান্ডডি) দিকে মন দিতে পারছেন না এ শিল্পের উদ্যোক্তারা। তাঁরা বরং রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে (অন্যকে অনুসরণ) দক্ষ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ শিল্পকৌশল প্রচলিত। এ প্রসঙ্গে একজন উদ্যোক্তা বলেন, 'এ শিল্পে করপোরেট বিনিয়োগ না থাকায় আরঅ্যান্ডডি সম্ভব হচ্ছে না। তা ছাড়া নয়া প্রযুক্তি আমদানি করে কাজ করতে গেলেও আমাদের জন্য তা লাভজনক হবে না, বরং ২০ থেকে ৫০ বছরের পুরনো প্রযুক্তি পেলেই আমরা খুশি। তাই আমাদের গবেষণার প্রয়োজন নেই। ভারত, চীনসহ বিভিন্ন দেশ অনেক গবেষণা করছে। আমরা তাদের অনুসরণ করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি।'
এ শিল্পের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্বাধীনতার আগে ঢাকার ধোলাইখালে বিহারি ও পাঞ্জাবি মালিকরা গাড়ি মেরামতের জন্য সাত-আটটি ওয়ার্কশপ গড়ে তুলেছিলেন। ওই সময় সারা দেশে এ ধরনের মেরামত কারখানা ছিল ৫০টিরও কম। তখন এসব কারখানায় যাঁরা শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন, স্বাধীনতার পর তাঁরাই উদ্যোক্তা হয়ে নতুন নতুন ওয়ার্কশপ গড়ে তোলেন। তৈরি করেন নানা ধরনের যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ। কিন্তু এ পর্যন্ত এ খাতের উদ্যোক্তারা সরকারের কাছ থেকে কার্যত কোনো সহায়তা পাচ্ছেন না। প্রয়োজন পড়েনি ব্যাংক ঋণেরও। পোশাক খাতসহ
অন্যান্য শিল্পের মতো এ খাতের উদ্যোক্তাদের সমিতি দল বেঁধে যেমন সরকারের কাছে দাবিনামা তুলে ধরেনি, তেমনি সরকারগুলোও কোনো অনুকম্পা দেখায়নি এ খাতের বিকাশে। তা সত্ত্বেও দেশের চাহিদার প্রায় ৫০ শতাংশ পূরণ করে বিদেশেও রপ্তানি করছেন এ শিল্পের উদ্যোক্তারা। আর দেশের বাজারে এ শিল্পের এতটাই চাহিদা যে, ক্রেতারা প্রায়ই যন্ত্রাংশ তৈরির জন্য উদ্যোক্তাদের অগ্রিম অর্থ দিয়ে বুকিং দিয়ে রাখেন।
হালকা প্রকৌশল শিল্পমালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্ডাস্ট্রিজ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিইআইওএ) সভাপতি আবদুর রাজ্জাক কালের কণ্ঠকে বলেন, এ শিল্পে সারা দেশে গড়ে উঠেছে ৪০ হাজারেরও বেশি কারখানা। এর মধ্যে ৩৬ হাজার প্রতিষ্ঠান রিপেয়ারিং সার্ভিসিং করে থাকে। বাকি প্রায় চার হাজার কারখানা নতুন যন্ত্র উৎপাদন করে। অথচ পুরো সেক্টরে ৫০ জন ইঞ্জিনিয়ারও খুঁজে পাওয়া যাবে না। অদক্ষ, অর্ধশিক্ষিত কারিগরদের হাতেই তৈরি হচ্ছে মূল্যবান সব যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ। তিনি আরো জানান, সরাসরি ছয় লাখ লোক কর্মরত হালকা প্রকৌশল শিল্পে। এ শিল্পে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। বছরে নতুন যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ উৎপাদন হচ্ছে ১২ হাজার কোটি টাকার। ভাঙাচোরা লোহালক্কড় থেকে তৈরি এসব যন্ত্র ও যন্ত্রাংশে মূল্য সংযোজন গড়ে ৮০ শতাংশেরও বেশি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মূল্য সংযোজন হাজার গুণ পর্যন্ত হয়। উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে মেরামত যোগ করলে এ খাতের বার্ষিক টার্নওভারের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিভিন্ন শিল্প খাত ও পরিবহন সেক্টরের প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের প্রায় ৫০ শতাংশ সরবরাহ হচ্ছে এ শিল্প থেকে। দুই-আড়াই দশক আগেও এর পুরোটাই ছিল আমদানিনির্ভর। যন্ত্রাংশ ছাড়াও আস্ত নতুন যন্ত্রও তৈরি হচ্ছে ঢাকার ধোলাইখাল, বগুড়া ও যশোরের বিভিন্ন কারখানায়। এসব রপ্তানিও হচ্ছে। প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৩০ কোটি ডলার আয় হচ্ছে এ খাতের রপ্তানি থেকে। জিডিপিতে এ শিল্পের অবদান প্রায় ২ শতাংশ বলে বিইআইওএ জানায়। তাদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশ বছরে সাত কোটি ৪০ লাখ ডলারের গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানি করে। আর হালকা প্রকৌশল শিল্প থেকেই দেশের বাজারে সরবরাহ করা হয় সাত কোটি ৫০ লাখ ডলারের যন্ত্রাংশ।
ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি), ইউকে ডিপার্টমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ও নরওয়ে সরকারের সহযোগিতায় সাম্প্রতিক এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৫০ হাজার অতি ছোট এবং ১০ হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি আয়তনের হালকা প্রকৌশল শিল্পে কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা ছয় লাখ। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অন্য এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, এ শিল্পে কারখানার সংখ্যা ৪০ হাজার আর কর্মরত শ্রমিক আট লাখ।
হালকা প্রকৌশল শিল্পে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ রকমের যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনে (বিসিক) নিবন্ধিত এক হাজার ২০০ উদ্যোক্তা বিভিন্ন সরকারি-আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানে সাবকন্ট্রাক্টের মাধ্যমে যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ সরবরাহ করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে রেলওয়ে, তিতাস, বাখরাবাদ ও জালালাবাদ গ্যাস কম্পানি, চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডাব্লিউটিএ), বন্দর কর্তৃপক্ষ, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, সিভিল এভিয়েশন, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি), বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশন (বিটিএমসি), বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন (বিজিএমসি) ইত্যাদি। যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ তৈরি করা ছাড়াও মেরামতের প্রায় ৮০ শতাংশ কাজই করছেন এ শিল্পের উদ্যোক্তারা।
বিইআইওএর সভাপতি আবদুর রাজ্জাক, নিপুণ ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের মালিক আবুল হাশিম, দিদার ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী বাচ্চু মিয়াসহ বিভিন্ন উদ্যোক্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্বাধীনতার আগে হালকা প্রকৌশল শিল্পে বাঙালিদের তেমন অবদান ছিল না। বিহারি ও পাঞ্জাবি উদ্যোক্তাদের হাতে ঢাকার ধোলাইখালে ইউনাইটেড ইঞ্জিনিয়ারিং, মডেল ইঞ্জিনিয়ারিং, বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং, ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং ও মমিন ওয়ার্কশপ গড়ে ওঠে। অবাঙালিদের এসব প্রতিষ্ঠানে পুরান ঢাকার মানুষ শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করে। ওই সময় পাটকলের যন্ত্রাংশ তৈরি করত চট্টগ্রামের ইস্পাহানি ও গালফ হাবিব নামের দুটি প্রতিষ্ঠান। উত্তরাঞ্চলের যানবাহনের যন্ত্রাংশ তৈরি ও মেরামতের জন্য রংপুরে একটি ওয়ার্কশপ ছিল। স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্কালে কারখানার মালিকরা শ্রমিকদের হাতে দায়িত্ব দিয়ে দেশ ছাড়েন। তাঁদের অনেকে এখনো সেসব কারখানা চালাচ্ছেন। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় ইস্পাহানি ও গালফ হাবিব বন্ধ হয়ে যায়। যুদ্ধের পর পাটকলগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ যন্ত্রাংশের অর্ডার আসতে থাকে ঢাকার ধোলাইখালের কারখানাগুলোতে। আগে থেকে ধোলাইখালে কাজ করা শ্রমিকরা তখন নতুন নতুন ওয়ার্কশপ স্থাপন করে যন্ত্রাংশ তৈরির কাজ শুরু করেন।
আবদুর রাজ্জাক বলেন, এ শিল্পে সরকারের তেমন কোনো সহযোগিতা নেই। শুল্কমুক্তভাবে কাঁচামাল ও প্রযুক্তি আমদানি, স্থানীয় বাজার থেকে কাঁচামাল সংগ্রহের ক্ষেত্রে ভ্যাট মওকুফ করা কিংবা নিজেদের উৎপাদিত যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ বিপণনেও ভ্যাট অব্যাহতি মেলেনি। ফলে ১০০-২০০ বছরের পুরনো হস্তচালিত মেশিনেই যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ তৈরি করতে হচ্ছে। দু-তিন বছর আগে কেবল রপ্তানি আয়ের ওপর ১০ শতাংশ হারে প্রণোদনা ঘোষণা করে সরকার। তাতে এ খাতের ব্যবসায়ীরা সব মিলিয়ে বছরে পান মাত্র ৫০-৬০ লাখ টাকা।
উদ্যোক্তাদের আরেকটি দাবি, কৃষি ও আইটি খাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের যে বিনা সুদে ঋণের তহবিল (ইইএফ ফান্ড) আছে, সেখানে হালকা প্রকৌশল শিল্পকেও অন্তর্ভুক্ত করা হোক বা ওই তহবিলের মতো এ শিল্পের জন্যও একটি তহবিল গঠন করা হোক।
শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়ার কাছে জানতে চাওয়া হলে কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, 'দেশে হালকা প্রকৌশল শিল্প থেকে বড় কিছু গড়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। আমরা এটা খুবই গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। শিল্পনীতিতে ছোট, মধ্য ও বড় কারখানা গড়ে তোলার যে পরিকল্পনা আছে, সেখানে এ শিল্পকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এমনকি হালকা প্রকৌশল শিল্পপল্লী গড়ে তোলার পরিকল্পনাও সরকারের আছে।'
 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. XNews2X - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু