চাচার পাঁ চালি- কৌশল by মাহবুব তালুকদার

Monday, February 24, 2014

চাচা বললেন, আমাদের জাতীয় সংসদ এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে।
কি সেই ইতিহাস? আমি জিজ্ঞাসা করলাম।

প্রথমত, এমন একটি সভ্য ভব্য বিনীত বিরোধী দল বিশ্বের আর কোন দেশের সংসদে পাওয়া যাবে না। এখানে বিরোধী দলের কাজ হলো সরকারের পক্ষে গুণকীর্তন করা। দ্বিতীয়ত, সরকার ইশারা দিলে সময়মতো কোনও কোনও বিষয়ে ‘না’ বলা। জাতীয় পার্টি এ দু’টি দায়িত্ব পালনে পারঙ্গমতার পরিচয় দিয়েছে।
তবে যে এরশাদ সাহেব বলেছেন, সরকারে জাতীয় পার্টির কোন মন্ত্রী না থাকলেই ভাল হতো।
এ কথা তিনি কখনও সংসদে দাঁড়িয়ে বলবেন না। চাচা মৃদু হেসে বললেন,
মন্ত্রীরা এরশাদের মন্ত্রী নয়, রওশনের মন্ত্রী। এ জন্যই এরশাদের এত দুঃখ। তিনি এক রাশ দুঃখ নিয়ে কথাগুলো বলেছেন।
কিন্তু আপনি বিরোধী দলকে ‘সভ্য ভব্য বিনীত’ আখ্যা দিলেন কেন?
আসলে তারা জাতীয় সংসদে কখনও অনাকাঙিক্ষত পরিবেশ সৃষ্টি করবেন না। সৌজন্যে বিনয়ে ভদ্রতায় ও আনুগত্যে তারা সংসদে বিরোধী দলের এক নতুন ধারার উদাহরণ সৃষ্টি করবেন। এদের কাছ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংসদীয় রীতিনীতির অনেক কিছু শেখার আছে। চাচা জানালেন।
কি বলছেন আপনি?
ঠিকই বলছি। তুমি নিশ্চয়ই দেখেছো সমপ্রতি ভারতে সংসদ সদস্যরা হাতাহাতি, মারামারি, মরিচের গুঁড়ো প্রতিপক্ষের চোখে ছুড়ে দেয়া ইত্যাদি কার্যকলাপে লিপ্ত হয়েছে। তুরস্কের সংসদেও হাতাহাতি হয়েছে। এরকম ঘটনা বিভিন্ন সময়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের পার্লামেন্টেও ঘটেছে। আমি তোমাকে গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, বাংলাদেশের বর্তমান সংসদে এমন কিছু ঘটবে না। বরং সরকারি দল বিরোধী দলকে যেভাবে উঠবস করতে বলবে, তারা সেভাবেই তা করবে। চাচা আরও বললেন, ‘বশংবদ’ বলে বাংলাভাষায় একটি শব্দ আছে। সংসদে বর্তমান বিরোধী দল সম্পর্কে সেটা খুব মানায়।
চাচা! কথাটা আপনি বিরোধী দলের সাংসদদের পক্ষে বললেন, না বিপক্ষে বললেন?
পক্ষেই বললাম। ‘বশংবদ’ হওয়া কি খারাপ? চরিত্রের মধ্যে বিনয়, আনুগত্য, ‘জ্বি হুজুর’ মার্কা স্বভাব, ইত্যাদি মহৎ গুণাবলী না থাকলে কখনও বশংবদ হওয়া যায় না। দল বেঁধে এমন বশংবদ হওয়ার নজির তুমি বিশ্বের আর কোন দেশের সংসদে পাবে না।
চাচার কথায় আমি মাঝে মধ্যেই বিভ্রান্তিতে পড়ি। তার অনেক কথার দ্বৈত অর্থ থাকে। অনেক সময় তিনি যা বলেন, কথাগুলো বিপরীতে দাঁড়িয়ে যায়, আবার অনেক সময় কারও বিরুদ্ধে কিছু বললে মনে হয়, তার প্রশংসা করছেন, যাকে ব্যাজস্তুতি বলা যায়। এটা চাচার এক ধরনের স্বভাব।
আমি প্রসঙ্গান্তরে যেতে চাইলাম। বললাম, চাচা, নির্বাচন সম্পর্কে কিছু বলুন।
কোন নির্বাচন? জাতীয়, নাকি উপজেলা?
জাতীয় নির্বাচন নিয়ে অনেক কথাই বলা হয়েছে। সে বিষয়ে আর কথা বাড়িয়ে লাভ কি? উপজেলা নির্বাচনের প্রথম পর্যায়ের ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। সে সম্পর্কে আপনার মতামত শুনতে চাই।
উপজেলা নির্বাচনে সরকার জিতেছে।
সরকার জিতেছে মানে? ৯৭টি উপজেলার মধ্যে ৫৫টি উপজেলায় বিএনপির জোট এবং ৩৪টি উপজেলায় আওয়ামী লীগের জোট জয়লাভ করেছে। আর আপনি বলছেন কিনা-
চাচা বাঁধা দিয়ে বললেন, আমি আওয়ামী লীগের কথা বলিনি। সরকারের কথা বলেছি। বিএনপি যে এবার উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিলো, এটাই তো সরকারের জয়। এর অর্থ বিএনপির শত অপপ্রচার সত্ত্বেও বোঝা গেল, বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে পারে।
আমি জানালাম, উপজেলার প্রথম পর্বের নির্বাচন সম্পর্কে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ (মন্ত্রী নয়) বলেছেন, ‘গত সিটি করপোরেশন নির্বাচন ও উপজেলা নির্বাচনের ফলাফল দেখলে বোঝা যায়, জনপ্রিয়তার একটা ধারাবাহিকতা আছে। গ্রামগঞ্জে আওয়ামী লীগের সমর্থন আছে। সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মতো তারা হোয়াইট ওয়াশ হননি’ (প্রথম আলো, ২১শে ফেব্রুয়ারি সংখ্যা)।
চাচা ব্যাজার মুখে বললেন, হোয়াইট ওয়াশ হবে কি করে?
কোন উপজেলায় নির্বাচনকালে যাতে সাদা রঙ না পাওয়া যায়, প্রশাসনকে গোপনে তেমন নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। তাছাড়া, তোফায়েল সাহেব স্পষ্টতই বলেছেন, গ্রামেগঞ্জে আওয়ামী লীগের সমর্থন আছে।
কিন্তু গ্রামেগঞ্জে জামায়াতে ইসলামীরও সমর্থন আছে। সেটাই তো এলার্মিং। তারা ১২টি উপজেলায় জয়ী হয়েছে।
চাচার মুখ কালো হলো। বললেন, জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করা হলে এমন ঘটনা ঘটতো না। সন্ত্রাসী দল হিসেবে নিশ্চয়ই ওরা জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে ভোটারদের ভোট দিতে বাধ্য করেছে। এব্যাপারে ইলেকশন কমিশন কিছু করতে পারতো।
ইসি এতে কি করবে?
ইসি এদের মনোনয়নপত্র বাতিল করতে পারতো।
এটা কি কোন কথা হলো! ইসি কি কারণে তাদের মনোনয়নপত্র বাতিল করবে? কোন ক্ষমতাবলে?
ইসি’র হাতে কি ক্ষমতা কম? ইসি যদি মনোনয়ন প্রত্যাহারকারীদের প্রার্থিতা বাতিল না করে জাতীয় নির্বাচনে জিতিয়ে আনতে পারে, তাহলে সামান্য উপজেলা নির্বাচনে কারও প্রার্থিতা বাতিল করার কোন কৌশল করতে পারতো না? ইসি না পারে কি?
চাচার কথায় ইসি’র করণীয় বিষয়ে আমি কোন কথা ভাবছি না। ভাবছি একটি সন্ত্রাসী দল হওয়ার পর হাজার হাজার নেতা-কর্মী জেনে যাওয়ার পর এবং বাকিরা পলাতক থাকার পরও জামায়াতে ইসলামীর সদস্যরা উপজেলা নির্বাচনে পার হলেন কিভাবে? যদি ওদের জনসমর্থন না থাকে, তাহলে ওদের ভোট দিলো কারা?
আমাকে চুপ থাকতে দেখে চাচা বললেন, কোন চিন্তা করো না। উপজেলা নির্বাচনের আগামী পর্বে জামায়াতে ইসলামীকে ঠেকাতে একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
কি ব্যবস্থা হবে?
এই মুহূর্তে তা বিস্তারিত বলতে পারছি না। তবে আমরা জাতীয় নির্বাচনকে হ্যান্ডেল করতে সেভাবে ব্যবস্থা নিয়েছিলাম, উপজেলা নির্বাচনে তেমন সচেতন ছিলাম না। জামায়াতে ইসলামীর যারা নির্বাচনে দাঁড়িয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী অভিযোগ আছে কিনা দেখলে সমস্যার সমাধান হয়ে যেতো।
চাচা, আরেকটা বিষয় ভাববার আছে।
কি সেটা?
উপজেলা নির্বাচনের এই পর্বে সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি কিন্তু একটা আসনও পায়নি।
তবে যে শুনেছিলাম তারা একটা আসন পেয়েছে।
যে একটি আসন পেয়েছে তা নাকি জাতীয় পার্টির এক বিদ্রোহী প্রার্থীর।
এটা কিন্তু ঠিক হলো না। আওয়ামী লীগ বা জাতীয় পার্টি জাতীয় নির্বাচনের কলাকৌশলগুলো মোটেই কাজে লাগালো না। তখনকার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে উপজেলা নির্বাচনে সরকারি দল ও বিরোধী দল কিছু আসন নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে নিতে পারতো। তবে এখনও কিছু আশার আলো আছে।
আপনি আশার আলো দেখছেন কিভাবে?
দেখছি এ জন্য যে উপজেলা নির্বাচন তো একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। অন্যান্য উপজেলাতে আগামী পর্বে নির্বাচন হবে। তখন যাতে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মুখরক্ষা হয়, এমন ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে।
সেটা কিভাবে সম্ভব?
কিছু পছন্দের প্রার্থীকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতিয়ে আনা কি এমন কঠিন?
বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নিলে সেটা হতে পারতো। আমি বললাম।
চাচা ক্ষুব্ধস্বরে বললেন, নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিএনপি খুবই খারাপ কাজ করেছে। এটাকে গর্হিত বলবো না জাতির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা বলবো, বুঝতে পারছি না।
চাচা, আপনি এমন কথা বলছেন কেন?
বলছি কি সাধে! খালেদা জিয়া জাতীয় নির্বাচনে এলেন না। তার কথা হলো, নির্দলীয় সরকার ছাড়া নির্বাচনে যাবেন না। এখন তো নির্দলীয় সরকার নেই। হাসিনার সরকার বহাল আছে। তাহলে খালেদা জিয়া কোন মুখে নির্বাচনে গেলেন? আসলে তার মুখের কথারই কোন ঠিক নেই।
বিএনপি উপজেলা নির্বাচনে জিতেছে এবং জিতে যাচ্ছে বলেই কি আপনি গোস্‌সা করে এসব কথা বলছেন?
না, না। তা নয়। তবে গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে জাগিয়ে রাখতে আওয়ামী লীগের কোন বিকল্প নেই। আগামী ২০৪১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ যাতে ক্ষমতায় থাকে, যে কোন ভাবেই হোক, সে ব্যবস্থা করতে হবে।
সেটা কি গায়ের জোরে করা হবে?
গায়ের জোর বলছো কেন? আসল কথা হলো কৌশল। সবাই জানে সরকারি দলের কৌশলের কাছে বিএনপি কেমন ধরাশায়ী হয়ে পড়ছে। একটু থেমে চাচা মৃদু হাস্যে নিচু গলায় বললেন, তবে গায়ের জোরও একটা কৌশল বলা যেতে পারে। দেখলে, তো, সরকার এবার গায়ের জোরেই কেমন টিকে গেল!

তাণ্ডব ও চেতনা by মাকসুদুল আলম

Saturday, February 22, 2014

কারও তাঁবেদারি না করার স্লোগানে অবিচল দৈনিক মানবজমিনের ১৭তম বর্ষে পদার্পণ উপলক্ষে দেরিতে হলেও সংশ্লিষ্ট সবাইকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা।
প্রবাসে দীর্ঘদিন পত্রিকাটির একজন নিয়মিত পাঠক। গুণগত মান, সার্বিক পরিবেশন, স্বাস্থ্য বিষয়ক ফিচার ও পত্রিকাটির গভীর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন আমার খুবই পছন্দের। প্রধান সম্পাদক একজন অভিজ্ঞ পেশাদার সাংবাদিক। টেলিভিশনে চেনামুখ। সাহসী সৎ নীতিবান ও নির্লোভ বলেই অধিক পরিচিত। প্রধান সম্পাদকের সঠিক দিকনির্দেশনায় সব স্টাফের সাধনায় ট্যাবলয়েড দৈনিকটির জনপ্রিয়তা পাঠক মহলে দিন দিন বছর বছর বেড়েই চলেছে বলে আমার বিশ্বাস। দ্বিমত পোষণ করার সুযোগ খুব কম। হালুয়া রুটির ভাগবাটোয়ারা আর ক্ষমতার সুবিধাভোগের অপরাজনীতির প্রতি আকর্ষণ থাকলে আজ  হয়তো সম্পাদক নিজে সরকারের মন্ত্রিসভায় ঠাঁই করে নিতে পারতেন। সম্পদের পাহাড় গড়তে পারতেন। খুবই স্বাভাবিক। আর  সাংবাদিক না হয়ে প্রবাসী হলে হয়তো বিদেশের মাটিতে স্ত্রী-সন্তানাদি নিয়ে সুখে শান্তিতে বসবাস করতেন। বিলেতেও বাড়ি-গাড়ি ধন-সম্পদ অর্জন করতেন। জানের ভয় নিয়ে মাঝরাতে বাড়ি ফিরতে হতো না। তবে সমাজের অতিসাধারণ মানুষের ভালবাসায় সিক্ত হতেন কি-না জানা নেই। মধ্যরাত পর্যন্ত টিভির সামনে সচেতন দর্শক তার সংবাদপত্র বিষয়ক অনুষ্ঠান দেখার জন্য অপেক্ষা করত কিনা বলতে পারছি না। মানুষের ভালবাসা মনের অনেক বড় শান্তি। যে কেউ তা পায় না। ক্ষমতার জোরেও তা অর্জন করা যায় না। ধন-সম্পদ আর বিত্তবৈভবের পাহাড়ের বিনিময়েও এ শান্তির দেখা মেলে না। এ শান্তি উপলব্ধি করতে হয়।
ভাষা ও সংস্কৃতির মাস ফেব্রুয়ারি। এ মাসেই ঢাকার পশ্চিম রাজাবাজারে নিজেদের বেডরুমে খুন হয়েছিলেন সাংবাদিক সাগর সারওয়ার ও তার স্ত্রী মেহেরুন রুনি। দু’বছরেও শেষ হয়নি তদন্তের সেই দু’দিন। তদন্তের অগ্রগতি জানতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে তলব করেছে হাইকোর্ট। ন্যায় বিচার এদেশে সোনার হরিণ। আশায় আশায় দিন যাবে। আশা পূরণ হবে না। শেষ পর্যন্ত গুঁড়েবালি পড়বে তাতে। ফেব্রুয়ারি এলেই বাংলা ভাষার কদর বাড়ে। ঢাকায় বসে প্রাণের বইমেলা। প্রদান করা হয় একুশে পদক। আমার এক বন্ধু বলেছে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পর এখন নাকি হাইজ্যাক হয়েছে একুশের চেতনাও। দলীয়করণ হয়েছে একুশে পদকও। বন্ধুর মতে, জন্মবার্ষিকী ও মৃত্যুবার্ষিকী নিয়ে এদেশে পত্রিকার পাতায় বাহারি বিজ্ঞাপন দেখা গেলেও তাতে স্থান পায় না মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এমএজি ওসমানীর কথা। পাঠ্যপুস্তক থেকে উধাও হওয়ার পর এখন পত্রিকার পাতা থেকেও উধাও এই মহান নেতা। অথচ এ মাসেই ছিল ওসমানীর মৃত্যুবার্ষিকী। নব্য-চেতনার আবেগের পানিতে ধুয়ে মুছে গেছে তার সব স্মৃতি। ওদিকে এক মাসের মধ্যে ইলেকট্রনিক মিডিয়া, বিজ্ঞাপন, গাড়ির নম্বরপ্লেট, সাইনবোর্ড ও ব্যক্তিগত নামফলক বাংলায় লেখার নির্দেশ দিয়েছে উচ্চ আদালত। সর্বস্তরে বাংলা ভাষার যথাযথ প্রয়োগ হলে খুব ভাল কথা। আপত্তি থাকার কথা নয়। নির্দেশ প্রদানকারী উচ্চ আদালতেও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলার প্রচলন হলে আরও ভাল হয়। এটা এখন জনদাবিতে পরিণত হয়েছে।
এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গ টানছি। পরপর বিগত দু’সপ্তাহ জাপানের রাজধানী টোকিও সহ গোটা পূর্ব জাপানে তীব্র তুষারপাত হয়েছে। আবহাওয়া কর্তৃপক্ষের পূর্বাভাসের চেয়েও অনেক বেশি বরফ পড়েছে। পিচ্ছিল রাস্তায় গাড়ি চালাতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হতে হয়েছে অনেককে। দু’দফায় প্রবল তুষার ঝড়ে একেবারেই ভেঙে পড়েছিল টোকিওর যোগাযোগ ব্যবস্থা। ব্যাহত হয়েছিল স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। স্থানে স্থানে ঘর-বাড়ি রেলস্টেশন ও স্টেডিয়ামের ছাদ ভেঙে পড়ে, রাস্তাঘাটে বড় গাছের ডালপালা ভেঙে পড়ে ইত্যাদি নানা কারণে দু’দফায় সব মিলিয়ে প্রায় ৩০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। আহত  হয়েছে কয়েক হাজার লোকজন। বিগত দেড় যুগেও টোকিওতে এমন তুষারপাত হয়নি। সর্দিজ্বর, ইনফ্লুয়েঞ্জা ছড়িয়ে পড়েছিল চারদিকে। অবস্থার এখন কিছুটা উন্নতি হয়েছে। এবার দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়া যাক বাংলাদেশের দিকে। শুরু হয়েছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। প্রথম পর্বে ১৯শে ফেব্রুয়ারি ৯৭টি উপজেলায় ভোটগ্রহণ শেষ হলো। নির্বাচনকে ঘিরে জেলায় জেলায় ছিল টান টান উত্তেজনা ও উৎকণ্ঠা। ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। এ নির্বাচনে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে মাঠে ছিল সেনাবাহিনী। তাদের সঙ্গে ছিল র‌্যাব, বিজিবি, পুলিশ ও আনসার বাহিনী। কাগজে কলমে অরাজনৈতিক স্থানীয় সরকার নির্বাচন হলেও বাস্তবে জাতীয় নির্বাচনের আমেজ পরিলক্ষিত হয়েছে। জানুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচনের পর দেশের মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছে। দুধের স্বাদ কিছুটা হলেও ঘোলে মিটিয়েছে। লড়াই হয়েছে তবে হাড্ডাহাড্ডি বলা যায় না। বিস্তারিত ফলাফল পাঠকের জানা। মান-সম্মান রক্ষার ভোটযুদ্ধে আপাতত বিএনপি-জামায়াত জোট বিজয়ী হয়েছে। সরকারি দল সমর্থিত প্রার্থীদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতিতেই ভোটকেন্দ্র দখল করে জালভোট প্রদান, ব্যালট বাক্স ছিনতাই ও ভোট কারচুপির অভিযোগ উঠেছে। সরকার সমর্থিত প্রার্থীদের বিরুদ্ধে বিএনপির ভোট জালিয়াতির অভিযোগ নির্বাচন কমিশন আমলে নেয়নি। সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেছেন ‘করিম রহিমের অভিযোগ চলবে না। সেলিমের অভিযোগ আমলে নেয়া হবে। নির্বাচন কমিশনের এমন দ্বৈত ভূমিকা অগ্রহণযোগ্য।’ ব্যাপক কারচুপির পরও এই ফলাফল। একেবারে ভরাডুবি। অদ্ভুত নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের তাণ্ডবের প্রতিবাদে ৯টি উপজেলায় স্থানীয়ভাবে নিরুত্তাপ হরতাল পালিত হয়েছে। নির্বাচন অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হলে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান আরও বাড়তে পারতো। সন্দেহ নেই।
অতীত নিয়ে খুব বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করতে নেই। বেশি দূর যাচ্ছি না। বিগত দু’বছরে আমাদের দেশে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনাবলী মনে করলে স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে নানা ছলচাতুরি ও কলাকৌশল। সাংবাদিক সাগর-রুনি হত্যার পর থেকে ঘটেছিল নানারকম লোমহর্ষক ঘটনা। গুলশানের কূটনীতিপাড়ায় খুন হয়েছিল সৌদি কূটনীতিক খালাফ আলী। মধ্যরাতে ঘটেছিল সাবেক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ৭০ লাখ টাকার অর্থ কেলেঙ্কারির চাঞ্চল্যকর ঘটনা। এরপর ঘটে ইলিয়াস আলীর গুমের ঘটনা। আগারগাঁও এলাকায় ঘটে ব্যাপক সাংবাদিক নির্যাতন। দিনদুপুরে সিএমএম কোর্ট সংলগ্ন এলাকায় পুলিশ ক্লাবের ভেতরে ঘটে তরুণীর শ্লীলতাহানির মতো ঘটনা। এরপর জাতীয় সংসদের সাবেক বিরোধী দলের চিফ হুইপের পা ও মাথা ভেঙে দেয়া পুলিশের পদোন্নতি হয়। মাসখানেক  সভা-সমাবেশে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সম্পর্কে চলে সরকারের মন্ত্রীদের মুখরোচক অশ্লীল কটূক্তি। এরপর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের একটি বক্তব্যকে বিকৃত করে জাতীয় সংসদে তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও অসম্মান করা হয়। ঘণ্টাব্যাপী তার বিরুদ্ধে চলে বিষোদগার। এরপর শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীরা ফটকাবাজ বলে বেফাঁস মন্তব্য করা হয়েছিল। একের পর এক ঘটেছিল এরকম হাজারও ঘটনা। এবারও অবস্থা অনেকটা অপরিবর্তিত। যথেষ্ট মিল রয়েছে। ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে গণতন্ত্রকে হত্যা করা। হবু বিশেষ দূতকে জোর করে হাসপাতালে বন্দি করে রাখা। সাবেক বিরোধীদলীয় প্রধানকে গৃহবন্দি করে রাখা। সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় প্রশাসন যন্ত্র ব্যবহার করে বিরোধীদলের ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচি লণ্ডভণ্ড করে দেয়া। অপহরণ-খুন, ক্রসফায়ার-এনকাউন্টার, গুম তথা বিচারবহির্ভূত রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ডকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া। আত্মরক্ষার নামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রলীগের অস্ত্রধারীরা বন্দুকযুদ্ধে লিপ্ত হওয়া। সাবেক বিরোধীদলের নেত্রীকে লেডি লাদেন বলে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করা। বিরোধীদলীয় নেত্রীর প্রবাসে অবস্থানরত ছেলেকে আল-কায়েদার বাংলাদেশী এজেন্ট বলে তাচ্ছিল্য করা। হেয় করা। প্রকাশ্য গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ‘ক্যাশ চাই ক্যাশ’ বলে বেফাঁস মন্তব্য করা। সর্বশেষে আল-কায়েদা প্রধান আয়মান আল জাওয়াহিরির কথিত অডিও বার্তাটি ইন্টারনেট ব্লগে ছড়িয়ে দেয়া ও এ সংক্রান্ত ভারতীয় সাংবাদিক সুবীর ভৌমিকের কাল্পনিক গাড়িবোমা তত্ত্ব আবিষ্কার করা। সব যেন একই সূত্রে গাঁথা। সুবীর ভৌমিক হয়তো সত্যিসত্যিই দক্ষিণ এশিয়ায় আগুন লাগিয়ে দিতে চাইছেন। প্রতিবেদন লেখার নামে দক্ষিণ এশিয়ায় হয়তো রক্তাক্ত সহিংসতার বীজ বপন করতে চাইছেন। তার কল্পিত বাংলাদেশের সঙ্গে বাস্তবতার তফাৎ অনেক। আগামী দিনগুলোতেও এভাবেই হয়তো ঘটতে থাকবে একের পর এক ঘটনা। সময়ের ব্যবধানে একই ছলচাতুরি ও কলাকৌশলের ভিন্ন রূপ দেখতে পাচ্ছি চোখের সামনে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদাকে জড়িয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার ছলচাতুরি বলা যায় ভেস্তে গেছে। নতুন বোতলে পুরনো মদ পরিবেশন করায় সবাই তা টের পেয়ে গেছে। প্রত্যাশিত সুফল বয়ে আনতে ব্যর্থ হয়েছে জঙ্গিবাদ কার্ড। দাম্ভিকতাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করেছে জনগণ। না বলেছে ভয়ভীতির অপসংস্কৃতিকে। অপহরণ, খুন, ক্রসফায়ার, গুম তথা বিচারবহির্ভূত রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে তারা। ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে গণতন্ত্র হত্যাকারী এক ব্যক্তির নিরঙ্কুশ তাণ্ডবের নীরব প্রতিবাদ জানিয়েছে। ব্যালটের মাধ্যমে তারা চলমান রাজনৈতিক অপসংস্কৃতিকে ধিক্কার জানিয়েছে।

২১শে ফেব্রুয়ারি ২০১৪, টোকিও

চাচার পাঁচালি- নব্য গণতন্ত্র by মাহবুব তালুকদার

Saturday, February 15, 2014

চাচা বললেন, ছাত্রলীগের মিডিয়া কানেকশন বিশেষ ভালো নয়। সে কারণে বারবার 
তাদের খেসারত দিতে হচ্ছে।
আমি বললাম, এ কথার অর্থ কী?
অর্থ খুব সোজা। মিডিয়া ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছে।
মিডিয়া তো রিপোর্ট করা ছাড়া আর কিছুই করছে না।
সেটাই বলতে চাচ্ছি। সেদিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের কয়েকজন সিনিয়র নেতার পিস্তল হাতে ছবি ছাপা হয়েছে। এ রকম একপেশে রিপোর্ট বা ছবি ছাপার নাম কী সাংবাদিকতা?
কিন্তু একপেশে রিপোর্ট হলো কীভাবে?
আরে ভাই! জামায়াতে ইসলামীর ক্যাডাররা যখন প্লাস্টিক বোমা ছোড়ে, তাদের কী কোনো ছবি আজ পর্যন্ত পত্রিকায় ছাপা হয়েছে? হয়নি। অথচ ছাত্রলীগের সোনার ছেলেরা যখন আত্মরক্ষার্থে পিস্তল হাতে নেয়, ফলাও করে সেটা ছাপা হয়, যা দুরভিসন্ধিমূলক।
চাচা কোনো বিষয়ে উত্তেজিত হয়ে গেলে আমাকে ভাই বলে সম্বোধন করেন। এটা নতুন কিছু নয়। আমি বললাম, ক’দিন আগে জাতীয় সংসদে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের ঢাকা মহানগরের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাজী সেলিম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলা প্রসঙ্গে বলেন, ‘শিবির রগ কাটে, ছাত্রলীগ কবজি কাটে, মাথা কাটে।’ এ কথার জবাবে ছাত্রলীগ লিখিতভাবে প্রতিবাদলিপিতে জানিয়েছে, হাজী সেলিম একজন ‘অশিক্ষিত’ ও ‘মূর্খ’ লোক। কিন্তু এটা কী হাজি সেলিমের কথার জবাব হলো?
ঠিকই বলেছে ওরা। চাচা জানালেন, ছাত্রলীগের ছেলেরা যেহেতু ছাত্র, সেহেতু তাদের চোখে ‘অশিক্ষিত’ ও ‘মূর্খ’ হাজী সেলিমের অপরাধ হচ্ছে ‘শিক্ষিত’ ও ‘বিদ্বান’ ছাত্রদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে মুখ খোলা। সংসদ সদস্য হয়েছেন বলে সংসদে দাঁড়িয়ে সমাজের শিক্ষিত অংশের বিরুদ্ধে গায়ে পড়ে মন্তব্য করা হাজী সেলিমের উচিত হয়নি। ছাত্রশিবির আর ছাত্রলীগ কি এক বিষয় হলো যে তাদের তুলনা করা হবে? ‘অশিক্ষিত’ আর ‘মূর্খ’ না হলে হাজী সেলিম এটা করতে পারতেন না।
আমি বললাম, চাচা! ছাত্রলীগ সম্পর্কে আরো অভিযোগ আছে। ক’দিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হল থেকে ৯৭ জন শিক্ষার্থীকে ছাত্রলীগ নেতারা বের করে দিয়েছে। ওই ৯৭ ছাত্রের অপরাধ হলো তাদের কাছে স্থানীয় ছাত্রলীগ বা আওয়ামী লীগের নেতাদের প্রত্যয়নপত্র নেই। তাদেরকে জানানো হয়েছে, তারা শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল না এবং ছাত্রলীগ করত- এ রকম প্রত্যয়নপত্র যার যার এলাকার আওয়ামী লীগ নেতার কাছ থেকে আনতে হবে। এটা কেমন কথা?
কী আশ্চর্য! এতে অভিযোগের কী আছে? চাচা ক্ষুব্ধস্বরে বললেন, ছাত্রলীগ স্বাধীনতার অতন্দ্র প্রহরী। বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তি যাতে আসন পেতে ঘাঁটি বানাতে না পারে, তা দেখা নিশ্চয়ই অন্যায় কিছু নয়। তাতে প্রয়োজনে ৯৭ জন কেন, ৯৭০ জনকে হলে থাকতে না দেয়ার অধিকার ছাত্রলীগের রয়েছে।
কিন্তু ছাত্রলীগ তো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত নয়। হলে স্থান পেতে ছাত্রদের যার যার এলাকার আওয়ামী লীগ নেতার প্রত্যয়নপত্রইবা আনতে হবে কেন?
তুমি ব্যাপারটা নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছ কেন? ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে সাহায্য করছে বলেই তাদের এটা করতে হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এককভাবে আবাসন সমস্যার সমাধান করতে পারছে না বলেই ছাত্রলীগ এ ব্যাপার হ্যান্ডেল করছে। ওরা যদি অন্যায় কিছু করত তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিশ্চয়ই তাতে বাধা দিতো। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কি কিছু বলেছে?
না। তারা তো ছাত্রলীগের পক্ষে।
তাহলেই বুঝতে পার, ছাত্রলীগ কোনো অন্যায় করছে না। তুমিও দেখছি হাজী সেলিম হয়ে গেলে।
চাচার কথায় আমি রীতিমতো বিচলিতবোধ করলাম। হাজী সেলিম ঢাকার একজন খ্যাতনামা রাজনীতিবিদ ও আওয়ামী লীগ নেতা। তিনি সংসদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হননি। আওয়ামী লীগের আরেক প্রখ্যাত নেতা ও আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দীনকে নির্বাচনে পরাজিত করে তিনি সংসদ সদস্য হয়েছেন। ভবিষ্যতে তিনি মন্ত্রীও হতে পারেন। যদি তাই হয়, তাহলে তিনি হবেন ছাত্রলীগের ভাষায় দেশের প্রথম ‘অশিক্ষিত’ ও ‘মূর্খ’ মন্ত্রী। তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে যা বলেছেন, আমি তা সমর্থন করিনি। তাহলে আমি তার সঙ্গে তুলনীয় হলাম কী করে?
আমি প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে বললাম, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ঘোষণা করেছেন, আগামী ২০১৯ সালের ২৮শে জানুয়ারির পূর্বে আগামী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। মেয়াদ শেষে বর্তমান সংবিধান অনুযায়ীই নির্বাচন হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
এটা নির্বাচনের ব্যাপারে আওয়ামী লীগের আন্তরিকতা ও স্বচ্ছতার প্রমাণ। চাচা বললেন, বিএনপি যাতে এ সময়ের মধ্যে নিজেদের তৈরি করে নিতে পারে, এজন্যই সৈয়দ আশরাফ সময়টি অগ্রিম জানিয়ে দিয়েছেন।
চাচা! নির্বাচন কী বিগত নির্বাচনের মতোই হবে?
অবশ্যই। চাচা বললেন, দু-একটি দেশ ছাড়া পৃথিবীর প্রায় সব দেশ আমাদের নির্বাচন মেনে নিয়েছে। সবাই বর্তমান নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছেন। তাছাড়া, বাংলাদেশের বিগত নির্বাচন একটা মডেল হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। ভবিষ্যতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এ মডেলটিকে গ্রহণ করবে। সুতরাং, সংবিধানের বাধ্যবাধকতা রক্ষা করে একই পদ্ধতিতে আগামী নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হবে।
কিন্তু এটা তো বিরোধী দলবিহীন নির্বাচন!
কেন? জাতীয় সংসদে বিরোধী দল তো আছে। বেগম রওশন এরশাদ বিরোধীদলীয় নেতা।
উনি কি সত্যি বিরোধীদলীয় নেতা?
তোমার এসব অহেতুক প্রশ্ন আমার ভালো লাগে না। বেগম রওশন এরশাদ একজন অসাধারণ রাজনীতিবিদ। তিনি একদিকে তার স্বামী হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কাছ থেকে দলের ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছেন, অন্যদিকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ক্ষমতার অংশীদার হিসেবে ভারসাম্য রক্ষা করছেন। দক্ষিণ এশিয়ায় এমন উদাহরণ আর এক পিস পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ।
আমি চুপ করে চাচার কথা শুনলাম। জাতীয় পার্টির অভ্যন্তরীণ ব্যাপারটা আমি ঠিক বুঝি না। গত নির্বাচনে এরশাদের নির্দেশে ১৮৬ জন প্রার্থী তাদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেন। বাকিরা নির্দেশ অমান্য করে নির্বাচন করেন। বর্তমান সংসদে জাতীয় পার্টির ৩৪ জন সদস্য রয়েছেন। এরশাদ নিজেও সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন। এরপর তাকে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত করা হয়। এজন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। অন্যদিকে তার স্ত্রী বেগম রওশন এরশাদ দলের যে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে স্বামীকে ক্ষমতাহীন করেছেন, তা ফিরে পেতে এরশাদ সমপ্রতি দলের নেতাকর্মীদের এক সম্মেলনে গান গেয়েছেন? ‘আয় খোকা আয়!’ তবে দলের ৩০ জন সংসদ সদস্য তার ডাকে সাড়া দেননি। আসলে দলের খোকারা বুঝতে পারছেন না কার কাছে যাবেন? ক্ষমতাবান রওশন এরশাদের কাছে, না ক্ষমতাহীন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কাছে?
আমি আবার প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে বললাম, চাচা! উপজেলা নির্বাচনে তো দেখছি রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন আছে, অথচ কাগজপত্রে সবই নির্দলীয়। নির্বাচনে একক প্রার্থী দেয়ার জন্য বিদ্রোহী প্রার্থীদের দল থেকে বহিষ্কারও করা হচ্ছে। ব্যাপারটা অদ্ভুত নয়?
তোমার কাছে তো সবই অদ্ভুত। তবে এ নির্বাচন আওয়ামী লীগের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
গুরুত্বপূর্ণ কেন?
বিএনপি তলে তলে এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে বলে। বর্তমান সরকারকে বিএনপি অবৈধ সরকার বলছে, আবার এ সরকারের অধীনে উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে। এটা কেমন নৈতিকতাবিরোধী কথা?
নির্বাচনে দলীয় প্রতীক নেই বলেই বোধহয়। আমি বললাম।
আওয়ামী লীগের উচিত ছিল এবারও কৌশল করে বিএনপিকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখা। চেষ্টাও করা হয়েছিল। তবে তা ব্যর্থ হয়েছে। এখন একটা ভিন্ন কৌশল দেখা যাচ্ছে।
কি কৌশল?
এবার উপজেলা নির্বাচনে জেলা প্রশাসক ও অন্যান্য প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ওপর বিশেষভাবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের ওপর তেমন আস্থা রাখা যায়নি বলেই এ ব্যবস্থা। চাচা বললেন।
এভাবে নির্বাচন করে কি গণতন্ত্র রক্ষিত হতে পারে?
গণতন্ত্রের তুমি বোঝটা কী? চাচা বিরক্তিস্বরে আমাকে বললেন, তুমি কি মনে করো নির্বাচনে কেবল দেশের মানুষেরা ভোট দেয়, বিদেশীরা কিছু করে না?
তা করে। বিগত জাতীয় নির্বাচনে ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের সচিব সুজাতা সিং সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছেন। জাতীয় পার্টি যাতে নির্বাচনে যায়, তার জন্য এরশাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিলেন তিনি।
কথাটা ফাঁস করা এরশাদের মোটেই উচিত হয়নি। চাচা গলার স্বর স্বাভাবিক করে বললেন, গণতন্ত্রের পুরোনো ধারণা এখন আর নেই। নির্বাচন ছাড়া কিংবা নামকা-ওয়াস্তে নির্বাচন করেও গণতন্ত্র রক্ষিত হতে পারে। এর নাম হচ্ছে নব্য গণতন্ত্র।
নব্য গণতন্ত্র!
আঁতকে উঠলে যে! এটা অবশ্য আইউব খানের মৌলিক গণতন্ত্র নয়। বর্তমান নব্য গণতন্ত্র সময়ের প্রয়োজনে ও সংবিধান রক্ষার্থে গণতন্ত্রের ভিন্নতর রূপ। এটা ওয়েস্ট মিনস্টার গণতন্ত্রের আদল থেকে আলাদা। এখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ নব্য গণতন্ত্রের বিকাশ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
সেটা কী রকম? আমি প্রশ্ন করলাম।
মিসরের দিকে তাকিয়ে দেখ। মিসরের সেনাপ্রধান ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফিল্ড মার্শাল আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি আগামী এপ্রিলে অনুষ্ঠেয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হচ্ছেন। ফিল্ড মার্শাল সিসি বিগত নির্বাচনে নির্বাচিত মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করে শাসনক্ষমতা দখল করেন ও মুরসিকে জেলে দেন। মিসরের এবারের নির্বাচনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ফিল্ড মার্শাল সিসিকে প্রকাশ্যে অগ্রিম সমর্থন দিয়েছেন। আমি শতভাগ গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, মিসরের আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ফিল্ড মার্শাল সিসি জয়যুক্ত হবেন।
কিন্তু এতে কি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে? আমি প্রশ্ন করলাম।
তুমি গণতন্ত্রের পুরোনো ধ্যানধারণার বিষয়টা ভুলে যাও। চাচা বিগলিত হাসি মুখে বললেন, নব্য গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় যে কোনো একটা নির্বাচন হলেই হলো। কিভাবে কী নির্বাচন হলো, তা নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা হবে না।

হাম-রুবেলার গণতন্ত্র by মাকসুদুল আলম

Friday, February 7, 2014

গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল বেঁচে থাকলে হয়তো নতুন করে গণতন্ত্রের সংজ্ঞা লিখতেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান পার্টির প্রথম প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন বেঁচে থাকলে হয়তো বাংলাদেশ সফরে এসে গণতন্ত্রের তালিম নিতেন। তাদের প্রবর্তিত গণতন্ত্রের সংজ্ঞা বাংলাদেশে অচল।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বা সমাজবিজ্ঞানীদের ধারণাপ্রসূত গণতন্ত্রের চর্চা আমাদের দেশে নেই। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম না। চাইলেও বিস্তারিত ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা নেই। পাঠ্যপুস্তকে জেনেছি গণতন্ত্র মানে জনগণের শাসন। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে দেখেছি গণতন্ত্র এমন একটি শাসনব্যবস্থা যেখানে রাষ্ট্রের বা কোন সংগঠনের ধনী-গরিব প্রত্যেক নাগরিকেরই নীতিনির্ধারণ করার ক্ষেত্রে বা জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়ে থাকে। গণতন্ত্রে খেলার মাঠ সবার জন্য সমান। পাকা-কাঁচা সবাই সমান খেলোয়াড়। এ শাসনব্যবস্থায় সবার অংশগ্রহণের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হয়ে থাকে। আমাদের নাগরিকদের বেলায় সেই অধিকার বা সুযোগ কোনটাই নেই। আমাদের দেশে যে গণতন্ত্রের চর্চা হয় তাতে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে জনগণের ভূমিকা নেই। অটো-এমপি নির্বাচিত হন। নির্বাচনের আগেই আসন ভাগাভাগি হয়ে যায়। ভোটারদের ভোট দেয়ারও প্রয়োজন পড়ে না। ফলাফল থাকে জানা। কে সরকার গঠন করবে তা-ও থাকে আগেভাগেই ঠিকঠাক। জনমতের তোয়াক্কা করার প্রয়োজন পড়ে না। জনপ্রতিনিধি সিলেকশনে এখানে অর্থ-বিত্ত, ক্যাডার-বাহিনীর আধিপত্য ও ক্ষমতার দাপট যোগ্যতার মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয় বললেও বাড়িয়ে বলা হবে না। সাবেক সামরিক শাসক ও জাতীয় পার্টির কোণঠাসা চেয়ারম্যানের মতে সংরক্ষিত আসনে টাকা-পয়সা ছাড়াও প্রয়োজন আবেদনময়ী চেহারা-সুরত, যা কিনা নারীদের প্রতি রীতিমতো বৈষম্যমূলক মন্তব্য। শিক্ষা-দীক্ষা, সততা, ন্যায়নীতি, রুচি, আভিজাত্য, সামাজিক মূল্যবোধ ও দেশপ্রেমের কদর নেই আমাদের গণতন্ত্রে। কে কত বড় গডফাদার, কে কত ভোট কিনতে পারবে বা অস্ত্রের মুখে কত ভোট সংগ্রহ করতে পারবে তা বিবেচিত হয় দলীয় মনোনয়নের বেলায়। এ ক্ষেত্রে সব দলই প্রায় একই নীতি অনুসরণ করে। ক্ষমতাসীন বা বিরোধী দল বলে কোন কথা নেই। ফলে আমাদের রাজনীতি এখন বিষবাষ্পে কলুষিত। তা এখন সওদাগরের হাতে। জনসেবার লেবাসে চলছে পেশিশক্তির মহড়া। জাল যার জলা তার। চাপাতি-ককটেল যার তালগাছ তার- চলছে এমন অবস্থা। আব্রাহাম লিঙ্কন তার বিখ্যাত গেটিসবার্গ বক্তৃতায় গণতন্ত্রকে সবার কাছে সহজভাবে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন। সবারই জানা। বলেছিলেন এটি ‘জনগণের দ্বারা জনগণের জন্য জনগণের শাসনব্যবস্থা’। আমাদের গণতন্ত্রের সঙ্গে এ সংজ্ঞার রয়েছে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। তাই বিভিন্ন সময় বক্তৃতা-বিবৃতিতে এ নিয়ে টিটকারিও করা হয়েছে। আমরা যে গণতন্ত্রের চর্চা করি তা হলো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকেন্দ্রিক। গণতন্ত্র এখানে ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি মাত্র। একবার গদিতে আসীন হলে ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত না হওয়া পর্যন্ত হালুয়া-রুটি খাওয়া। রাতারাতি সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার সবচেয়ে দ্রুততম উপায় এটি। রাতে পুঁটি মাছ চাষ করলে পরদিন সকালেই রুই-কাতলা ফলে। ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংক, বীমা, বিশ্ববিদ্যালয়, টেলিযোগাযোগ প্রযুক্তি, ইন্টারনেট গেইটওয়ে, রেডিও-টিভি চ্যানেলসহ যাবতীয় লাইসেন্স কুক্ষিগত করার মোক্ষম সময়। শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানি, সরকারি বাড়ি দখল, চাকর-বাকরদের জন্যও ঢাকায় প্লট-ফ্ল্যাটের ব্যবস্থা করার সুবর্ণ সুযোগ। আমাদের গণতন্ত্র মানে সাধারণ নাগরিকদের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলা। রাষ্ট্রীয় প্রশাসনকে দলীয় কাজে ব্যবহার করা। ভিন্নমতকে বুটের চাপায় পিষ্ট করা। ক্রসফায়ারের নামে নির্বিচারে সরাসরি গুলি করা। মানবাধিকারকে জাদুঘরে পাঠিয়ে দেয়া। রাষ্ট্রীয় নির্বাহী পদে থেকে খেয়াল-খুশিমতো আইনি ব্যাখা দেয়া। গণমাধ্যম নিপীড়নে বেপরোয়া হয়ে ওঠা। আমরা যে গণতন্ত্রের চর্চা করি তাতে জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের প্রয়োজন পড়ে না। অ্যারিস্টটল বা আব্রাহাম লিঙ্কনের গণতন্ত্রে ভাগবাটোয়ারার ভিত্তিতে সর্বদলীয় সরকার, ঐকমত্যের সরকার শব্দগুলোর প্রচলন ছিল না। তারা বেঁচে থাকলে অনন্ত এ শব্দগুলো তাদের নতুন করে রপ্ত করতে হতো। কাউকে গৃহবন্দি করে, কাউকে জোর করে অসুস্থ বানিয়ে হাসপাতালে বন্দি করে, কাউকে রাজনৈতিক মামলায় ফাঁসিয়ে, ডাণ্ডা মেরে ঠাণ্ডা করেও যে গণতন্ত্রের চর্চা হয় তা তাদের চাক্ষুষ দেখতে হতো। নিত্যনতুন অভিনব কৌশলে বালুভর্তি ট্রাকে ও জলকামান ব্যবহার করেও যে গণতন্ত্রের চর্চা হয় তা শিখতে হতো। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের চর্চাকৃত তথাকথিত গণতন্ত্র এখন হাসপাতালের আইসিইউ কক্ষে। এ গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখতে নিয়ম রক্ষার স্বার্থে ৫ই জানুয়ারি হাম-রুবেলার টিকা সফল হয়েছে দাবি করা হলেও বাস্তবে তা এখন মুমূর্ষু অবস্থায় আছে। যত দ্রুত সম্ভব সমঝোতার ভিত্তিতে সঠিক চিকিৎসা করা না হলে অকালেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে পারে এ শিশু গণতন্ত্র।
বালুভর্তি ট্রাক নয় এবার অস্ত্রভর্তি ট্রাক। গুলশানের ৭৯ নম্বর সড়কে ফেলানো দু’টি বা পাঁচটি নয়, বন্দর থেকে খালাস পাওয়া পুরো ১০ ট্রাক। বহুল আলোচিত চট্টগ্রামের ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকারের মন্ত্রীদের শাস্তি হওয়ায় মামলার পুনঃতদন্তের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। আদালতে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। জাতীয় সংসদে বলা হয়েছে, ‘এ অস্ত্র চোরাচালানের সঙ্গে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও হাওয়া ভবনের সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখা হবে। সব ষড়যন্ত্রের বিচার করা হবে। তদন্ত করে প্রমাণ মিললে সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।’ ভাল কথা। তবে এই হক কথাটি ছাত্রলীগের বেলায় প্রযোজ্য হলে হয়তো দেশবাসীর আস্থা অর্জন করা সম্ভব হতো। ছাত্রলীগের আত্মরক্ষার অধিকারের নমুনা এখন দেশবাসী টিভির খবরে ও পত্রপত্রিকায় দেখতে পাচ্ছে। এ ছাত্র সংগঠনের অস্ত্রধারীরা কিছু দিন পরপর দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ও রাস্তাঘাটে নামীদামি সব আধুনিক অস্ত্রের মহড়া দিয়ে থাকে। অস্ত্রধারীরা থাকে আইনের ঊর্ধ্বে। প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডের বিচার করেছি বলে মুখে ফেনা তোলা হলেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের অস্ত্রধারীদের একজন ছাড়া কাউকে ধরা হয়নি। মামলা হলেও আসামি করা হয়নি। একজনকে ধরতেও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মহল থেকে নির্দেশের প্রয়োজন পড়েছে। চট্টগ্রামের ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজিপি)-এর চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ বলেছেন, ‘চারদলীয় জোট সরকারের আমলে আটক হওয়া ১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালান মামলার দায় তৎকালীন সরকারকেই নিতে হলে আওয়ামী-লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি পিলখানায় ৫৭ জন সেনা অফিসারসহ নিহতদের হত্যাকাণ্ডের দায়ভার কে নেবে?’ এটিও হক কথা। সরকারের চলতি মেয়াদের শেষ নেই হুমকি-ধমকির। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের জরিপকারীদের তদন্তের দাবি করা হয়েছে। বলা হয়েছে, যে জরিপকারীদের কোন ধারণাই নেই কিভাবে জরিপ চালাতে হয়। হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে জরিপের ক্লাসে বহিরাগতদের অংশগ্রহণের কোন সুযোগ থাকলে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের জরিপকারীদের পাঠানোর ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানাচ্ছি। ওই মন্তব্যে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, কিছু পশ্চিমা দূতাবাস ও এ দু’টি পত্রিকা ‘মারাত্মক ভুল’ করেছে। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনকে কালিমালিপ্ত করতে চেয়েছিল তারা।
৫ই জানুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচনে মৌলভীবাজার-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে পরে সমাজকল্যাণমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েই নিজ এলাকায় মিষ্টি বিতরণ করেছেন সৈয়দ মহসীন আলী। শহরজুড়ে আনন্দ মিছিল করেছেন। মন্ত্রীর চেয়ারে বসেই সংবাদকর্মীর প্রশ্নের জবাবে ক্ষিপ্ত কণ্ঠে হুঙ্কার ছেড়ে বলেছেন, ‘হু ইজ বিএনপি? দিস ইজ মহসীন আলী। আমরা এদের (বিএনপিকে) ডেমোলিস (বিলুপ্ত) করে দেব।’ কিছুদিন পর নিজেই প্রায় ডেমোলিস হওয়ার মতো অবস্থা। প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে নিজের কাণ্ডজ্ঞানের যথোপযুক্ত পরিচয় দেন এ মন্ত্রী। সিলেট বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের জেএসসি ও পিএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে মঞ্চে বসেই ধূমপান করে দেশব্যাপী সমালোচিত হন এ মন্ত্রী। প্রকাশ্যে ধূমপান দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও মেধাবী শিক্ষার্থীদের সামনে বসেই ধূমপান করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন তিনি। নিজে সংবাদের শিরোনাম হয়ে উঠেন। অবস্থা বেগতিক দেখে পরে সংবাদ সম্মেলন করে প্রকাশ্যে ধূমপান করার জন্য ক্ষমা চান তিনি। সমাজকল্যাণমন্ত্রীর অসামাজিক কর্মকাণ্ডে হতভম্ব হয়ে সামাজিক যোগাযোগ ওয়েবসাইট ফেসবুকে অনেকে মহসীন আলীকে পরিবেশ বা স্বাস্থ্য বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন, যা পাঠকের হাসির খোরাক যুগিয়েছে মাত্র।

চাচার পাঁচালি- বাকশাল by মাহবুব তালুকদার

Wednesday, January 29, 2014

চাচা বললেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আসলেই ঝানু পলিটিশিয়ান। নির্বাচনটা তিনি করিয়েই ছাড়লেন।
আমি বললাম, অপারেশন সাকসেসফুল, বাট পেশেন্ট ইজ ডেড।

পেশেন্ট কোন বড় বিষয় নয়, বড় বিষয় হচ্ছে অপারেশন সাকসেসফুল হয়েছে কিনা! এক্ষেত্রে ডাক্তার  
হাসিনা শতভাগ সফল। চাচা আরও বললেন, এরপর তার কাজ হচ্ছে মৃতদেহে প্রাণ সঞ্চার করা।
সেটা কি করে সম্ভব?
শেখ হাসিনার জন্য সবকিছুই সম্ভব। চাচা উদ্দীপ্ত হয়ে জানালেন, দেখছো না বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন তাকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন যেভাবে পাশে দাঁড়িয়েছিল, সেভাবেই তারা পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। খালেদা জিয়া নির্বাচনে না আসার সমালোচনা পর্যন্ত করেছে রাশিয়া।
এটা আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হয়ে গেল না?
তারা তো সরকার বা রাষ্ট্রের বিপক্ষে কোন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেনি। বিরোধী দলের কি করা উচিত ছিল আর কি করা উচিত হয়নি বললে তা অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হয় কি করে? চাচা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বললেন, বলতে পারো বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচন বর্জন করে কি অর্জন করলেন?
একটা প্রহসনের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেই বা তিনি কি অর্জন করতেন?
শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে অংশ নিলে তিনি বিরোধীদলীয় নেত্রী তো হতে পারতেন। এখন তার আমও গেছে, ছালাও গেছে। আওয়ামী লীগ আগামী ২০৪১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবে। সে জন্যই তো তারা ২০৪১ সাল পর্যন্ত রূপকল্প ঘোষণা করেছে।
তাহলে কি দেশে আর কোন নির্বাচন হবে না?
নির্বাচন অবশ্যই হবে। এবারের নির্বাচনে একটা মডেল তৈরি হয়ে গেছে। আশা করি নির্বাচন কমিশন মডেলটির স্থায়ী রূপ দেবে। এই মডেল অনুসরণ করলেই আওয়ামী লীগের পোয়া বারো। ‘শেখ হাসিনার সরকার বারবার দরকার’ স্লোগানটি এখন জাতীয় স্লোগানে পরিণত হয়েছে।
চাচার কথাবার্তায় আমি রীতিমতো বিভ্রান্ত। আরও বিভ্রান্ত সরকারি দলের সিনিয়র নেতাদের কথাবার্তা শুনে। যেসব সরকারি নেতা ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনকে ‘সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা’ কিংবা ‘নিয়ম রক্ষার নির্বাচন’ বলে অভিহিত করেছেন, তারাই এখন বলছেন পাঁচ বছরের আগে আর কোন নির্বাচন নয়। নির্বাচন বিষয়ে সংলাপ হতে পারে পাঁচ বছর পরে। মাননীয় অর্থমন্ত্রী মুহিত সাহেব পর্যন্ত এমন স্ববিরোধী উক্তি করেছেন। তাহলে ব্যাপারটা কি দাঁড়ালো? আমি চাচাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি যে নির্বাচনের মডেলের কথা বলেছেন, তা কি রকম?
সব কথা তো প্রকাশ্যে বলা যায় না। চাচা রহস্যময় হাসি হাসলেন। বললেন, বাংলাদেশে যে নির্বাচন হয়েছে, তাতে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ব্যাপার ছিল, তা মানি। মেনিপুলেশনের ব্যাপার ছিল, তা-ও মানি। ভোটার সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে, এ কথা স্বীকার করতেও আপত্তি নেই। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা হলো, ইলেকশন হয়েছে কিনা। যে কোন মূল্যে ইলেকশন হওয়াই হচ্ছে এই মডেল।
আমি বললাম, কিন্তু ইলেকশন গ্রহণযোগ্য হয়েছে কিনা, সেটা কোন ব্যাপার নয়?
চাচা দু’চোখে অগ্ন্যুৎপাত সৃষ্টি করে আমার দিকে তাকালেন। সরোষে বললেন, কার কাছে গ্রহণযোগ্য? কে গ্রহণযোগ্যতার সার্টিফিকেট দেবে? বিদেশীরা? ইলেকশনের ব্যাপারে আমরা তাদের বয়কট করেছি।
তাহলে আপনি বলছেন, নির্বাচন যথাযোগ্য হয়েছে?
চাচা কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক করে বললেন, তোমার এই ‘যথাযোগ্য’ শব্দটা আমার খুব মনঃপূত হয়েছে। সত্যি বলতে কি, আমাদের যোগ্যতা অনুসারে এই নির্বাচন ‘যথাযোগ্য’ হয়েছে। খোদ আমেরিকা পর্যন্ত নবনির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়ন, বৃটিশ পার্লামেন্ট তো পুনরায় নির্বাচন দাবি করেছে।
যার বিয়ে তার মনে নেই, পাড়া-পড়শির ঘুম নেই। চাচা বললেন, বিদেশীদের দাবিনামা আস্তে আস্তে চাপা পড়ে যাবে। সবাই বুঝতে পেরেছে, দেশের মানুষ নির্বাচন মেনে নিয়েছে। যেসব দুষ্কৃতকারী নির্বাচন মেনে নেয়নি, সহিংসতার সৃষ্টি করেছে কিংবা উস্কানি দিয়েছে, তাদের পরিণতি তো চোখের সামনে দেখতেই পাচ্ছো। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এর মধ্যে দু’টি হার্ডল পার হলেন।
কি রকম?
প্রথমত তিনি নির্বাচনে জয়লাভ করলেন এবং কৌশলে বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখলেন। দ্বিতীয়ত তিনি বিএনপি থেকে জামায়াতকে বিচ্ছিন্ন করতে সফল হচ্ছেন এবং হয়েছেন।
কিন্তু জামায়াতকে তিনি নিষিদ্ধ করছেন না কেন? আমি বললাম।
নিষিদ্ধ করার দরকার কি? কাজ সুসিদ্ধ হলেই হলো। চাচা শান্তকণ্ঠে বললেন, একবারে নয়, জামায়াতকে ধীরে ধীরে নিশ্চিহ্ন করা হবে। বিএনপিও ধীরে ধীরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
বিএনপি নিশ্চিহ্ন হবে কিভাবে?
ওরা তো ইলেকশনেই আসতে পারবে না। এরপর যত ইলেকশন হবে, সংবিধান মেনে নিয়ে সবই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অধীনেই হতে হবে।
বিএনপি যদি তাতেই রাজি হয়ে যায়?
তখন নতুন কোন কৌশল করে ওদের বাদ দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
এ কথার অর্থ কি?
নির্বাচন কমিশন যেন সরকারের সাহায্য ছাড়াই বিএনপিকে বসিয়ে দেয়ার ক্ষমতা অর্জন করতে পারে!
চাচা! একটা বিষয় আমি ঠিক বুঝতে পারি না।
কি বিষয়?
নির্বাচনী প্রতীক ব্যবহারের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী অন্যান্য দলের সদস্যদের নৌকা প্রতীক ব্যবহার করার সম্মতি দিয়ে কমিশনে চিঠি দিয়েছেন। সে অনুযায়ী রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনুরা নৌকায় চড়ে বৈতরণী পার হলেন। কিন্তু এরশাদ যখন লাঙ্গল প্রতীক ব্যবহারের অনুমতি না দিতে নির্বাচন কমিশনে চিঠি দিলেন, তার চিঠি আমলেই নেয়া হলো না। এক যাত্রায় এমন পৃথক ফল হয় কি করে? আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
এটাই তো নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতার প্রমাণ। এরশাদের সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী জেনেই তা কমিশন আমলে নেয়নি।
কিন্তু এরশাদকেও লাঙ্গল প্রতীক নিয়েই নির্বাচনে জিতিয়ে আনা হলো। তিনি তো নির্বাচনই করতে চাননি।
এটা সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মহানুভবতা বলতে পারো। এরশাদ সাহেব নিজের ভালমন্দ বোঝার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন। আসলেই তিনি খুব অসুস্থ। সত্যি কথা হলো, তিনি একজন মানসিক রোগী।
এ কি কথা বলছেন আপনি?
ঠিকই বলছি। মানসিক রোগী না হলে কেউ নিজের মাথায় পিস্তল ধরে! পিস্তলের ভেতরে যদি গুলিভর্তি থাকতো তখন কি হতো? বারবার যার মুখের কথা ফসকে যায়, তার হাত ফসকে যাওয়াটা কি অস্বাভাবিক কিছু?
আমি কথা অন্যদিকে ঘুরিয়ে বললাম, চাচা! দেশের এ অবস্থা কি আপনি স্বাভাবিক মনে করছেন?
অবশ্যই স্বাভাবিক। এখনকার মন্ত্রিসভা আওয়ামী লীগের আগের মন্ত্রিসভাগুলোর চেয়ে অনেক বেশি পাকাপোক্ত। আমু তোফায়েল নাসিম- এরা সবাই তারকা রাজনীতিবিদ।
কিন্তু বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গেও তো কয়েকজন তারকা রাজনীতিবিদ ছিলেন।
খালেদা জিয়া কি রাজনীতি বোঝেন? মোটেই না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেই দিয়েছেন, খালেদা জিয়াকে তার ভুলের খেসারত দিতে হবে।
রাজনীতিতে কাকে কখন ভুলের খেসারত দিতে হয়, সেটা সময় বলে দেবে। তবে খালেদা জিয়ার ভুলটা কি?
তার তো সবটাই ভুল। তিনি জনগণের ভোটে সংসদ সদস্য হলেন, কিন্তু জনগণের কথা বলতে সংসদে বসলেন না। তিনি যাতে আদৌ সংসদ অভিমুখী না হতে পারেন, শেখ হাসিনা তার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তবে তুমি হয়তো বলবে, খালেদা জিয়া নির্বাচিত হয়েও যখন সংসদে যাননি, তার আর নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদে যাওয়ার দরকার কি?
আমি তা বলবো না। সংসদ বর্জন আর সংসদে যেতে না পারা এক কথা নয়। তবে বিরোধী দলবিহীন সংসদ গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়।
বিরোধী দলবিহীন কে বললো? বেগম রওশন এরশাদ এখন বিরোধী দল নেতা। তিনি সরকারের সঙ্গেও আছেন আবার বিরোধী দলেও আছেন। সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এটা এক বিরল দৃষ্টান্ত।
বিরল কথাটা বোধ হয় ঠিক হলো না। পৃথিবীতে এমন দৃষ্টান্ত আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।
তা বলতে পারো। এটা সাধারণ বিরোধী দল নয়, গঠনমূলক বিরোধী দল। দলের নেতারা বলেছেন, তারা কেবল গঠনমূলক বিষয়ে বক্তব্য রাখবেন। জাতীয় পার্টির মন্ত্রীরা সরকারের পক্ষেও যেমন আছেন, আছেন তেমন বিরোধী দলেও।
সংসদে হ্যাঁ কিংবা না ভোটের সময় তারা কোনদিকে ভোট দেবেন?
চাচা বললেন, তারা সরকারি দলের হয়ে সর্বদা হ্যাঁ ভোট দেবেন, আবার বিরোধী দল হিসেবে না ভোট দেবেন।
তাহলে কি তারা দু’বার ভোট দেবেন?
তা হতেই পারে। তবে এসব ভোটাভুটিতে সরকারি দল সর্বদাই জয়যুক্ত হবে। বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় পার্টি না ভোট দিলেও তাতে সিদ্ধান্তের কোন নড়চড় হবে না। ফলে কিছুই আসবে যাবে না।
দেশে তাহলে বাকশাল চালু হয়ে গেল না?
চাচা ভ্রু-কুঞ্চিত করে আমার দিকে তাকালেন। বললেন, বাকশালের ব্যাপারটা কিছু বোঝো তুমি? বাকশাল অর্থ বোঝো?
বললাম, বাকশাল হচ্ছে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা।
মোটেই না। বাকশাল হচ্ছে বহুদলীয় গণতন্ত্র। পঁচাত্তর সালে যে বাকশাল হয়েছিল, তা-ও একদলীয় ছিল না। বহুদলীয় গণতন্ত্রই ছিল তার রূপরেখা। বাকশাল হচ্ছে গণতন্ত্রের সর্বশেষ কথা। গণতন্ত্রের নির্যাসও বলতে পারো।
বলছেন কি চাচা!
ঠিকই বলছি। চাচা হাসিমুখে বললেন, শেখ হাসিনা বাকশাল কায়েম করতে চাইলে সমগ্র জাতি সাধুবাদ জানাবে। তিনি যদি বিএনপিকে তাতে যোগ দিতে বলেন, বিএনপি’র উচিত হবে অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে তাতে যোগদান করা। কথাটা পারলে খালেদা জিয়ার কানে পৌঁছে দিও।

হাজার বছরের বিখ্যাত: ভুবন ভোলানো ৭ নারী

Tuesday, January 28, 2014

হাজার বছর ধরে তারা বিখ্যাত। কোটি মানুষের মনে তারা ঠাঁই পেয়েছেন। নির্মাণ করেছেন নতুন ইতিহাস। যার যার অবস্থানে থেকে তারা পৃথিবীর মানুষকে আনন্দ দিয়েছেন। ঝড় তুলেছেন প্রেমিক মনে।
সে আবেদন যুগের পর যুগ টিকে আছে। এর মধ্য দিয়ে তারা লাভ করেছেন অমরত্ব। তাদের কেউ রাজনীতিক, কেউ গোয়েন্দা, সেক্স সিম্বল, কেউ বা সাংস্কৃতিক আইকন। এমন সাত আবেদনময়ীকে বাছাই করেছে হাফিংটন পোস্ট। তাতে বলা হয়েছে ওই সাত আবেদনময়ী হলেন ক্লিওপেট্রা, ক্যাথেরিন দ্য গ্রেট, ভায়োলেট গর্ডন-উডহাউজ, মাতাহারি, ওয়ালিস সিম্পসন, আনাইস নিন ও মেরিলিন মনরো।

ক্লিওপেট্রা: এক সময় জুলিয়াস সিজার ও মার্ক অ্যান্থনি ছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর সম্রাট। তাদের মনকে জয় করেছিলেন ক্লিওপেট্রা। জুলিয়াস সিজারের সঙ্গে তিনি যেভাবে সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন তার জন্য ক্লিওপেট্রাকে বেশি স্মরণ করা হয়। জুলিয়াস সিজারের ব্যক্তিগত চেম্বারে তিনি গোপনে ঢুকেছিলেন একটি কার্পেটের ভিতর নিজেকে লুকিয়ে। তারপর সেই কার্পেট থেকে সিজারের সামনে নিজের অবগুণ্ঠন খুলে দেন। তাদের জানাশোনা হয়।
মেরিলিন মনরো: বিশ শতাব্দীর সবচেয়ে জনপ্রিয় আবেদনময়ী মেরিলিন মনরো। তিনি মার্কিন তারকা অভিনেত্রী। তার রূপে মুগ্ধ হয়ে প্রেমে পড়েছেন বিশ্বের বাঘা বাঘা রাজনীতিকও। তার রূপের কাছে বশ্যতা স্বীকার করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি। তাদের প্রেমকাহিনী নিয়ে সারা বিশ্ব তোলপাড় হয়েছে। বলা হয়, প্রেমের ক্ষেত্রে এটি সর্বাধিক আলোচিত কাহিনী। ১৯৬২ সালে কেনেডির জন্মদিনে ‘হ্যাপি বার্থডে’ গানটি শুনিয়ে কেবল কণ্ঠের জাদুতেই তাকে জয় করে নিয়েছিলেন মনরো। সংক্ষিপ্ত সময়ের হলেও কিংবদন্তি এই তারকা অভিনেত্রী ও কেনেডির প্রেম ছিল অত্যন্ত গাঢ়। অ্যাথলে থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ, লেখক, বিজ্ঞাপননির্মাতাসহ নানা গুণী ব্যক্তিকেই বশ করেছিলেন তীব্র যৌন আবেদনময়ী মনরো। সেই সময়েই খোলামেলা পোশাক থেকে শুরু করে নানা ঘটনায় নিজেকে জড়িয়ে সব সময়ই আলোচনায় ছিলেন এবং অকপট যৌনতার প্রতীক হিসেবে আজও স্মরণীয় হয়ে আছেন তিনি। 
ক্যাথারিন দ্য গ্রেট: রাশিয়ার শাসন ক্ষমতায় এসেছিলেন এমন নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ও আবেদনময়ী হিসেবে পরিচিত রুশ সম্রাজ্ঞী ‘ক্যাথরিন দ্য গ্রেট’। জীবনের নানা পর্যায়ে বহু পুরুষের সঙ্গে তার প্রণয়-কাহিনী বিখ্যাত হয়ে আছে। ক্যাথারিন খুবই আবেগী ও প্রচণ্ড রোমান্টিক ছিলেন। এই সম্রাজ্ঞী ঠিক ততদিনই কোন পুরুষকে সঙ্গ দান করতেন, যতদিন তারা তাকে তৃপ্ত করতে পারতো। তার বিরাগভাজন হয়ে পড়লেই ওই প্রেমিককে বিতাড়িত করতেন। অবশ্য প্রণয়ের পুরস্কার হিসেবে ভূ-সম্পত্তি বা পদবি দিয়ে সম্মানেই বিদায় করা হতো ওই পুরুষদের।
ভায়োলেট গর্ডন-উডহাউস: আভিজাত্য ও সৌন্দর্যে পরিপাটি ভায়োলেট গর্ডন-উডহাউজ। তিনি ইংরেজ নারী। পিয়ানোর মতো বাদ্যযন্ত্র ‘হার্পসিকর্ড’ বাজাতেন তিনি। ভারতীয় পুরাণের পঞ্চপাণ্ডবের কাহিনীর মতো না হলেও ভায়োলেট তার চার স্বামীকে নিয়ে এক সংসার গড়েছিলেন তার কেবল একজন স্বামীই আইনত বৈধ হলেও একই ছাদের তলায় চার পুরুষকেই সুখী রাখতে পেরেছিলেন ভায়োলেট। কেবল একবারই নাকি ক্রিকেট খেলা নিয়ে ওই পঞ্চ নর-নারীর মধ্যে বিতর্ক হয়েছিল!
মাতা হারি: মাতাহারি উন্মাতাল ডাচ্‌ নর্তকী। নাচের মধ্যে পুরুষকে শিকার করার মতো একটি প্রবণতা থাকায় ১৯০০-এর দশকের শুরুতে তিনি প্যারিসকে যেন মাত করে দেন। এ জন্য তার ওপর নজর পড়ে অনেক পুরুষের। ফলে তারা তাকে রক্ষিতা হিসেবে ব্যবহার করে। এভাবে অনেক পুরুষের কাছে তিনি ব্যবহৃত হয়েছেন। এসব পুরুষের সফরসঙ্গী হয়ে ঘুরেছেন সারা ইউরোপে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তিনি তার দৈহিক গোপন আকর্ষণকে কাজে লাগান। শুরু করেন গুপ্তচরবৃত্তি। তার কোড নাম ছিল এইচ-২১। কিন্তু জার্মানি ও ফ্রান্স উভয় পক্ষের কাজ করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত ফরাসিদের হাতে তিনি ধরা পড়েন। তাকে অভিযুক্ত করা হয়। পরে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়।
ওয়ালিস সিম্পসন: যুক্তরাষ্ট্রের অভিজাত সমাজের সুন্দরী ওয়ালিস সিম্পসন পর পর তিন পুরুষকে বিয়ে করেন। এক রাজাকে সিংহাসন থেকে নামিয়ে এনেছিলেন। ১৯৩০ সালের দিকে যখন ইংল্যান্ডের যুবরাজ অষ্টম এডওয়ার্ডের সঙ্গে তার দেখা হয়, ততদিনেই নিজের দ্বিতীয় বিয়ে সম্পন্ন করেছিলেন সিম্পসন। দুই বছরের মাথায় তাদের প্রেম তুঙ্গে ওঠে। ১৯৩৬ সালের জানুয়ারিতে এই যুবরাজ সিংহাসনে আসীন হন। কিন্তু তা কেবল ছেড়ে আসার জন্যই। রাজা হয়ে দু’বার তালাক নেয়া এক আমেরিকান নারীকে বিয়ে করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। নিজেকে সিম্পসনের প্রেমে সমর্পণ করে ওই বছরই ভাই যুবরাজ ষষ্ঠ জর্জের কাছে সিংহাসন ছেড়ে দেন তিনি। উইন্ডসরের ডিউক ও ডাচ্‌েস হিসেবে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিয়েছিলেন তারা।
আনাইস নিন: স্প্যানিশ-কিউবান পিতা আর ফরাসি-ডেনিশ মায়ের সন্তান আনাইস নিন জন্মেছিলেন প্যারিসে। আটলান্টিকের ওপারে পাড়ি জমিয়ে একজন আমেরিকান লেখিকা হিসেবে খ্যাতিমান হয়ে ওঠেন এই সুন্দরী। বিখ্যাত লেখক হেনরি মিলারের সঙ্গে বোহেমিয়ান জীবনের অনেকটা সময় প্যারিসে কাটিয়েছেন তিনি। হাগ গুইলার ও রুপার্ট পোল নামে দুই পুরুষকে বিয়েও করেছিলেন আনাইস নিন। কিন্তু বোহেমিয়ান ও বহুগামী জীবনে অভ্যস্ত আনাইস দুই স্বামীর কারও ঘরেই বেশি দিন স্থির থাকতে পারেন নি। নিজের প্রেমিককুলকে নিয়ে নিউ ইয়র্ক থেকে ক্যালিফোর্নিয়ায় ঘুরে ফিরে লুকোচুরি খেলতে হয়েছে তাকে।

ঢাকায় ভিনদেশীদের অপরাধ জাল by নুরুজ্জামান লাবু

তারা ভিনদেশী নাগরিক। ঢাকায় অস্থায়ী আবাস। ব্যবসা বা ভ্রমণের কথা বলে আসা অনেক বিদেশী নাগরিক রাজধানী জুড়ে গড়ে তুলেছে অপরাধের জাল। প্রতারণা আর আইন ভঙ্গ করে অর্থ উপার্জনই তাদের টার্গেট।
কেউ তৈরি করছেন জাল মুদ্রা। স্বর্ণ চোরাচালান, আদম পাচার, মাদক ব্যবসা, অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা, জঙ্গি কার্যক্রমসহ নানা রকম অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে তারা। দেশের অভ্যন্তরে ভিনদেশীরা কি করছে এসব বিষয়ে কার্যকর কোন নজরদারি না থাকায় সহজেই অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছে তারা। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার তৎপরতায় এই অপরাধী চক্রের কেউ কেউ ধরা পড়লেও চক্রের বড় অংশটিই থেকে যাচ্ছে অধরা। গ্রেপ্তার হলেও মামলার দুর্বলতার কারণে ও আইনি ফাঁকফোকর গলে জেল থেকে সহজেই জামিনে বেরিয়ে আসে কেউ কেউ। জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও ডিবি’র যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, মাঝে মধ্যেই ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে ভিনদেশী অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। কিন্তু গ্রেপ্তারের পরপরই তারা ইংরেজি ভাষায় কথা বলা বন্ধ করে দেয়। ভাষাগত সমস্যার কারণে অপরাধ সংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় তথ্য উদ্ধার করা যায় না। তিনি বলেন, ভিনদেশী নাগরিকদের গ্রেপ্তারের পর তাদের নিজ নিজ দেশের দূতাবাসকে জানাতে হয়। এছাড়া, বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষেত্রেও সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। তবে ঢাকায় ভিনদেশী অপরাধীদের ওপর নিয়মিত গোয়েন্দা নজরদারি চলে। গত কয়েক বছরে শতাধিক ভিনদেশী অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
গোয়েন্দা সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজধানীর উত্তরা ও কূটনৈতিক এলাকা হিসেবে পরিচিত গুলশান, বনানী ও বারিধারা এলাকায় ভিনদেশী অপরাধীরা আস্তানা গেড়ে থাকে। বেশির ভাগই ঢাকায় প্রবেশ করে পর্যটক ভিসায়। কোন দেশ থেকে সরাসরি ভিসা সংগ্রহ করে আবার কোন কোন দেশের নাগরিকরা অন অ্যারাইভাল ভিসায় বাংলাদেশে প্রবেশ করে। বিদেশী ট্যুরিস্টদের সবসময় স্বাগত জানাতে বিদেশী নাগরিকদের সহজেই ভিসা দিয়ে দেয়া হয়। এই সুযোগে অপরাধী চক্র দেশে ঢুকে আস্তানা গেড়ে বসে। সূত্র জানায়, রাজধানী ঢাকা এমনিতেই অপরাধপ্রবণ ও ঘনবসতি এলাকা হওয়ায় ভিনদেশী অপরাধীরা সহজেই অপরাধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে পারে। তবে বেশির ভাগ অপরাধীরই এ দেশীয় এজেন্ট রয়েছে। দেশীয় এজেন্টরাই তাদের মূলত অপরাধ কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করে থাকে। ভিনদেশীদের অপরাধ কার্যক্রম নিয়ে অনুসন্ধান করা ডিবি’র একজন কর্মকর্তা জানান, নির্দিষ্ট কিছু অপরাধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকে ভিনদেশী অপরাধীরা। এর মধ্যে রয়েছে মুদ্রাপাচার ও জাল মুদ্রা তৈরি, আদম পাচার, জঙ্গি কার্যক্রম ও মাদক ব্যবসা। বিশেষ করে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা এসব কাজের সঙ্গে বেশি জড়িত। এসব দেশের মধ্যে ক্যামেরুন, নাইজেরিয়া, ঘানা, কঙ্গো, লিবিয়া, উগান্ডা, সুদান, আলজিরিয়া, তাঞ্জানিয়া উল্লেখযোগ্য। এছাড়া, প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমার ছাড়াও আফগানিস্তান, ইরাক, শ্রীলঙ্কার নাগরিকরাও এ দেশে বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত। ডিবি’র ওই কর্মকর্তা বলেন, পাকিস্তানের নাগরিকরা সাধারণত জঙ্গি ও মুদ্রা পাচার এবং জাল মুদ্রা তৈরির সঙ্গে জড়িত। পাকিস্তানের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে যোগাযোগ থাকায় ব্যবসার আড়ালে তারা ঢাকায় আসে। পরে দেশীয় এজেন্টদের মাধ্যমে তারা অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। এছাড়া, ভারতের নাগরিকরা বেশির ভাগই স্বর্ণ চোরাচালানসহ বিভিন্ন চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা আন্তর্জাতিক জাল ডলার তৈরি চক্র ও মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত। এছাড়া, অন্যান্য দেশের নাগরিকরা আদম পাচার করে বলে তিনি জানান। ওই কর্মকর্তা বলেন, কোন ভিনদেশী অপরাধীকে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসও আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে থাকে। এছাড়া, অনেকেই দেশে ঢুকেই তাদের পাসপোর্ট ফেলে দেয়। ফলে তাদের নিজ নিজ দেশে পুশব্যাকও করা যায় না। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, পোশাক শিল্প, বায়িং হাউস, আইটি ও টেলিকম সেক্টর, বিজ্ঞাপনী সংস্থা, রেস্টুরেন্ট এবং এনজিওসহ নানা ধরনের প্রতিষ্ঠানের ঢাল ব্যবহার করে তারা অপরাধ কর্মকাণ্ড করে থাকে। অনেকেই গার্মেন্ট শিল্পের ক্রেতা সেজেও বিভিন্ন গার্মেন্ট মালিকদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে।

সূত্র জানায়, ভিনদেশী অপরাধীরা এদেশে প্রবেশের আগেই প্রথমে তারা দেশীয় এজেন্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করে থাকে। দেশে প্রবেশ করে প্রথমে তারা নামীদামি আবাসিক হোটেলগুলোতে অবস্থান নেয়। পরে দেশীয় এজেন্টদের মাধ্যমে গুলশান, বনানী, বারিধারা কিংবা উত্তরা এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করে। এসব এলাকায় এমনিতেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় কর্মরত বিদেশী নাগরিকরা থাকেন বলে কেউ তাদের সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখে না। এছাড়া, ভিনদেশীদের সবাই সমীহ করে চলে বলে এই সুযোগ কাজে লাগায় তারা। দেশীয় এজেন্টদের মাধ্যমে তারা প্রতারণা ও আদম পাচারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। এছাড়া, দেশীয় এজেন্টদের মাধ্যমে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হাত করে মুদ্রা ও মাদক পাচার করে থাকে। শাহজালাল বিমানবন্দরকে তারা চোরাচালানের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করে।
র‌্যাবের গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা বিভিন্ন সময়ে দেশে এসে দেশীয় জঙ্গিদের সংগঠিত করে থাকে। তবে বর্তমানে জঙ্গিদের কার্যক্রম কিছুটা ঝিমিয়ে পড়েছে। বর্তমানে তথ্য-প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট অপরাধ চক্রের সদস্যরা ঢাকাকে নিরাপদ স্থান হিসেবে বেছে নিয়েছে। গত মাসে তারা উত্তরা এলাকা থেকে এমন একটি চক্রকে শনাক্ত করেছেন যারা দীর্ঘ দেড় বছর ধরে উত্তরায় একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়ে অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা করে আসছিল। ওই চক্রটির ভিওআইপি ব্যবসার পাশাপাশি ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতির আন্তর্জাতিক চক্রের সঙ্গেও যোগাযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে। র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এটিএম হাবিবুর রহমান জানান, ভিনদেশীদের অপরাধ কর্মকাণ্ড ঠেকাতে র‌্যাব সবসময় কড়া গোয়েন্দা নজরদারি করে থাকে। ঢাকায় বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রের সন্ধান পেয়েছে র‌্যাব। তাদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের জন্য অনুসন্ধান চলছে। তিনি জানান, গত কয়েক বছরে র‌্যাব বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকা সন্দেহে ৯১ জন বিদেশী নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে। এর মধ্যে গত বছরই গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৫৩ জনকে। গ্রেপ্তারকৃতদের বেশির ভাগই জঙ্গি, মাদক ও জাল মুদ্রা তৈরি ও পাচারের সঙ্গে জড়িত বলে তিনি জানান।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ট্যুরিস্ট ও অন্যান্য কাজের সঙ্গে যুক্ত বিদেশী নাগরিককে সার্বক্ষণিক নজরদারি করা হলেও বাংলাদেশে ভিনদেশীদের ওপর কার্যকর কোন নজরদারি নেই। ফলে ট্যুরিস্ট ভিসায় ভিনদেশী নাগরিকরা দেশে ঢুকে সহজেই নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। ভিসার মেয়াদ শেষ হলেও মাসের পর মাস দেশেই অবস্থান করছে। এমনকি ভিনদেশী অপরাধীরা জেল থেকে জামিনে বেরিয়ে আবারও অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। বিদেশী পর্যটক কিংবা বিভিন্ন উদ্দেশ্যে দেশে আসা নাগরিকদের নজরদারি করে থাকে পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি)। তাদের এক কর্মকর্তা জানান, প্রয়োজনীয় লোকবল না থাকায় বিদেশী নাগরিকদের যথাযথ নজরদারি করা যায় না।

ভাড়াটিয়া ঘাতকরাই খুন করে সোহানকে by ওয়েছ খছরু

Monday, January 27, 2014

ভাড়াটিয়া খুনিরাই কুয়ারপাড়ের ভিআইপি রুটে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করে কলেজ ছাত্র সোহান ইসলামকে। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে একই এলাকার পিচ্চি শাকিল, টাইগার জামাল, আমির,
টিপু ও গুলজারের ছোটভাই রিপন ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে তাকে খুন করে। আর এই খুনের খবর জানতো লামাবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই মনির। আগে থেকেই তার হাতে গুলজার ও কামাল পক্ষের লোকজন মোটা অঙ্কের টাকা তুলে দিয়েছিল এবং সুর চিৎকার শুনলেও পুলিশ যেন নীরব থাকে সে ব্যাপারে বলেও দেয়া হয়েছিল। গতকাল নিহত কলেজ ছাত্র সোহান ইসলামের পরিবারের একাধিক সদস্য এসব কথা বলছিলেন আর বিলাপ করছিলেন। এ ঘটনার পর নির্বাক হয়ে গেছে খুনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী নিহতের বোন নুশরাত জাহান স্বর্ণা। সোহানের বোন স্বর্ণা সিলেট নগরীর জিন্দাবাজারের অগ্রগামী সরকারি কিন্ডার স্কুলের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী। শনিবার বিকাল ৩টায় স্বর্ণাকে নিয়ে মোটরসাইকেল যোগে বাসায় ফিরছিল সোহান। কুয়ারপাড় পয়েন্টে পুলিশ ফাঁড়ির সামনে পিচ্ছি শাকিল, টিপু, আমির, টাইগার জামাল ও রিপন সোহানের মোটরসাইকেল থামায়। এ সময় তারা সোহানের কাছ থেকে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয় এবং তাকে মারধর করতে থাকে। এ দৃশ্য দেখে শিশু স্বর্ণা পার্শ্ববর্তী পুলিশ ফাঁড়িতে ঢুকে এক পুলিশ সদস্যের পায়ে ধরে ভাইকে বাঁচানোর আকুতি জানায়। এ সময় এক পুলিশ সদস্য তাকে লাথি দিয়ে ফেলে দেয় বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শী লোকজন। এই ফাঁকে খুনিরা নির্বিঘ্নে এলোপাতাড়ি কোপায় সোহানের শরীর। তার উরু ও পায়ে বেশ কয়েকবার আঘাত করা হয়। এতে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয় সোহানের। ঘটনার নেপথ্যে কাহিনীও তুচ্ছ। শুক্রবার বিকালে সোহানের সঙ্গে একই এলাকার কামালের কথাকাটাকাটি পরে হাতাহাতি হয়। এ ঘটনায় কামাল আহত হলে তাকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনার পর কামাল ও তার পক্ষের লোকজন বলে বেড়াতো তারা বদলা নেবে। নিহতের পরিবার জানান, তারা সোহানকে হত্যা করে এর বদলা নিয়েছে।

নেপথ্যে লিভটুগেদার by শর্মী চক্রবর্তী

Sunday, January 26, 2014

লিভটুগেদারের বলি হলো জহিরুল। ফোনে পরিচয় হয়েছিল লাভলী নামে এক তরুণীর সঙ্গে। পরিচয় থেকে গড়ে ওঠে বন্ধুত্ব। এ বন্ধুত্বই রূপ নেয় ভালবাসায়। শুরু হয় লিভটুগেদার।
স্ত্রী-সন্তান থাকা সত্ত্বেও ভালবাসার টানে সব  কিছু ভুলে জহিরুল এ সম্পর্ক চালিয়ে যান। সে সম্পর্কই কাল হলো তার। প্রেমিকা লাভলীর প্ররোচনায় আত্মহত্যা করে বসেন জহিরুল।
জানা গেছে, দীর্ঘদিন প্রেমের সম্পর্ক ছিল জহিরুল-লাভলীর। সবার অগোচরে গড়ে ওঠে এ সম্পর্ক। জহিরুল বিবাহিত ছিলেন। তার স্ত্রী-সন্তান আছে। অন্যদিকে লাভলীও বিবাহিতা। তারও সন্তান রয়েছে। স্বামী থাকেন ইতালিতে। স্বামীর অবর্তমানে এ সম্পর্কে জড়িয়ে যান তিনি। সম্পর্কের এক পর্যায়ে তারা একসঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। এ সিদ্ধান্ত থেকেই ৪-৫ মাস আগে যাত্রাবাড়ী কাউন্সিল রোডের বড়বাড়িতে সাবলেট ভাড়া নেন। নিজেদের পরিচয় দেন স্বামী-স্ত্রী হিসেবে। এখানে প্রায় সময়ই তারা দু’জনে একসঙ্গে কাটাতেন। জহিরুল লিভটুগেদারের পাশাপাশি স্ত্রী সাজু বেগমের সঙ্গেও সংসার করে আসছিলেন। কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার নাম করে যেতেন লাভলীর কাছে। সন্ধ্যা হলে ফিরে আসতেন বাসায়। এ কারণে জহিরুলের পরিবারের সদস্যরাও বিষয়টি বুঝতে পারেননি। এমনকি তার স্ত্রী-সন্তানের সঙ্গেও তার সম্পর্ক ভাল ছিল। কোন অভাব ছিল না তাদের পরিবারে।
গত শনিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত জহিরুল তার বড় ভাই শহিদুলের সঙ্গে ছিলেন। এরপরই ফোন এলে তিনি ছুটে যান লাভলীর বাসায়। সেখানে তাদের মধ্যে ঝগড়া হয়। পরে বিকাল সাড়ে ৫টায় শহিদুলের পরিবার জানতে পারে জহিরুল মারা গেছেন। তার পরিবারের দাবি, জহিরুল আত্মহত্যা করতে পারে না। তাকে হত্যা করা হয়েছে। তার বড় ভাই শহিদুল জানান, আমরা যাত্রাবাড়ীর শাহজালাল রোড এলাকায় দুই ভাই থাকি। তার স্ত্রী-সন্তান আছে। সুখের সংসার ছিল। এর মধ্যে জহিরুল কারও সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে যাবে- এমন কোন কথা আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। আর তাদের সংসারে এমন কোন ঝামেলাও ছিল না- যে কারণে সে আত্মহত্যা করতে পারে। তাকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় গতকাল জহিরুলের বড় ভাই শহীদুল বাদি হয়ে যাত্রাবাড়ী থানায় মামলা দায়ের করেন। এতে কথিত স্ত্রী লাভলীর বিরুদ্ধে আত্মহত্যার প্ররোচণার অভিযোগ আনা হয়েছে।
যাত্রাবাড়ী থানার উপপরিদর্শক মাহবুবুল আলম বলেন, তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন অনৈতিক সম্পর্ক ছিল। প্রাথমিক তদন্তে আমরা ধারণা করছি তারা লিভটুগেদার করতো। লাভলী দাবি করেছেন, তাদের বিয়ে হয়েছে। তবে আমরা এমন কোন কাগজ পাইনি। ঘটনার দিন বিকালে তাদের ঝগড়া হয়। লাভলী চেয়েছিল জহিরুল যেন তার স্ত্রী সাজু বেগমকে তালাক দেয়। কিন্তু জহিরুল সেটা চাচ্ছিল না। এ নিয়ে কোন ব্ল্যাকমেইলের শিকার হতে পারে সে। আমরা বিষয়টি আরও খতিয়ে দেখছি। তদন্ত পুরোপুরি শেষ হলেই এর আসল কারণ জানা যাবে।
এদিকে ঢামেক হাসপাতালে লাভলী জানান, সে জহিরুলের বিবাহিতা স্ত্রী। গত বছরের ১৩ই আগস্ট জহিরুল তাকে বিয়ে করেছে। বিয়ের কাবিননামাও আছে। ৪-৫ মাস ধরে যাত্রাবাড়ীর ৫ তলা বাসায় সাবলেট থাকেন। কয়েক দিন ধরে পারিবারিক কারণে তাদের ঝগড়া চলছিল। তার দাবি ছিল, প্রথম স্ত্রীকে ছেড়ে দিতে হবে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব হয়। গত শনিবার বিকালেও তাদের মধ্যে ঝগড়া হয়। রাগ করে তিনি নিচে নেমে আসেন। অপেক্ষায় ছিলেন স্বামী তাকে মোবাইল ফোনে কল দেবেন। কিন্তু কল না আসায় কিছুক্ষণ পর আবার বাসায় গিয়ে দেখেন জহিরুল গালায় ফাঁস দিয়েছেন। তারপর তিনি নিজেই স্বামী জহিরুলকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। হাসপাতালে লাভলী দুই ধরনের তথ্য দিলে পুলিশের সন্দেহ হয়। সে সময় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ তাকে আটক করে। এদিকে জহিরুলের পরিবারের দাবি, তারা লাভলীকে চেনেন না। তিনি তার স্ত্রীও নন। জহিরুলের ঠিকানা ডেমরার কোনাপাড়া। তাদের সন্দেহ, জহিরুলকে খুন করা হয়ে থাকতে পারে।


৯ মাসেও রানা প্লাজা নিয়ে স্বচ্ছ পরিসংখ্যান হয়নি

রানা প্লাজা দুর্ঘটনার ৯ মাসেও নিহত ও নিখোঁজের প্রকৃত পরিসংখ্যান বের করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে জানার জন্য আজ পর্যন্ত কোন ওয়েবসাইট বা ডাটাবেজ তৈরি হয়নি।
আর এতে আগামীতে নেয়া পদক্ষেপ বাস্তবায়নে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার পর সরকারি-বেসরকারি যেসব প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে, সেগুলোরও সঠিক প্রয়োগ হচ্ছে না। এ অবস্থায় রানা প্লাজা নিয়ে সার্বিক তথ্য বের করা জরুরি। গতকাল ব্র্যাক সেন্টার ইনে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) উদ্যোগে আয়োজিত আলোচনায় অংশ নেয়া প্যানেল আলোচকরা এসব কথা বলেন। এতে ‘রানা প্লাজা দুর্ঘটনা ও পরবর্তী পদক্ষেপসমূহ, প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের সর্বশেষ পরিস্থিতিবিষয়ক’ রিপোর্ট উপস্থাপন করেন ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। আলোচনা সভার সভাপতিত্ব করেন সিপিডি’র চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তাফিজুর রহমানের সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন শ্রম সচিব মিকাইল শিপার, ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, অধ্যাপক এমএম আকাশ, বিজিএমইএ’র সভাপতি আতিকুল ইসলাম, সাবেক সভাপতি টিপু মুন্সী, সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিসের (বিলস) যুগ্ম সচিব জাফরুল হাসান, বিকেএমইএ’র সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম ও ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক আলী আহমেদ খান প্রমুখ।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, রানা প্লাজা ধসের পরে নিহত-আহত শ্রমিকদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে কত টাকা জমা হয়েছে, কে কত টাকা দিয়েছেন, আর কাকে কত টাকা দেয়া হয়েছে তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। আমরা শেষ পর্যন্ত দেখবো শ্রমিকরা কত টাকা পেয়েছে। আর শ্রমিকদের দেখিয়ে কে কত টাকা নিয়েছে। কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকলে কোন প্রশ্ন উঠবে না। তিনি বলেন, রানা প্লাজায় দুর্ঘটনার ফলে সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু কাজের অগ্রগতি হয়নি। ব্যক্তি পর্যায়ে কিছু কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্ত সামগ্রিকভাবে উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এসব বিষয় সামনে রেখে দ্বিতীয় প্রজন্মের গার্মেন্ট শিল্প তৈরি করতে একটি জাতীয় পরিকল্পনা প্রণয়ন করা জরুরি বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ। ড. দেবপ্রিয় বলেন, এখন তিনটি বিষয়ের দিকে নজর দিতে হবে। প্রথমত, নিহত-আহত শ্রমিকদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণের বিষয়টি সমাধান করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দ্বিতীয় মেয়াদের কারখানাগুলো কিভাবে হবে তা ঠিক করা। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে দরকষাকষি করে কারখানায় কাজ নিতে হবে। অনেকেই ঋণ দেয়ার কথা বলেন। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদি অবকাঠামোগত উন্নয়নে ঋণ কিভাবে পাওয়া যাবে সেটা ঠিক করা দরকার। তিনি বলেন, একটা সমন্বয়ের অভাব ছিল রানাপ্লাজা উত্তর পরিস্থিতিতে। মানুষের নিহত ও নিখোঁজের বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়। তিনি আরও বলেন, দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো সৃষ্টিতে কিভাবে ঋণ পাওয়া যায় তা নিয়ে চিন্তা করা উচিত। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এটি করতে হবে। ড. দেবপ্রিয় বলেন, স্বচ্ছতার বিষয়টি শেষ পর্যন্ত নিষ্পত্তি হতে হবে। ডিএনএ টেস্টে কাদের পরিচয় মিললো তা-ও প্রকাশিত হয়নি।
বিজিএমইএ’র সভাপতি আতিকুল ইসলাম বলেন, যে সব শ্রমিক ক্ষতিপূরণ পায়নি তাদেরকেও ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে। এতিম শিশুদের শিক্ষা, খাদ্য, চিকিৎসাসহ সব ধরনের সহায়তা দেয়া হবে। ৩০০ জন এতিম শিশুর দায়িত্ব বিজিএমইএ নেবে বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, উত্তর আমেরিকান ক্রেতাদের জোট (অ্যাকর্ড) ও ইউরোপীয় ক্রেতাদের জোট (অ্যালায়েন্স) যে শর্ত দিচ্ছে তাতে দেশের কোন কারখানাই থাকবে না। তারা বলছে, নিচে দোকান ও উপরে কারখানা থাকলে কারখানা বন্ধ করে দিতে হবে। এভাবে করলে পুরো পোশাকখাত লণ্ডভণ্ড হয়ে যাবে। তারা আর্থিক সহযোগিতা করার কথা বললেও এক টাকাও দেয়নি। জাইকা একটি ফান্ড দেয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু তাদের চাহিদা পূরণ করে ফান্ড পাওয়া সম্ভব নয়। তিনি বলেন, গার্মেন্ট শিল্পে রাজনীতি ঢুকে গেছে। এ শিল্পকে ধ্বংস করতে উঠে পড়ে লেগেছে একটি চক্র। ২১ বিলিয়ন রপ্তানির এ খাত অনেকেই সহ্য করতে পারছে না। আমরা বিশ্বের দ্বিতীয় স্থানে এটাই আমাদের দোষ।
টিপু মুন্সি বলেন, নিহত-আহত শ্রমিকদের সহায়তার মনিটরিং সেল গঠন করা প্রয়োজন। যাতে সবাই সমান ভাবে ক্ষতিপূরণ পায়। তিনি সিপিডি’র উদ্দেশে বলেন, শুধু নেতিবাচক মনোভাব নিয়ে কথা বললে সামনের দিকে এগোনো সম্ভব হবে না। সবাইকে মিলেই তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে।
জাফরুল হাসান বলেন, শ্রম আইনে ভাল-মন্দ দুই দিকই আছে। ২০০৬ সালের শ্রম আইনের অনেক কিছুই সংশোধন করতে হবে। যে করেই হোক আমাদেরকে গার্মেন্ট শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হবে। রানাপ্লাজা ও তাজরীনের মতো আর কোন ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।
শ্রমিক নেতা বাবুল আকতার বলেন, রানা প্লাজায় যারা কাজ করেছেন তারা এখন কোন গার্মেন্টে কাজ করতে চান না। তাদেরকে অন্য চাকরির ব্যবস্থা করতে হবে। শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির কথা এলেই বলে কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু কোন কারখানাই বন্ধ হয়নি। মালিকদের মানসিকতা পরিবর্তন হলে সবকিছু সম্ভব হবে। নয়তো কোন কিছুই সম্ভব নয়।
অনুষ্ঠানে রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় নিহত মোজাম্মেল হকের স্ত্রী কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, রানা প্লাজার তিন তলায় নিউ বটনে কাজ করতো তার স্বামী। তাকে কবর দেয়ার পরে এ পর্যন্ত বিকাশের মাধ্যমে মাত্র ২০ হাজার টাকা পেয়েছি। এরপর আর কেউ কোন খোঁজখবর নেয়নি। ঘরে এখন বাতি জ্বলে না। টাকার অভাবে ছোট মেয়ের বই কিনতে পারি না। মেয়ের স্কুলে যাওয়া বন্ধ।
বেঁচে যাওয়া আরেক শ্রমিক মরিয়ম বলেন, আমাকে একটা কৃত্রিম হাত দেয়া হয়েছে। কিন্তু এটা দিয়ে কাজ করতে পারি না। কারণ এটা অনেক ভারি, ব্যবহার করলে খুব কষ্ট হয়, শরীরে যন্ত্রণা হয়।
রানা প্লাজার ওপর প্রতিবেদনে গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, দুর্ঘটনায় নিহত ও নিখোঁজের সংখ্যা নিয়ে একেকটি সংস্থা একেক ধরনের তথ্য দিয়েছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ-বিলস নিখোঁজের সংখ্যা জানাচ্ছে ৩৭৯ জন। অন্যদিকে রানা প্লাজা কো-অর্ডিনেশন সেল এই সংখ্যা ১৮৯ জন এবং সিপিডি’র মতে ৯৮ জন। প্রতিবেদনে তিনি বলেন, দুর্ঘটনার সময় ভবনটিতে কর্মরত মানুষের সংখ্যা নিয়েও রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য। বিজিএমইএ-অ্যাকশন এইড-এর রিপোর্ট বলছে ৩৫৭২ জন, সিপিডি ৩৬৭০, বিলস ৩৯৪৮ আর কো-অর্ডিনেশন সেল ৩৮৪৮ জন। দুর্ঘটনার নয় মাসেও নিহত ও নিখোঁজের প্রকৃত সংখ্যা বের করতে না পারা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং এ কারণেই পরবর্তী পদক্ষেপ বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানান গোলাম মোয়াজ্জেম। প্রতিবেদনে আরও বলেন, দুর্ঘটনায় আহতদের যারা পরে কাজে যোগ দিয়েছেন তাদের কেউই কাজের জন্য পুরোমাত্রায় সক্ষম নন। এতে তাদের আয় কমেছে। গার্মেন্ট খাতে স্বাভাবিক আয়ের তুলনায় ৬০ শতাংশ কম আয় করছেন এই শ্রমিকরা।

বর্তমান সরকার ৫ নম্বর পেয়েও বিজয়ী: বি. চৌধুরী

Tuesday, January 21, 2014

বর্তমান সরকার ৫ শতাংশ নম্বর পেয়ে বিজয়ী বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বিকল্পধারা সভাপতি প্রফেসর ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। বলেছেন, এখন যারা ক্ষমতায় আছে- তারাই খেলোয়াড়, তারাই রেফারি, তারাই সব।
শতকরা ৫ মার্ক পেয়ে ফেল করা ব্যক্তিরাই এখন পাস। তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে ৫ শতাংশ নম্বর পেয়ে আওয়ামী লীগ এখন ক্ষমতায়। বিরোধী দলকে (জাতীয় পার্টি) সঙ্গে নিয়ে একটি জগাখিচুড়ি মার্কা মন্ত্রিপরিষদ গঠন করা হয়েছে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৭৮তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ আয়োজিত ‘গণতন্ত্র ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন। বি. চৌধুরী বলেন, শতকরা পাঁচ শতাংশ নম্বর পেয়ে কেউ পরীক্ষায়ও পাস করতে পারে না। তাই আওয়ামী লীগও পাঁচ শতাংশ ভোটে সরকার গঠন করতে পারে না। যারা ৯৫ শতাংশ মানুষের ভোটের অধিকার হরণ করেছে তাদের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যারা দেশকে ভালোবাসে তারা ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করে না। আপনারা গণতন্ত্রের জন্য, শিক্ষার উন্নয়নের জন্য, খাদ্যে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য রাজনীতি করুন। আমরা বাংলাদেশের গর্বিত নাগরিক হয়ে থাকব। অন্য কোন দেশের দাসত্ব মেনে নেব না। আমাদের ইতিহাস অন্যান্য দেশ থেকে সমৃদ্ধ। আমাদের ইতিহাস গর্বিত। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমাদের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। সাবেক এ প্রেসিডেন্ট বলেন, মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করাই জিয়াউর রহমানের একমাত্র ক্রেডিট ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের পর যখন দেশের গণতন্ত্র নিহত হয়েছিল তখন গণতন্ত্রকে জীবন দিয়েছিলেন। মহিলা বিষয়ক, শিশু বিষয়ক, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক ও ধর্ম মন্ত্রণালয় গঠন করেছেন। জিয়াউর রহমান ছিলেন দূরদর্শী ও তীক্ষ্ম বুদ্ধিসম্পন্ন রাজনীতিক। যখন বলা হয় জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা দেননি তখন দেশের মানুষ লজ্জা পায়, ইতিহাস লজ্জা পায়। তবে যারা অপপ্রচার করছে তারা লজ্জা পায় না। বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক ও বিএফইউজের সভাপতি রুহুল আমীন গাজীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু, শওকত মাহমুদ, ড্যাবের সভাপতি এজেডএম জাহিদ হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য আফম ইউসুফ হায়দার, দৈনিক ইনকিলাব এর সহকারী সম্পাদক আবদুল আউয়াল ঠাকুর, ইউনিভার্সিটি টিচার্স এসোসিয়েশনের যুগ্ম মহাসচিব তাহমিনা আক্তার টপি, ডিইউজের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম প্রধান বক্তব্য দেন।

গণতন্ত্রের জন্য আরেকটা যুদ্ধ হতে পারে: শাহ মোয়াজ্জেম
এদিকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, আগুন নিয়ে নাড়াচাড়া করবেন না। ক্ষমতার লোভে আপনি দাবি না মানলে দেশ ভাগ হবে না তবে গণতন্ত্রের জন্য আরেকটা যুদ্ধ হতেই পারে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জন্মবাষির্কী উপলক্ষে জাতীয় প্রেস ক্লাবে জেড ফোর্স আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে শেখ হাসিনার অবদান প্রসঙ্গে শাহ মোয়াজ্জেম বলেন, আপনি কি ত্যাগ করেছেন? জাগপার সভাপতি সফিউল আলম প্রধান সন্ত্রাস প্রসঙ্গে বলেন, ১৮ দল সন্ত্রাস করেনি। সন্ত্রাস করেছে রাষ্ট্র-সরকার। জেড ফোর্সের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর সিকদারের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় বিএনপি নেতা এটিএম মোশারফ হোসেন ও ছড়াকার আবু সালেহ বক্তব্য দেন।

মীমের আর্তনাদ কেন বেঁচে গেলাম? by শর্মী চক্রবর্তী

Sunday, January 5, 2014

তন্ময় নেই, ভাবতেই পারছি না। আমরা তো একসঙ্গে মরতে গিয়েছিলাম, আমি কেন বেঁচে গেলাম। আমি তন্ময়কে চাই বলেই চিৎকার করে কেঁদে ওঠেন মীম।
আমাকে একদিন না দেখতে পারলে তন্ময় পাগল হয়ে যেতো। স্কুল না থাকলে প্রায়ই সে আমার বাসার কাছে এসে দাঁড়িয়ে থাকতো একনজর দেখার জন্য। জানালার পাশে আমিও দাঁড়িয়ে থাকতাম তাকে দেখার জন্য। এসব আমি এখন কিভাবে ভুলবো। আমিও তন্ময়ের কাছে চলে যেতে চাই। আমরা ওয়াদা করেছিলাম, বাঁচতে হলে দু’জন একসঙ্গে বাঁচবো, মরলেও দু’জন একসঙ্গে মরবো। এজন্যই আমরা একসঙ্গে মরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কেন আমি বাঁচলাম? তন্ময় আমাকে রেখে একাই কেন চলে গেল না ফেরার দেশে?’

শুক্রবার বাড্ডা থানায় বসে এভাবেই আর্তনাদ করছিল শেহরীনা রহমান মীম। এর আগে ভোরে হাতিরঝিলের রামপুরা অংশের প্রথম ব্রিজ থেকে প্রেমিক তন্ময়ের হাত ধরে আত্মহত্যার জন্য ঝাঁপ দিয়েছিল দু’জন। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে মীম বেঁচে যায়। স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে। চোখের সামনেই পানিতে ডুবে মারা যায় তন্ময়। পুলিশ মীমকে আত্মহত্যা চেষ্টা ও আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে আদালতে পাঠায়। আদালত তাকে গাজীপুরের কিশোরী সংশোধনাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়।
মীম বলে, আমাকে জোর করে বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছিল বাবা-মা। মা অসুস্থ থাকায় আমি কিছু বলিনি। নীরবে মেনে নিয়েছি তাদের সকল কথা। তবে আমার মনে সবসময় তন্ময়ই ছিল। তবে মীমের মা শাহীনা আক্তার বলেন, আমি জানতাম না আমার মেয়ের কারও সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। কখন বুঝতেও পারিনি এমন কোন সম্পর্কের কথা। আমার একটাই কথা যদি তাদের মধ্যে এমন কিছু থাকতো তাহলে সে আমাকে খুলে বলতো। আমি বিষয়টি দেখতাম। কিন্তু সে এমন কিছু করেনি। আমি তার জন্য ছেলে দেখেছি, সে কোন আপত্তিও করেনি। কাবিনও করেছে নিজ ইচ্ছায়। এত কিছুর পর আমি কি করে বলবো আমার মেয়ের তন্ময়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। কিছু না জানতে পেরে আমরা বিয়ের প্রস্তুতিও নিয়েছি।  বিয়ের প্রস্তুতিও শেষ করেছি। এখন আমি কিভাবে সবাইকে মুখ দেখাবো?
মেয়ের এই ঘটনার পর অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী শাহিনা। বারবার মীমের নাম নিয়ে বিলাপ করছেন। তিনি বলেন, মীম আমাকে বলে মা আমি খালার বাসা থেকে মোবাইলে গান লোড করে আসি। এই বলে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। এরপর সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে সে আর ঘরে আসছে না। তাই আমি নিজেই আমার বোনের বাসায় গিয়ে দেখি সেখানে মীম নেই। তারা জানায়, মীম তাদের বাসায় যায়নি। তখনও আমি জানি না মীম তন্ময়ের সঙ্গে গেছে। তখন তার বান্ধবীদের কাছে ফোন দিলাম তারাও কিছু বলতে পারলো না। তখন আমি তার স্কুলের শিক্ষকের কাছে  ফোন দিলে তিনি আমাকে তন্ময়ের মায়ের নাম্বার দেন। তখন জানতে পারি তাদের ছেলেকেও পাওয়া যাচ্ছে না। এরপর থেকেই খোঁজাখুঁজি শুরু হয়। একপর্যায়ে তারা তন্ময়ের লাশ খুঁজে পায় হাতিরঝিল লেকে। আর মীমকে জীবিত পাওয়া যায়। এত কিছু হওয়ার পরও তন্ময়ের পরিবার দাবি করছে, আমরা তার ছেলেকে হত্যা করেছি। যদি হত্যা হয় তাহলে আমাদের মেয়ে তো আমাদের কাছে থাকার কথা। এসব কথার তো কোন মানে হয় না। আর তারা দু’জনেই তো চেয়েছিল আত্মহত্যা করতে। এর মধ্যে আল্লাহর রহমতে মীম বেঁচে গেছে। আর এখন সে দায়ী হয়ে গেল।
অন্যদিকে একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে পাগলপ্রায় তন্ময়ের পিতা একরামুল ইসলাম ও মা রোকসানা বেগম। গতকাল তাদের ইস্কাটনের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, ছেলেকে হারিয়ে বাবা-মা দু’জনই বিলাপ করছেন। যাকে সামনে পাচ্ছেন তাকেই জড়িয়ে ধরে বলছেন, তোমরা আমার ছেলেকে এনে দাও। আমি আমার ছেলেকে ছাড়া আর কিছু চাই না। পুরো পরিবারে বইছে শোকের ছায়া। একমাত্র ছেলেকে নিয়ে বাবা-মায়ের অনেক স্বপ্ন ছিল। কিন্তু সেই স্বপ্ন এভাবে শেষ হয়ে যাবে তারা ভাবতেই পারেননি। তন্ময়ের পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন, তন্ময়কে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এ জন্য তারা মামলার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন বলে জানালেন এক স্বজন। তবে বাড্ডা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এমএ জলিল বলেন, প্রাথমিক তদন্তে দু’জন প্রেম করে একসঙ্গে ঘর থেকে বের হয়েছিল বলে তারা নিশ্চিত হয়েছেন। পরে তারা একসঙ্গে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। এ জন্য হাতিরঝিলের ব্রিজ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে।
তিনি বলেন, আত্মহত্যার চেষ্টা ফৌজদারি অপরাধ। আর অন্যকে আত্মহত্যার প্ররোচনা করাটাও অপরাধ। এ জন্য মেয়েটির বিরুদ্ধে এ দু’টি অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় আদালত তাকে গাজীপুরের কিশোর সংশোধনাগারে পাঠিয়েছে।
 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. XNews2X - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু