বিশেষ সাক্ষাৎকার- আফগানিস্তানে তালেবানের প্রভাব আর নেই: নাজেস আফরোজ by মশিউল আলম ও এ কে এম জাকারিয়া

Tuesday, February 11, 2014

নাজেস আফরোজের জন্ম পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান শহরে, ১৯৫৮ সালে। কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে ১৯৭৯ সালে রসায়নশাস্ত্রে স্নাতক ডিগ্রি লাভের পর এক বছর কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েন। ১৯৮১ সালে কলকাতার দৈনিক আজকাল পত্রিকায় সাংবাদিকতা শুরু করেন।
১৯৯৮ সালে বিবিসি বাংলা বিভাগে প্রযোজক হিসেবে যোগ দেন। ২০০১ সালে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে কাজ শুরু করেন প্রযোজক হিসেবে। ২০০৬ সালে বিবিসি ওয়ার্ল্ডের সাউথ এশিয়া ব্যুরোর এক্সিকিউটিভ এডিটর হন। ২০১১-১২-তে তিনি এডিটর ইন্টারন্যাশনাল অপারেশন্স-এর দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সালে চাকরি ছেড়ে দিয়ে লেখালেখি শুরু করেন। নাজেস আফরোজ একজন আফগানিস্তান বিশেষজ্ঞ।

প্রথম আলো  আপনি তো দীর্ঘ সময় ধরে আফগানিস্তানে যাওয়া-আসা করেছেন এবং সাংবাদিক হিসেবে সে দেশের খোঁজখবর রাখেন। দেশটির অবস্থা এখন কেমন?
নাজেস আফরোজ  ২০০১ সালে তালেবানের পতনের পর আফগানিস্তানের যে চেহারা ছিল, এখন তার সঙ্গে আকাশ-পাতাল তফাত।
প্রথম আলো  ভালো না খারাপ?
নাজেস আফরোজ  অনেক ভালো। ২০০২ সালে গোটা কাবুল শহরের যে ভগ্নদশা ছিল, আজকে সেই জায়গাগুলো ঘুরেফিরে দেখলে শহরটাকে চেনাই যায় না। জমির দাম, বাড়িভাড়া অনেক বেড়েছে। অবশ্য এর একটা কারণ, অনেক আন্তর্জাতিক এনজিও সেখানে কাজ করছে, প্রচুর বিদেশি লোক থাকে। এসব কারণে একটা ফলস ইকোনমি তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেটাকে যদি বাদও দিই, তবু কাবুলের অনেক উন্নতি হয়েছে। শুধু কাবুল নয়, আমি হেরাত, মাজারে শরিফ, জালালাবাদ, কান্দাহার—যেখানেই গেছি, সবখানেই অনেক উন্নতি চোখে পড়েছে।
কাবুল শহর থেকে ১৪ কিলোমিটার উত্তরে একটা ছোট্ট গঞ্জমতো আছে চারিকার নামে। চারিকার মানে চৌরাস্তা, চারটি প্রধান সড়ক সেখানে মিলিত হয়েছে। ২০০৩ সালে সেই চারিকারে দেখেছিলাম খুব দীন দশা, দু-চারটি দোকানপাট ছাড়া আর তেমন কিছু ছিল না। প্রায় ১০ বছর বাদে আমি আবার সেই চারিকারে গেলাম। দেখলাম, গমগম করছে প্রাণবন্ত একটা শহর। বোঝা গেল যে অর্থনীতির চাকা ঘুরছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্য দেখতে পাবেন। চাষবাস হচ্ছে।
প্রথম আলো  নিরাপত্তা পরিস্থিতি কেমন?
নাজেস আফরোজ  নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে, এ কারণে যেকোনো জায়গায় যেকোনো সময় আক্রমণ হতে পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় সেটার প্রতিফলন একদমই চোখে পড়ে না। কারণ, তালেবান ও অন্যান্য বিদ্রোহী, জঙ্গিগোষ্ঠী আক্রমণ চালায় সরকারি লোকজন ও স্থাপনার ওপর এবং বিদেশিদের ওপর। সাধারণ মানুষ তাদের আক্রমণের শিকার হয় না। সেই কারণে নিরাপত্তার উদ্বেগটা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে দৃশ্যমান নয়।
প্রথম আলো  কিন্তু আমরা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আফগানিস্তানের যে চিত্র পাই, সেটা তো একেবারেই উল্টো।
নাজেস আফরোজ  আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের হয়ে কাজ করতে যাঁরা আফগানিস্তানে যান, তাঁদের বেশির ভাগই ইউরোপ-আমেরিকার মানুষ। গায়ের রঙেই তাঁদের আলাদা করে চেনা যায়। তাঁদের যাতায়াতের ওপর অনেক বিধিনিষেধ থাকে, তাঁদের প্রতিষ্ঠানই সেটা তাঁদের নিরাপত্তার স্বার্থে করে। আমি নিজেও বিবিসিতে কাজ করার সময় সেটা দেখেছি। তাঁরা যদি রাস্তাঘাটে না বেরোন, গ্রামগঞ্জে না যান, তাহলে প্রকৃত চিত্রটা পাবেন কী করে? সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় যে নিরাপত্তাহীনতার প্রভাব পড়ছে না, সেটা তো তাঁদের দেখতে হবে। বছর দেড়েক আগে আমি আমার আফগান বন্ধু-সহকর্মীর বাড়িতে গিয়ে থেকেছি—মাজারে শরিফে। সেখান থেকে একটা ছোট্ট ভাঙা গাড়িতে করে বাল্ক শহর পর্যন্ত গেছি, সেখানে রাস্তার মধ্যে ছবি তুলেছি। আমার সহকর্মীরা গাড়িতে করে মাজারে শরিফ চলে যায়, ১২ ঘণ্টা লাগে। অবশ্য কান্দাহারের সড়কটা নিরাপদ নয়; এ রকম আরও কিছু রাস্তা আছে, যেগুলো নিরাপদ নয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আফগানিস্তান নিয়ে যাঁরা লেখেন, তাঁদের সিংহভাগই পশ্চিমা; সেখানে তাঁদের জীবনের নিরাপত্তার শঙ্কাটা খুব বেশি। সেই শঙ্কা তাঁদের লেখালেখিতে প্রতিফলিত হয়।
প্রথম আলো  আফগানিস্তান থেকে ন্যাটোর সেনাবাহিনী এ বছর চলে গেলে দেশটিতে আবার তালেবান ফিরে আসতে পারে বলে উদ্বেগের খবর আমরা পাই। আপনার কী মনে হয়?
নাজেস আফরোজ  তিন ধরনের সম্ভাবনা আছে। একটা হচ্ছে, এই সরকারের পতন ঘটবে, তালেবান ক্ষমতা নিয়ে নেবে। দুই নম্বর হচ্ছে, আলোচনা হবে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে। আফগানিস্তানের পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে যাবে। তিন নম্বর হচ্ছে, একটা মাঝামাঝি অবস্থা থাকবে। অর্থাৎ, একটা সরকার থাকবে এবং মাঝারি থেকে নিম্ন মাত্রায় বিদ্রোহ চলতে থাকবে। আমার ধারণা, এই শেষের সম্ভাবনাটাই বেশি।
প্রথম আলো  সে অবস্থায় বাইরের শক্তিগুলোর ভূমিকা কেমন হতে পারে? বিশেষত পাকিস্তানের?
নাজেস আফরোজ  আফগানরা মনে করে, পাকিস্তানের ভূমিকা নেতিবাচক; তাদের কাছে পাকিস্তানের প্রভাব, তাদের উপস্থিতি কাম্য নয়। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে অভিজাত পর্যন্ত, গোত্রনির্বিশেষে আফগানিস্তানের সব মানুষ এটা মনে করে। আর পাকিস্তান যে আফগানিস্তানে প্রভাব রাখতে চায়, সেটা খুব পরিষ্কার। পাকিস্তান খোলাখুলি সেটা বলেছেও। পাকিস্তানের আশঙ্কা হচ্ছে, আফগানিস্তানে ভারতীয় প্রভাব খুব বেশি। ভারত খুব বুদ্ধি করে সেখানে প্রভাব বাড়িয়েছে। ভারত আফগানিস্তানের পঞ্চম বৃহত্তম দ্বিপক্ষীয় দাতাদেশ। ভারত আফগানিস্তানকে দুই বিলিয়ন ডলার দিয়েছে; রাস্তা, স্কুল, হাসপাতাল বানিয়েছে, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন বানিয়ে দিচ্ছে, চিশত শহরের কাছে একটা বড় হাইড্রোইলেকট্রিক বাঁধ তৈরি করছে। আফগান পার্লামেন্টের নতুন ভবন তৈরির পুরো ব্যয় দিয়েছে ভারতীয় সরকার। এখন আফগান সরকার ভারতের কাছে সামরিক সাহায্য চাইছে। এটা পাকিস্তানকে ভীষণভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। আর পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতি ঠিক করে তার সেনাবাহিনী, যার অনেক বড় বড় অফিসার একাত্তর সালকে ভুলতে পারেননি। এমনিতেই পাকিস্তানের পূর্ব সীমান্তে ভারতের সঙ্গে উত্তেজনা আছে, কাশ্মীর নিয়ে তারা কিছু করতে পারেনি। এর ওপর আফগানিস্তানে যদি ভারতের প্রভাব বাড়ে এবং সামরিক সহযোগিতাও যুক্ত হয়—এটা নিয়ে তারা ভীষণ উদ্বিগ্ন।
প্রথম আলো  আমেরিকার ভূমিকাও তো নেতিবাচক হতে পারে। কারণ, আমরা দেখেছি, আফগান সরকারকে এড়িয়ে তারা তালেবানের সঙ্গে আলোচনা করেছে।
নাজেস আফরোজ  আমার ধারণা, আমেরিকানরা খুব ভেবেচিন্তে তালেবানের সঙ্গে কথা বলেছে, তা নয়। আফগানিস্তান বা ইরাকের যুদ্ধ আমেরিকার জনগণের কাছে ভীষণ অজনপ্রিয় হয়ে গেছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের মতো অত সেনা মারা না গেলেও গত ১২ বছরে চার-পাঁচ হাজার সেনা মারা গেছে, আট-দশ হাজার আহত হয়েছে, প্রচুর টাকা ব্যয় হচ্ছে। এর মধ্যে ২০০৮ সাল থেকে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ ছিল। ফলে, এ প্রশ্ন আমেরিকার ভেতরেই উঠছে যে আমরা ওখানে কী করছি? আবার সব ছেড়েছুড়ে চলেও যেতে পারছে না, কারণ তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে আফগানিস্তানে তারা একটা স্থিতিশীল অবস্থা তৈরি করে দিয়ে যাবে। সে জন্য তারা সব পক্ষকে নিয়ে আলোচনা করে একটা শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চায়। সম্প্রতি তারা কাতারে তালেবানের সঙ্গে আলোচনা করেছে। আমেরিকানরা আশা করেছিল, তালেবান অন্তত তিনটি জিনিস করবে: আফগানিস্তানে যে সংবিধান তৈরি করা হয়েছে, সেটি মেনে নেবে, হামিদ কারজাইয়ের সরকারকে স্বীকৃতি দেবে এবং তালেবান বলবে যে আফগানিস্তানের ভূমিতে তারা কোনো সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীকে জায়গা দেবে না। কিন্তু তালেবান এই তিনটির কোনোটিতেই রাজি হয়নি। সে জন্য আমেরিকার সঙ্গে তালেবানের আলোচনা ভেঙে গেছে।
প্রথম আলো  সামাজিক দিক থেকে আফগানিস্তানে গত ১০-১২ বছরে আপনি কী ধরনের পরিবর্তন লক্ষ করেছেন?
নাজেস আফরোজ  পরিবর্তন হচ্ছে খুব ধীরে। কিন্তু পরিবর্তন হচ্ছে। যারা লেখাপড়া করছে, তাদের মধ্যে নতুন ভাবনাচিন্তা আছে। প্রায় ৫০ লাখ আফগান বহু বছর শরণার্থী হিসেবে অন্যান্য দেশে বাস করেছে, তারা এখন ফিরে আসছে। কিছু নতুন ভাবনা তারাও নিয়ে আসছে। কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫০ হাজার ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা করে, তাদের মধ্যে ৩০ শতাংশ মেয়ে। হেরাত খুবই ছোট শহর, সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী মেয়ে। আফগানিস্তানে আট-দশটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও আছে বেশ কয়েকটা। কাবুল শহরে কারদান ইউনিভার্সিটি নামে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে ১০ হাজার ছাত্রছাত্রী। তাদের অনেকে পেশাজীবী; সারা দিন কাজ করে, রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করে। ফলে, সামাজিক দিক থেকেও পরিবর্তন আসছে।
প্রথম আলো  সমাজে, সাধারণ মানুষের মধ্যে তালেবানের প্রভাব কেমন?
নাজেস আফরোজ  ১৯৯৪ সালের দিকে তালেবান যখন আসে, যখন জনগণ তাদের সমর্থন করেছিল। কিন্তু আজকে তাদের প্রতি সমর্থন ১ শতাংশও নেই। যেসব জায়গা তারা এখনো নিয়ন্ত্রণ করে, সেগুলোতে তাদের অস্ত্র হচ্ছে ভীতি। ১৯৯৪ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তালেবান জনসাধারণের ওপর যে অকথ্য অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়েছে, সেটা মানুষের মনে গভীর ছাপ ফেলেছে। এ কারণে একটা আতঙ্ক এখনো রয়ে গেছে। কিন্তু তালেবানের প্রভাব তেমন নেই। মানুষের মন থেকে ভীতিটা কেটে গেলে তালেবানের মিথ ভেঙে যাবে। গণতন্ত্র ও ক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা তৈরি হলে তালেবানের ভীতিটা দূর হবে। গজনি শহর ও উত্তরের কয়েকটা জায়গায় স্থানীয় জনগণ তালেবানের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছে; মেরে বের করে দিয়েছে। আফগানিস্তানের লোকসংখ্যা তিন কোটি, এর ১ শতাংশও যদি তালেবানের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, তালেবানের কিছু করার থাকবে না।
প্রথম আলো  আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
নাজেস আফরোজ  ধন্যবাদ।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মশিউল আলম ও এ কে এম জাকারিয়া

সাক্ষাৎকার- মঞ্জুরকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে by ব্যারিস্টার আবুল মনসুর

‘আমার ভাইকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এমনকি বিচারের জন্যও তাকে বাঁচিয়ে রাখা হয়নি। আমি চাই সত্য বেরিয়ে আসুক। ইতিহাসের এসব শূন্যস্থান বা ক্ষতগুলো সম্পর্কে সত্যি কথা দেশবাসীর জানার অধিকার রয়েছে।’
১৯৯৫ সালের মার্চে ভোরের কাগজ-এর সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এ কথাগুলো বলেছেন ব্যারিস্টার আবুল মনসুর। ১৯৮১ সালে চট্টগ্রাম সামরিক বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর সেনাবাহিনীর হেফাজতে থাকাকালে নিহত মেজর জেনারেল এম আবুল মঞ্জুরের বড় ভাই তিনি। ভাইকে হত্যার বিচার চেয়ে ১৯৯৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তিনি চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানায় মামলা করেন। ওই সময় রাজধানীর ইস্কাটনের বাসায় ব্যারিস্টার মনসুরের সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন ভোরের কাগজ-এর তৎকালীন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক সানাউল্লাহ। ১৯৯৫ সালের ১৫ মার্চ প্রকাশিত সাক্ষাৎকারটি পাঠক চাহিদার কথা বিবেচনা করে প্রথম আলোতে ছাপা হলো।

ভোরের কাগজ  মেজর জেনারেল এম আবুল মঞ্জুর নিহত হয়েছিলেন ১৯৮১ সালের ১ জুন। প্রায় ১৪ বছর পর মামলা করলেন কেন?
আবুল মনসুর  আসলে আমি সব সময় চেষ্টা করেছি মামলা করার জন্য। কিন্তু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, তথ্য-প্রমাণাদি আমার কাছে ছিল না। এমনকি জেনারেল মঞ্জুরের ময়নাতদন্ত রিপোর্টও খুঁজে পাইনি। গত মাসে ময়নাতদন্ত রিপোর্টটি পাওয়ার পরপরই আমি পাঁচলাইশ থানায় এফআইআর করেছি। আমি চাই সত্য বেরিয়ে আসুক। আমার ভাইয়ের হত্যাকাণ্ডের বিচার হোক। আইন অনুযায়ী দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি হোক।
কাগজ  কিন্তু এ রকম একটা কথা শোনা যাচ্ছে যে, আপনি মামলা করেছেন সরকারের পরামর্শে বা অন্য কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে?
মনসুর  এটা সত্যি নয়। আমার ভাইকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এমনকি বিচারের জন্যও তাঁকে বাঁচিয়ে রাখা হয়নি। জেনারেল মঞ্জুর একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। দেশের স্বাধীনতার জন্য, মানুষের মুক্তির জন্য তিনি লড়াই করেছেন। কিন্তু এত বছরেও তাঁর হত্যার মতো একটি জঘন্য ঘটনার তদন্ত বা বিচার হয়নি। আমি বা আমাদের পরিবার সব সময়ই এ হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চেয়েছি। এ নিয়ে আমার নিজের কোনো রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ বা লক্ষ্য নেই।
কাগজ  কিন্তু এ রকম একটি ধারণা সহজেই করা যায় যে, মঞ্জুর হত্যার বিচার জিয়া হত্যার বিচারের সঙ্গে সম্পর্কিত।
মনসুর  দেখুন, আমি বা আমাদের পরিবারও চায় জিয়া হত্যারও সুষ্ঠু তদন্ত এবং বিচার হোক। মঞ্জুর হত্যার বিচার হলে অনেক সত্যি কথা বেরিয়ে আসবে। জিয়া হত্যার জন্য আমার ভাইকে দায়ী করা হয়ে থাকে। এটাও সত্যি কি না সেটা বের হয়ে আসবে। কারণ সে সময় বিচারের কোনো সুযোগ না দিয়ে জেনারেল মঞ্জুর এবং আরও কয়েকজনকে হত্যা করা হয়েছিল। তড়িঘড়ি করে চট্টগ্রাম কারাগারের অভ্যন্তরে জেনারেল কোর্ট মার্শালে গোপন বিচার করে ১৩ জন মুক্তিযোদ্ধা অফিসারের ফাঁসি হয়েছিল।
সে সময় সরকার যে শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছিল আজ তথ্য-প্রমাণে দেখা যাচ্ছে, সেটি সত্যি কথা বলেনি। তাই আমরা চাই সুষ্ঠু তদন্ত হোক। সঠিক ইতিহাস বেরিয়ে আসুক। ইতিহাসের এসব শূন্যস্থান বা ক্ষতগুলো সম্পর্কে সত্যি কথা দেশবাসীর জানার অধিকার রয়েছে।
কাগজ  কিন্তু রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড তো আরও হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, খালেদ মোশাররফ, কর্নেল হুদা, হায়দার...
মনসুর  খালেদ মোশাররফ ব্যক্তিগতভাবে আমার বন্ধু ছিল। সে সত্যিকার অর্থে একজন দেশপ্রেমিক ও জাতীয়তাবাদী ছিল। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান ছিল সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে। তার হত্যার বিচার আজও হয়নি। বিচার হয়নি কর্নেল হুদা, হায়দার এদের হত্যার। হুদা মুক্তিযুদ্ধে জেনারেল মঞ্জুরের একজন সঙ্গী ছিলেন। তাঁদের সবার অবদান, আমাদের মুক্তিযুদ্ধে রয়েছে।
সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গেও আমার ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা ছিল। তাঁর হত্যার ব্যাপারে জেনারেল কোর্ট মার্শালে যে গোপন বিচার হয়েছিল, সে সম্পর্কে এখনো দেশবাসী সন্দেহমুক্ত নন।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাঁর এবং তাঁর পরিবারবর্গের হত্যার ব্যাপারেও কোনো সুষ্ঠু তদন্ত বা বিচার আজও হলো না।
আসলে সব হত্যাকাণ্ডেরই বিচার হওয়া উচিত। জাতি হিসেবে আমাদের এর জন্য দাবি করা উচিত, ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কারণ বিচার না হওয়ায় অনেকেই হত্যা করে পার পেয়ে গেছে। যা পরবর্তী সময়ে অন্যদেরও এ ধরনের অপকর্মে উৎসাহিত করেছে। দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য এবং প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসার জন্য এসব ঘটনার বিচার হওয়া প্রয়োজন।
কাগজ  এ মামলার ক্ষেত্রে পত্রপত্রিকার লেখালেখি হচ্ছে। নানা কথা শোনা যাচ্ছে।
মনসুর  হ্যাঁ, পত্রপত্রিকায় অনেক কথাই বলা হচ্ছে। কোনোটা সত্য, কোনোটা মিথ্যা। নানা রকম তথ্য প্রকাশিত হচ্ছে। আমি মিডিয়ার কাছে অনুরোধ জানাব, তারা যাতে এমন কিছু না করে যাতে মামলার কোনো ক্ষতি হয়। আমাদের সবার চেষ্টা করা প্রয়োজন যাতে সত্য প্রকাশিত হয়। প্রকৃত দোষীদের বিচার হয়।

আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া হতে যাচ্ছে : ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ

বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ বলেছেন, আওয়ামী লীগের বর্ষিয়ান রাজনীতিকরা ভোটারবিহীন নির্বাচনের পরও পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার স্বপ্ন দেখছেন। এটাই প্রমাণ করে তারা রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া হতে যাচ্ছে।
মানবজমিনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, একের পর এক বিরোধী নেতাকর্মীদের হত্যা করা হচ্ছে বিচারবহির্ভূতভাবে। আর বলা হচ্ছে এরা সবাই সন্ত্রাসী। আসাদুজ্জামান নূর তো এখন সত্যি সত্যিই বাকের ভাই হয়ে গেলেন। আমাদের নামেও তো বোমা মারার অভিযোগে বিস্ফোরকদ্রব্য আইনে মামলা আছে। আমাদেরও তাহলে সন্ত্রাসী বলে হত্যা করে ফেলুক। তাদের চিন্তাচেতনায় গণতন্ত্র নেই এটা তারই প্রমাণ। ১৯ দলের তরুণ এ নেতা বলেন, সংবিধান বলছে প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার উৎস হলো জনগণ। আর এখন প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার উৎস হয়ে গেছে আওয়ামী লীগ। বিরোধী জোটের আন্দোলন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আন্দোলন তো শেষই হয়নি। মার্চ ফর ডেমোক্রেসি কর্মসূচিতে বিরোধীদলীয় নেতাকে তার বাড়িতে অবরোধ করে রাখার পর এটা স্পষ্ট হয়েছিল, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের চেয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকাই আওয়ামী লীগের বড় বিষয়। ওই দিন কর্মীরা রাস্তায় নামলে অনেকগুলো প্রাণ হারাতো। বিরোধী দল রাস্তায় না নেমে অনেকগুলো জীবন বাঁচানো গেছে। এমন একটা সরকার গঠন করেই খেলা শেষ মনে করছে আওয়ামী লীগ। আসলে খেলা তো শেষ নয়। সামনে আন্দোলনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশে অহিংস আন্দোলন করে কোন সরকার পতনের আন্দোলন সফল হয়নি। আমরা কোন সহিংসতা সমর্থন করি না, কিন্তু সহিংসতা হচ্ছে তা দেখতে হবে। তিন বছর ধরে দেশে আর লাঠিচার্জ বলে কিছু নেই। এখন সিনিয়র নেতাদেরও রাস্তায় নামলেই গুলি করে দেয়া হচ্ছে। কঠোর আন্দোলন শুরু হলে আর কিছু বলার থাকবে না কারও। তিনি বলেন, যারা জনগণের ইচ্ছার কথা চিন্তা করে না তাদের সঙ্গে তো লড়াই করা মুশকিল। তারা তো ভোটের কথা চিন্তাই করে না। জনগণের কাছে তো তাদের জবাবদিহির ভাবনা নেই। তারা যা খুশি করতে পারে। আমরা তো পারি না। আমাদের জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছা, সুখ-শান্তির বিষয় ভাবতে হয়। বারবার পাঁচ বছর থাকার কথা বলে আওয়ামী লীগ নেতারা স্পষ্ট করছেন তাদের পাঁচ বছর থাকার বৈধতা নেই। বিদেশী কোন বাধা নেই- এ কথা বলেই তারা প্রমাণ করছেন বিদেশীদের চাপে সরকার বিব্রত। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে পুতুল প্রার্থীদের দিয়ে নির্বাচন করা হয়েছে উল্লেখ করে সাবেক এ সংসদ সদস্য বলেন, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন সম্ভব নয় এটা প্রমাণ হয়েছে। আমাদের আন্দোলন এখনও শেষ হয়নি। সরকার এখন নানাভাবে মিডিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। একটা মিডিয়া বন্ধ করে ১০০টা মিডিয়াকে নার্ভাস করার চেষ্টা করছে। কিন্তু আসলে সরকার নিজেই চাপে আছে। গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন যে ব্যর্থ এটা মিডিয়ার মাধ্যমেই স্পষ্ট হয়েছে। আমরা বুঝি যে, মিডিয়া অনেক চাপের মধ্য দিয়ে কৌশল করে চলছে। কিছু কিছু ডিজিটাল বিটিভি আছে যারা সম্পূর্ণ সরকারের তোষামোদী করছে। তা ছাড়া সবাই সাহসী ভূমিকা রাখছে।

বিশেষ সাক্ষাৎকার: রেহমান সোবহান- সুশীল সমাজের প্রভাব আগের চেয়ে কমেছে by আব্দুল কাইয়ুম

Tuesday, February 4, 2014

অধ্যাপক রেহমান সোবহান বাংলাদেশের প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। এরপর ১৯৫৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭৭ সালে অধ্যাপক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।
এ ছাড়া তিনি বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ছিলেন। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া ১৯৯১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একজন উপদেষ্টা ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি। তিনি বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৫।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ নানা বিষয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেন এই স্বনামধন্য ও বরেণ্য অর্থনীতিবিদ।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আব্দুল কাইয়ুম
 
প্রথম আলো : প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতিকে আপনি কীভাবে বিশ্লেষণ করেন?
রেহমান সোবহান : গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচন আওয়ামী লীগের ৬৫ বছরের গণতান্ত্রিক উত্তরাধিকারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয় এবং গণতন্ত্রকে দুর্বল করেছে। ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগ সেই ১৯৪৯ সাল থেকে প্রতিটি গণতান্ত্রিক সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে এবং অবাধ নির্বাচনে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাজিত করার মধ্য দিয়ে সব সময় ক্ষমতায় এসেছে। তাদের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি কতটা নষ্ট হয়েছে, সে সম্পর্কে ক্ষমতাসীন জোটের ১৫৩ জন সদস্যের চেয়ে বেশি আর কেউ সচেতন হতে পারেন না, যাঁরা একটিও ভোট না পেয়ে জনপ্রতিনিধি হিসেবে দশম জাতীয় সংসদের সদস্যের শপথ নিয়েছেন। প্রথম আলো : দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে আপনার মন্তব্য কী? এ রকম একটি নির্বাচন কি বৈধতা দাবি করতে পারে?
রেহমান সোবহান : ৩০০ জন সাংসদের মধ্যে ১৫৩ জনকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দশম সংসদে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন থেকে প্রকাশিত সরকারি হিসাব অনুযায়ী, অবশিষ্ট ১৪৭টি আসনের সদস্যরা ৪০ শতাংশ ভোটার উপস্থিতির মাধ্যমে নির্বাচিত হয়েছেন। এসব সংখ্যার হিসাব এটাই প্রতিষ্ঠা করে যে নিবন্ধিত ভোটারদের মধ্যে আনুমানিক ১৮ শতাংশ নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। এ রকম একটি নির্বাচন ১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চেয়ে কোনো অংশেই বেশি বিশ্বাসযোগ্য নয়। ওই নির্বাচনে ২৬ শতাংশ ভোটার তাঁদের ভোট দিয়েছিলেন বলে সরকারিভাবে জানানো হয়। ১৯৯৬ ও ২০১৪ উভয় নির্বাচনেই বাস্তবতার চেয়ে বেশি ভোট পড়েছে বলে দাবি করা হয়। ১৯৯৬ সালে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে যুক্তিসংগতভাবেই প্রশ্ন ওঠার কারণে বিএনপি সরকারের বৈধতা মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। ওই সরকার তখন সংবিধানে ত্রয়োদশ সংশোধনী এনে জাতীয় নির্বাচন পরিচালনার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে বাধ্য হয়েছিল। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভোটারবিহীন নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার প্রথম দিন থেকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ছিল এবং শাসনকালের মেয়াদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে তারা কোনো উৎসাহ পায়নি। দশম সংসদের সদস্যরা এবং তাঁদের সমন্বয়ে গঠিত সরকারকে তাদের দুর্বল ম্যান্ডেট নিয়ে উদ্বিগ্ন মনে হচ্ছে না এবং মনে হচ্ছে তারা মনে করে যে বিরোধীদের যেকোনো চ্যালেঞ্জকে ব্যর্থ করে দিয়ে টিকে থাকতে পারবে। এ ধরনের মনোভঙ্গির মধ্যে আছে বাংলাদেশের জনগণের জন্য একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ইঙ্গিত।
প্রথম আলো : আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই পরিস্থিতিকে কীভাবে নেয়? কোনো আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে কি?
রেহমান সোবহান : আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ, যদিও সবাই নয়, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়েছে বলে মনে হচ্ছে। বাংলাদেশে নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতার ব্যাপারে জাতিসংঘ, কমনওয়েলথ সচিবালয়, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং এ ধরনের ঘটনার অবসানের আহ্বান জানিয়েছে। তারা গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনী পদ্ধতি প্রণয়নের লক্ষ্যে সংলাপ অনুষ্ঠানের বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়ে ভারত ও চীনের প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে বার্তা এসেছে। পাশাপাশি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছ থেকে অভিনন্দন প্রাপ্তির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের পরিস্থিতি বিবেচনা করে কোনো জোরালো শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেবে বলে এখন পর্যন্ত ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশকারী ওই দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতেরা বঙ্গভবনে ১২ জানুয়ারি সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন। কয়েকটি দেশের দূতেরা নির্বাচনের মান নিয়ে হতাশা প্রকাশ করলেও নির্বাচিত নতুন প্রশাসনের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে সেই হতাশা বাংলাদেশে বিদেশি সহায়তার ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না। অবশ্য আজকের বাংলাদেশে বিদেশি সাহায্যের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক কম গুরুত্বপূর্ণ। বাণিজ্যের বিষয়টি তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি কেবল অর্থনীতি নয়, লাখ লাখ পরিবারের জীবিকার ওপর প্রভাব ফেলে। আমাদের প্রধান দুটি বাজার হিসেবে বিবেচিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এমন অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের ক্ষমতা রাখে, যাতে তাদের বাজারে আমাদের রপ্তানি কমে যেতে পারে। তবে সে ধরনের আশঙ্কা আপাতত দেখা যাচ্ছে না। আমরা একটি সার্বভৌম দেশ এবং যেকোনো ধরনের আন্তর্জাতিক চাপের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর স্বাধীনতা আমাদের রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কোনো পদক্ষেপের চড়া মূল্য যদি সাধারণ জনগণকে দিতে হয়, তখন এ ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জোরালো জনসমর্থন প্রাপ্তির ব্যাপারে সরকারকে আত্মবিশ্বাসী হতে হবে।
প্রথম আলো : বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে ভারত একটি ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে?
রেহমান সোবহান : অংশগ্রহণবিহীন হলেও একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা রক্ষার পথে এগিয়ে চলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি ভারত তুলনামূলক বেশি সহানুভূতিশীল অবস্থান নিয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে, এ রকম ভালো বন্ধুও একটি গুরুত্বপূর্ণ মিত্রের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারে কদাচিৎ নির্বিকার থাকতে পারে, যাদের এবারের নির্বাচনী ম্যান্ডেট ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে অর্জিত ম্যান্ডেটের একটি ভগ্নাংশমাত্র। তা ছাড়া, ভারতের বর্তমান সরকার নিজেই একটি সন্ধিক্ষণে রয়েছে এবং এ সরকার হয়তো আগামী তিন থেকে চার মাসের বেশি ক্ষমতায় থাকবে না। এ ধরনের অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে যেকোনো সরকার তাদের বৈদেশিক নীতিতে বড় কোনো ধরনের পরিবর্তনে আগ্রহী হয় না। তাই আমাদের এমনটা আশা করা উচিত হবে না যে আগামী এপ্রিলে অনুষ্ঠেয় লোকসভা নির্বাচনের পর নয়াদিল্লিতে নতুন একটি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের আগে বাংলাদেশের বিষয়ে ভারত খুব একটা সক্রিয় ভূমিকা নেবে।
প্রথম আলো : বিএনপি হরতালের মতো কর্মসূচি দিয়ে কোনো সুফল পাবে কি?
রেহমান সোবহান : খালেদা জিয়া গত ১৫ জানুয়ারি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে বৈঠকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁরা হরতালের মতো কর্মসূচি বন্ধ রেখে শান্তিপূর্ণ বিকল্প উপায়ে রাজনৈতিক সংহতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে যাবেন বলে জানিয়েছেন। নীতি এবং প্রাজ্ঞ রাজনীতির বিবেচনায় এটি একটি সুবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত। হরতাল হচ্ছে প্রতিবাদ করার একটি উপায়। কিন্তু বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এটি গত কয়েক বছরে সব ধরনের রাজনৈতিক তাৎপর্য হারিয়ে ফেলেছে। খুব সামান্য লোক আজকাল প্রতিবাদ জানানোর লক্ষ্যে হরতাল পালন করে। এখন যেভাবে হরতাল পালিত হয় তা কেবল সহিংসতার হুমকি দিয়ে লোকজনকে কাজে যেতে বাধা প্রদানের মধ্যেই সীমিত রয়েছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বিএনপির মিত্র জামায়াতে ইসলামী বিভিন্ন ধরনের গণপরিবহন লক্ষ্য করে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করে, যাতে সুনির্দিষ্টভাবে সাধারণ নাগরিকেরাই আক্রমণের শিকার হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় হরতাল চলাকালে হতাহতের সংখ্যা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেড়েছে। ঢাকার মতো পুলিশবেষ্টিত অঞ্চলে হরতালের প্রভাব সামান্য হলেও দূরতর পাল্লার আন্তনগর যানবাহন চলাচলে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এ ছাড়া বিপণন, যোগাযোগ ও গণপরিবহনের ওপর নির্ভরশীল নাগরিকদের দূরপাল্লার যাতায়াত বিপর্যস্ত হচ্ছে। অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিএনপির ভাবমূর্তি অনেকটাই নষ্ট হয়েছে, বিশেষ করে, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে মৈত্রীর কারণে। দলটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আন্দোলনের পরিবর্তে যুদ্ধাপরাধের বিচার-প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে রাস্তায় সহিংসতা বাড়ানোর কৌশল বেছে নিয়েছে। যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রতি জনগণের সমর্থন রয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর সহিংসতা তাই অত্যন্ত অজনপ্রিয় হয়েছে, যাতে করে বিএনপির আন্দোলনের কর্মসূচির বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
প্রথম আলো : সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনাও ঘটছে।
রেহমান সোবহান : সাম্প্রদায়িক সহিংসতা অবলম্বনের কাজটি অত্যন্ত জঘন্য এবং কাপুরুষোচিত। কারণ, জনগণের সবচেয়ে অরক্ষিত অংশটি এই সহিংসতার লক্ষ্যে পরিণত হয়, যাদের প্রতিরোধের সামর্থ্য সবচেয়ে কম। আর যুদ্ধাপরাধের বিচার-প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে এ ধরনের সন্ত্রাসী তৎপরতা হলে সেটা আরও নিন্দনীয়। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে এ ধরনের সহিংসতার ঘটনা নতুন নয় এবং রামুর বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনার পর থেকে বেড়েই চলেছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে ও পরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর সুনির্দিষ্ট হামলার সব রকম সম্ভাবনা ছিল। কারণ, তারা চিরাচরিতভাবে আওয়ামী লীগকেই ভোট দিয়ে থাকে—এমন ধারণা প্রচলিত রয়েছে। অতএব, সম্ভাব্য হামলা এড়াতে নির্দিষ্ট এলাকাগুলোতে আরও ভালো সুরক্ষার ব্যবস্থা রাখা উচিত ছিল। অপরাধী যে-ই হোক না কেন, এ ধরনের হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইনের সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু এটিই যথেষ্ট হবে না, যেহেতু আমাদের দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করছে। যেকোনো সরকারের আমলে তাদের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে হবে।
প্রথম আলো : অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে, করণীয় কী?
রেহমান সোবহান : সহিংসতা ও হরতালের কারণে অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছে কিন্তু ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে আরও ক্ষতি হতে পারে। যেসব দিনমজুর ও কৃষক তাঁদের ফসল বাজারে নিয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের অবস্থা সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত। সব ব্যবসাই নির্ভরশীল পরিবহনব্যবস্থার ওপর। পণ্য সরবরাহ ও বাজারব্যবস্থায় বিঘ্ন হলে ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং ব্যয় বৃদ্ধি পায়। তবে, রাজনৈতিক পরিস্থিতির স্বল্পমেয়াদি প্রভাব, অন্তত সামষ্টিক অর্থনীতিতে, জিডিপি ও রপ্তানি বৃদ্ধির ভিত্তিতে পরিমাপ করা হয়। এটিকে অতিরঞ্জিত করা উচিত নয়। অব্যাহত রাজনৈতিক সংকটের প্রতিক্রিয়ায় আসলে অনিশ্চয়তার ওপরই জোর দিতে হয় এবং যা নতুন বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ওপর প্রভাব ফেলে এবং আমাদের রপ্তানি বাজারকে বড় ধরনের হুমকির মুখে ঠেলে দেয়। অর্থমন্ত্রীর প্রতি সুপরামর্শ, বর্তমান রাজনৈতিক অচলাবস্থায় অর্থনীতি রক্ষার স্বার্থে স্বল্পমেয়াদি কিছু উদ্যোগ গ্রহণের লক্ষ্যে স্টেকহোল্ডারদের-স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা শুরু করতে হবে এবং তাতে বিরোধী দলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এ ধরনের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে বিরোধী দল জনস্বার্থের প্রতি তাদের অঙ্গীকারের প্রমাণ
দিতে পারে।
প্রথম আলো : কোনো অর্থবহ সংলাপের সম্ভাবনা কি এখনো আছে?
রেহমান সোবহান : সংলাপ আয়োজন করা সব সময়ই সম্ভব কিন্তু এটির কার্যকারিতা নির্ভর করবে পরিপূর্ণ অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে মীমাংসায় পৌঁছানোর ব্যাপারে উভয় দলের সদিচ্ছার ওপর। ক্ষমতাসীন জোট যদি মনে করে যে নির্বাচনে ম্যান্ডেট অর্জনের মধ্য দিয়ে তারা সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যেতে পারে যত দিন পর্যন্ত বিরোধী দল রাজপথে আন্দোলন পরিচালনার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করতে না পারে, তাহলে সরকার সংলাপের ব্যাপারে অনাগ্রহী হয়ে উঠতে পারে। এই নেতিবাচক উদ্দীপনার প্রভাব বিরোধী দলের ওপরও পড়তে পারে, যারা বিক্ষোভ-আন্দোলন অব্যাহত রাখার বিষয়টিকে সম্ভাব্য আগাম নির্বাচনে (একাদশ সংসদ) জয়লাভের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার বাধ্যতামূলক উপায় মনে করতে পারে। এ ধরনের আন্দোলন থেকে চাপের মাত্রা বৃদ্ধির মাধ্যমে বিএনপিকে রাজপথে জামায়াতের সহিংস কর্মকাণ্ডের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হতে হবে। সংলাপের মধ্য দিয়ে আরও গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ফিরে আসার লক্ষ্যে উভয় জোট যদি এ ধরনের বিকৃত কৌশল পরিহার না করে, তাহলে রাজপথে সহিংসতা ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের কবলে পড়ে বাংলাদেশকে আবার একটি বছরব্যাপী অনিশ্চয়তায় পড়তে হতে পারে।
প্রথম আলো : নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণাটি কি গণতন্ত্রে রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য?
রেহমান সোবহান : যেকোনো ধারণা, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাসহ, গ্রহণযোগ্য হবে যদি সেটি গণতন্ত্রকে উন্নীত করে এবং প্রধান দলগুলোর সমর্থন অর্জন করে। গণতন্ত্রে চিরন্তন কোনো ধারণা নেই। আসলে এটি মূলত এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা, যাতে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে কোনো ধরনের ভয় বা জবরদস্তি বা সহিংসতার হুমকি ছাড়াই। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিএনপি ১৯৯৬ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে প্রবর্তন করেছিল। এটি তৎকালীন বাংলাদেশে সব রাজনৈতিক দলের কাছে পরিপূর্ণভাবে অবশ্যই গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ, ১৯৯৬ থেকে ২০১১ সালের মধ্যবর্তী সময়ে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে নিজেদের দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলনের ফসল হিসেবে বিবেচনা করেছে। কেবল ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর পরই ওই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অগণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্যটি আলোচনায় আসে এবং এ ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভেদ তৈরি হয়। নবম জাতীয় সংসদে প্রতিষ্ঠা করা হয় সংবিধান সংস্কারবিষয়ক সংসদীয় কমিটি। এটি প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে একটি অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল রাখার সুপারিশ করে। এমনকি প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্ত করে তাঁর সংক্ষিপ্ত রায়ে পরামর্শ দিয়েছেন যে নতুন বিকল্প ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত সংসদ চাইলে আরও দুটি নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
প্রথম আলো : এ রকম নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে সংকটের সমাধান অদূর ভবিষ্যতে সম্ভব হবে কি?
রেহমান সোবহান : অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করা।

‘শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে ন্যায়বিচার পদানত হতে দেয়া যায় না’ -সৈয়দ আবুল মকসুদ

Saturday, January 25, 2014

বিশিষ্ট লেখক ও কলামনিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেছেন, একটি নির্বাচিত সরকারের বৈধতা নিয়ে বিভিন্ন দেশের পার্লামেন্টে সালিশ-বিচার হচ্ছে, বৈধতা, অবৈধতার প্রশ্ন উঠছে। এটাই প্রমাণ করে এই নির্বাচনে গোলমাল আছে।
তিনি বলেন, একটি স্বৈরাচারী সরকার মেনে নেয়া যায় কিন্তু কোন তাঁবেদার মানা যায় না, অর্থনৈতিক সঙ্কট মানা গেলেও অগণতন্ত্রিক অনাচার মেনে নেয়া যায় না। শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে ন্যায়বিচার পদানত হতে দেয়া যায় না। সংলাপের জন্য জামায়াত ছাড়ার শর্তকে মূল্যহীন উল্লেখ করে তিনি বলেন, জামায়াতের সাংবিধানিক অবস্থান কি তা আগে সরকার ঠিক করুক। যদি জামায়াত আইনগতভাবে নিষিদ্ধ হয়ে যায় তা হলে আপনা আপনিই জামায়াত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে বিএনপি। মানবজমিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, দেশের সঙ্কটের জন্য প্রধান দুই দল, অপ্রধান দলসমূহ, একশ্রেণীর গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের দালালি ভূমিকা দায়ী। গত নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার আইনসম্মত কিনা, বৈধ কিনা- এমন প্রশ্ন উঠছে। এর আগে বাংলাদেশের আর কোন নির্বাচিত সরকার নিয়ে এই প্রশ্ন কেউ করেননি। এসব প্রশ্ন ওঠে সামরিক শাসকদের সম্পর্কে। সামরিক শাসকরা অসাংবিধানিক শাসক বা জবরদখলের শাসক। কিন্তু একটি নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার সম্পর্কে যখন আইনগত বৈধতার প্রশ্ন ওঠে তখন বুঝতে হবে কোথাও না কোথাও গোলমাল হয়েছে। হয় নির্বাচনে আইনগত গোলমাল হয়েছে, নয়তো অন্য কোন জায়গায় সমস্যা হয়েছে। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন সম্পর্কে সরকারি দলের নেতারাই বলছেন- ‘সংবিধান রক্ষার নির্বাচন’, ‘নিয়ম রক্ষার নির্বাচন’, ‘সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার নির্বাচন’ ইত্যাদি। যদি ধরে নিই সরকারের পক্ষ থেকে যা বলা হয়েছে সেটাই ঠিক- তাহলে সমস্যা কোথায়? তখন দেখা যাচ্ছে, আইনি সব বিষয়ই ঠিক আছে, কিন্তু কয়েকটি দল সেই নির্বাচনে অংশ নেয়নি। বেশ, তা না নিতে পারে। কিন্তু সেই দলগুলো কারা? বাংলাদেশে ৪০টির বেশি নিবন্ধিত দল রয়েছে। সবদলকেই নির্বাচনে আসতে হবে তা সংবিধানে লেখা নেই। বেআইনি যদি নাও হয়ে থাকে, কিন্তু অনৈতিক কাজ করেছে ১৪ দলীয় মহাজোট নিযুক্ত ও মহাজোটপন্থি নির্বাচন কমিশন।

তিনি বলেন, শতকরা ৫২ ভাগ ভোটারকে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগই দেয়া হলো না। তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ১৫৩ জন প্রার্থী নির্বাচিত হয়ে গেলেন। বাকি যে ১৪৭ আসন সেখানে ভোট পড়ল ১০-১২ শতাংশ। বহু কেন্দ্রে একটি ভোটও পড়েনি। এই নির্বাচনকে আপনি কিভাবে বলবেন আইনগতভাবে বৈধ? নৈতিকভাবে বৈধ বললে তো নৈতিকতা শব্দটিকেই অসম্মান করা হয়। তারপরেও যদি আমরা বলি এবং বলবোই যে, সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে এসেছে। তখনই আসে গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন। এভাবে নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত একটি সরকারকে কেউ গ্রহণযোগ্য মনে করে না। তবে কেউ গ্রহণযোগ্য মনে করুক বা না করুক কোন সরকার যখন প্রশাসনের মাধ্যমে রাষ্ট্র চালায় তাকে মেনে নিতে হবে, তাই নির্বাচনের পর গঠিত বর্তমান সরকারকে যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, ফ্রান্স, জার্মানি প্রভৃতি দেশ অভিনন্দন না জানালেও অর্থাৎ গ্রহণযোগ্য মনে না করলেও সরকারের সঙ্গে স্বাভাবিক কাজকর্ম চালিয়ে যেতে অস্বীকার করেনি। সঙ্গে সঙ্গে তারা তাগিদ দিচ্ছে- অতি দ্রুত আর একটি নির্বাচন করা। যে নির্বাচনে অধিকাংশ মানুষের ভোট প্রয়োগের সুযোগ থাকবে। সত্যিকারের জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা গঠিত হবে একটি সরকার একটি পার্লামেন্ট।
এখন দুই দলের মধ্যে সমঝোতা আদৌ সম্ভব কি না এমন প্রশ্নে বিশিষ্ট এ নাগরিক বলেন, হানাহানি-মারামারি ও দেশী-বিদেশী চাপ সত্ত্বেও সমঝোতা হয়নি দু’টি পক্ষের মধ্যে। ভবিষ্যতে যে হবে তার শতকরা এক ভাগও নিশ্চয়তা নেই। বিশেষ করে যে ইস্যু থেকে বিরোধের সৃষ্টি, সেই ইস্যুর ন্যায্যতা যদি সরকারি পক্ষ স্বীকার না করে তা হলে তো তারা আলোচনা বা সংলাপেই বসবেন না। অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দলও যদি কোন কোন বিষয়ে ছাড় দিতে না চায় তা হলে সরকারের পক্ষেও অনড় থাকাই স্বাভাবিক। যার পরিণাম সমঝোতা না হওয়া। একটি নির্দলীয় এবং মোটের উপর নিরপেক্ষ একটি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচন হোক- সেটাই অধিকাংশ মানুষের আশঙ্কা এবং দাতাগোষ্ঠীর চাপ। তা হলে ধারণা করা যায়, ১৪ দলীয় মহাজোটের পুনঃনির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন সম্ভব নয়। সুতরাং তারা তাতে সম্মত হবে না। ভারতের মিডিয়া ও কর্মকর্তাদের কথাবার্তা থেকে জানা গেছে তারা শেখ হাসিনার সরকারকেই ক্ষমতায় দেখতে চান। সেই মোতাবেকই নির্বাচন হয়েছে এবং গঠিত হয়েছে সরকার। সুতরাং, সমঝোতা আলোচনার মাধ্যমে কিভাবে হবে? তারপরেও বড় দলগুলোর নেতারা যদি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাস করতেন তা হলে নিজেদের ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতির বাইরে গিয়ে দেশের স্বার্থে তারা একটি সমঝোতার পথ বের করতেন। এখন মন্ত্রীরা বলছেন, পাঁচ বছর পরে নির্বাচন হবে। এর আগে নির্বাচনের কোন সম্ভাবনা নাই। তা যদি না থাকে, তা হলে সমঝোতা কি?
দেশে যে একটা সর্বাত্মক সঙ্কট আছে, তা কি নেতারা উপলব্ধি করেন? বর্তমানে পৃথিবীর কাছে বাংলাদেশের মুখ দেখাবার উপায় নেই। এই দেশের কংগ্রেসে, ওই দেশের পার্লামেন্টে, প্রভৃতি জায়গায় বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, বিচার-সালিশ হচ্ছে, প্রস্তাব পাস হচ্ছে, আরও কতো কি হচ্ছে- কিন্তু সরকার তা তিন তুড়িতে উড়িয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশ আজ অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি সঙ্কটে আবর্তিত। স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে অস্তিত্বের সঙ্কটে। জনগণ বুঝতে পারছে, নেতারা বুঝতে পারছেন না- তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। আমরা অতীতে অনেক সঙ্কট পার হয়ে এসেছি। নেতারাই তা সমাধান করেছেন। আজকের সঙ্কট আর যে কোন সঙ্কটের চেয়ে গভীর। একাত্তরে মানুষ অকাতরে জীবন দিয়েছিল, অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করেছিল, কিন্তু তাদের সামনে স্বপ্ন ছিল তারা তার বিনিময়ে পাবে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। সেই রাষ্ট্রে থাকবে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার। মানুষে মানুষে বৈষম্য থাকবে কম। আজ কি দেখছি। একাত্তরের চেতনার লেশমাত্র নেই কোথাও।
তিনি বলেন, সরকারি ও বিরোধী দলের বড় বড় নেতারা দায়িত্বজ্ঞানহীন কথাবার্তা বলছেন। অতীতে অনেক রকম সমস্যা ছিল কিন্তু স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোন সংশয় ছিল না। আজ মানুষের সেটা নিয়েই সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। এ অবস্থায় শুধু একটি সুযোগ্য নেতৃত্বের অধীনে ঐক্যবদ্ধ গণআন্দোলনই রাষ্ট্রকে আবার স্বাভাবিক জায়গায় নিয়ে যেতে পারে বলে মত দেন তিনি। আলোচনার জন্য ‘জামায়াত’ ছাড়ার শর্ত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এসব শর্তের কোন মূল্য নেই। সমঝোতার ইচ্ছা থাকলে বসেই অনেক বিষয়ের ফয়সালা সম্ভব। জামায়াত ইস্যু নিয়েও আলোচনা হতে পারে। অন্যান্য বিষয়েও আলোচনা হতে পারে। কোন পক্ষেরই শর্ত দিয়ে অনড় থাকা ঠিক নয়।
জাতীয় পার্টির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গণতন্ত্রের মাপকাঠিতে যেভাবে সংসদ নির্বাচন হয়েছে সেটা অগ্রহণযোগ্য। তাছাড়া গঠনের পরে জাতীয় পার্টির সঙ্গে সরকারের যে সম্পর্ক তাতে তাকে কোনক্রমেই বিরোধী দলের পর্যায়ে ফেলা যায় না। রওশন এরশাদকে বিরোধী দলের নেতার মর্যাদা দেয়া আর এরশাদকে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত করা সম্পূর্ণ এক গোঁজামিলের ব্যাপার। নির্বাচিত হলেও, যতো কম ভোটেই নির্বাচিত হোক, এই সংসদকে গণতান্ত্রিক সংসদ হিসেবে আখ্যায়িত করা যায় না। একে ভবিষ্যতে ইতিহাসবিদরা অত্যন্ত খারাপভাবে চিত্রিত করবে বলেই আমার বিশ্বাস।
তিনি বলেন, বিএনপিকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করেও জাতীয় পার্টিকে নিয়ে সংসদীয় রীতিনীতি সম্মত একটি পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠা করা যেত। জাতীয় পার্টিকে প্রকাশ্যে একটি বিরোধীদলের রূপ দিতে পারতো। তলে তলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে তার যতোই বোঝাপড়া থাক। কিন্তু এখন যা করা হয়েছে তা গণতন্ত্রকে কলঙ্কিত করা ছাড়া আর কিছু নয়।
এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী কে- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমরা বড় দুই দলের কাছেই দেশটিকে ইজারা দিয়ে রেখেছি। সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার না করে যতোভাবে অপব্যবহার করা সম্ভব তা তারা করে আসছে। এই অবস্থায় ছোট দলগুলোর একটি গঠনমূলক ভূমিকা থাকতে পারত। কিন্তু তারা রুটিন সভা, সংবাদ সম্মেলন সেগুলো করেই মনে করছে তাদের দায়িত্ব পালন হলো। ছোট দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ চাপ থাকলে, আওয়ামী লীগ-বিএনপি স্বৈরাচারী হতে পারতো না। এবং আর যে দু’টি দল-জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী তারাও বড় দুই দলের লেজুড় হয়ে ক্ষমতায় ভাগ বসাতে পারতো না। বড় দুই দলের সঙ্গে মাঝারি ওই দুই দল, যুক্ত হয়ে নানান অপকীর্তি করে এখন গণতন্ত্রকে একেবারে কবর দিয়ে দিলো। তিনি বলেন, বিকল্প ধারা, কমিউনিস্ট পার্টি, বাসদ, গণফোরাম, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, জেএসডি প্রভৃতি দল সংঘবদ্ধ থাকলে তা খুব ছোট রাজনৈতিক শক্তি নয়। কিন্তু তারা এখন আর কোন সংগ্রামী সংগঠন নয়। নেতারা সভা-সমাবেশে বক্তব্য দিচ্ছেন, কিন্তু জনগণকে সংগঠিত করার চেষ্টা তাদের নেই। তা থাকলে এবং তাদের যদি এই বড় দুই দলের সঙ্গে কোনরকম জোট থাকতো তাহলে, এই বড় দুই দল, যা-খুশি তাই করতে পারতো না। এখন অপ্রধান দলগুলোর নিষ্ক্রীয়তার সুযোগে বড় দুই দল স্বেচ্ছাচারী, অগণতান্ত্রিক শক্তি পরিণত হয়েছে। আজকে দেশের এই দুর্দশার জন্য অপ্রধান দলগুলোও কম দায়ী নয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সারা পৃথিবীতে রাজনৈতিক সংগঠনের বাইরে নাগরিক সমাজ, অন্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আমাদের দেশী নাগরিক সমাজ স্বাধীনতার আগে এবং আশির দশক পর্যন্ত রাজনৈতিক ব্যাপারে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তারা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে তাদেরকে সহযোগিতা দিয়েছে। নব্বইয়ের দশক থেকে নাগরিকরা সমাজের বুদ্ধিজীবীরা দুই বড় দলের ব্যাপারে বিভক্ত হয়ে গেছে। তারা উঁচু চিন্তা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন। অধিকাংশই ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে জাতীয় স্বার্থকে বিসর্জন দিয়েছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদদের এমন নির্লজ্জ দালালিমূলক ভূমিকা আর কখনও দেখা যায়নি। নামকরা বুদ্ধিজীবীরা সরকারকে অন্ধভাবে সমর্থন করে যাচ্ছেন। একদিন ইতিহাসের কাঠগড়ায় তাদের দাঁড়াতে হবে। দেশী বিদেশী শক্তির এজেন্ট হিসেবে তাদের যে ভূমিকা তা পাকিস্তান বাহিনীর দালালদের প্রায় কাছাকাছি। এই অবস্থাটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক। আজ বাংলাদেশে বহুজাতিক কোম্পানির পৃষ্ঠপোষকতা করতে একশ্রেণীর মিডিয়াকে খুবই তৎপর দেখা যায়। জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় যখন বাম ও অন্যান্য দলগুলো আন্দোলন করে সেসব সংবাদ তারা সুকৌশলে চেপে যায়। ফলে সাধারণ মানুষের আবেগ-অনুভূতি সঠিকভাবে প্রচারিত হতে পারছে না। সুতরাং আজকের যে সঙ্কট, এই সঙ্কটের জন্য প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো যেমন দায়ী অপ্রধান রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজও কম দায়ী নয়।

‘নির্বাচন বৈধ হলেও অসম্পূর্ণ’ : ফারুক চৌধুরী by জাকারিয়া পলাশ

Monday, January 20, 2014

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ফারুক চৌধুরী বলেছেন, বাংলাদেশের সামনে এখন সময় এসেছে একথা প্রমাণ করার যে, আমরা গণতন্ত্র বলতে শুধু নির্বাচনই মনে করি না। গণতন্ত্র বলতে আমরা মানুষের মতামতের সার্বিক গুরুত্বকেও বুঝি।
বাংলাদেশের মনে রাখা উচিত যে, আমরা একটি ক্রমাগত ছোট হয়ে আসা পৃথিবীতে বাস করছি এবং আমরা এই পৃথিবীতে একা দাঁড়িয়ে নেই। আমরা জাতিসংঘের একটি গুরুত্বপূর্ণ সদস্য রাষ্ট্র। আমাদের দেশে যাতে এমন কিছু না ঘটে যা বিদেশীদের সমালোচনায় উৎসাহিত করে। তিনি বলেছেন, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন সাংবিধানিকভাবে বৈধ হলেও তা অসম্পূর্ণ। মানবজমিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সরকার সাংবিধানিক ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হয়েছে। কিন্তু, এটা একটা বড় ‘কিন্তু’, বৃহত্তম বিরোধী দল নির্বাচনে অংশ নেয়নি। অতএব, নির্বাচন বৈধ হলেও ‘অসম্পূর্ণ’ রয়ে গেছে। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের জন্য এটা কাম্য নয়। এ জন্য আমি মনে করি যে, সরকার পক্ষ ও বিরোধী দলের (বিএনপি) সংলাপে বসা উচিত। একটি জাতির ইতিহাসে দুই-চার-পাঁচ বছর বড় কথা নয়। বড় কথা হচ্ছে, দেশে একটি নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকার গঠন করা। নির্বাচন কিন্তু গণতন্ত্রের শেষ নয়, শুরু। গণতন্ত্র হচ্ছে দেশের মানুষের চিন্তাধারায় অবগাহনের নিমন্ত্রণ ও প্রতিফলন। ফারুক চৌধুরী বলেন, আমি খুবই আশাবাদী, দুই দলের মধ্যে সংলাপের সুষ্ঠু একটি পরিবেশ সৃষ্টি হবে। বস্তুনিষ্ঠ আলোচনার মাধ্যমে প্রয়োজন হলে দুই দলকেই ছাড় দিয়ে প্রত্যেকের অংশগ্রহণের মাধ্যমে দেশে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই পরিবেশ সৃষ্টির জন্য দুই দলের রাজনীতিবিদদেরই এগোতে হবে। হারি জিতি নাহি ভয়- এমন চিন্তা রাখতে হবে। যে দল হেরে গেল সে দল যে সবকিছু হারিয়ে ফেললো তা তো নয়। রাষ্ট্র পরিচালনায় বিরোধী দলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে এক অর্থে বিরোধী দল নেই। যা গণতন্ত্রের জন্য খুবই হানিকর। কারণ বিরোধী দলের যদি লক্ষ্য হয় সরকারে প্রবেশ করা তাহলে তো আর বিরোধী দলে থাকা হলো না। তারা বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হবে। বিরোধী দলের ভূমিকা কি- তা মনে রাখতে হবে। তারা যদি মনে করে, সরকার ভুল পথে রয়েছে তাহলে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া তাদের কাজ। কখনও বা জাতীয় স্বার্থে সরকারকে সহায়তা করবে তারা। যেমন ভারত বা অন্য কোন দেশের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে দেশের স্বার্থের প্রশ্ন রয়েছে। সেখানে সরকার ও বিরোধী দল একজোট হয়ে কাজ করবে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিদেশীদের ভূমিকা প্রসঙ্গে বললেন, বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ। এখানে ১৬ কোটি মানুষের বাস। এর ভূ-রাজনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর সঙ্গে পৃথিবীর বড় রাষ্ট্রগুলো যেমন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, রাশিয়া, ভারতসহ প্রতিবেশী এবং বিভিন্ন দেশের ব্যাপক ও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। অতএব এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই যে, অন্যান্য দেশ অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করবে। তারা আমাদের দেশে স্থিতিশীলতা চায়, সন্ত্রাসমুক্ত বাংলাদেশ চায়। কিন্তু আগ্রহ প্রদর্শন আর হস্তক্ষেপ এই দুয়ের মধ্যে ফারাক আছে। আমরা নিশ্চয়ই চাইবো না যে কেউ আমাদের ওপর হস্তক্ষেপ করুন। প্রতিবেশী দেশের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভারত একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। আজকে এখানে একটি সরকার আছে। কাল একটি সরকার হবে। আমি আশা করবো, ভারত তার দেশের স্বার্থেই সবার সঙ্গে, রাজনৈতিক সব গোষ্ঠীর সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখবে। অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ করা ভারতের স্বার্থ হতে পারে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, যদি দেশে সমঝোতার একটি আবহ সৃষ্টি হয়, তাহলে আমাদের রাজনীতিতে বহির্বিশ্বের কোন প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের কারণ থাকবে না।
তিনি নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা প্রসঙ্গে বলেন, যারা সাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাস করে, তারা বাংলাদেশে বিশ্বাসী না। কারণ, অসাম্প্রদায়িকতা রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের একটি স্তম্ভ; গণতন্ত্র যেমন, ন্যায়বিচার যেমন। দেশে এমন একটি অবস্থার সৃষ্টি হওয়া উচিত যাতে রাজনীতির নিরিখে বা অন্য কোন মাপকাঠিতে কোন একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে সংখ্যালঘু বলে বিবেচনা করা হবে না। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে সমতা রইবে। কোন একটি গোষ্ঠী নিজেকে সংখ্যাগুরু বলে বিবেচনা করবে না। তা ভাষাভিত্তিক হোক, ধর্মভিত্তিক হোক, সমাজভিত্তিক হোক। কারণ যখনই সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিতে আমরা বাংলাদেশকে দেখি তখনই আমরা বাংলাদেশকে দুর্বল করে ফেলি।

এ নিপীড়ন সার্বক্ষণিক ও বহুমাত্রিক by জাকারিয়া পলাশ

Sunday, January 19, 2014

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক স্বাধীন সেন বলেছেন, সদ্য নির্বাচন কেন্দ্রিক সাম্প্রদায়িক হামলাগুলো আমাদের নজরে আসছে। কিন্তু নিপীড়ন চলছে সার্বক্ষণিক।
নির্বাচন নিপীড়নকে আরও প্রত্যক্ষ করে তুলেছে, নিপীড়নের সহিংস রূপের প্রকট প্রকাশ ঘটিয়েছে মাত্র। প্রতিদিনের জীবনযাপনে আমরা সাম্প্রদায়িক বিভেদকে পরিপুষ্ট করে চলেছি। একই সঙ্গে বলে চলেছি, আমরা অসাম্প্রদায়িক।

মানবজমিন অনলাইনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সাম্প্রদায়িক হামলার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনা যেমন দরকার, তেমনই দরকার বিভেদের অনুশীলনগুলোকে চিহ্নিত করে সেগুলো দূর করার রাস্তা খোঁজা। সাংবিধানিক, আইনগত, চর্চাগত বৈষম্যগুলোকে দূর করার তৎপরতা জোরেশোরে শুরু করা দরকার।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসের দাপুটে বয়ান আর জাতীয়তাবাদী আখ্যানে সাম্প্রদায়িক সংঘাত ও সহিংসতার চেতনাগত প্রেক্ষাপটকে স্বীকার করা হয় না। একে কেবল ‘রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন’ হিসেবে শনাক্ত করা হয়। এটাই সাম্প্রদায়িকতা জারি থাকার অন্যতম প্রধান কারণ। অন্যদিকে, সাংবিধানিক, আইনগত ও গণতান্ত্রিক বিধিবিধানের পক্ষপাতদুষ্ট প্রয়োগের মধ্য দিয়েই স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা পৌনঃপুনিকভাবে ঘটে চলেছে।
সাম্প্রদায়িকতার ইতিহাসের এই গবেষক আরও বলেছেন, বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক নিপীড়নের ঐতিহ্য নতুন নয়। আমার মতে, সাম্প্রদায়িকতা প্রধানত দুই রকমের, এক. ইতিহাস ও চৈতন্যগত; দুই. বিভিন্নভাবে নির্মিত ও সৃষ্ট। উপনিবেশপূর্ব ও উত্তর-ঔপনিবেশিক ইতিহাসে ধর্মীয় ও জাতিগত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘাত আর এক সম্প্রদায়ের ওপরে আরেক সম্প্রদায়ের সহিংসতার ঘটনাবলি বিভিন্ন ঐতিহাসিক শর্ত দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। ‘বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ’-এই কথাটির পেছনেও ঐতিহাসিক অসত্যতা আছে। মুক্তিযুদ্ধের পরে বাংলাদেশে অ-মুসলিম ও অ-বাঙালিদের ওপরে নানামুখী নিপীড়নের, নির্যাতনের ও রাষ্ট্রীয় অন্যায়ের অনেক ঘটনা আছে। ঐতিহাসিক ও চৈতন্যগতভাবে জন্ম নেয়া সাম্প্রদায়িক বিভেদকে বিলোপ করার চেষ্টা করা হয়নি। বরং তাকে আড়াল করে আমরা ‘সংখ্যাগুরুর’ দাপটকে বৈধতা দিয়ে চলেছি।
এই সহিংসতার পেছনে দায়ী কারা এমন প্রশ্নে তিনি বলেছেন, পুনঃপুনঃ সাম্প্রদায়িক হামলার পেছনে শুধুমাত্র ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’কে দায়ী করলে সামগ্রিক চিত্র স্পষ্ট হয় না। সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক দিকগুলোও এখানে মুখ্য। অ-মুসলিম ও অ-বাঙালিদের জমি, বসতভিটা ও ব্যবসা দখলের আইনি ও বেআইনি তৎপরতাগুলো ব্যাপক ও স্বাভাবিকভাবে চলে আসছে। এর পেছনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষিতের মতো বহুমাত্রিক বিষয় জড়িত ছিল।
বারবার হামলা, নির্যাতনের পরও দায়ীরা দায়মুক্তি পেয়ে যাচ্ছে। এর পেছনে কোন রাজনৈতিক স্বার্থ আছে বলে মনে করেন কি? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাংবিধানিকভাবেই তো বাংলাদেশে অ-মুসলিম ও অ-বাঙালিরা প্রথম শ্রেণীর নাগরিক নন। বিশেষ পরিস্থিতিতে ‘সংখ্যালঘুদের’ জন্য আলাদা নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেয়ার ঘটনা এটাই প্রমাণ করে। অর্পিত সম্পত্তির মত নিবর্তনমূলক আইন এখনও বলবৎ রয়েছে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা কমিয়ে আনার জন্য রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হিসেবে আলাদা আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়ার কথা ভাবা যেতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে যে, যে ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ বিভিন্ন সময়ে সহিংসতা ও হামলার সঙ্গে জড়িত থাকে তারা রাষ্ট্র ও ক্ষমতা বদলের সঙ্গে সঙ্গে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পায়। বিচার না করাও এক ধরনের পৃষ্ঠপোষকতারই প্রমাণ। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত কোন সাম্প্রদায়িক হামলাকারীরই বিচারের ও শাস্তির নজির নেই। শুধু রাজনৈতিকই নয়, দলীয় স্বার্থ, আত্মীয়তার স্বার্থ, অর্থনৈতিক স্বার্থ, গোষ্ঠীগত স্বার্থ- এমন নানামুখী ও বিচিত্র স্বার্থ এখানে জড়িত থাকে। আর এ সাম্প্রদায়িকতা সর্বদলীয়। বিচারহীনতা এর অন্যতম কারণ। তবে সেটা একমাত্র কারণ না। আমাদের যাপিত জীবনে অসাম্প্রদায়িকতা যেমন সত্য, সাম্প্রদায়িকতাও তেমনই বাস্তব। একটি গভীর বহুত্ববাদী সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক লড়াই শুরু করা জরুরি। একথা আজ প্রমাণিত যে, এই লড়াই লড়তে গেলে বিদ্যমান ইতিহাস চৈতন্য, জাতীয়তাবাদী স্বৈরাচার, আর বহু ব্যবহারে জীর্ণ ভাষা ও অভিব্যক্তির জায়গায় ভিন্ন ভাষা-অভিব্যক্তি-চর্চার সন্ধান আমাদের করতে হবে। সেটা দীর্ঘমেয়াদি কাজ। আপাতত, দায়িদের বিচারের আওতায় আনা আর সহিংসতার শিকার মানুষগুলোর মধ্যে স্বাভাবিকতার বোধ ফিরিয়ে আনা দরকার। সেই উদ্যোগ রাষ্ট্র, সরকার, প্রচারমাধ্যম এবং সংখ্যাগুরুসহ ক্ষমতাশালী পক্ষগুলোকেই নিতে হবে।

ভয়েস অব আমেরিকাকে খালেদা- ‘জামায়াতের সঙ্গে জোট কৌশলগত’: বেগম খালেদা জিয়া

Friday, January 10, 2014

বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং একাদশ সংসদ নিয়ে আলোচনা পরের বিষয়। জামায়াতের সঙ্গে জোট বা ঐক্যর বিষয়টি শুধুই কৌশলগত ব্যাপার বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
শন্তি, উন্নয়ন, দারিদ্র বিমোচন চায় বলেই তরুণরা এই সরকারকে প্রত্যাখ্যান করেছে বলেও তিনি দাবি করেন। গতকাল ভয়েস অব আমেরিকাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন খালেদা জিয়া। ভয়েস অব আমেরিকার ওয়াশিংটন স্টুডিও থেকে তাঁর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন সরকার কবীরূদ্দীন। এ সাক্ষাৎকারে বিএনপির দলীয় অবস্থান ও আঠারো দলের পরবর্তী ভাবনা তুলে ধরেছেন খালেদা জিয়া। নির্বাচন হয়ে গেল। এখন কি কর্মসূচি নিয়ে এগোবেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রথম কথা আমি বলব যে, দেশে কোন নির্বাচন হয়নি। যেটা হয়েছে তা কারও কাছেই গ্রহণযোগ্য নয়। দেশের মানুষ সরকারকে সম্পূর্ণভাবে রিজেক্ট করেছে। আপনি নিজেই দেখেন যেখানে ১৫৩টা সিটে কেউ পার্টিসিপেট করেনি। কন্টেস্ট করেনি। কেউ আগ্রহীই নয় নির্বাচন করতে। সেখানে শুধু একদলীয় নির্বাচন ১৫৩টা সিটে হয়েছে। কোন প্রতিযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি। দ্বিতীয়ত যে ১৪৭টা সিটে ৫ই জানুয়ারি নির্বাচনের কথা ছিল। সেখানেও দেশের ও বিদেশের মিডিয়া কর্মীরা দেখেছে, ভোটিং সেন্টারে মানুষই নেই। প্রিজাইডিং অফিসার কোনো কোনো যায়গায় ঘুমাচ্ছে। কোনো কোনো যায়গায় নিজেরাই ভোট দিচ্ছেন। ৪৭/৪৮টা ভোট কেন্দ্রে কোন ভোটার ভোট দেয়নি। তারপরে অনেক কেন্দ্র বন্ধ। তারপরও যেটা হল তাতে ৫%ও হবে না। তো এতে কি হল। মানুষের এটাইকি রায়? জনগণের মতামতের কোনও প্রতিফলন এখানে হয়নি। কাজেই এটাকে কোনও ইলেকশন আমি বলব না। এটা ভাগাভাগির নির্বাচন বলতে পারেন। তারা নিজেরা সিট ভাগাভাগি এবং ক্ষমতার ভাগাভাগি হয়েছে। বাংলাদেশের জনগণ সত্যিকারের একটা অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দেখতে চায়। যেখানে সকল দলের অংশগ্রহণ থাকবে। সেরকম একটি নির্বাচন দেখতে চায়। সেই নির্বাচনটা হতে হবে একটা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে। মানুষ এখন আরও পরিষ্কার ৫ই জানুয়ারির পরে যে আওয়ামী লীগের অধীনে কোনও সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে পারে না। এবং নির্বাচন কমিশন যে একটা মেরুদণ্ডহীন বা দলীয় সরকারের মতো কাজ করেছে, এটা একদম পরিস্কার। যেখানে ৫%ও ভোট পড়েনি। সেখানে কেমন করে ৪০%ভোট বলে? এটা একটা নির্লজ্জ মিথ্যা কথা বলছে। এবং এজন্য তার দু’দিন সময় লেগেছে। সব ঠিকঠাক করে, গুছিয়ে কিভাবে বলবে তা ঠিক ঠাক করে। কাজেই এটা পরিস্কার। এবং জাতী এটাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। একাদশ সংসদ নিয়ে আলোচনার আহ্বান প্রশ্নে তিনি বলেন, দশম নির্বাচনই তো মানুষ রিজেক্ট করেছে। একাদশের কথা পরে হবে। আমরা গণিতান্ত্রিক দল। আমি অনেক আগে থেকেই গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করছি। আমরা সত্যিকারই গণতন্ত্র চাই। জনগণের ভোটের অধিকার, ভাতের অধিকার, মানবাধিকার রক্ষার জন্য চাই। শন্তি চাই, উন্নয়ন চাই, দারিদ্র বিমোচন চাই, লেখাপাড়া চাই। তরুণরা এই সরকারকে প্রত্যাখ্যান করেছে।
জামায়াতের সঙ্গে যোগাযোগ, জোট বা ঐক্য বা আঁতাত কৌশলগত কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জামায়াতের সঙ্গে আতাত বলেন, জোট বলেন বা ঐক্য বলেন তা আওয়ামী লীগই আগে করেছে। এরশাদের আমলে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম কেউ নির্বচানে যাব না। তারপর মাঝ রাতে এরশাদের সঙ্গে আতাত করে নির্বাচনে গেল আওয়ামী লীগ। জামায়াতের সঙ্গে কথা বলে তাদেরকে নিয়ে গেল। নিরপেক্ষ সরকারের দাবিটা আওয়ামী লীগ এবং জামায়াতের। সে জন্য তখন আওয়ামী লীগ অনেক নাশকতা করেছে। আওয়ামী লীগ এখনও জামায়াতের সঙ্গে সেই যোগাযোগ রক্ষা করে চলছে। বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের এই জোট সমূর্ণভাবে কৌশলগত। বিদেশীদের হস্তক্ষেপ প্রসঙ্গে খালেদা জিয়া বলেন, আমরা স্বাীধন দেশ। এদেশের মানুষই সিদ্ধান্ত নেবে। বিদেশীরা আমাদের ডেভেলপমেন্ট পার্টনার হিসাবে সাহায্য সহযোগিতা করেন। তারা বিভিন্ন বিষয়ে কথাবার্তা বলতে পারেন। কিন্তু তারা স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের উপর হস্তক্ষেপ করলে মানুষ তা সহ্য করবে না। সাম্প্রতিক সময়ে অচলাবস্থা, হত্যা, নাশকতা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, এ সবকিছুর দায় বর্তায় গভর্নমেন্টের উপর। তাদের একগুয়েমি, জেদের উপর। এজন্য সরকার দায়ী। দলীয় লোকজনই এসব ঘটনা ঘটিয়েছে। সংখ্যালঘুদের বাড়ি ঘর তারা পোড়াচ্ছে। অতীতেও তারা হিন্দুদের বাড়িঘর, ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান দখল করেছে। সংখ্যালঘুদের সবসময় তারা খারাপ আরচণ করছে। পুলিশের চোখের সামনে এগুলো ঘটলেও তারা কিছু বলছে না। কারন তাদেরকে নির্দেশনা দেয়া আছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিষয়ে তিনি বলেন, গণতন্ত্র, জনগণের অধিকার, মানবাধিকার, স্বাধীন দেশের আভ্যন্তরীন ব্যাপারে কারও হস্তক্ষেপ নয় এটাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। এগুলো আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপি চেয়াপারসন অভিযোগ করেন, দেশের পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত খারাপ। অত্যন্ত ভয়াবহ। সারাজীবন ক্ষমতায় থাকার জন্য হত্যা, গুম করছে আওয়ামী লীগ। যারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলে তাদের বিরুদ্ধেই নির্যাতন চালানো হচ্ছে। আজ জেলখানাগুলো বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কর্মীদের দিয়ে ভরে ফেলা হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

সংবিধানের আলোকেই নির্বাচন পিছানো যেতে পারে- ব্যারিস্টার রফিক-উল-হক by উৎপল রায়

Saturday, January 4, 2014

প্রথিতযশা আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল-হক বলেছেন, বিদায়ী বছরে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের প্রধান দুই নেত্রী একে অপরের উদ্দেশে বিষোদগার করেছেন।
বিবাদে জড়িয়েছেন। আশা করি, নতুন বছরে তারা দেশের জন্য মিলেমিশে কাজ করবেন। দেশ ও জনগণের প্রয়োজনে একে অপরকে কাছে ডাকবেন। যদিও সে আশা দুরাশা। তারপরও আমরা সে প্রত্যাশা করছি। পুরানা পল্টনস্থ নিজ বাসভবনে মানবজমিন-এর সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও তা থেকে উত্তরণ, আগামী নির্বাচন ও এর গ্রহণযোগ্যতা, রাজনীতিতে কূটনীতিকদের হস্তক্ষেপসহ বিভিন্ন বিষয়ে তার নিজস্ব ভঙ্গিতে মতামত তুলে ধরেন। ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেন, আশা করি আগামী দিনগুলো ভাল যাবে। সুখী, সমৃদ্ধ, রাজনৈতিক হানাহানিমুক্ত সোনার বাংলা হবে। প্রত্যাশায় আছি, বাকিটা সময় বলবে। আগামী ৫ই জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিষয়ে তিনি বলেন, এটা কি নির্বাচন হচ্ছে না সিলেকশন হচ্ছে? এভাবে কোন দল ছাড়া ৫ তারিখ নির্বাচন কিভাবে হয়? সবাই বলছে নির্বাচন পিছিয়ে দিতে। সরকার বারবার সংবিধানের দোহাই দিচ্ছে। তাতে কি বলা আছে তা বলছে না। সংবিধানের ৬৫(২) অনুচ্ছেদে একক আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকা হতে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে প্রার্থী নির্বাচন করার কথা বলা আছে। সিলেকশনের মাধ্যমে প্রার্থী নির্বাচন করার কথা বলা নেই। তিনি বলেন, এ ধরনের নির্বাচন অতীতে এরশাদ করেছেন, খালেদা জিয়া করেছেন। কিছুদিন পর বাতিলও হয়েছে। পরিণতি ভাল হয়নি। সরকার সেই শিক্ষা নেয়নি। ‘দশম নির্বাচনের সরকার ৬ মাস থেকে বড়  জোর ১ বছর টিকতে পারে’ জানিয়ে প্রবীণ এই আইনজীবী বলেন, যে নির্বাচন হচ্ছে তাতে দেশের চেয়ে শেখ হাসিনার ক্ষতি হবে বেশি। ‘সংবিধানের আলোকে নির্বাচন পিছিয়ে দেয়া যেতে পারে’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, সমঝোতা করে এপ্রিলে নির্বাচন হতে পারে। ১২৩ (৩)-এর বি অনুচ্ছেদে এর স্পষ্ট সমাধান দেয়া আছে। সংবিধানের নাম নিয়ে সংবিধানের বিরুদ্ধে গিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কোন মানে হয় না। আওয়ামী লীগ ও সরকার সংবিধান নাম নিয়ে নির্বাচনের কথা বলছে মুখে আর আমি বলছি সংবিধানের লেখা নিয়মে। আর এতই যখন ভাল ভাল কাজ করেছেন- তত্ত্বাবধায়ক না হোক নির্দলীয়, নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচনে যেতে এত ভয় কিসের? আমি আগেও বলেছি, এখনও বলছি- এই দেশে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের কোন বিকল্প নেই। ‘দেশে কোন গণতন্ত্র নেই’ উল্লেখ করে সরকারের সাবেক প্রধান আইন কর্মকর্তা বলেন- এতদিন বিরোধী দল হিসেবে বিএনপির কোন তৎপরতা ছিল না। আন্দোলনের নামে সহিংস কর্মসূচিও সমর্থন করি না। কিন্তু ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচিতে তাদের তৎপরতা ছিল। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের সম্ভাবনা ছিল। আগে আমি বলেছিলাম বিএনপি বাস ফেল করেছে, অভিযাত্রা কর্মসূচি দেখে বলেছি তারা ট্রেনে উঠেছে। সরকার সেটাও করতে দেয়নি। এটা তো ভাল কর্মসূচি ছিল। দেশের রাজনীতিতে বিদেশী কূটনীতিকদের হস্তক্ষেপকে ‘চরম লজ্জা’ দাবি করে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র এ আইনজীবী বলেন, গণতান্ত্রিক দেশে এখনও বিদেশীদের ওপর নির্ভর করতে হয়। তাদের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করতে হয়। এটি শোভনীয় নয়। আমাদের রাজনৈতিক সমস্যা আমাদের নিজস্ব রাজনৈতিক নিয়মেই সমাধান করতে হবে।

‘সবাই কেবলামুখী তাই আমিও হয়েছি’- কাজী ফিরোজ রশীদ by নিয়াজ মাহমুদ

এক সময়ে সরকারের কঠোর সমালোচক ছিলেন জাতীয় পার্টির নেতা কাজী ফিরোজ রশীদ। অবস্থান এখন ঠিক উল্টো।
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিলেও তিনি আছেন নির্বাচনে। প্রচারণাও চালাচ্ছেন। তার মতে দলের সবাই কেবলামুখী। তাই তিনি নিজেও কেবলামুখী হয়েছেন। বলেছেন- তার এই অবস্থানই সঠিক। সময়ের সিদ্ধান্ত। তবে ভুলের জন্য ভবিষ্যতে দল শাস্তি দিলে তা-ও মেনে নিতে রাজি জাতীয় পার্টির এ প্রেসিডিয়াম সদস্য। ধানমন্ডির বাসায় মানবজমিন-এর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকালে এসব কথা বলেন জাপার এই সময়ের আলোচিত নেতা। তিনি বলেন, আমার কোন দোষ নেই। আমার সারা জীবনের রাজনীতি ঘাঁটলেও কোথাও দোষ খুঁজে  পাবেন না। পাকিস্তান আমলে বার বার জেলে গিয়েছি। ১৯৬২, ১৯৬৪ ও ১৯৬৬ সালে জেলে ছিলাম। কেন শেখ মুজিব জেলে গেলেন? এই জন্য ১৯৬৮ সালে আন্দোলন করেছি। এক বছর জেল হলো আমার। যা করেছি নেতা এরশাদের জন্য। তবে দুঃখের রাজনীতি করি আমরা। আর কি বলবো? জাপার ঢাকা উত্তরের নেতারা গম, চাল, তেলসহ সব ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য করেছেন। আমরা দক্ষিণের নেতারা কিছুই পাইনি। চেয়ারম্যান স্যার সভা ডেকে নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার পর থেকে আমি বদলে গেছি। তার ঘোষণা ও কথাবার্তা শুনে মনে হয়েছিল আমার রাজনীতিতে ভুল ছিল। আমি শপথ নিলাম নির্বাচনে যাবো। যারা মন্ত্রী হয়েছেন তাদের সহযোগিতা করবো। গত নির্বাচনে আমরা মন্ত্রী পেয়েছি একজন। আর এখন ৬ জন। আমার রাজনীতি ছিল ভুল। ওই দিনই প্রতিজ্ঞা করলাম। নির্বাচনেও দাঁড়িয়ে গেলাম। অন্য কোথাও থেকে দাঁড়ালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি হতে পারতাম। স্যার বললেন- ঢাকা-৬ আসন থেকে নির্বাচন করতে। আমি তা-ই করলাম। চেয়ারম্যান স্যার নির্বাচন বর্জন করলেন। এরপর কি হয়েছে না হয়েছে, তা জানি না। আমি ঠিক পথেই আছি। আমরা রাজনীতি করি। একবার শপথ করলে আর বেরোতে পারি না। মুখের কথা বা বন্দুকের গুলি একবার বের হয়ে গেলে তা ফিরিয়ে নেয়া যায় না। ফিরোজ রশীদ বলেন, সময়-বয়স বা যৌবন একবার চলে গেলে তা আর ফিরে পাওয়া যায় না। আমি সঠিক পথে আছি। তিনি বলেন, এরশাদ স্যার এ জীবনে যত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন- সবচেয়ে বড় এবং ভাল সিদ্ধান্ত হয়েছে নির্বাচনে যাওয়া ও মন্ত্রিত্ব দেয়া। এটা তার জীবনে শেষ এবং বড় সিদ্ধান্ত। একজনকে উপদেষ্টা করার জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীকে ৩ বার ফোন দিয়েছেন। পাশাপাশি চিঠিও দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীকে বলেছেন- তাকে মন্ত্রী না করলে কেবিনেটে স্যারের সমস্যা হবে। পার্টির চেয়ারম্যান সিএমএইচ থেকে জিএম কাদের ও রুহুল আমীন হাওলাদারের মাধ্যমে বলেছেন- দলের প্রার্থীদের মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিতে। এ প্রশ্নে কাজী ফিরোজ বলেন, কার কাছে বলেছেন, কিভাবে বলেছেন- আমার জানা নেই। তবে এরশাদ সাহেবের অন্তরের লোক যারা (আনিস-বাবলু) তারা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালে শুকুর আলহামদুলিল্লাহ বলে আমিও মিলাদ পড়াবো।

বাংলাদেশ এখন কালো অধ্যায় পার করছে by ফারুক চৌধুরী

Tuesday, December 31, 2013

বাংলাদেশের নির্বাচন ও রাজনৈতিক সংকট আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কী প্রভাব ফেলতে পারে, কীভাবে দেশে একটি সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরে আসতে পারে, সে বিষয়ে প্রথম আলো মুখোমুখি হয়েছেন সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ফারুক চৌধুরী
প্রথম আলো  আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল থেকে কি বাংলাদেশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল?
ফারুক চৌধুরী  আমি তো মনে করি, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি যে অবস্থায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, এতটা নিচে আর কখনো নামেনি। ১৯৭২ থেকে ১৯৮২ এবং ১৯৮৬ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত আমি কূটনৈতিক দায়িত্ব পালনের জন্য দেশের বাইরে ছিলাম। বিদেশে বসে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির ওঠানামা লক্ষ করেছি। অনেকটা শ্রাবণের মেঘের মতো। কিন্তু এবার যা হলো, সম্ভবত আর কখনোই তা হয়নি।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ছিল এক বিস্ময়। আমাদের স্বাধীনতার দুটি মাইলফলক ঘটনা আছে—২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা, ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস। পৃথিবীর আর কোনো দেশের বিজয় দিবস নেই। অর্থাৎ, আমরা একটি দখলদার বিদেশি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বিজয় অর্জন করেছি। সেই দ্বিমেরু বিশ্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম বিশ্বসম্প্রদায়ের ব্যাপক সমর্থন আদায় করতে সক্ষম হয়েছিল। ভারত বা তৎকালীন সোভিয়েত শিবির তো আমাদের সাহায্য করেছেই, কিন্তু যে পশ্চিমা বিশ্ব পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে রাষ্ট্রীয়ভাবে সমর্থন করেনি; সেসব দেশের জনগণ নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করেছে।
প্রথম আলো  গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত হলো সুষ্ঠু নির্বাচন ও শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর। গত ৪২ বছরেও আমরা সেটি করতে পারলাম না কেন?
ফারুক চৌধুরী  এটি রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতা। তাঁরা ঠিক করতে পারেননি নির্বাচনটি কীভাবে করবেন। আমাদের রাজনীতি হচ্ছে ক্ষমতা দখলের। ক্ষমতায় আসা মানে রাজনীতিবিদদের কাছে শুধু সরকার গঠন নয়; যা খুশি তাই করা। সরকারপ্রধানেরা হয়ে ওঠেন আইনকানুনের ঊর্ধ্বে। তাঁরা কাউকেই পরোয়া করেন না। দেশের বর্তমান সংকটের মূলেও এই মানসিকতা কাজ করেছে।
প্রথম আলো  বিশ্বের যেসব রাষ্ট্র এখন বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, তারাও তো একসময় সামরিক শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে?
ফারুক চৌধুরী  নিশ্চয়ই দিয়েছে। পাকিস্তানে, ফিলিপাইনে, ইরানেও তারা স্বৈরশাসকদের মদদ জুগিয়েছে। এ কারণেই আমি বলব, আমাদের সমস্যা আমাদেরই সমাধান করতে হবে। এই যে কূটনীতিক দেবযানীকে নিয়ে ভারত আমেরিকার সঙ্গে একটি অবস্থান নিতে পেরেছে, তা তার নিজের সামর্থ্যবলেই। একই সঙ্গে এ নিয়ে দেশটির রাজনৈতিক ঐকমত্যও এই অবস্থান নিতে সহায়তা করেছে।
প্রথম আলো  ভারত প্রথম দিকে শক্ত অবস্থান নিলেও পরে মনে হয় কিছুটা সরে এসেছে, নমনীয় হয়েছে।
ফারুক চৌধুরী  দুটি দেশের অর্থনৈতিক শক্তিও কিন্তু এক নয়। অধিকতর শক্তিধরের বিরুদ্ধে লড়তে নানা হিসাব-নিকাশ করতে হয়। কিন্তু যেটুকু তারা নিতে পেরেছে, সেটি জাতীয় ঐকমত্যের কারণেই। আর আমাদের এখানে ঠিক তার বিপরীতটি ঘটেছে।
প্রথম আলো  কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করার বিষয়ে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে নেওয়া প্রস্তাবকে কীভাবে দেখছেন?
ফারুক চৌধুরী  এটি তাদের চরম নির্বুদ্ধিতা। বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে পাকিস্তানের বলার কিছু নেই। এর মাধ্যমে পাকিস্তান আবারও প্রমাণ করল, তারা একাত্তরের দৃষ্টিভঙ্গিতেই আচ্ছন্ন। কাদের মোল্লাকে তারা তাদের লোক বলে দাবি করেছে। এটাই হলো পাকিস্তানি মানসিকতা। আর ইমরান খানের রাজনীতি হলো তালেবানি রাজনীতি। তবে পাকিস্তানে এর প্রতিবাদও হয়েছে।
প্রথম আলো  কিন্তু এ নিয়ে বাংলাদেশে যে পাল্টাপাল্টি রাজনীতি হচ্ছে?
ফারুক চৌধুরী  যেখানে জাতীয় মর্যাদার প্রশ্ন, সেখানে পাল্টাপাল্টি মোটেই কাম্য নয়। কিন্তু কোনো কোনো মহল থেকে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের যে দাবি করা হয়েছে। আমি মনে করি, সেই চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এখনো আসেনি। তবে পাকিস্তানের অন্যায়ের প্রতিবাদ আমরা অবশ্যই করব।
প্রথম আলো  পাকিস্তানের ব্যাপারে আমরা যতটা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছি, তুরস্কের ব্যাপারে সেটি দেখাতে পারিনি। তারা আরও নগ্নভাবে যুদ্ধাপরাধের বিচারে হস্তক্ষেপ করেছে। সেখানে বাংলাদেশ দূতাবাসে হামলা হয়েছে। জাতিসংঘের পক্ষ থেকেও প্রতিবাদ করা হয়েছে। কিন্তু আমরা নীরব থেকেছি।
ফারুক চৌধুরী  আমি মনে করি তুরস্কের ব্যাপারে আমাদের নমনীয় থাকার কোনো কারণ নেই। সব ক্ষেত্রেই ভারসাম্য থাকা উচিত।
প্রথম আলো  ৪০ বছর পর আমরা যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু করেছি। এ ব্যাপারে বহির্বিশ্বে নানা অপপ্রচারও চলছে। এসব বন্ধে এবং বিচারের যৌক্তিকতা তুলে ধরতে সরকারের যা যা করণীয় ছিল তা কি তারা করতে পেরেছে?
ফারুক চৌধুরী  সরকার করতে পারেনি। আমি বলব, এটি কূটনৈতিক দুর্বলতা।
প্রথম আলো  বাংলাদেশে বর্তমানে যে রাজনৈতিক সংকট চলছে, তার পেছনে দুটি ঘটনা কাজ করছে। যুদ্ধাপরাধের বিচার ও নির্বাচন।
ফারুক চৌধুরী  দুটি আলাদা বিষয়। যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। যে বিচার শুরু হয়েছে, তা শেষ করতে হবে। কিন্তু সরকার ৫ জানুয়ারি একতরফা নির্বাচন করে ফেললে তার ফল খুব নেতিবাচক হবে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে, তার বিশ্বাসযোগ্যতাও থাকবে না। দক্ষিণ আফ্রিকার নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা বলতেন, দুই পক্ষের ঝগড়ায় কে হারবে, কে জিতবে—সেটি বড় কথা নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো, মানুষের ওপর এর প্রতিক্রিয়া কী হবে?
ইকোনমিস্ট-এর সঙ্গে আমি একমত নই যে, আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জিতলে বাংলাদেশ হারবে। বাংলাদেশ হারবে না। আমি বলব, বাংলাদেশ একটি কালো অধ্যায় অতিক্রম করছে। এমনকি পুরোনো রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগও কিন্তু কঠিন সময়ের মুখোমুখি। কীভাবে এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসবে, সেটাই দেখার বিষয়।
প্রথম আলো  এ অবস্থার জন্য বিরোধী দলেরও কি দায় নেই?
ফারুক চৌধুরী  অবশ্যই দায় আছে। বিরোধী দলের যে দায়িত্ব, তা কি তারা গত পাঁচ বছরে পালন করতে পারেনি? তারা সংসদে গরহাজির থেকেছে। বিএনপি এখন বসে বসে বিবৃতি দেয় এবং তাদের একটি কর্মসূচি পালনের জন্য আরেকটি বাহু আছে, তার নাম জামায়াত-শিবির। তারা দেশের ভয়াবহ ক্ষতি করেছে, তারা মানুষ মেরেছে, সরকারি স্থাপনায় হামলা করছে, পরিবহনব্যবস্থা ভেঙে দিয়েছে। এগুলো আন্দোলন নয়, সন্ত্রাস। আর জামায়াত-শিবিরই তা করতে পারে। কেননা, দেশের প্রতি তাদের দরদ নেই। থাইল্যান্ডেও সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন হচ্ছে। সেখানে তো সরকারি কোনো স্থাপনায় হামলা হচ্ছে না।
প্রথম আলো  বিরোধী দলের অভিযোগ, সরকার তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করেছে বলেই তারা এসব করতে বাধ্য হচ্ছে।
ফারুক চৌধুরী  বিরোধী দলকে সভা-সমাবেশ করতে না দেওয়া অন্যায় ও অগ্রহণযোগ্য। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে জামায়াত-শিবিরকে দিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাতে হবে। শান্তিপূর্ণ উপায়েই তারা সরকারের অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ জানাতে পারে।
তবে আবারও ম্যান্ডেলার কথায় ফিরে যেতে হয়। ১৯৯৭ সালে নেলসন ম্যান্ডেলা বাংলাদেশে এসে বলেছিলেন, ‘আমি দেশের প্রেসিডেন্ট। অতএব দেশটিতে যা কিছু ঘটুক না কেন, তার দায় আমাকেই নিতে হবে।’ বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনদেরও আমি সে কথাটি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই।
দেশে বর্তমানে জনজীবনে যে দুর্বিষহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব তার দায় এড়াতে পারে না। দুই দলে মুষ্টিমেয় লোক রাজনীতি করেন। আর সেই রাজনীতির জন্য গোটা দেশের মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। এটা মেনে নেওয়া যায় না।
প্রথম আলো  বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে আমাদের বন্ধু ও উন্নয়ন-সহযোগী রাষ্ট্রগুলো বলা যায় মুখোমুখি অবস্থানে। এর কারণ কী?
ফারুক চৌধুরী  আমার মতে, কোনো রাষ্ট্রই স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নয়। সবাই নিজের স্বার্থ দেখবে। প্রশ্ন হলো, আমরা আমাদের স্বার্থ কতটা দেখছি।
প্রথম আলো  ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘ, কমনওয়েলথ ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে, তারা পর্যবেক্ষক পাঠাবে না। আরও কোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে?
ফারুক চৌধুরী  হ্যাঁ, তারা অবরোধ আরোপ করতে পারে। যেমন, অনেক দেশে করেছে। জিএসপি সুবিধা বাতিলও একধরনের অবরোধ। কিন্তু বাংলাদেশে চূড়ান্ত অবরোধ আরোপ করার মতো পরিস্থিতি এখনো হয়েছে বলে মনে করি না।
প্রথম আলো  যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা জাতিসংঘ যদি শেষ পর্যন্ত কোনো কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়, বাংলাদেশ কি তা বহন করতে পারবে?
ফারুক চৌধুরী  বাংলাদেশের বিকাশমান অর্থনীতির ওপর মারাত্মক চাপ পড়বে। আমাদের রপ্তানি কমবে, বিনিয়োগ কমলে মানুষের কর্মসংস্থানও কমবে, বেকারত্ব বাড়বে। ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশের পক্ষে এসব দায় বহন করা কঠিন হবে। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ যে সুনাম অর্জন করেছিল, তা ধুলায় মিশে যাবে।
প্রথম আলো  আপনাকে ধন্যবাদ।
ফারুক চৌধুরী  ধন্যবাদ।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন  সোহরাব হাসান ও রাহীদ এজাজ

‘নির্বাচন নয় সিলেকশন হচ্ছে’- ড. বদিউল আলম মজুমদার

Tuesday, December 17, 2013

সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার নির্বাচন বিষয়ে বলেন, এটা নির্বাচন নামের প্রহসন হচ্ছে। এটাকে আমরা বলতে পারি সিলেকশন। সিলেকশনকেই ইলেকশন বলে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে।
গণতন্ত্র কায়েম হওয়ার জন্য প্রাথমিক পদক্ষেপ হলো নির্বাচন। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বী ছাড়া নির্বাচন হলে গণতন্ত্রের ওই প্রাথমিক পদক্ষেপ হোঁচট খায়। মানবজমিন অনলাইনকে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতার মাসেও দুই দল একটা সমাধান বের করতে পারছে না। মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন, চেতনাগুলো হলো, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সামাজিক সুবিচার, সততা, আইনের শাসন, একতা এগুলো। কিন্তু এগুলো এখন অনুপস্থিত। অনেক রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা এসছে আমাদের দেশের। এখনও সেখানে রক্ত ঝরছে মানুষের। এটা ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে। ভূখণ্ড স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু তার সুফল ঘরে ওঠেনি। কিছু লোক আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে। কিন্তু স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়নি। এ অবস্থার পরিবর্তন জরুরি।

‘লুটপাটতন্ত্র বন্ধ করলে মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র পূর্ণতা পাবে’

Saturday, December 14, 2013

গণসংহতি আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলেছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার বাস্তবায়নের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু হয়েছে মাত্র।
কিন্তু এটাই শেষ নয়। মূল মর্মটা তখনই বাস্তবায়ন হবে, যখন দেশের সার্বভৌমত্ব নিরাপদ হবে। কিন্তু এখন আমাদের সার্বভৌমত্ব নিরাপদ নয়। সার্বভৌমত্বের উপর এখন নানামুখী আক্রমণ হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র পূর্ণতা পাবে যদি লুটপাটের রাজনীতি বন্ধ করে উৎপাদনশীল অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করা যায়। কিন্তু তা হচ্ছে না। মানবজমিন অনলাইনকে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ৭২ সাল থেকে নির্বাচিত কিংবা অনির্বাচিত কায়দায় স্বৈরতান্ত্রিক কাঠামোতেই চলেছে সরকারগুলো। ফলে, আমরা কাঙ্খিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ পাইনি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আনুষ্ঠানিকতার বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে।

রাজনৈতিক সংকটের মোকাবিলায় বিদেশীদের কূটনৈতিক পদক্ষেপ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুই দল নিজেদের দাবিতে অনড় থেকে সমাধান চাইছে। এটা সম্ভব নয়। তাই সমাধানের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ছাড় দিতে পারলে নিজেরাই সমস্যার সমাধান করা যেত। কিন্তু তা করতে পারে নি শাসকদলগুলো। ফলে এখন কূটনীতিকরা হস্তক্ষেপ করে আমাদেরকে একটা লজ্জাজনক অবস্থায় ফেলেছে।
জামায়াত-শিবিরের রাজনৈতিক মোকাবিলার উপায় প্রসঙ্গে এই বাম রাজনীতিক বলেন, জামায়াত-শিবিরের বাড়বাড়ন্ত অবস্থা শাসক দলগুলোর আপোষকামিতার ফল। জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার জন্য গণতান্ত্রিক শাসন কাঠামো ও গণমুখী অর্থনীতি গড়ে তোলা দরকার। কিন্তু তা গড়ে ওঠেনি এবং তার দিকে ক্ষমতাসীন দলগুলো মনোযোগীও নয়। এই বিষয়ে জনগণের এগিয়ে আসা প্রয়োজন।

‘সকলেই সরকারে থাকতে চায়’ by উৎপল রায়

Monday, December 2, 2013

বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)-এর সভাপতি অধ্যাপক মোজফ্‌ফর আহমদ বলেছেন, রাজনীতি জনগণের জন্য হলেও জনগণের জন্য কেউ রাজনীতি করে না।
গণতন্ত্রে কিছু না কিছু ছাড় দিতে হয়। আগে তা হতো। কিন্তু এখন কারও ছাড় দেয়ার মানসিকতা নেই। আর যদি তা না থাকে তাহলে সঙ্কট উত্তরণ হবে না। সমপ্রতি বারিধারার ৪৮ পার্ক রোডের বাসায় মানবজমিনকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট ও তা থেকে উত্তরণসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন তিনি। শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘নেপথ্য’ (বিদেশী) শক্তি রয়েছে উল্লেখ করে অধ্যাপক মোজফ্‌ফর বলেন, আওয়ামী লীগের শেখ হাসিনা ও বিএনপির খালেদা জিয়া ‘নেপথ্য’ শক্তি দিয়ে পরিচালিত হন। এরা নিজেরাও তা জানেন না। দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের সমালোচনা করে তিনি বলেন, দেশে রাজনৈতিক শূন্যতা চলছে। কেউই সাধারণ জনগণের জন্য বোধগম্য সমাধান দিতে পারছে না। অনেকটা ‘পাটা-পোতায় ঘষাঘষি, মরিচের জান যায়’-এর মতো অবস্থা। যদি রাজনৈতিক দলগুলো গণতান্ত্রিক বিধিবিধান মেনে চলতো তাহলে এ সঙ্কট হতো না। তারা গণতন্ত্র ও জনগণকে বিশ্বাস করে না। তাছাড়া বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক সঙ্কটের কারণ বিরোধী দলে না থাকার মানসিকতা। গণতন্ত্রে একজনকে হারতে হয়। কিন্তু তারা কেউই হারবে না। দু’দলের কেউ বিরোধী দলে থাকতে চায় না। সকলেই সরকারে থাকতে চায়, এ ফর্মুলা ত্যাগ করতে হবে। নতুন ফর্মুলা গ্রহণ করতে হবে। সমঝোতায় আসতে হবে। সংলাপ, নির্বাচন ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিদেশী ও কূটনৈতিক তৎপরতার কঠোর সমালোচনা করে বাংলাদেশের বাম রাজনীতির অন্যতম এ পুরোধা বলেন, মরণোন্মুখ সমাজব্যবস্থাকে দীর্ঘায়ু করার জন্য, নতজানু সরকার সৃষ্টির জন্য দেশী-বিদেশী সুবিধাভোগীরা তৎপর। তারা ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, আইএমএফ, ডব্লিউটিএ, এনজিও এবং নানা রকম কোরামিনসহ বিভিন্ন ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত ও ফন্দিফিকির করছে। অবস্থার প্রেক্ষিতে আমাদের মতো দেশে রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচন করে ক্ষমতায় যেতে হলে এসব ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের অংশীদার হতে হয়। বিদেশী সুবিধাভোগীদের কথা না শুনলে সরকার পরিচালনা ঝুঁকির মধ্যে থাকে। এজন্য সরকারকে নামে মাত্র গণতন্ত্রের চর্চা করতে বাধ্য করা হয়। আমাদের দেশেও তা-ই চলছে। এ যেন অনেকটা ‘সুতার টানে পুতুল নাচে’র মতো। হরতালের সমালোচনা করে তিনি বলেন, হরতাল এখন ‘ডরতাল’। হরতাল ‘ব্রহ্মাস্ত্র’। আন্দোলনের শেষ অস্ত্র। কিন্তু এ শেষ অস্ত্র আগেই দিয়ে দেয়া হচ্ছে। যেনতেনভাবে এর অপব্যবহার করা হচ্ছে। এ কারণে হরতালের গুরুত্ব এখন আর আগের মতো নেই। তাছাড়া যারা হরতাল ডাকে, তারা নিজেরাও হরতালে বিশ্বাস করে বলে মনে হয় না। হরতাল ডেকে তারা মাঠে নামে না। ঘরে বসে থাকে। এ ধরনের হরতাল আইন করে বন্ধ করা উচিত। দেশের জনগণ ‘চেইঞ্জ ইজ দ্য টেস্ট’ (পরিবর্তনই স্বাদ)- এ নীতিতে বিশ্বাসী মন্তব্য করে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের একমাত্র জীবিত এ উপদেষ্টা বলেন- তাদের বোঝা, তাদের ভাষা বোঝা রাজনীতির প্রথম পাঠ। জনগণের ভাষা বুঝতেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান। দেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধ বুঝতে চায় না বোঝে ‘স্বাধীনতা যুদ্ধ’। বোঝে দুই দাবি ‘বৈষম্য’ ও ‘গণতন্ত্র’র জন্য স্বাধীনতা যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছে। তারা মনে করে ধর্ম হচ্ছে মাথার তাজ। পবিত্র ধর্মকে রাজনীতিতে টেনে এনে কলুষিত করা অধার্মিক কাজ। জনগণ একটা অপরাধকে আরেকটা অপরাধের সাফাই হিসেবে সমর্থন করে না। সে কারণে তারা একই চরিত্রের এক দলকে পর পর দু’বার ভোট দিতে চায় না। সুশীল সমাজের সমালোচনা করে ন্যাপ সভাপতি বলেন, ডিগ্রিধারী কুশিক্ষিতদের জনতার কাতারে ফেলা যাবে না। এদের নিয়েই সমাজের তথাকথিত উপরতলা। তাদের থেকেই রাজনীতির নেতৃত্ব আসে। কিন্তু আজ তারা সর্বদিক দিয়ে পচে গেছে। সঙ্কটকালে তাদের পাওয়া যায় না। উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি করছে তারা। রাজনৈতিক সঙ্কট কেটে যাবে- এ আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, হতাশার কোন কারণ নেই। সমাধান হবে। দ্রুতই হবে। সমঝোতাও হবে। এজন্য নেতৃত্বে আসার একটি উজ্জ্বল উৎস হতে পারে ছাত্র-যুবক-তরুণ সমাজ। জয় সুনিশ্চিত। ইতিহাস তা-ই বলে।

‘প্রেসিডেন্টের সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও নৈতিক ক্ষমতা আছে’

Wednesday, November 27, 2013

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেন বলেছেন, একতরফা কোন নির্বাচনই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বিগত ত্রিশ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় একতরফা নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হওয়ার কোনো নজির নেই। ৮৬ সালের নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি।
৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি। ২০০৭ সালের ২২শে জানুয়ারির নির্বাচন হতে যাচ্ছিল তাও গ্রহণযোগ্যতা পেত না। মানবজমিন অনলাইনকে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ কথা বলেন। গতকাল প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা নাগরিক হিসাবে উদ্বিগ্ন। সেই উদ্বেগের যায়গা থেকেই প্রেসিডেন্টের কাছে গিয়েছি। আমরা প্রেসিডেন্টের কাছে একই সুরে কথা বলেছি। আমাদের মূল আহ্বান ছিল একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অবাধ নির্বাচনের জন্য সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিতের বিষয়ে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমেই এই সংকট সৃষ্টি হয়েছে তা আমরা স্পষ্ট করেছি। সন্ত্রাস, সংঘর্ষ ও সহিংস কর্মসূচিগুলো অবস্থার অবনতি ঘটছে তাও আমরা তুলে ধরেছি। আমরা মনে করি আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব। কিন্তু সমাধানের আগেই নির্বাচনে সিডিউল ঘোষণা হয়েছে। এটা আমাদের উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আপনাদেরকে প্রেসিডেন্ট কি আশার বাণী শুনিয়েছেন এমন প্রশ্নে বিশিষ্ট এ নাগরিক বলেন, প্রেসিডেন্ট আমাদের কথা ধৈর্য ধরে শুনেছেন। তাঁর সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার কথা বলেছেন। তার সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও নৈতিক ক্ষমতা আছে। অভিভাবক হিসাবে তার ভূমিকা নেয়ার আছে। এগুলো আমরা উল্লেখ করেছি। প্রেসিডেন্ট আমাদেরকে জানিয়েছেন, বিরোধী দলের দাবিগুলো সরকারি দলকে তিনি অবগত করেছেন। এ সময় আমরা বলেছি, আপনার এই উদ্যোগের ফলোআপ অব্যহত রাখবেন বলে আমরা আশা করি। সংকট সমাধানে লেগেথাকা প্রয়োজন।
 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. XNews2X - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু