চাচার পাঁ চালি- কৌশল by মাহবুব তালুকদার

Monday, February 24, 2014

চাচা বললেন, আমাদের জাতীয় সংসদ এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে।
কি সেই ইতিহাস? আমি জিজ্ঞাসা করলাম।

প্রথমত, এমন একটি সভ্য ভব্য বিনীত বিরোধী দল বিশ্বের আর কোন দেশের সংসদে পাওয়া যাবে না। এখানে বিরোধী দলের কাজ হলো সরকারের পক্ষে গুণকীর্তন করা। দ্বিতীয়ত, সরকার ইশারা দিলে সময়মতো কোনও কোনও বিষয়ে ‘না’ বলা। জাতীয় পার্টি এ দু’টি দায়িত্ব পালনে পারঙ্গমতার পরিচয় দিয়েছে।
তবে যে এরশাদ সাহেব বলেছেন, সরকারে জাতীয় পার্টির কোন মন্ত্রী না থাকলেই ভাল হতো।
এ কথা তিনি কখনও সংসদে দাঁড়িয়ে বলবেন না। চাচা মৃদু হেসে বললেন,
মন্ত্রীরা এরশাদের মন্ত্রী নয়, রওশনের মন্ত্রী। এ জন্যই এরশাদের এত দুঃখ। তিনি এক রাশ দুঃখ নিয়ে কথাগুলো বলেছেন।
কিন্তু আপনি বিরোধী দলকে ‘সভ্য ভব্য বিনীত’ আখ্যা দিলেন কেন?
আসলে তারা জাতীয় সংসদে কখনও অনাকাঙিক্ষত পরিবেশ সৃষ্টি করবেন না। সৌজন্যে বিনয়ে ভদ্রতায় ও আনুগত্যে তারা সংসদে বিরোধী দলের এক নতুন ধারার উদাহরণ সৃষ্টি করবেন। এদের কাছ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংসদীয় রীতিনীতির অনেক কিছু শেখার আছে। চাচা জানালেন।
কি বলছেন আপনি?
ঠিকই বলছি। তুমি নিশ্চয়ই দেখেছো সমপ্রতি ভারতে সংসদ সদস্যরা হাতাহাতি, মারামারি, মরিচের গুঁড়ো প্রতিপক্ষের চোখে ছুড়ে দেয়া ইত্যাদি কার্যকলাপে লিপ্ত হয়েছে। তুরস্কের সংসদেও হাতাহাতি হয়েছে। এরকম ঘটনা বিভিন্ন সময়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের পার্লামেন্টেও ঘটেছে। আমি তোমাকে গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, বাংলাদেশের বর্তমান সংসদে এমন কিছু ঘটবে না। বরং সরকারি দল বিরোধী দলকে যেভাবে উঠবস করতে বলবে, তারা সেভাবেই তা করবে। চাচা আরও বললেন, ‘বশংবদ’ বলে বাংলাভাষায় একটি শব্দ আছে। সংসদে বর্তমান বিরোধী দল সম্পর্কে সেটা খুব মানায়।
চাচা! কথাটা আপনি বিরোধী দলের সাংসদদের পক্ষে বললেন, না বিপক্ষে বললেন?
পক্ষেই বললাম। ‘বশংবদ’ হওয়া কি খারাপ? চরিত্রের মধ্যে বিনয়, আনুগত্য, ‘জ্বি হুজুর’ মার্কা স্বভাব, ইত্যাদি মহৎ গুণাবলী না থাকলে কখনও বশংবদ হওয়া যায় না। দল বেঁধে এমন বশংবদ হওয়ার নজির তুমি বিশ্বের আর কোন দেশের সংসদে পাবে না।
চাচার কথায় আমি মাঝে মধ্যেই বিভ্রান্তিতে পড়ি। তার অনেক কথার দ্বৈত অর্থ থাকে। অনেক সময় তিনি যা বলেন, কথাগুলো বিপরীতে দাঁড়িয়ে যায়, আবার অনেক সময় কারও বিরুদ্ধে কিছু বললে মনে হয়, তার প্রশংসা করছেন, যাকে ব্যাজস্তুতি বলা যায়। এটা চাচার এক ধরনের স্বভাব।
আমি প্রসঙ্গান্তরে যেতে চাইলাম। বললাম, চাচা, নির্বাচন সম্পর্কে কিছু বলুন।
কোন নির্বাচন? জাতীয়, নাকি উপজেলা?
জাতীয় নির্বাচন নিয়ে অনেক কথাই বলা হয়েছে। সে বিষয়ে আর কথা বাড়িয়ে লাভ কি? উপজেলা নির্বাচনের প্রথম পর্যায়ের ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। সে সম্পর্কে আপনার মতামত শুনতে চাই।
উপজেলা নির্বাচনে সরকার জিতেছে।
সরকার জিতেছে মানে? ৯৭টি উপজেলার মধ্যে ৫৫টি উপজেলায় বিএনপির জোট এবং ৩৪টি উপজেলায় আওয়ামী লীগের জোট জয়লাভ করেছে। আর আপনি বলছেন কিনা-
চাচা বাঁধা দিয়ে বললেন, আমি আওয়ামী লীগের কথা বলিনি। সরকারের কথা বলেছি। বিএনপি যে এবার উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিলো, এটাই তো সরকারের জয়। এর অর্থ বিএনপির শত অপপ্রচার সত্ত্বেও বোঝা গেল, বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে পারে।
আমি জানালাম, উপজেলার প্রথম পর্বের নির্বাচন সম্পর্কে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ (মন্ত্রী নয়) বলেছেন, ‘গত সিটি করপোরেশন নির্বাচন ও উপজেলা নির্বাচনের ফলাফল দেখলে বোঝা যায়, জনপ্রিয়তার একটা ধারাবাহিকতা আছে। গ্রামগঞ্জে আওয়ামী লীগের সমর্থন আছে। সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মতো তারা হোয়াইট ওয়াশ হননি’ (প্রথম আলো, ২১শে ফেব্রুয়ারি সংখ্যা)।
চাচা ব্যাজার মুখে বললেন, হোয়াইট ওয়াশ হবে কি করে?
কোন উপজেলায় নির্বাচনকালে যাতে সাদা রঙ না পাওয়া যায়, প্রশাসনকে গোপনে তেমন নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। তাছাড়া, তোফায়েল সাহেব স্পষ্টতই বলেছেন, গ্রামেগঞ্জে আওয়ামী লীগের সমর্থন আছে।
কিন্তু গ্রামেগঞ্জে জামায়াতে ইসলামীরও সমর্থন আছে। সেটাই তো এলার্মিং। তারা ১২টি উপজেলায় জয়ী হয়েছে।
চাচার মুখ কালো হলো। বললেন, জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করা হলে এমন ঘটনা ঘটতো না। সন্ত্রাসী দল হিসেবে নিশ্চয়ই ওরা জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে ভোটারদের ভোট দিতে বাধ্য করেছে। এব্যাপারে ইলেকশন কমিশন কিছু করতে পারতো।
ইসি এতে কি করবে?
ইসি এদের মনোনয়নপত্র বাতিল করতে পারতো।
এটা কি কোন কথা হলো! ইসি কি কারণে তাদের মনোনয়নপত্র বাতিল করবে? কোন ক্ষমতাবলে?
ইসি’র হাতে কি ক্ষমতা কম? ইসি যদি মনোনয়ন প্রত্যাহারকারীদের প্রার্থিতা বাতিল না করে জাতীয় নির্বাচনে জিতিয়ে আনতে পারে, তাহলে সামান্য উপজেলা নির্বাচনে কারও প্রার্থিতা বাতিল করার কোন কৌশল করতে পারতো না? ইসি না পারে কি?
চাচার কথায় ইসি’র করণীয় বিষয়ে আমি কোন কথা ভাবছি না। ভাবছি একটি সন্ত্রাসী দল হওয়ার পর হাজার হাজার নেতা-কর্মী জেনে যাওয়ার পর এবং বাকিরা পলাতক থাকার পরও জামায়াতে ইসলামীর সদস্যরা উপজেলা নির্বাচনে পার হলেন কিভাবে? যদি ওদের জনসমর্থন না থাকে, তাহলে ওদের ভোট দিলো কারা?
আমাকে চুপ থাকতে দেখে চাচা বললেন, কোন চিন্তা করো না। উপজেলা নির্বাচনের আগামী পর্বে জামায়াতে ইসলামীকে ঠেকাতে একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
কি ব্যবস্থা হবে?
এই মুহূর্তে তা বিস্তারিত বলতে পারছি না। তবে আমরা জাতীয় নির্বাচনকে হ্যান্ডেল করতে সেভাবে ব্যবস্থা নিয়েছিলাম, উপজেলা নির্বাচনে তেমন সচেতন ছিলাম না। জামায়াতে ইসলামীর যারা নির্বাচনে দাঁড়িয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী অভিযোগ আছে কিনা দেখলে সমস্যার সমাধান হয়ে যেতো।
চাচা, আরেকটা বিষয় ভাববার আছে।
কি সেটা?
উপজেলা নির্বাচনের এই পর্বে সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি কিন্তু একটা আসনও পায়নি।
তবে যে শুনেছিলাম তারা একটা আসন পেয়েছে।
যে একটি আসন পেয়েছে তা নাকি জাতীয় পার্টির এক বিদ্রোহী প্রার্থীর।
এটা কিন্তু ঠিক হলো না। আওয়ামী লীগ বা জাতীয় পার্টি জাতীয় নির্বাচনের কলাকৌশলগুলো মোটেই কাজে লাগালো না। তখনকার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে উপজেলা নির্বাচনে সরকারি দল ও বিরোধী দল কিছু আসন নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে নিতে পারতো। তবে এখনও কিছু আশার আলো আছে।
আপনি আশার আলো দেখছেন কিভাবে?
দেখছি এ জন্য যে উপজেলা নির্বাচন তো একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। অন্যান্য উপজেলাতে আগামী পর্বে নির্বাচন হবে। তখন যাতে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মুখরক্ষা হয়, এমন ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে।
সেটা কিভাবে সম্ভব?
কিছু পছন্দের প্রার্থীকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতিয়ে আনা কি এমন কঠিন?
বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নিলে সেটা হতে পারতো। আমি বললাম।
চাচা ক্ষুব্ধস্বরে বললেন, নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিএনপি খুবই খারাপ কাজ করেছে। এটাকে গর্হিত বলবো না জাতির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা বলবো, বুঝতে পারছি না।
চাচা, আপনি এমন কথা বলছেন কেন?
বলছি কি সাধে! খালেদা জিয়া জাতীয় নির্বাচনে এলেন না। তার কথা হলো, নির্দলীয় সরকার ছাড়া নির্বাচনে যাবেন না। এখন তো নির্দলীয় সরকার নেই। হাসিনার সরকার বহাল আছে। তাহলে খালেদা জিয়া কোন মুখে নির্বাচনে গেলেন? আসলে তার মুখের কথারই কোন ঠিক নেই।
বিএনপি উপজেলা নির্বাচনে জিতেছে এবং জিতে যাচ্ছে বলেই কি আপনি গোস্‌সা করে এসব কথা বলছেন?
না, না। তা নয়। তবে গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে জাগিয়ে রাখতে আওয়ামী লীগের কোন বিকল্প নেই। আগামী ২০৪১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ যাতে ক্ষমতায় থাকে, যে কোন ভাবেই হোক, সে ব্যবস্থা করতে হবে।
সেটা কি গায়ের জোরে করা হবে?
গায়ের জোর বলছো কেন? আসল কথা হলো কৌশল। সবাই জানে সরকারি দলের কৌশলের কাছে বিএনপি কেমন ধরাশায়ী হয়ে পড়ছে। একটু থেমে চাচা মৃদু হাস্যে নিচু গলায় বললেন, তবে গায়ের জোরও একটা কৌশল বলা যেতে পারে। দেখলে, তো, সরকার এবার গায়ের জোরেই কেমন টিকে গেল!

চাচার পাঁচালি- নব্য গণতন্ত্র by মাহবুব তালুকদার

Saturday, February 15, 2014

চাচা বললেন, ছাত্রলীগের মিডিয়া কানেকশন বিশেষ ভালো নয়। সে কারণে বারবার 
তাদের খেসারত দিতে হচ্ছে।
আমি বললাম, এ কথার অর্থ কী?
অর্থ খুব সোজা। মিডিয়া ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছে।
মিডিয়া তো রিপোর্ট করা ছাড়া আর কিছুই করছে না।
সেটাই বলতে চাচ্ছি। সেদিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের কয়েকজন সিনিয়র নেতার পিস্তল হাতে ছবি ছাপা হয়েছে। এ রকম একপেশে রিপোর্ট বা ছবি ছাপার নাম কী সাংবাদিকতা?
কিন্তু একপেশে রিপোর্ট হলো কীভাবে?
আরে ভাই! জামায়াতে ইসলামীর ক্যাডাররা যখন প্লাস্টিক বোমা ছোড়ে, তাদের কী কোনো ছবি আজ পর্যন্ত পত্রিকায় ছাপা হয়েছে? হয়নি। অথচ ছাত্রলীগের সোনার ছেলেরা যখন আত্মরক্ষার্থে পিস্তল হাতে নেয়, ফলাও করে সেটা ছাপা হয়, যা দুরভিসন্ধিমূলক।
চাচা কোনো বিষয়ে উত্তেজিত হয়ে গেলে আমাকে ভাই বলে সম্বোধন করেন। এটা নতুন কিছু নয়। আমি বললাম, ক’দিন আগে জাতীয় সংসদে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের ঢাকা মহানগরের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাজী সেলিম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলা প্রসঙ্গে বলেন, ‘শিবির রগ কাটে, ছাত্রলীগ কবজি কাটে, মাথা কাটে।’ এ কথার জবাবে ছাত্রলীগ লিখিতভাবে প্রতিবাদলিপিতে জানিয়েছে, হাজী সেলিম একজন ‘অশিক্ষিত’ ও ‘মূর্খ’ লোক। কিন্তু এটা কী হাজি সেলিমের কথার জবাব হলো?
ঠিকই বলেছে ওরা। চাচা জানালেন, ছাত্রলীগের ছেলেরা যেহেতু ছাত্র, সেহেতু তাদের চোখে ‘অশিক্ষিত’ ও ‘মূর্খ’ হাজী সেলিমের অপরাধ হচ্ছে ‘শিক্ষিত’ ও ‘বিদ্বান’ ছাত্রদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে মুখ খোলা। সংসদ সদস্য হয়েছেন বলে সংসদে দাঁড়িয়ে সমাজের শিক্ষিত অংশের বিরুদ্ধে গায়ে পড়ে মন্তব্য করা হাজী সেলিমের উচিত হয়নি। ছাত্রশিবির আর ছাত্রলীগ কি এক বিষয় হলো যে তাদের তুলনা করা হবে? ‘অশিক্ষিত’ আর ‘মূর্খ’ না হলে হাজী সেলিম এটা করতে পারতেন না।
আমি বললাম, চাচা! ছাত্রলীগ সম্পর্কে আরো অভিযোগ আছে। ক’দিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হল থেকে ৯৭ জন শিক্ষার্থীকে ছাত্রলীগ নেতারা বের করে দিয়েছে। ওই ৯৭ ছাত্রের অপরাধ হলো তাদের কাছে স্থানীয় ছাত্রলীগ বা আওয়ামী লীগের নেতাদের প্রত্যয়নপত্র নেই। তাদেরকে জানানো হয়েছে, তারা শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল না এবং ছাত্রলীগ করত- এ রকম প্রত্যয়নপত্র যার যার এলাকার আওয়ামী লীগ নেতার কাছ থেকে আনতে হবে। এটা কেমন কথা?
কী আশ্চর্য! এতে অভিযোগের কী আছে? চাচা ক্ষুব্ধস্বরে বললেন, ছাত্রলীগ স্বাধীনতার অতন্দ্র প্রহরী। বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তি যাতে আসন পেতে ঘাঁটি বানাতে না পারে, তা দেখা নিশ্চয়ই অন্যায় কিছু নয়। তাতে প্রয়োজনে ৯৭ জন কেন, ৯৭০ জনকে হলে থাকতে না দেয়ার অধিকার ছাত্রলীগের রয়েছে।
কিন্তু ছাত্রলীগ তো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত নয়। হলে স্থান পেতে ছাত্রদের যার যার এলাকার আওয়ামী লীগ নেতার প্রত্যয়নপত্রইবা আনতে হবে কেন?
তুমি ব্যাপারটা নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছ কেন? ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে সাহায্য করছে বলেই তাদের এটা করতে হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এককভাবে আবাসন সমস্যার সমাধান করতে পারছে না বলেই ছাত্রলীগ এ ব্যাপার হ্যান্ডেল করছে। ওরা যদি অন্যায় কিছু করত তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিশ্চয়ই তাতে বাধা দিতো। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কি কিছু বলেছে?
না। তারা তো ছাত্রলীগের পক্ষে।
তাহলেই বুঝতে পার, ছাত্রলীগ কোনো অন্যায় করছে না। তুমিও দেখছি হাজী সেলিম হয়ে গেলে।
চাচার কথায় আমি রীতিমতো বিচলিতবোধ করলাম। হাজী সেলিম ঢাকার একজন খ্যাতনামা রাজনীতিবিদ ও আওয়ামী লীগ নেতা। তিনি সংসদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হননি। আওয়ামী লীগের আরেক প্রখ্যাত নেতা ও আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দীনকে নির্বাচনে পরাজিত করে তিনি সংসদ সদস্য হয়েছেন। ভবিষ্যতে তিনি মন্ত্রীও হতে পারেন। যদি তাই হয়, তাহলে তিনি হবেন ছাত্রলীগের ভাষায় দেশের প্রথম ‘অশিক্ষিত’ ও ‘মূর্খ’ মন্ত্রী। তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে যা বলেছেন, আমি তা সমর্থন করিনি। তাহলে আমি তার সঙ্গে তুলনীয় হলাম কী করে?
আমি প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে বললাম, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ঘোষণা করেছেন, আগামী ২০১৯ সালের ২৮শে জানুয়ারির পূর্বে আগামী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। মেয়াদ শেষে বর্তমান সংবিধান অনুযায়ীই নির্বাচন হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
এটা নির্বাচনের ব্যাপারে আওয়ামী লীগের আন্তরিকতা ও স্বচ্ছতার প্রমাণ। চাচা বললেন, বিএনপি যাতে এ সময়ের মধ্যে নিজেদের তৈরি করে নিতে পারে, এজন্যই সৈয়দ আশরাফ সময়টি অগ্রিম জানিয়ে দিয়েছেন।
চাচা! নির্বাচন কী বিগত নির্বাচনের মতোই হবে?
অবশ্যই। চাচা বললেন, দু-একটি দেশ ছাড়া পৃথিবীর প্রায় সব দেশ আমাদের নির্বাচন মেনে নিয়েছে। সবাই বর্তমান নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছেন। তাছাড়া, বাংলাদেশের বিগত নির্বাচন একটা মডেল হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। ভবিষ্যতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এ মডেলটিকে গ্রহণ করবে। সুতরাং, সংবিধানের বাধ্যবাধকতা রক্ষা করে একই পদ্ধতিতে আগামী নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হবে।
কিন্তু এটা তো বিরোধী দলবিহীন নির্বাচন!
কেন? জাতীয় সংসদে বিরোধী দল তো আছে। বেগম রওশন এরশাদ বিরোধীদলীয় নেতা।
উনি কি সত্যি বিরোধীদলীয় নেতা?
তোমার এসব অহেতুক প্রশ্ন আমার ভালো লাগে না। বেগম রওশন এরশাদ একজন অসাধারণ রাজনীতিবিদ। তিনি একদিকে তার স্বামী হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কাছ থেকে দলের ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছেন, অন্যদিকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ক্ষমতার অংশীদার হিসেবে ভারসাম্য রক্ষা করছেন। দক্ষিণ এশিয়ায় এমন উদাহরণ আর এক পিস পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ।
আমি চুপ করে চাচার কথা শুনলাম। জাতীয় পার্টির অভ্যন্তরীণ ব্যাপারটা আমি ঠিক বুঝি না। গত নির্বাচনে এরশাদের নির্দেশে ১৮৬ জন প্রার্থী তাদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেন। বাকিরা নির্দেশ অমান্য করে নির্বাচন করেন। বর্তমান সংসদে জাতীয় পার্টির ৩৪ জন সদস্য রয়েছেন। এরশাদ নিজেও সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন। এরপর তাকে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত করা হয়। এজন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। অন্যদিকে তার স্ত্রী বেগম রওশন এরশাদ দলের যে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে স্বামীকে ক্ষমতাহীন করেছেন, তা ফিরে পেতে এরশাদ সমপ্রতি দলের নেতাকর্মীদের এক সম্মেলনে গান গেয়েছেন? ‘আয় খোকা আয়!’ তবে দলের ৩০ জন সংসদ সদস্য তার ডাকে সাড়া দেননি। আসলে দলের খোকারা বুঝতে পারছেন না কার কাছে যাবেন? ক্ষমতাবান রওশন এরশাদের কাছে, না ক্ষমতাহীন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কাছে?
আমি আবার প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে বললাম, চাচা! উপজেলা নির্বাচনে তো দেখছি রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন আছে, অথচ কাগজপত্রে সবই নির্দলীয়। নির্বাচনে একক প্রার্থী দেয়ার জন্য বিদ্রোহী প্রার্থীদের দল থেকে বহিষ্কারও করা হচ্ছে। ব্যাপারটা অদ্ভুত নয়?
তোমার কাছে তো সবই অদ্ভুত। তবে এ নির্বাচন আওয়ামী লীগের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
গুরুত্বপূর্ণ কেন?
বিএনপি তলে তলে এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে বলে। বর্তমান সরকারকে বিএনপি অবৈধ সরকার বলছে, আবার এ সরকারের অধীনে উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে। এটা কেমন নৈতিকতাবিরোধী কথা?
নির্বাচনে দলীয় প্রতীক নেই বলেই বোধহয়। আমি বললাম।
আওয়ামী লীগের উচিত ছিল এবারও কৌশল করে বিএনপিকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখা। চেষ্টাও করা হয়েছিল। তবে তা ব্যর্থ হয়েছে। এখন একটা ভিন্ন কৌশল দেখা যাচ্ছে।
কি কৌশল?
এবার উপজেলা নির্বাচনে জেলা প্রশাসক ও অন্যান্য প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ওপর বিশেষভাবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের ওপর তেমন আস্থা রাখা যায়নি বলেই এ ব্যবস্থা। চাচা বললেন।
এভাবে নির্বাচন করে কি গণতন্ত্র রক্ষিত হতে পারে?
গণতন্ত্রের তুমি বোঝটা কী? চাচা বিরক্তিস্বরে আমাকে বললেন, তুমি কি মনে করো নির্বাচনে কেবল দেশের মানুষেরা ভোট দেয়, বিদেশীরা কিছু করে না?
তা করে। বিগত জাতীয় নির্বাচনে ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের সচিব সুজাতা সিং সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছেন। জাতীয় পার্টি যাতে নির্বাচনে যায়, তার জন্য এরশাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিলেন তিনি।
কথাটা ফাঁস করা এরশাদের মোটেই উচিত হয়নি। চাচা গলার স্বর স্বাভাবিক করে বললেন, গণতন্ত্রের পুরোনো ধারণা এখন আর নেই। নির্বাচন ছাড়া কিংবা নামকা-ওয়াস্তে নির্বাচন করেও গণতন্ত্র রক্ষিত হতে পারে। এর নাম হচ্ছে নব্য গণতন্ত্র।
নব্য গণতন্ত্র!
আঁতকে উঠলে যে! এটা অবশ্য আইউব খানের মৌলিক গণতন্ত্র নয়। বর্তমান নব্য গণতন্ত্র সময়ের প্রয়োজনে ও সংবিধান রক্ষার্থে গণতন্ত্রের ভিন্নতর রূপ। এটা ওয়েস্ট মিনস্টার গণতন্ত্রের আদল থেকে আলাদা। এখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ নব্য গণতন্ত্রের বিকাশ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
সেটা কী রকম? আমি প্রশ্ন করলাম।
মিসরের দিকে তাকিয়ে দেখ। মিসরের সেনাপ্রধান ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফিল্ড মার্শাল আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি আগামী এপ্রিলে অনুষ্ঠেয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হচ্ছেন। ফিল্ড মার্শাল সিসি বিগত নির্বাচনে নির্বাচিত মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করে শাসনক্ষমতা দখল করেন ও মুরসিকে জেলে দেন। মিসরের এবারের নির্বাচনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ফিল্ড মার্শাল সিসিকে প্রকাশ্যে অগ্রিম সমর্থন দিয়েছেন। আমি শতভাগ গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, মিসরের আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ফিল্ড মার্শাল সিসি জয়যুক্ত হবেন।
কিন্তু এতে কি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে? আমি প্রশ্ন করলাম।
তুমি গণতন্ত্রের পুরোনো ধ্যানধারণার বিষয়টা ভুলে যাও। চাচা বিগলিত হাসি মুখে বললেন, নব্য গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় যে কোনো একটা নির্বাচন হলেই হলো। কিভাবে কী নির্বাচন হলো, তা নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা হবে না।

চাচার পাঁচালি- বাকশাল by মাহবুব তালুকদার

Wednesday, January 29, 2014

চাচা বললেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আসলেই ঝানু পলিটিশিয়ান। নির্বাচনটা তিনি করিয়েই ছাড়লেন।
আমি বললাম, অপারেশন সাকসেসফুল, বাট পেশেন্ট ইজ ডেড।

পেশেন্ট কোন বড় বিষয় নয়, বড় বিষয় হচ্ছে অপারেশন সাকসেসফুল হয়েছে কিনা! এক্ষেত্রে ডাক্তার  
হাসিনা শতভাগ সফল। চাচা আরও বললেন, এরপর তার কাজ হচ্ছে মৃতদেহে প্রাণ সঞ্চার করা।
সেটা কি করে সম্ভব?
শেখ হাসিনার জন্য সবকিছুই সম্ভব। চাচা উদ্দীপ্ত হয়ে জানালেন, দেখছো না বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন তাকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন যেভাবে পাশে দাঁড়িয়েছিল, সেভাবেই তারা পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। খালেদা জিয়া নির্বাচনে না আসার সমালোচনা পর্যন্ত করেছে রাশিয়া।
এটা আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হয়ে গেল না?
তারা তো সরকার বা রাষ্ট্রের বিপক্ষে কোন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেনি। বিরোধী দলের কি করা উচিত ছিল আর কি করা উচিত হয়নি বললে তা অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হয় কি করে? চাচা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বললেন, বলতে পারো বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচন বর্জন করে কি অর্জন করলেন?
একটা প্রহসনের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেই বা তিনি কি অর্জন করতেন?
শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে অংশ নিলে তিনি বিরোধীদলীয় নেত্রী তো হতে পারতেন। এখন তার আমও গেছে, ছালাও গেছে। আওয়ামী লীগ আগামী ২০৪১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবে। সে জন্যই তো তারা ২০৪১ সাল পর্যন্ত রূপকল্প ঘোষণা করেছে।
তাহলে কি দেশে আর কোন নির্বাচন হবে না?
নির্বাচন অবশ্যই হবে। এবারের নির্বাচনে একটা মডেল তৈরি হয়ে গেছে। আশা করি নির্বাচন কমিশন মডেলটির স্থায়ী রূপ দেবে। এই মডেল অনুসরণ করলেই আওয়ামী লীগের পোয়া বারো। ‘শেখ হাসিনার সরকার বারবার দরকার’ স্লোগানটি এখন জাতীয় স্লোগানে পরিণত হয়েছে।
চাচার কথাবার্তায় আমি রীতিমতো বিভ্রান্ত। আরও বিভ্রান্ত সরকারি দলের সিনিয়র নেতাদের কথাবার্তা শুনে। যেসব সরকারি নেতা ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনকে ‘সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা’ কিংবা ‘নিয়ম রক্ষার নির্বাচন’ বলে অভিহিত করেছেন, তারাই এখন বলছেন পাঁচ বছরের আগে আর কোন নির্বাচন নয়। নির্বাচন বিষয়ে সংলাপ হতে পারে পাঁচ বছর পরে। মাননীয় অর্থমন্ত্রী মুহিত সাহেব পর্যন্ত এমন স্ববিরোধী উক্তি করেছেন। তাহলে ব্যাপারটা কি দাঁড়ালো? আমি চাচাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি যে নির্বাচনের মডেলের কথা বলেছেন, তা কি রকম?
সব কথা তো প্রকাশ্যে বলা যায় না। চাচা রহস্যময় হাসি হাসলেন। বললেন, বাংলাদেশে যে নির্বাচন হয়েছে, তাতে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ব্যাপার ছিল, তা মানি। মেনিপুলেশনের ব্যাপার ছিল, তা-ও মানি। ভোটার সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে, এ কথা স্বীকার করতেও আপত্তি নেই। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা হলো, ইলেকশন হয়েছে কিনা। যে কোন মূল্যে ইলেকশন হওয়াই হচ্ছে এই মডেল।
আমি বললাম, কিন্তু ইলেকশন গ্রহণযোগ্য হয়েছে কিনা, সেটা কোন ব্যাপার নয়?
চাচা দু’চোখে অগ্ন্যুৎপাত সৃষ্টি করে আমার দিকে তাকালেন। সরোষে বললেন, কার কাছে গ্রহণযোগ্য? কে গ্রহণযোগ্যতার সার্টিফিকেট দেবে? বিদেশীরা? ইলেকশনের ব্যাপারে আমরা তাদের বয়কট করেছি।
তাহলে আপনি বলছেন, নির্বাচন যথাযোগ্য হয়েছে?
চাচা কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক করে বললেন, তোমার এই ‘যথাযোগ্য’ শব্দটা আমার খুব মনঃপূত হয়েছে। সত্যি বলতে কি, আমাদের যোগ্যতা অনুসারে এই নির্বাচন ‘যথাযোগ্য’ হয়েছে। খোদ আমেরিকা পর্যন্ত নবনির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়ন, বৃটিশ পার্লামেন্ট তো পুনরায় নির্বাচন দাবি করেছে।
যার বিয়ে তার মনে নেই, পাড়া-পড়শির ঘুম নেই। চাচা বললেন, বিদেশীদের দাবিনামা আস্তে আস্তে চাপা পড়ে যাবে। সবাই বুঝতে পেরেছে, দেশের মানুষ নির্বাচন মেনে নিয়েছে। যেসব দুষ্কৃতকারী নির্বাচন মেনে নেয়নি, সহিংসতার সৃষ্টি করেছে কিংবা উস্কানি দিয়েছে, তাদের পরিণতি তো চোখের সামনে দেখতেই পাচ্ছো। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এর মধ্যে দু’টি হার্ডল পার হলেন।
কি রকম?
প্রথমত তিনি নির্বাচনে জয়লাভ করলেন এবং কৌশলে বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখলেন। দ্বিতীয়ত তিনি বিএনপি থেকে জামায়াতকে বিচ্ছিন্ন করতে সফল হচ্ছেন এবং হয়েছেন।
কিন্তু জামায়াতকে তিনি নিষিদ্ধ করছেন না কেন? আমি বললাম।
নিষিদ্ধ করার দরকার কি? কাজ সুসিদ্ধ হলেই হলো। চাচা শান্তকণ্ঠে বললেন, একবারে নয়, জামায়াতকে ধীরে ধীরে নিশ্চিহ্ন করা হবে। বিএনপিও ধীরে ধীরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
বিএনপি নিশ্চিহ্ন হবে কিভাবে?
ওরা তো ইলেকশনেই আসতে পারবে না। এরপর যত ইলেকশন হবে, সংবিধান মেনে নিয়ে সবই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অধীনেই হতে হবে।
বিএনপি যদি তাতেই রাজি হয়ে যায়?
তখন নতুন কোন কৌশল করে ওদের বাদ দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
এ কথার অর্থ কি?
নির্বাচন কমিশন যেন সরকারের সাহায্য ছাড়াই বিএনপিকে বসিয়ে দেয়ার ক্ষমতা অর্জন করতে পারে!
চাচা! একটা বিষয় আমি ঠিক বুঝতে পারি না।
কি বিষয়?
নির্বাচনী প্রতীক ব্যবহারের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী অন্যান্য দলের সদস্যদের নৌকা প্রতীক ব্যবহার করার সম্মতি দিয়ে কমিশনে চিঠি দিয়েছেন। সে অনুযায়ী রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনুরা নৌকায় চড়ে বৈতরণী পার হলেন। কিন্তু এরশাদ যখন লাঙ্গল প্রতীক ব্যবহারের অনুমতি না দিতে নির্বাচন কমিশনে চিঠি দিলেন, তার চিঠি আমলেই নেয়া হলো না। এক যাত্রায় এমন পৃথক ফল হয় কি করে? আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
এটাই তো নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতার প্রমাণ। এরশাদের সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী জেনেই তা কমিশন আমলে নেয়নি।
কিন্তু এরশাদকেও লাঙ্গল প্রতীক নিয়েই নির্বাচনে জিতিয়ে আনা হলো। তিনি তো নির্বাচনই করতে চাননি।
এটা সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মহানুভবতা বলতে পারো। এরশাদ সাহেব নিজের ভালমন্দ বোঝার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন। আসলেই তিনি খুব অসুস্থ। সত্যি কথা হলো, তিনি একজন মানসিক রোগী।
এ কি কথা বলছেন আপনি?
ঠিকই বলছি। মানসিক রোগী না হলে কেউ নিজের মাথায় পিস্তল ধরে! পিস্তলের ভেতরে যদি গুলিভর্তি থাকতো তখন কি হতো? বারবার যার মুখের কথা ফসকে যায়, তার হাত ফসকে যাওয়াটা কি অস্বাভাবিক কিছু?
আমি কথা অন্যদিকে ঘুরিয়ে বললাম, চাচা! দেশের এ অবস্থা কি আপনি স্বাভাবিক মনে করছেন?
অবশ্যই স্বাভাবিক। এখনকার মন্ত্রিসভা আওয়ামী লীগের আগের মন্ত্রিসভাগুলোর চেয়ে অনেক বেশি পাকাপোক্ত। আমু তোফায়েল নাসিম- এরা সবাই তারকা রাজনীতিবিদ।
কিন্তু বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গেও তো কয়েকজন তারকা রাজনীতিবিদ ছিলেন।
খালেদা জিয়া কি রাজনীতি বোঝেন? মোটেই না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেই দিয়েছেন, খালেদা জিয়াকে তার ভুলের খেসারত দিতে হবে।
রাজনীতিতে কাকে কখন ভুলের খেসারত দিতে হয়, সেটা সময় বলে দেবে। তবে খালেদা জিয়ার ভুলটা কি?
তার তো সবটাই ভুল। তিনি জনগণের ভোটে সংসদ সদস্য হলেন, কিন্তু জনগণের কথা বলতে সংসদে বসলেন না। তিনি যাতে আদৌ সংসদ অভিমুখী না হতে পারেন, শেখ হাসিনা তার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তবে তুমি হয়তো বলবে, খালেদা জিয়া নির্বাচিত হয়েও যখন সংসদে যাননি, তার আর নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদে যাওয়ার দরকার কি?
আমি তা বলবো না। সংসদ বর্জন আর সংসদে যেতে না পারা এক কথা নয়। তবে বিরোধী দলবিহীন সংসদ গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়।
বিরোধী দলবিহীন কে বললো? বেগম রওশন এরশাদ এখন বিরোধী দল নেতা। তিনি সরকারের সঙ্গেও আছেন আবার বিরোধী দলেও আছেন। সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এটা এক বিরল দৃষ্টান্ত।
বিরল কথাটা বোধ হয় ঠিক হলো না। পৃথিবীতে এমন দৃষ্টান্ত আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।
তা বলতে পারো। এটা সাধারণ বিরোধী দল নয়, গঠনমূলক বিরোধী দল। দলের নেতারা বলেছেন, তারা কেবল গঠনমূলক বিষয়ে বক্তব্য রাখবেন। জাতীয় পার্টির মন্ত্রীরা সরকারের পক্ষেও যেমন আছেন, আছেন তেমন বিরোধী দলেও।
সংসদে হ্যাঁ কিংবা না ভোটের সময় তারা কোনদিকে ভোট দেবেন?
চাচা বললেন, তারা সরকারি দলের হয়ে সর্বদা হ্যাঁ ভোট দেবেন, আবার বিরোধী দল হিসেবে না ভোট দেবেন।
তাহলে কি তারা দু’বার ভোট দেবেন?
তা হতেই পারে। তবে এসব ভোটাভুটিতে সরকারি দল সর্বদাই জয়যুক্ত হবে। বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় পার্টি না ভোট দিলেও তাতে সিদ্ধান্তের কোন নড়চড় হবে না। ফলে কিছুই আসবে যাবে না।
দেশে তাহলে বাকশাল চালু হয়ে গেল না?
চাচা ভ্রু-কুঞ্চিত করে আমার দিকে তাকালেন। বললেন, বাকশালের ব্যাপারটা কিছু বোঝো তুমি? বাকশাল অর্থ বোঝো?
বললাম, বাকশাল হচ্ছে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা।
মোটেই না। বাকশাল হচ্ছে বহুদলীয় গণতন্ত্র। পঁচাত্তর সালে যে বাকশাল হয়েছিল, তা-ও একদলীয় ছিল না। বহুদলীয় গণতন্ত্রই ছিল তার রূপরেখা। বাকশাল হচ্ছে গণতন্ত্রের সর্বশেষ কথা। গণতন্ত্রের নির্যাসও বলতে পারো।
বলছেন কি চাচা!
ঠিকই বলছি। চাচা হাসিমুখে বললেন, শেখ হাসিনা বাকশাল কায়েম করতে চাইলে সমগ্র জাতি সাধুবাদ জানাবে। তিনি যদি বিএনপিকে তাতে যোগ দিতে বলেন, বিএনপি’র উচিত হবে অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে তাতে যোগদান করা। কথাটা পারলে খালেদা জিয়ার কানে পৌঁছে দিও।

 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. XNews2X - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু