নেপথ্যে লিভটুগেদার by শর্মী চক্রবর্তী

Sunday, January 26, 2014

লিভটুগেদারের বলি হলো জহিরুল। ফোনে পরিচয় হয়েছিল লাভলী নামে এক তরুণীর সঙ্গে। পরিচয় থেকে গড়ে ওঠে বন্ধুত্ব। এ বন্ধুত্বই রূপ নেয় ভালবাসায়। শুরু হয় লিভটুগেদার।
স্ত্রী-সন্তান থাকা সত্ত্বেও ভালবাসার টানে সব  কিছু ভুলে জহিরুল এ সম্পর্ক চালিয়ে যান। সে সম্পর্কই কাল হলো তার। প্রেমিকা লাভলীর প্ররোচনায় আত্মহত্যা করে বসেন জহিরুল।
জানা গেছে, দীর্ঘদিন প্রেমের সম্পর্ক ছিল জহিরুল-লাভলীর। সবার অগোচরে গড়ে ওঠে এ সম্পর্ক। জহিরুল বিবাহিত ছিলেন। তার স্ত্রী-সন্তান আছে। অন্যদিকে লাভলীও বিবাহিতা। তারও সন্তান রয়েছে। স্বামী থাকেন ইতালিতে। স্বামীর অবর্তমানে এ সম্পর্কে জড়িয়ে যান তিনি। সম্পর্কের এক পর্যায়ে তারা একসঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। এ সিদ্ধান্ত থেকেই ৪-৫ মাস আগে যাত্রাবাড়ী কাউন্সিল রোডের বড়বাড়িতে সাবলেট ভাড়া নেন। নিজেদের পরিচয় দেন স্বামী-স্ত্রী হিসেবে। এখানে প্রায় সময়ই তারা দু’জনে একসঙ্গে কাটাতেন। জহিরুল লিভটুগেদারের পাশাপাশি স্ত্রী সাজু বেগমের সঙ্গেও সংসার করে আসছিলেন। কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার নাম করে যেতেন লাভলীর কাছে। সন্ধ্যা হলে ফিরে আসতেন বাসায়। এ কারণে জহিরুলের পরিবারের সদস্যরাও বিষয়টি বুঝতে পারেননি। এমনকি তার স্ত্রী-সন্তানের সঙ্গেও তার সম্পর্ক ভাল ছিল। কোন অভাব ছিল না তাদের পরিবারে।
গত শনিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত জহিরুল তার বড় ভাই শহিদুলের সঙ্গে ছিলেন। এরপরই ফোন এলে তিনি ছুটে যান লাভলীর বাসায়। সেখানে তাদের মধ্যে ঝগড়া হয়। পরে বিকাল সাড়ে ৫টায় শহিদুলের পরিবার জানতে পারে জহিরুল মারা গেছেন। তার পরিবারের দাবি, জহিরুল আত্মহত্যা করতে পারে না। তাকে হত্যা করা হয়েছে। তার বড় ভাই শহিদুল জানান, আমরা যাত্রাবাড়ীর শাহজালাল রোড এলাকায় দুই ভাই থাকি। তার স্ত্রী-সন্তান আছে। সুখের সংসার ছিল। এর মধ্যে জহিরুল কারও সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে যাবে- এমন কোন কথা আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। আর তাদের সংসারে এমন কোন ঝামেলাও ছিল না- যে কারণে সে আত্মহত্যা করতে পারে। তাকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় গতকাল জহিরুলের বড় ভাই শহীদুল বাদি হয়ে যাত্রাবাড়ী থানায় মামলা দায়ের করেন। এতে কথিত স্ত্রী লাভলীর বিরুদ্ধে আত্মহত্যার প্ররোচণার অভিযোগ আনা হয়েছে।
যাত্রাবাড়ী থানার উপপরিদর্শক মাহবুবুল আলম বলেন, তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন অনৈতিক সম্পর্ক ছিল। প্রাথমিক তদন্তে আমরা ধারণা করছি তারা লিভটুগেদার করতো। লাভলী দাবি করেছেন, তাদের বিয়ে হয়েছে। তবে আমরা এমন কোন কাগজ পাইনি। ঘটনার দিন বিকালে তাদের ঝগড়া হয়। লাভলী চেয়েছিল জহিরুল যেন তার স্ত্রী সাজু বেগমকে তালাক দেয়। কিন্তু জহিরুল সেটা চাচ্ছিল না। এ নিয়ে কোন ব্ল্যাকমেইলের শিকার হতে পারে সে। আমরা বিষয়টি আরও খতিয়ে দেখছি। তদন্ত পুরোপুরি শেষ হলেই এর আসল কারণ জানা যাবে।
এদিকে ঢামেক হাসপাতালে লাভলী জানান, সে জহিরুলের বিবাহিতা স্ত্রী। গত বছরের ১৩ই আগস্ট জহিরুল তাকে বিয়ে করেছে। বিয়ের কাবিননামাও আছে। ৪-৫ মাস ধরে যাত্রাবাড়ীর ৫ তলা বাসায় সাবলেট থাকেন। কয়েক দিন ধরে পারিবারিক কারণে তাদের ঝগড়া চলছিল। তার দাবি ছিল, প্রথম স্ত্রীকে ছেড়ে দিতে হবে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব হয়। গত শনিবার বিকালেও তাদের মধ্যে ঝগড়া হয়। রাগ করে তিনি নিচে নেমে আসেন। অপেক্ষায় ছিলেন স্বামী তাকে মোবাইল ফোনে কল দেবেন। কিন্তু কল না আসায় কিছুক্ষণ পর আবার বাসায় গিয়ে দেখেন জহিরুল গালায় ফাঁস দিয়েছেন। তারপর তিনি নিজেই স্বামী জহিরুলকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। হাসপাতালে লাভলী দুই ধরনের তথ্য দিলে পুলিশের সন্দেহ হয়। সে সময় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ তাকে আটক করে। এদিকে জহিরুলের পরিবারের দাবি, তারা লাভলীকে চেনেন না। তিনি তার স্ত্রীও নন। জহিরুলের ঠিকানা ডেমরার কোনাপাড়া। তাদের সন্দেহ, জহিরুলকে খুন করা হয়ে থাকতে পারে।


সহিংসতার আগুন- ৫৬ দিন হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন রুবেল by শর্মী চক্রবর্তী

Tuesday, January 21, 2014

দীর্ঘ ৫৬ দিন ধরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে কাতরাচ্ছেন পেট্রল বোমায় আহত সিএনজিচালক রুবেল (৫০)। ২৫শে নভেম্বর আহত হয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। এখনও চিকিৎসা চলছে।
কবে বাড়ি ফিরতে পারবেন তার নিশ্চয়তা নেই। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকতে আর ভাল লাগে না। বাড়ি ফিরে যেতে চান। কিন্তু পুরোপুরি সুস্থ না হওয়ায় ডাক্তাররা ছাড়ছেন না। এখন পর্যন্ত ২০ ব্যাগ রক্ত দেয়া হয়েছে। আরও দিতে হবে। তার স্ত্রী নাছিমা বেগম বলেন, এই দুনিয়ায় আমার নিজের বলতে কেউ নেই। ছেলেমেয়েগুলো একা বাড়িতে পড়ে আছে। তার স্বামীও সন্তানদের কথা মনে করে কাঁদেন। তিনি বলেন, ডাক্তার বলেছেন আরও অন্তত মাস খানেক থাকতে হবে। অপারেশন করতে হবে। আমরা গরিব মানুষ। নিজের সহায় সম্পত্তি কিছুই নাই। এতদিন মানুষের সাহায্য নিয়ে চলেছি। আর কতদিন এভাবে থাকতে হবে জানি না। আমার স্বামীর কিছু হলে আমাদের সব কিছু শেষ হয়ে যাবে। রুবেলের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায়। পেট চালাতে অবরোধে বেরিয়ে ছিলেন সিএনজি নিয়ে। কচুয়ার চৌমুহনীতে শিকার হয়েছিলেন দুর্বৃত্তদের ছোড়া পেট্রল বোমায়।

শুধু রুবেলই নয়, তার মতো আরও অনেকেই এখনও কাতরাচ্ছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। তাদের আর্তনাদ যেন  থামছে না। হরতাল-অবরোধে পেট্রল বোমায় আহত হয়েছেন এমন ২০জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে আইসিইউতে ২জন, এইচডিইউতে ৭ জন, পেইং ওয়ার্ডে ৯ জন এবং কেবিনে আছেন দু’জন। পেইং ওয়ার্ডে আহত শাহাদাত (৩৫) আর্তনাদ করে বলেন, আমি আর যন্ত্রণা সইতে পারছি না। প্রচণ্ড  কষ্ট হচ্ছে। আমাকে একটু ওষুধ দিবেন- যাতে আমার যন্ত্রণা সেরে যায়? কেরানীগজ্ঞের ফল বিক্রি করতেন শাহাদত। সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে চোখের পানি ধরে রাখতে পারছিলেন না। বলেন, গত ৭ই ডিসেম্বর কেরানীগঞ্জের আলম মার্কেটের ফুটপাতে আমি ফল বিক্রি করছিলাম। হঠ্যৎ আমার সামনে একটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। এতে তার শরীরের প্রায় ৩৫ শতাংশ ঝলসে যায়। ককটেল বিস্ফোরণের কিছুক্ষণ আগে দোকানে ছেলে বসে ছিল। ছেলেকে বাসায় পাঠানোর পরপরই ককটেল বিস্ফোরিত হয়। শাহাদাত বলেন, সেদিন যদি ছেলেকে বাসায় না পাঠাতাম তাহলে তাকে হারাতে হতো। এক ছেলে আর তিন মেয়ে নিয়ে শাহাদাতের সংসার। পরিবারে উপার্জনক্ষম আর কেউ নেই। বলেন, আমার কিছু হলে ছেলেমেয়েগুলো কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? আমি ছাড়া তো তাদের আর কেউ নেই। বাবার এই কান্না দেখে পাশে চিৎকার করে কান্না শুরু করে এক বছরের ছোট্ট মেয়েটি।
পেশায় সিএনজি চালক রিপন (৩৫)-এর গ্রামের বাড়ি ফেনীতে। দুর্বৃত্তদের ছোড়া পেট্রল বোমায় আহত হয়ে গত ৭ই ডিসেম্বর তিনি ভর্তি হয়েছিলেন ঢাকা মেডিকেলে। শুধু আগুনে শরীরই পুড়ে যায়নি তার, হারিয়েছেন ডান চোখ। কিছুই দেখতে পান না সেই চোখ দিয়ে। বারবার একটা কথাই জানতে চাচ্ছিলেন তিনি, আমি কি আর এই চোখ দিয়ে দেখতে পারবো না? আমার চোখ কি কেউ ফিরিয়ে দিতে পারবেন না? আমি যদি দেখতে না পাই তবে আমার সংসার কিভাবে চালাবো? আমার তো আর কেউ নেই। বার্ন ইউনিটের চিকিৎসাধীন হরতাল-অবরোধের আগুনে পোড়ারা সবাই এখন ফিরে পেতে চান স্বাভাবিক জীবন। সুস্থ হয়ে ফিরে যেতে চান নিজ নিজ পরিবারের কাছে। চিকিৎসাধীন অন্যরা হলেন- চাঁপাই নবাবগঞ্জের ট্রাকচালক জামাতুল ইসলাম (২৭), রংপুরের সবজি ব্যবসায়ী লোকমান (৪৫), চট্টগ্রামের সিএনজিচালক খোরশেদ আলম (৫০), যশোরের কৃষক মেহের আলী (৬০), গাইবান্ধার পুলিশ কনস্টেবল আবুল কালাম (৪৫), চানখাঁপুলের কাজল (৩০), চট্টগ্রামের ট্রাকচালক আবু মিয়া (৪০), ট্রাকের হেলপার মো. বিল্টু (৩০), উত্তরার এডভোকেট উজ্জ্বল সরকার (২৭), বরিশালের মিশুকচালক সুলতান সরকার, ট্রাকচালক কামরুল ইসলাম (৩৪), ডিম বিক্রেতা মো. আবুল (৪০), এবি আবির (৪০), এসআই নুরুন্নবি (৫৫)। এদের চিকিৎসা এখনও চলছে। বাড়ি যাওয়ার জন্য উদ্বিগ্ন সবাই। এ ব্যাপারে বার্ন ইউনিটে আবাসিক সার্জন পার্থ শঙ্কর পাল বলেন, এদের মধ্যে অনেকেরই অবস্থা এখন ভাল। তবে তাদের বাড়ি ফিরতে একটু সময় লাগবে। তার কারণ প্লাস্টিক সার্জারি। এ অপারেশনটি না হওয়া পর্যন্ত আমরা তাদের ছাড়তে পারছি না। এ ছাড়া সুস্থ হতে সময় লাগার আরেকটি কারণ শীতে পোড়া ক্ষত শুকাতে সময় লাগছে। তবে আমরা আশা করছি কিছুদিনের মধ্যেই আমরা সবাইকে সুস্থ করে পাঠাতে পারবো।

মীমের আর্তনাদ কেন বেঁচে গেলাম? by শর্মী চক্রবর্তী

Sunday, January 5, 2014

তন্ময় নেই, ভাবতেই পারছি না। আমরা তো একসঙ্গে মরতে গিয়েছিলাম, আমি কেন বেঁচে গেলাম। আমি তন্ময়কে চাই বলেই চিৎকার করে কেঁদে ওঠেন মীম।
আমাকে একদিন না দেখতে পারলে তন্ময় পাগল হয়ে যেতো। স্কুল না থাকলে প্রায়ই সে আমার বাসার কাছে এসে দাঁড়িয়ে থাকতো একনজর দেখার জন্য। জানালার পাশে আমিও দাঁড়িয়ে থাকতাম তাকে দেখার জন্য। এসব আমি এখন কিভাবে ভুলবো। আমিও তন্ময়ের কাছে চলে যেতে চাই। আমরা ওয়াদা করেছিলাম, বাঁচতে হলে দু’জন একসঙ্গে বাঁচবো, মরলেও দু’জন একসঙ্গে মরবো। এজন্যই আমরা একসঙ্গে মরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কেন আমি বাঁচলাম? তন্ময় আমাকে রেখে একাই কেন চলে গেল না ফেরার দেশে?’

শুক্রবার বাড্ডা থানায় বসে এভাবেই আর্তনাদ করছিল শেহরীনা রহমান মীম। এর আগে ভোরে হাতিরঝিলের রামপুরা অংশের প্রথম ব্রিজ থেকে প্রেমিক তন্ময়ের হাত ধরে আত্মহত্যার জন্য ঝাঁপ দিয়েছিল দু’জন। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে মীম বেঁচে যায়। স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে। চোখের সামনেই পানিতে ডুবে মারা যায় তন্ময়। পুলিশ মীমকে আত্মহত্যা চেষ্টা ও আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে আদালতে পাঠায়। আদালত তাকে গাজীপুরের কিশোরী সংশোধনাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়।
মীম বলে, আমাকে জোর করে বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছিল বাবা-মা। মা অসুস্থ থাকায় আমি কিছু বলিনি। নীরবে মেনে নিয়েছি তাদের সকল কথা। তবে আমার মনে সবসময় তন্ময়ই ছিল। তবে মীমের মা শাহীনা আক্তার বলেন, আমি জানতাম না আমার মেয়ের কারও সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। কখন বুঝতেও পারিনি এমন কোন সম্পর্কের কথা। আমার একটাই কথা যদি তাদের মধ্যে এমন কিছু থাকতো তাহলে সে আমাকে খুলে বলতো। আমি বিষয়টি দেখতাম। কিন্তু সে এমন কিছু করেনি। আমি তার জন্য ছেলে দেখেছি, সে কোন আপত্তিও করেনি। কাবিনও করেছে নিজ ইচ্ছায়। এত কিছুর পর আমি কি করে বলবো আমার মেয়ের তন্ময়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। কিছু না জানতে পেরে আমরা বিয়ের প্রস্তুতিও নিয়েছি।  বিয়ের প্রস্তুতিও শেষ করেছি। এখন আমি কিভাবে সবাইকে মুখ দেখাবো?
মেয়ের এই ঘটনার পর অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী শাহিনা। বারবার মীমের নাম নিয়ে বিলাপ করছেন। তিনি বলেন, মীম আমাকে বলে মা আমি খালার বাসা থেকে মোবাইলে গান লোড করে আসি। এই বলে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। এরপর সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে সে আর ঘরে আসছে না। তাই আমি নিজেই আমার বোনের বাসায় গিয়ে দেখি সেখানে মীম নেই। তারা জানায়, মীম তাদের বাসায় যায়নি। তখনও আমি জানি না মীম তন্ময়ের সঙ্গে গেছে। তখন তার বান্ধবীদের কাছে ফোন দিলাম তারাও কিছু বলতে পারলো না। তখন আমি তার স্কুলের শিক্ষকের কাছে  ফোন দিলে তিনি আমাকে তন্ময়ের মায়ের নাম্বার দেন। তখন জানতে পারি তাদের ছেলেকেও পাওয়া যাচ্ছে না। এরপর থেকেই খোঁজাখুঁজি শুরু হয়। একপর্যায়ে তারা তন্ময়ের লাশ খুঁজে পায় হাতিরঝিল লেকে। আর মীমকে জীবিত পাওয়া যায়। এত কিছু হওয়ার পরও তন্ময়ের পরিবার দাবি করছে, আমরা তার ছেলেকে হত্যা করেছি। যদি হত্যা হয় তাহলে আমাদের মেয়ে তো আমাদের কাছে থাকার কথা। এসব কথার তো কোন মানে হয় না। আর তারা দু’জনেই তো চেয়েছিল আত্মহত্যা করতে। এর মধ্যে আল্লাহর রহমতে মীম বেঁচে গেছে। আর এখন সে দায়ী হয়ে গেল।
অন্যদিকে একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে পাগলপ্রায় তন্ময়ের পিতা একরামুল ইসলাম ও মা রোকসানা বেগম। গতকাল তাদের ইস্কাটনের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, ছেলেকে হারিয়ে বাবা-মা দু’জনই বিলাপ করছেন। যাকে সামনে পাচ্ছেন তাকেই জড়িয়ে ধরে বলছেন, তোমরা আমার ছেলেকে এনে দাও। আমি আমার ছেলেকে ছাড়া আর কিছু চাই না। পুরো পরিবারে বইছে শোকের ছায়া। একমাত্র ছেলেকে নিয়ে বাবা-মায়ের অনেক স্বপ্ন ছিল। কিন্তু সেই স্বপ্ন এভাবে শেষ হয়ে যাবে তারা ভাবতেই পারেননি। তন্ময়ের পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন, তন্ময়কে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এ জন্য তারা মামলার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন বলে জানালেন এক স্বজন। তবে বাড্ডা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এমএ জলিল বলেন, প্রাথমিক তদন্তে দু’জন প্রেম করে একসঙ্গে ঘর থেকে বের হয়েছিল বলে তারা নিশ্চিত হয়েছেন। পরে তারা একসঙ্গে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। এ জন্য হাতিরঝিলের ব্রিজ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে।
তিনি বলেন, আত্মহত্যার চেষ্টা ফৌজদারি অপরাধ। আর অন্যকে আত্মহত্যার প্ররোচনা করাটাও অপরাধ। এ জন্য মেয়েটির বিরুদ্ধে এ দু’টি অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় আদালত তাকে গাজীপুরের কিশোর সংশোধনাগারে পাঠিয়েছে।

মৃত্যুর নির্মমতায় থমকে গিয়েছিল গোটা বিশ্ব by শর্মী চক্রবর্তী

Wednesday, January 1, 2014

‘আমি ভাবি নাই বাঁচমু। বাঁচার জন্য পাগলের মতো করেছি। এদিকে ওদিকে খোঁজাখুঁজি করেছি। আওয়াজ দিছি। প্রথম কেউরে পাই নাই। হায়রে কি আর্তনাদ।
ও ভাই কেউ আছেন আমারে একটু বাঁচান না ভাই। আমার দু’পায়ের উপর ছিল দেয়ালের বিম। তার যে কি যন্ত্রণা। এখনো ভাবলে গা শিওরে উঠে। তখন ভাবছিলাম আর মনে হয় বাইর হইতে পারমু না, কেউ রে দেখতে পারমু না। তখন আল্লাহর কাছে মাপ চাইয়া নিছি। আল্লাহ আমার সব গোনাহ মাপ কইরা দিও আমার স্বামীরে ভালো রাইখো। তখন আল্লাহর দূত হইয়া আইসা আমারে এক উদ্ধারকর্মী ভাই উদ্ধার করছে। সে পর্যন্ত বিমের চাপায় আমার পা পচা শুরু হইছিল। ভবন ধসের ৪র্থ দিন আমারে সেখান থেকে উদ্ধার করা হয়। এখন কৃত্রিম পায়ের সাহায্যে চলছি। দুই পা হারাইয়া জীবন ফিরা পাইছি!’ এই ছিল জীবন নিয়ে ফিরে আসা রেবেকার কথা। শুধু রেবেকাই নন অনেক দরিদ্র শ্রমিক কেউ পা হারিয়ে, কেউ হাত হারিয়ে, কেউ অর্ধেক পঙ্গুত্ব নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে টিকে আছেন। হাজারো পরিবার এখনও স্বজনদের জন্য হাহাকার করছেন। ২৪শে এপ্রিল সকাল পৌনে ৯টা। অন্য আর দশটা দিনের মতোই শুরু হয়েছে নতুন আর একটা দিন। হঠাৎ বিকট শব্দে সাভারে ৯ তলা রানা প্লাজা ভবন ধসে পড়ে। প্রায় এক মিনিটের মধ্যে বহুতল ভবনটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। কিছু অংশ মাটির নিচে দেবে যায়। এসময় রানা প্লাজার আশপাশ ও সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকা কেঁপে ওঠে। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে পুরো এলাকা। আতঙ্কিত লোকজন দৌড়ে নিরাপদ স্থানে যেতে থাকেন। মৃত্যুর মিছিলে, স্বজনহারাদের আর্তনাদে, আহতদের আহাজারিতে শুধু সাভারই নয় সারা দেশ ছিল কষ্টে নিমজ্জিত। স্মরণকালের ভয়াবহ ভবন ধসের ধ্বংস বিভীষিকায় প্রাণ হারিয়েছে সহস্রাধিকের বেশি শ্রমিক। শুধু বাংলাদেশেই নয় বিশ্ব মিডিয়ায়ও ছিল এই আলোচনা। এবছর বিশ্বের শীর্ষ ১০ রিপোর্টের মধ্যে স্থান পেয়েছে সাভারের রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অসংখ্য রিপোর্টের ভেতর থেকে গুরুত্ব ও ভয়াবহতা বিচার করে বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিন শীর্ষ ১০টি রিপোর্টের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। এর ৭ম স্থানে অবস্থান করছে বাংলাদেশের রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি। বিবরণে বলা হয়, ২৪শে এপ্রিল বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার অদূরে রানা প্লাজা ভবনধস স্মরণকালের সব থেকে ভয়াবহ শিল্প দুর্ঘটনা। ভবন ধসে ১১০০’রও বেশি কর্মী প্রাণ হারান। বাংলাদেশে ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী গুরুত্বপূর্ণ গার্মেন্ট খাতে নিম্নমানের কর্মপরিবেশের বিষয়টি ভয়াবহ পন্থায় মনে করিয়ে দিয়েছে ওই দুর্ঘটনা। ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে শীর্ষ সব ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের জন্য পোশাক তৈরি করা কারখানাগুলোর কর্মপরিবেশ উন্নতিকল্পে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনা শুরু হয়। নভেম্বর মাসে ওয়াল-মার্ট, গ্যাপ এবং এইচঅ্যান্ডএম সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গঠিত গ্রুপ তাদের কর্মীদের জন্য আরও উন্নত মান নিশ্চিত করতে সম্মত হয়। তবে সার্বিক অগ্রগতি তেমন হয়নি। ওই ভবন ধসের পরেও বিচ্ছিন্ন কিছু গার্মেন্ট কারখানায় আগুনের ঘটনায় কমপক্ষে ১৮ জন মারা গেছে। বাংলাদেশের গার্মেন্ট খাতের কর্মীরা এখনও মজুরি বৃদ্ধির আবেদন করে যাচ্ছে। বিশ্বের মধ্যে দেশটির কর্মীরা সব থেকে নিম্ন মজুরি উপার্জন করে থাকে। টাইম ম্যাগাজিনের শীর্ষ ১০ রিপোর্টের ৭ নম্বরে এভাবেই উঠে আসে রানা প্লাজা ভবন ধসের ঘটনা। বিদায়ী বছরের  সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ছিল এটি। টানা এক মাস ধরে এই ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার হয়েছে জীবিত ও মৃত মানুষ। ১১২৭ জন নিহত হন ভবন ধসের ঘটনায়। ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয় ২৪৩৮ জন জীবিত মানুষ, ১২ জন উদ্ধারের পর হাসপাতালে মারা যান, ৮৩৬ মৃতদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়, ২৯১ অ-শনাক্ত মৃতদেহ জুরাইন কবরস্থানে দাফন, ৩১৬ জন নিখোঁজ ব্যক্তির তালিকা রয়েছে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে, ২২৩ জন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাদের অনেকেরই স্থান হয়েছিল সাভারের জাতীয় পক্ষাঘাত পুনর্বাসন কেন্দ্রে (সিআরপি)। অনেকে পরিবারের কাছে ফিরে গেলেও স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হচ্ছে। পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন অনেকে। ২৪শে এপ্রিল থেকে ১৪ই মে পর্যন্ত চলেছে উদ্ধার কাজ। টানা ২১ দিন উদ্ধারের পরও অনেকে ফিরে পায়নি তাদের স্বজনদের। নয় তলা ভবনের ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে ছিলো অনেকে। প্রথম দিন মধ্যরাত পর্যন্ত ১৩৫ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এদের ৮০ জনের পরিচয় নিশ্চিত করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে সহস্রাধিক মানুষকে। তাদের অনেকের অবস্থা ছিল গুরুতর। এদের অনেকের হাত ও পা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছিল বিচ্ছিন্ন। দিনে ভেতর থেকে তারা বাঁচার আকুতি জানালেও রাতে তাদের  সে আর্তনাদ ক্ষীণ হয়ে আসছিল। আগের দিন ভবনে ফাটল ধরা পড়ে। ফাটল ধরা পড়ার পর শিল্প পুলিশের পক্ষ থেকে কারখানাগুলো বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। ভবনটি ধসে পড়ার পরই দেখা যায় এক মর্মন্তুদ চিত্র। পিলার পড়ে কারও মাথা থেঁতলে পড়ে আছে। কারও পা টুকরা টুকরা হয়ে রডের সঙ্গে লেগে আছে। কারও শরীরের ওপর ছাদ পড়ে থেঁতলে  গেছে। রক্তে ভেসে গেছে মেঝ। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে বাঁচার আকুতি, কান্না আর মৃত্যু গোঙানি শুনে চোখের পানি ফেলেছেন উপস্থিত উদ্ধারকারীরাও।

ঘটনার পরপরই উদ্ধার কাজে ছুটে যান স্থানীয় লোকজন। একে একে বের করে আনেন নিহতদের নিথর দেহ। আহতদের রক্তাক্ত অবস্থায় বের করে  নেয়া হয় বিভিন্ন হাসপাতালে। উদ্ধারকাজে একে একে যোগ দেয় ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ফায়ার সার্ভিসের প্রশিক্ষিত  স্বেচ্ছাসেবীরাও অংশ নেন উদ্ধারকাজে। এছাড়াও সারা দেশ থেকে মানুষ ছুটে আসে উদ্ধারকাজে। সেখানে অনেকেই অনেককে চিনে না। কিন্তু প্রাণ রক্ষায় সবাই একত্রিত হয়ে কাজ করেছে। ছাত্রছাত্রীরাও ছুটে গেছে সেখানে। এছাড়া, বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠন এবং সাধারণ মানুষও ছুটে যায় সেখানে।  তবে পুরো ভবনটি ধসে পড়ায় এবং বিপজ্জনক অবস্থায় থাকায় উদ্ধারকাজে  বেগ পেতে হয়। অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি না থাকায় চাপা পড়া জীবিতদের উদ্ধার করতে অনেক সময় লেগে যায়। ধসে পড়ার সময় ৯ তলা ভবনের তিন, চার, পাঁচ, ছয়, সাত ও আট তলায় অবস্থিত ৬টি ফ্লোরে শ্রমিকরা কাজ করছিলেন। এছাড়া, প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় মার্কেট ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় ছিল। সব মিলিয়ে ওই ভবনে ৪/৫ হাজার লোক ছিলেন। এদের বেশির ভাগই ভবন  থেকে বের হতে পারেননি। ভবনধসের এ ঘটনা বিশ্বে বড় ধরনের একটি শিল্পবিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যা বাংলাদেশের তৈরী পোশাক খাতকে বিশ্ববাজারে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের দাফন খরচ বাবদ ২০ হাজার টাকা আর আহত ব্যক্তিদের প্রাথমিকভাবে পাঁচ হাজার করে নগদ টাকা দেয়া  হয়। সরকারি হিসাবে ৮৩৬টি মৃতদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ২৯১টি মৃতদেহ অ-শনাক্ত হিসেবে জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। শনাক্তের জন্য এই  দেহগুলো থেকে ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণ করা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের কাছে ৩১৬ জন নিখোঁজের তথ্য রয়েছে।
রানা প্লাজার ওপরের ছয়টি তলায় পাঁচটি  পোশাক কারখানা, দোতলা ও নিচতলার এক অংশে বিপণিবিতান, আরেক অংশে ব্র্যাক ব্যাংকের সাভার শাখার কার্যক্রম চলছিল। ২৩শে এপ্রিল সকালেই রানা প্লাজার তৃতীয় ও চতুর্থ তলার বিম,  দেয়াল ও স্তম্ভে ফাটল দেখা দেয়। ধসের আতঙ্কে পোশাক কারখানাগুলোর শ্রমিকেরা হুড়োহুড়ি করে বের হয়ে আসেন। ওই দিন ছুটি দিয়ে দেয়া হয়। খবর শুনে আসেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), পুলিশ ও গণমাধ্যমকর্মীরা। ওই দিন বিকালেই ইউএনও গণমাধ্যমকে বলেন, সে রকম কিছু হয়নি। পরদিন (২৪শে এপ্রিল) সকালে পোশাক কারখানাগুলোর মালিকেরা মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দিয়ে ফোন করিয়ে ডেকে আনেন শ্রমিকদের। শ্রমিকেরা যেতে না চাইলে  জোর করে তাদের কারখানায় ঢোকানো হয়। সকাল আটটার দিকে কাজ শুরু করার কিছু সময় পরই প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে বিকট শব্দে ধসে পড়ে নয়তলা ভবনটি। মাথার ওপর পড়া ইট-কংক্রিটে চিড়েচ্যাপ্টা হয়ে সেখানেই প্রাণ হারান সহস্রাধিক মানুষ। অনেকের গলিত লাশ বের করা হয় ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে। ধ্বংসস্তূপের ভেতরে সুড়ঙ্গ  কেটে জীবন বাজি রেখে ঢুকে পড়েন উদ্ধারকারীরা। হাঁকডাক দিয়ে আহতদের অবস্থান শনাক্ত করে একের পর এক বের করে আনছিলেন জীবিত মানুষদের। অক্সিজেনের অভাব, হাঁসফাঁস করা গরমে কাজ করতে করতে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন অনেকেই। তবু  থেমে থাকেনি উদ্ধারকাজ। ভবন ধসের পঞ্চম দিনে জীবিত উদ্ধার করা হয় কিউ এম এ সাদিক নামের পোশাক কারখানার এক কর্মকর্তাকে। তখন তৃতীয় তলায় শাহীনা নামের এক শ্রমিককে জীবিত উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছিলেন উদ্ধারকর্মীরা। কিন্তু রাত ১০টায় সুড়ঙ্গে আগুন ধরে যাওয়ায় শাহীনাকে আর জীবিত উদ্ধার করা যায়নি। সেই আগুনে দগ্ধ হয়ে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান উদ্ধারকর্মী এজাজউদ্দীন কায়কোবাদ।
মৃত্যুঞ্জয়ী রেশমা: সাভারের ভয়াবহ রানা প্লাজা ধসের ঘটনার ১৭ দিন (৩৯১ ঘণ্টা ৩০ মিনিট পর) পর উদ্ধার হয়েছে গার্মেন্ট কর্মী রেশমা। অলৌকিক! অবিশ্বাস্য ঘটনা। ক্ষণিকের জন্য হাজারো লাশের শোক ভুলিয়ে দিয়েছেন তিনি। সবার চোখে আনন্দাশ্রু ঝরেছে। উদ্ধার-মুহূর্ত ছিল সেখানে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। উপস্থিত হাজার হাজার মানুষ  মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রাণভিক্ষা  চেয়ে হাত তুলে মোনাজাত করেন।  কেউ কেউ দাঁড়িয়ে যান নামাজে। এমনই অবস্থায় যখন তাকে সুড়ঙ্গ কেটে বাইরে বের করে আনা হয় তখন আল্লাহু আকবর ধ্বনিতে প্রকম্পিত হয়ে উঠে এলাকা। মিরাকল এক ঘটনা। কিভাবে এ ১৭ দিন রানা প্লাজার কংক্রিটের স্তূপে চাপা পড়েছিলেন তিনি। ধ্বংসস্তূপের ভিতর জীবিত মানুষ পাওয়া যখন কোন আশাই ছিল না, তখনই ঘটে গেল এই অভাবনীয় ঘটনা। জীবিত অবস্থায় বের করা হয় পোশাক শ্রমিক রেশমাকে। গত ৩রা নভেম্বর রোববার ঢাকা মেডিকেল কলেজের ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরির পক্ষ থেকে ১৫৭ জনের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। এদের মধ্যে ১১৬ জন নারী ও ৪১ জন পুরুষ। ফলাফল হস্তান্তর করা হয়েছে শ্রম মন্ত্রণালয়ে। অন্যদিকে পরিবারের সদস্যরা ডিএনএ’র ব্যাপারে কোন তথ্য না পাওয়ায় ১৬৫ জনের পরিচয় শনাক্ত হয়নি।         
সাভারে রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপে এখনো হাড়গোড়ের সন্ধান মিলছে। গত ২৭শে ডিসেম্বর পথশিশুরা রড ও বিভিন্ন পরিত্যক্ত মালামাল সংগ্রহ করতে গিয়ে এসব কুড়িয়ে পায়। এ নিয়ে গত ১৫ দিনে ধ্বংসস্তূপ থেকে একটি কঙ্কাল, দুটি মাথার খুলি ও হাড়গোড় পাওয়া  গেছে। ধ্বংসস্তূপে বার বার কঙ্কাল, মাথার খুলি ও হাড়গোড় পাওয়ার কারণে স্থানীয় জনসাধারণসহ নিখোঁজ শ্রমিকদের স্বজনেরা ধ্বংসস্তূপের ভেতরে তল্লাশির ব্যবস্থা করার দাবিও জানিয়েছেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে কুড়িয়ে পাওয়া হাড়গোড় উদ্ধার করে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠিয়েছেন। এর আগে ১৩ ও ২২শে ডিসেম্বর ওই ধ্বংসস্তূপ থেকে একটি কঙ্কাল ও মাথার খুলি পাওয়া গেছে।
ভবন ধসের ঘটনায় সারা বাংলাদেশের মানুষ একত্রিত হয়ে কাজ করেছে। শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া সহ সাধারণ মানুষও এগিয়ে এসেছিল আহতদের বাঁচাতে। জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলের একান্ত চেষ্টায় চলেছিল উদ্ধার কাজ। কেউ জানে না কি কার পরিচয়। তখন একটি পরিচয় ছিল সবার। সকলেই মানুষ। এই ভাবনা থেকেই এগিয়ে গিয়েছিলেন সবাই। তবে এই ভবন ধসের ঘটনা নিয়ে আলোচনা- সমালোচনা ছিলো মুখরিত। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর এই ঘটনায় বিরোধী দলকে দায়ী করে বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য দেন। তিনি বলেন- বিরোধী দলের হরতালে জামায়াত-শিবির ও বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা আন্দোলনের সময় বিল্ডিং- এর পিলার ধরে নাড়াচাড়া করায় সাভারের রানা প্লাজা ধসে পড়ে। এ বক্তব্যে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। ভবনধসের ঘটনায় এখন পর্যন্ত চারটি মামলা হয়েছে। ধসে পড়া ভবনটির মালিক সোহেল রানা, তার বাবা আবদুল খালেক ও পাঁচটি কারখানার মালিকসহ ১১ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। এর মধ্যে আবদুল খালেক জামিনে ছাড়া পেয়েছেন। এখনও তদন্ত কাজ চলছে।
 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. XNews2X - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু