কালের পুরাণ- বিএনপিকে মাঠে নামাতে মন্ত্রীদের উসকানি! by সোহরাব হাসান

Saturday, February 15, 2014

কূটনীতিকেরা বিএনপিকে দুই বছরের মধ্যে আন্দোলন না করার পরামর্শ দিয়েছেন বলে গতকাল একটি পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে। এ খবরের সত্যাসত্য সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত নই।
তবে বিএনপির নেতাদের হাবভাব দেখে মনে হয়, তাঁরা দুই বছর না হলেও আন্দোলনের জন্য সরকারকে কিছুটা সময় দিতে চান। এর আগে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনের আগে দল গোছানোর কথা বলেছিলেন। সেই সঙ্গে তিনি এ কথাও জানিয়ে দেন যে তাঁরা খুব বেশি দিন অপেক্ষা করবেন না। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৯-দলীয় জোটের ভেতরেও যে আন্দোলনে নামা না-নামা নিয়ে চাপান-উতোর চলছে, নানা সূত্রে তারও আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

কিন্তু এক মাস বয়সী সরকারের কতিপয় মন্ত্রী যে ভাষায় কথা বলছেন, তাতে মনে হচ্ছে, ক্ষমতাসীন দলটিই চাইছে না বিএনপি বেশি দিন আন্দোলনের বাইরে থাকুক। মাঠ গরম না হলে এই শেষ শীতের দিনে তাঁদের ভালো লাগে না।
গত বৃহস্পতিবার শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু একটি বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে জাতীয় নির্বাচনে অংশ না নিয়ে উপজেলা নির্বাচনে অংশ কেন নিচ্ছে, সে জন্য বিএনপির কাছে কৈফিয়ত তলব করেছেন। এ নিয়ে মন্ত্রীর আত্মশ্লাঘার কিছু নেই। বিএনপি জাতীয় নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার কারণেই তো আমির হোসেনের মতো আরও অনেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সাংসদ নির্বাচিত হয়ে শেখ হাসিনার তৃতীয় সরকারের মন্ত্রী হয়েছেন। শেখ হাসিনার প্রথম সরকারে যিনি প্রথমে মন্ত্রীই হতে পারেননি। কেননা, তিনি বিএনপির একজন নবীন নেতার কাছে হেরে গিয়েছিলেন। পরে টেকনোক্র্যাট কোটায় খাদ্যমন্ত্রী হন এবং উপনির্বাচনে ইলেন ভুট্টোকে হারিয়ে সাংসদ হন। ২০০১ সালের নির্বাচনে আবার ইলেন ভুট্টোই নির্বাচিত হন। হেরে যান আমির হোসেন আমু।
সে ক্ষেত্রে বিএনপি নির্বাচনে না আসায় তাঁর অন্তত সুবিধাই হয়েছে। বিএনপির কাছে কৈফিয়ত না চেয়ে তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারতেন।
আর নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বিএনপি ভুল করে থাকলে সে জন্য জনগণ তাদের কাছে কৈফিয়ত চাইবে। এখন যদি বিএনপি ভুল বুঝতে পেরে উপজেলা নির্বাচনে শরিক হয়েও থাকে, সে জন্য কৈফিয়ত দিতে হবে কেন?
আমির হোসেন আমুরা যেহেতু নিজেদের নির্বাচিত প্রতিনিধি মনে করেন, তাঁদেরই উচিত জনগণের কাছে কৈফিয়ত দেওয়া। এক মাসের বেশি সময় হলো, তিনি শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন। এই সময়ে তাঁর মন্ত্রণালয়ে কী কাজ হয়েছে, সেটি জানার অধিকার দেশবাসীর আছে। এত দিন সব দুর্গতির জন্য তাঁরা বিরোধী দলের সংঘাত-সংঘর্ষ, হরতাল-অবরোধের অজুহাত দিতেন। এখন তো সেসব নই। তাহলে কেন শিল্পকারখানায় উৎপাদন বাড়ছে না? কেন কারখানাগুলোতে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে না? কেন রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকারখানাগুলোর লোকসান বাড়ছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর আমির হোসেন আমু শিল্পবহির্ভূত বিষয় নিয়ে কথাবার্তাই বেশি বলছেন।
আরেক মন্ত্রী, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন একই দিন ফরিদপুরে ছাত্রলীগের কর্মী সম্মেলনে বিএনপির উদ্দেশে বলেছেন, তাদের আন্দোলন ঠেকাতে ছাত্রলীগই যথেষ্ট। তাঁর এ কথাটি পত্রিকায় পড়ে দুই দশক আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার একটি বক্তব্য মনে পড়ে। সে সময় বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে জোরদার আন্দোলন চলছিল। সেই প্রেক্ষাপটে তিনি বলেছিলেন, বিরোধী দলের আন্দোলন দমন করতে ছাত্রদলই যথেষ্ট। আমাদের দেশে ক্ষমতা বদলায়, দল বদলায়, ক্ষমতাবানদের চরিত্র বদল হয় না।
কঠিন সত্য হলো, খালেদা জিয়ার ছাত্রদল বিরোধী দলের আন্দোলন মোকাবিলা করতে পারেনি। তাঁকে শেষ পর্যন্ত বিরোধী দলের দাবি মেনে নিতে হয়েছিল। আর এখন তো বিরোধী দল আন্দোলনই করছে না। সংসদের ভেতরে যাঁরা বিরোধী দলের আসনে বসেছেন, তাঁরা নিষ্ক্রিয়, নির্জীব। একই সঙ্গে সরকারে ও বিরোধী দলেও আছেন। দলের নেতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নির্বাচন না করেও সাংসদ হয়েছেন, বিশেষ দূত হয়েছেন। রওশন এরশাদ নির্বাচন করে সংসদে বিরোধী দলের নেতা হয়েছেন। তাঁদের স্বামী-স্ত্রীর বিরোধ এখন সংসদেও গড়িয়েছে। রঙ্গভরা বঙ্গদেশে আরও কত কিছু দেখতে হবে।
আর সংসদের বাইরে থাকা বিএনপি ভোটে পরাজিত না হলেও রাজনৈতিক কৌশলে পরাজিত হয়ে এখন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। দলের বিভিন্ন পর্যায়ে নেতা-কর্মীদের মধ্যে বিরোধ ও দ্বন্দ্ব লক্ষ করা যাচ্ছে। কর্মীদের অভিযোগ, নেতাদের কারণে আন্দোলন সফল হয়নি। এই অবস্থায় বিএনপির নেতারা যখন শিগগিরই আন্দোলনের চিন্তা করছেন না, তখন মন্ত্রীদের উসকানিমূলক বক্তৃতা-বিবৃতির কী যুক্তি থাকতে পারে?
বাংলায় একটি প্রবাদ আছে। সুখে থাকতে ভূতে কিলায়। দেশে আন্দোলন নেই, হরতাল-অবরোধ নেই এটি সম্ভবত মন্ত্রীদের ভালো লাগছে না। এ কারণেই কি মন্ত্রীরা উসকানিমূলক বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে যাচ্ছেন? তবে গত মন্ত্রিসভার সদস্য যাঁরা ছিলেন, তাঁদের কাছ থেকে নব্য মন্ত্রীদের শিক্ষা নেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি। সেই মন্ত্রিসভায় যাঁরা বড় বড় কথা বলতেন, তাঁদের অনেকেই এখন মন্ত্রিসভার বাইরে। পাঁচ বছর তাঁরা বিএনপি তথা বিরোধী দলকে গালমন্দ করে নিজেদের সফল মন্ত্রী হিসেবে দেখাতে চেয়েছিলেন। দিনের শেষে মন্ত্রিত্ব হারিয়েছেন। কেননা, শেষ বিচারে সরকারের সাফল্য ও ব্যর্থতার দায় শেখ হাসিনাকেই নিতে হবে।
বর্তমানে বিএনপি নাজুক অবস্থায় আছে, মানি। এর অর্থ এই নয় যে আওয়ামী লীগ খুব ভালো অবস্থায় আছে। বিএনপি নির্বাচন করেনি, তাই সংসদে বা সরকারে তার কোনো ভূমিকা নেই। কিন্তু যেহেতু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে, ভালোমন্দের দায়ও তাদের নিতে হবে। কে কীভাবে নেন সেটাই দেখার বিষয়। ইতিমধ্যে মন্ত্রী পদমর্যাদার চিফ হুইফ সাহেব এক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন। দলের নেতা-কর্মীদের কাছে ক্রেস্ট না দিয়ে ক্যাশ নিয়ে আসার জন্য হুকুম দিয়েছেন। বিগত সরকারের ক্যাশ আদায়কারীরা এখন দুদকের সন্দেহ ও তদন্তের আওতায়।
আমরা জানি না, উসকানিমূলক বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে মন্ত্রীরা বিরোধী দলকে মাঠে নামাতে চাইছেন কেন? দেশে শান্তি আছে, এটি তাঁদের পছন্দ নয়? আবার কি মন্ত্রীরা ৫ জানুয়ারির আগের অবস্থায় দেশকে ফিরিয়ে নিতে চান?
শেখ হাসিনার তৃতীয় সরকারের মেয়াদ মাত্র এক মাস কয়েক দিন। এই কয়েক দিনে নিশ্চয়ই সরকার টের পেয়েছে, বিরোধী দলকে রাজনৈতিক কৌশলে হারানো যত সহজ, দেশ চালানো তত সহজ নয়। এই এক মাস সময়ের মধ্যেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেছে, এই এক মাস সময়ের মধ্যেই দাম না পেয়ে কৃষকেরা আলু রাস্তায় ফেলে দিচ্ছেন। এই সময়ের মধ্যেই জানা গেল, যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি-সুবিধা সহজে ফিরিয়ে দিচ্ছে না।
প্রায় প্রতিদিনই সরকারপ্রধানকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তিনি সাধ্যমতো সেগুলো সমাধানেরও চেষ্টা করছেন। কিন্তু তাঁর অধিকাংশ মন্ত্রীই সম্ভবত সেই বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারছেন না। আর সে কারণেই বিরোধী দলকে রাজপথে নিয়ে আসার জন্য উসকানি দিয়ে যাচ্ছেন। এটি থামানো প্রয়োজন।

সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

সপ্তাহের হালচাল- বিএনপি কি তাহলে হেরে যেত? by আব্দুল কাইয়ুম

Friday, February 7, 2014

বিএনপি হারত না, কিন্তু এখন হেরে গেছে!!! সর্বশেষ এক জরিপে দেখা যাচ্ছে, সব দল অংশগ্রহণ করলে ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপি অন্তত সাড়ে ৫ শতাংশ ভোট কম পেত।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের (ডিআই) এই জরিপ নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ কম। তাহলে প্রশ্ন, নির্বাচনের আগে একাধিক জরিপে দেখা গেছে, ভোটে আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপি অনেক বেশি এগিয়ে থাকবে, সেটা কি ভুল ছিল?

না, তা নয়। ওই জরিপের ফলাফলও যথার্থই ছিল। ওই সময় যদি বিএনপি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলত, ঠিক আছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচন করব, তাহলে বিএনপির বিজয় ছিল অবধারিত। এটা মনগড়া কথা নয়। গত ২৪ জানুয়ারি রাতের ট্রেনে রাজশাহী যাচ্ছিলাম। সেখানে পরদিন গণিত উৎসব হবে। আমাদের কক্ষের বাকি দুজনের সঙ্গে আড্ডা জুড়ে দিলাম। তাঁরা রাজশাহীর অধিবাসী। বললেন, নির্বাচনে না গিয়ে বিএনপি মারাত্মক ভুল করেছে। তাদের বিজয় ছিল অবশ্যম্ভাবী। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আওয়ামী লীগের সাংসদেরা বহাল, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায়, এ অবস্থায় কি বিএনপিকে জিততে দেওয়া হতো? তাঁরা কথাটা উড়িয়ে দিলেন। বললেন, কারচুপির কোনো সুযোগই ছিল না। মানুষের বন্যায় সব ভেসে যেত।

আমি রাজশাহীতে গিয়ে বিভিন্নজনের সঙ্গে কথা বলে জানলাম, নির্বাচনে গেলে মোট ছয়টি আসনের সব কটিতেই বিএনপি চোখ বন্ধ করে জিতে যেত। কারও মধ্যে কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা যায়নি। যেমন রাজশাহী-৬, বাঘা-চারঘাট আসনে ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এক লাখ ২৭ হাজার ভোট পেয়ে জিতেছিলেন। এবারও তিনি জিতেছেন। বিএনপির প্রার্থী ছিল না। ছিল আওয়ামী লীগেরই বিদ্রোহী প্রার্থী। ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে এই দুই আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বীর মিলিত ভোটের পরিমাণ মোট মাত্র ৯১ হাজার। গত নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগ প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোটের চেয়েও প্রায় ৩০ হাজার কম! তাহলে দেখুন, আওয়ামী লীগের অবস্থান কত পড়ে গেছে। বিএনপি থাকলে তাদের বিজয় কে ঠেকাত?

দুই দিন আগে ঢাকায় সাতক্ষীরার একজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনি বললেন, ওদের ওখানে নির্বাচন হলে চারটি আসনের সব কটিতেই আওয়ামী লীগ পরাজিত হতো। সেখানে মূলত জামায়াতের প্রভাব। বিএনপির তেমন প্রভাব নেই। কিন্তু কথা তো একই। জামায়াত জিতলেও তো বিএনপির ভাগেই যেত। হয়তো সদর আসনে জাতীয় পার্টি জিতত। বাকি তিনটির মধ্যে জামায়াত একটি ও বিএনপি দুটি আসন পেত। আমি ওখানের লোকজনের সঙ্গে ফোনে কথা বলে দেখেছি, তাদের চিন্তার সঙ্গে সব মিলে যায়।

সিলেটে কথা বললাম। পরিচিতজনেরা জানালেন, সিলেট বিভাগের ১৯টি আসনের মধ্যে ১৭টিতেই বিএনপি চোখ বন্ধ করে জিতে যেত। আওয়ামী লীগ হয়তো দুটি আসনে জিততে পারত।

অবশ্য আলোচ্য তিন জেলায় বিএনপির পাল্লা ভারী। ফরিদপুর, দিনাজপুরসহ অন্য অনেক জেলায় হয়তো আওয়ামী লীগের প্রার্থীরাও জিতত। ফলে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে বিএনপি জিতলেও দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া কঠিন হতো। বিএনপি হয়তো ভেবেছিল সরকারের পতন ঘটিয়ে নির্বাচনে গেলে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য থাকবে। এই চিন্তাই তাদের কাল হয়েছে। মানুষ এখন আর কোনো দলের একাধিপত্য চায় না। এটা সত্যিই দুর্ভাগ্য যে বিএনপি মানুষের মনের কথা বুঝতে পারেনি।

মোটের ওপর নির্বাচনে গেলে বিএনপি অনায়াসে জিততে পারত। প্রশ্ন ওঠে, অবস্থাটা যদি ওই রকমই হয়ে থাকে, তাহলে আজ কেন জরিপে মানুষ বলছে যে ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপি কম ভোট পেত? এর কারণ হলো, বিএনপি নির্বাচন বর্জনের জন্য যে মারাত্মক ও নির্মম সহিংসতার পথ ধরেছিল, তার ফলে মানুষ ক্রমে দূরে সরে গেছে। পেট্রলবোমা, ককটেল, পুলিশ হত্যা, বাস-ট্রাকের চালক হত্যা, শিশু হত্যা, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া, দিনের পর দিন হরতাল-অবরোধ—এর প্রতিটি কর্মসূচি মানুষের মন বিষিয়ে তুলেছে। কৃষক থেকে শুরু করে গরিব দিনমজুর-খেটে খাওয়া মানুষ ছিল অসহায়। অনেক ব্যবসায়ী শিল্পপতিকে লোকসান গুনতে হয়েছে।

বিএনপি যদি সেপ্টেম্বর-অক্টোবর থেকেই নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করত, তাহলে মানুষের ঢল নামত বিএনপির পক্ষে। কিন্তু পরে যখন দেখল দেশকে বিএনপি সহিংসতার বিপজ্জনক পথে ঠেলে দিচ্ছে, তখনই ভোটারদের মনোভাব বদলাতে থাকে। এ জন্যই নির্বাচনের আগে ও পরে জরিপের ফলাফল উল্টে গেছে। বিএনপি বলবে, ওরা কোনো সহিংসতা করেনি, করেছে জামায়াত। হতে পারে। কিন্তু তাদের মৌন সমর্থন
ছাড়া কি জামায়াতের সাধ্য ছিল সহিংসতা করার? এটা তো মানুষ বোঝে।

আরেকটি প্রশ্ন হলো, নির্বাচনের আগে বিএনপির পক্ষে এত বিশাল সমর্থন থাকা সত্ত্বেও মানুষ কেন রাস্তায় নেমে নির্বাচন প্রতিহত করল না? কারণ, মানুষ সহিংসতার পথে নয়, গণতন্ত্রের পথেই ওই একতরফা নির্বাচনকে ‘না’ বলাকে শ্রেয় মনে করেছে। দু-চারটি ছাড়া বাকি সব কটি আসনেই মানুষ বাসায় বসে থেকে, ভোটকেন্দ্রে না গিয়ে তাদের প্রতিবাদ জানিয়েছে। একই সঙ্গে তাদের একটা বড় অংশ বলতে গেলে বিএনপির সহিংসতার প্রতিও ‘না’ জানিয়ে দিয়েছে। তাদের দলে দলে রাস্তায় নেমে না আসার কারণ এটাই। এখানে বিএনপি ভুল করেছে। তাদের হিসাব ছিল জনপ্রতিরোধ নির্বাচন রুখে দেবে, সরকারের পতন ঘটবে। মানুষ কিন্তু সেই মেজাজে ছিল না।

বিএনপির সহিংসতা ও একটানা হরতাল-অবরোধে বিপর্যস্ত হয়ে আজ, নির্বাচনের পর, মানুষ আগের মতো আর বিএনপিকে ঢালাওভাবে ভোট দিতে আগ্রহী না। ডিআই জরিপের ফলাফলের এটাই তাৎপর্য। নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পর মানুষ একটু স্বস্তি পেয়েছে। দিনের পর দিন হরতাল-অবরোধ-ককটেল খেতে কেউ রাজি নয়। এখন শান্তিতে চলাফেরা করা যাচ্ছে। পথেঘাটে বোমা-ককটেলে মারা যাওয়ার আশঙ্কা কম। এটাই ভালো।

একটা বিষয় পরিষ্কার। বোমা মেরে সরকারের পতন ঘটানোর স্বপ্ন থেকে বিরোধী দলকে বেরিয়ে আসতে হবে। জামায়াত যে বৃহস্পতিবার আবার হরতাল ডেকেছে, তার বোঝা কিন্তু ওই বিএনপিকেই টানতে হবে। তাই জামায়াতের সংশ্রব ছাড়তে হবে, অথবা পরিষ্কার বলতে হবে জামায়াতের হরতাল বিএনপি সমর্থন করে না। তারা সংবাদ সম্মেলন করে, পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে বলুক যে জামায়াতের সঙ্গে ওরা নেই।

যদি বিএনপির বোধোদয় হয় ভালো। না হলে মানুষ তার পথ বেছে নেবে। বাঙালির টিকে থাকার অসাধারণ ক্ষমতা। সেদিন প্রথম আলো কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাবেক মহাসচিব আইরিন খান বলছিলেন, সাধারণ বাঙালি ইটালিতে যায়। প্রথমে রাস্তায় ফুটপাতে দাঁড়িয়ে পথচারীদের কাছে গোলাপ ফুল বিক্রি করে দুই পয়সা কামাই করেন। একটু পয়সা জমলেই ছোটখাটো ব্যবসা খুলে বসেন। তাঁরাই দেশে টাকা পাঠান। দেশের বৈদেশিক মুদ্রাভান্ডার সমৃদ্ধ করেন।

অবরোধের সময় আমি বাসে করে যাচ্ছিলাম। খুব ভিড়। হঠাৎ একজন আসন ছেড়ে আমাকে প্রায় জোর করে বসিয়ে দিলেন। জানতে পারলাম, তিনি আমাদের পত্রিকা অফিসের সামনে রোজ বিকেলে জুতার খুচরা দোকান বসান। রমজান মিঞা। তিনি বাসে করে গুলিস্তানে যান আর সেখান থেকে জুতা কিনে এনে কারওয়ান বাজারে বিক্রি করেন। লাভ মোটামুটি ভালো। তিনি জানালেন, এত হরতালের মধ্যেও ক্রেতা মোটামুটি ছিল, তিনি খেয়েপরে বেঁচে আছেন। অল্পে খুশি বলেই তাঁর মুখে হাসিটি অমলিন। বলেন, হরতাল-অবরোধের মধ্যেও তো সংসার চালাতে হবে। রোববার তাঁর সঙ্গে দেখা হলে বলেন, স্যার, আমাদের ব্যবসা আবার পুরোদমে শুরু হয়ে গেছে। রমজান মিঞাকে হাজার সালাম জানাই। তাঁরা আছেন বলেই দেশ অচল হয় না।

রাজশাহীতে কথা হচ্ছিল আলমিরা আর্টস অ্যান্ড ফার্নিচারের স্বত্বাধিকারী আরাফাত রুবেলের সঙ্গে। পারটেক্সের ব্যবসা করেন। নিজে ডিজাইন করেন, তাঁর আসবাব জনপ্রিয়। তিনি বললেন, রাজনৈতিক গোলযোগে যেটুকু লোকসান হয়েছিল, গত তিন সপ্তাহে পুষিয়ে গেছে। এখন কেনাকাটার ধুম পড়েছে। আর চিন্তা নেই।

এই মানুষগুলো আছে বলেই বাংলাদেশ টিকে আছে। টিকে থাকবে।

আব্দুল কাইয়ুম: সাংবাদিক।

quayum@gmail.com     

কালের পুরাণ- জামায়াতমুক্ত বিএনপি! দেশ সন্ত্রাসমুক্ত হবে কি? by সোহরাব হাসান

Sunday, January 26, 2014

নির্বাচনের আগে ও পরে সারা দেশে যে সংঘাত, সহিংসতা, গাড়ি পোড়ানো, বাড়ি জ্বালানোর ঘটনা ঘটেছে; তার মূল হোতা যে জামায়াতে ইসলামী ও তার ছাত্রসংগঠন ছাত্রশিবির—এ ব্যাপারে কারও সন্দেহ নেই।
সরকারের দমন-পীড়নও এর পক্ষে কোনো সাফাই হতে পারে না। এসব নারকীয় ঘটনা অস্বীকার কিংবা সেই ঘটনাকে একমাত্র রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা—দুটোই রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের পরিচয়।

কিন্তু আমাদের প্রশ্ন হলো জামায়াতে ইসলামীর মতো একটি প্রায় গণবিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক দল, সারা দেশে যাদের জনসমর্থন এখন ৩ শতাংশে এসে ঠেকেছে; দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যার অংশ নেওয়ারই যোগ্যতা ছিল না এবং নবম জাতীয় সংসদে মাত্র দুটি আসন পেয়েছিল, সেই দলটি কীভাবে বছরজুড়ে এত সব তাণ্ডব ঘটাল? এটি কি নিছক বিএনপির সঙ্গে জোট বাধার জন্য, না আরও গভীরে এর কারণ লুকিয়ে আছে?
নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ কেন তাঁর নির্বাচনী এলাকার জামায়াতের একজন রুকনকে ফুলের মালাসমেত দলে নিয়ে এলেন, তার ব্যাখ্যা নেই। এখন যদি ওই রুকনের পথ অনুসরণ করে জামায়াতের সব নেতা-কর্মী আওয়ামী লীগে যোগদানের জন্য লাইন দেন, তাহলে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব কি তাঁদের সাদরে বরণ করে নেবে? ক্ষমতার রাজনীতির অঙ্ক এমন সরলরেখায় চালিত হলেও আদর্শের রাজনীতি বড় কঠিন। সেই কঠিনকে আওয়ামী লীগ ভালোবাসতে প্রস্তুত আছে বলে মনে হয় না।
বিএনপি জামায়াতে ইসলামী নামের দলটির সঙ্গে গাঁটছড়া রাখবে কি রাখবে না, সেটি তাদের একান্ত নিজস্ব বিষয়। কিন্তু বিএনপি নেতৃত্বকে মনে রাখতে হবে যে জামায়াতের কারণেই আজ তাদের মৌলবাদের দোসর, জঙ্গিবাদের সহযোগী এবং যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষকের যে বদনাম হয়েছে, তা ঘোচানো কঠিন হবে। মধ্যপন্থী বিএনপি কী করে একটি মৌলবাদী দলের সঙ্গে একীভূত হলো?
এসব কথা বললে নিশ্চয়ই বিএনপি-সমর্থক বুদ্ধিজীবীরা হইচই করে উঠবেন এবং জানান দিতে চাইবেন, জামায়াতের সঙ্গে কেবল বিএনপিই জোটবদ্ধ হয়নি; আশির দশকে ও নব্বইয়ের দশকে আওয়ামী লীগও জোট বেঁধেছিল। আওয়ামী লীগ ছিয়াশি সালে ও পঁচানব্বই-ছিয়ানব্বইয়ে জামায়াতের সঙ্গে জোট বাঁধেনি। ছিয়াশিতে দলটি তার নিজের স্বার্থেই নির্বাচন করেছিল; যেমনটি করেছিল আওয়ামী লীগ। আর ১৯৯৫-৯৬ সালে আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে যে আন্দোলন গড়ে তোলে, সেই আন্দোলনে জামায়াত ও জাতীয় পার্টিও যোগ দিয়েছিল রাজনৈতিক সুবিধা পেতে। এরশাদ আমলে তিন জোটের পাশাপাশি জামায়াত যে যুগপৎ আন্দোলন করেছিল, তার যোগসূত্রটি ছিল বিএনপিই। ১৯৯৫-৯৬ সালের আন্দোলনে জামায়াত সহযাত্রী হওয়া সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ যুদ্ধাপরাধের বিচারের আন্দোলনেও জোরালো ভূমিকা রেখেছিল। অন্যদিকে সেই আন্দোলনের কারণে বিএনপি সরকার জাহানারা ইমামসহ ২৪ বিশিষ্ট নাগরিকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করে। বিএনপির বাকি আমল সেই মামলা ঝুলে ছিল; বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে তা প্রত্যাহার করে নেয়।
এখন বিএনপি যদি যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রতি সমর্থন জানিয়ে জামায়াতের সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলন করত, তাহলে কারও কিছু বলার থাকত না। দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। বিএনপির নেতৃত্ব কেবল জামায়াতকেই আন্দোলনের সহযাত্রী করেনি, ১৮-দলীয় জোটে এমন কিছু ধর্মান্ধ দলকে যুক্ত করেছে, যারা কখনোই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিশ্বাস করে না। তারা বিশ্বাস করে হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফায়। আর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটের শরিকেরা যত কমজোরিই হোক না কেন, তারা চিন্তাচেতনায় বামপন্থার অনুসারী। দুই জোটের মৌলিক পার্থক্যটাও এখানে। তবে আমরা একইভাবে সাবেক স্বৈরাচারের সঙ্গে আওয়ামী লীগের গাঁটছড়া বাঁধাকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারি না। বিগত নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে সবচেয়ে বিপদে ফেলেছে এরশাদ। তার অস্বাভাবিক কর্মকাণ্ডই নির্বাচনকে বেশি প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। রাজাকারের মতো স্বৈরাচারও গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক।
বিএনপির নেতৃত্ব স্বীকার করুক আর না করুক জামায়াত-শিবির যে তাদের ঘাড়ে বন্দুক রেখেই যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে সারা দেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়েছিল, তা দিবালোকের মতো স্পষ্ট। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকেই সরকার ও প্রশাসনকে অকেজো করে দিতে তারা একের পর এক বোমা হামলা চালিয়েছে, বাস-ট্রাক পুড়িয়েছে, পুলিশ খুন করেছে। বিএনপির মতো একটি নিয়মতান্ত্রিক দল কেন সেই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে নিজেদের যুক্ত করল সেটাই বড় প্রশ্ন। শত্রুর শত্রু যে সব সময় মিত্র হয় না, সেটা আবার প্রমাণিত হলো।
বিএনপির নেতৃত্বের ব্যর্থতা হলো, তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলনটিকে জামায়াত-শিবিরের যুদ্ধাপরাধের বিচার বন্ধে পরিচালিত আন্দোলন থেকে পৃথক করতে পারেনি। যুদ্ধাপরাধের বিচার এবং জোটের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে জামায়াত-শিবিরের নাশকতায় তারা সমভাবে মৌনতা অবলম্বন করেছে। ক্ষেত্রবিশেষে বিএনপির স্থানীয় নেতা-কর্মীরাও যুক্ত হয়েছেন। নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা তিন মাস ধরে চললেও জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাস ও নাশকতা চলেছে বছরজুড়েই; নির্বাচনের প্রাক-মুহূর্তে এবং পরে যা সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতায় রূপ নিয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত যে বাংলাদেশ, সেই বাংলাদেশে এ ধরনের সাম্প্রদায়িক সহিংসতা কীভাবে ঘটল? গণতন্ত্রের সঙ্গে স্বৈরতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্রের যতটুকু দূরত্ব, তার চেয়ে কম দূরত্ব নয় সাম্প্রদায়িকতার। আমাদের দুর্ভাগ্য, এক পক্ষ কেবল স্বৈরতন্ত্রকে গণতন্ত্রের বিপদ মনে করে, সাম্প্রদায়িকতাকে নয়। অন্য পক্ষ সাম্প্রদায়িকতাকে বিপদ ভাবলেও স্বৈরতন্ত্রের বিপদ আমলে নেয় না।
প্রধানমন্ত্রী অভয়নগরের মালোপাড়ায় আক্রান্ত ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘এই মাটির সন্তান আপনারা। অধিকার নিয়েই আপনারা এখানে থাকবেন। কেউ আপনাদের অধিকার ছিনিয়ে নিতে পারবে না। মনে জোর নিয়ে আপনাদের রুখে দাঁড়াতে হবে। আমরা আপনাদের পাশে আছি।’ প্রধানমন্ত্রীর কথায় আবেগ ও আন্তরিকতা আছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের প্রতিটি নেতা-কর্মী কি প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য হূদয়ে ধারণ করেন? করেন না। করলে আক্রান্ত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সাহায্য চেয়েও কেন পায়নি? কেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা সময়মতো এগিয়ে এলেন না। কেন প্রশাসন ও পুলিশ নির্বিকার ছিল? আসলে সাম্প্রদায়িকতা যখন সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মনের গভীরে বাসা বাঁধে, তখন আওয়ামী লীগ-বিএনপি থাকে না; সব এক হয়ে যায়। কেউ আক্রমণ করে, কেউ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। ৪২ বছর ধরেই সংখ্যালঘুদের ওপর এ নির্যাতন চলে আসছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ওহাবের বিরুদ্ধে উসকানির অভিযোগ আছে। সরকার কি তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে? এ রকম একজন ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানে কীভাবে গেলেন? সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার কারণ এই বিচারহীনতা। অপরাধীদের শাস্তি না পাওয়া।
সরকার সংখ্যালঘুদের পুড়িয়ে দেওয়া বাড়িঘর দ্রুত নির্মাণ করেছে। কিন্তু তাদের মনে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, ইটপাথরের দেয়াল তা মুছে ফেলতে পারবে না। সে জন্য চাই সরকার, রাজনৈতিক দল ও সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের সম্মিলিত উদ্যোগ।
মওলানা ভাসানী একবার বলেছিলেন, নকশাল কারও গায়ে লেখা থাকে না। সেই কথাটি একটু ঘুরিয়ে বলা যায়, সাম্প্রদায়িকতাও কারও গায়ে লেখা থাকে না। খালেদা জিয়া কিংবা বিএনপির অন্যান্য নেতা যখন কথায় কথায় ভারতীয় জুজুর ভয় দেখান, তখন তার মধ্যে বৃহৎ প্রতিবেশী সম্পর্কে ক্ষোভের পাশাপাশি ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতিও দলটির প্রচ্ছন্ন হুমকি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। যাঁরা আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে মসজিদে উলুধ্বনি শোনা যাবে বলে বক্তৃতা করেন এবং যাঁরা ভোটের হিসাবে সংখ্যালঘুদের নাম বাদ দিয়ে রাখেন; সংখ্যালঘুরা কোন ভরসায় তাঁদের ভোট দেবেন?
ডেইলি স্টার-এ মাহ্ফুজ আনাম বিএনপিকে উদ্দেশ করে লিখেছেন, পুরোনো ধ্যানধারণা, পুরোনো কৌশল, পুরোনো মিত্র কোনো সুফল বয়ে আনবে না; বরং বোঝা হয়ে থাকবে। তবে এটি কেবল বিএনপির জন্য নয়, ক্ষমতাসীন দলটির জন্যও সমান সত্য। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে বুঝতে হবে সবকিছুর দায় বিএনপি-জামায়াতের ওপর চাপালে দেশে শান্তি আসবে না, সুশাসনও প্রতিষ্ঠিত হবে না।
প্রধানমন্ত্রী বিএনপিকে জামায়াতমুক্ত হতে বলেছেন। তিনি বোঝাতে চাইছেন, জামায়াতমুক্ত হলে বিএনপি সন্ত্রাসমুক্ত হবে। কিন্তু দেশকে সন্ত্রাসমুক্ত করার এবং রাখার দায়িত্ব সরকারেরই। অতএব আওয়ামী লীগকেও পুরোনো কৌশল, দোষারোপের পুরোনো রাজনীতি পরিহার করে দেশকে সামনে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবতে হবে। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে। সমালোচনা সহ্য করার ধৈর্য থাকতে হবে। সবকিছু বিএনপি-জামায়াতের কাজ বলে দায় এড়ানোর প্রবণতা কাজে দেবে না।
বিএনপি সংসদে থাকুক বা না থাকুক, তার সঙ্গে একটি কর্মসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সেটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য ও শক্তি।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বিএনপি নেত্রী নির্বাচনে না গিয়ে যে ভুল করেছেন, এখন তাঁকে খেসারত দিতে হবে। খেসারত দিচ্ছেনও। তবে একটি রাজনৈতিক দল বা নেত্রী ভুল করলে তার খেসারত দলের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীকে মনে রাখতে হবে যে, একটি সরকার ভুল করলে তার খেসারত গোটা জাতিকেই দিতে হয়।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

প্রসঙ্গ জামায়াত- আওয়ামী লীগের উস্কানি বিপদে বিএনপি

বিএনপির কারাবন্দি জ্যেষ্ঠ নেতা মওদুদ আহমদ ইঙ্গিত করেছেন যে, ১৯৯১ সালে জামায়াতের সমর্থনে বিএনপি সরকার গঠন করে ‘আওয়ামী লীগের উস্কানিতেই’ জামায়াতকে বিপদে ফেলেছিল।
আবার তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার দাবির মুখেই জেনারেল এরশাদকে গুলশানের সাব-জেল থেকে কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়েছিল। অথচ আওয়ামী লীগ পরে এই দু’টি দলকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপির নির্বাচিত সরকার উৎখাতের আন্দোলনে শরিক হয়েছিল।

২০১২ সালে মওদুদ আহমদের বইটি প্রকাশ করেছে ইউপিএল। ‘বাংলাদেশ এ স্টাডি অব দ্য ডেমোক্রেটিক রেজিমস’ শীর্ষক বইয়ে মওদুদ আহমদ জামায়াত-বিএনপি সমঝোতা এবং তা ভঙ্গ হওয়ার নেপথ্য ইতিহাস বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। মওদুদের বর্ণনা মতে, জেনারেল মোহাম্মদ নুর উদ্দীন খান খালেদা জিয়া ও গোলাম আযমের মধ্যে দূতিয়ালি করেন। স্থান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জি ডব্লিউ চৌধুরীর বাসভবন। এখানে বেগম খালেদা জিয়া, গোলাম আযম ও মতিউর রহমান নিজামীর মধ্যে বৈঠকটি হয়। সে সময় ১৮ আসনধারী জামায়াত ওই বৈঠকের পর প্রেসিডেন্টকে লিখিতভাবে বিএনপিকে সমর্থনের কথা জানিয়ে দেয়।
মওদুদ লিখেছেন, ‘কি করে সমঝোতা রদ হলো সে প্রশ্নটি কোন আদালতের মামলার বিষয় ছিল না। কিংবা তার নাগরিকত্বের কারিগরি দিক নিয়েও ছিল না। এমনকি অধ্যাপক গোলাম আযম একজন কোলাবরেটর ছিলেন কি ছিলেন না কিংবা এই প্রশ্নও ছিল না যে বাংলাদেশ থেকে তাকে বহিষ্কার করার সিদ্ধান্ত ঠিক ছিল কি ছিল না।’
এরপর মওদুদ বলেন, ‘কিন্তু এই প্রশ্নটি এক বিশাল বিস্ময়ের সঙ্গে তোলা যেতে পারে যে কি করে জামায়াতের সমর্থন নিয়ে গঠিত সরকার তাদের আমীরকেই কারাগারে পাঠিয়েছিল? সেটা কেবল দুই নেতার মধ্যকার সমঝোতার লঙ্ঘন নয় সেটা রাজনৈতিক আস্থা ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে একটি ঘোরতর প্রতারণাও বটে। যদি জামায়াত ও অধ্যাপক  গোলাম আযম পাাকিস্তানি দখলদার সরকারের সহযোগীই হয়ে থাকবেন, তাহলে বেগম জিয়া কেন সরকার গঠনে ১১ বামপন্থি সংসদ সদস্যের সমর্থন নিলেন না?’ তিনি ইঙ্গিত দেন যে, ওই বামেরা যাদের কেউ কেউ এখন মহাজোটে সক্রিয় তারা খালেদা জিয়াকে সমর্থন দিতে চেয়েছিলেন।
মওদুদ আরও লিখেছেন, গোলাম আযম দেশের ভেতরে ও বাইরে সক্রিয়ভাবে বাংলাদেশ বিরোধী প্রচারণায় অংশ নেন বলে বিএনপি সরকারের পক্ষে আদালতে দেয়া বিবৃতিতে বলা হয়। ১৯৭১ সালের পর গোলাম আযম পাকিস্তানের নাগরিক হন। বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্যের শপথ তিনি নেননি। জামায়াতে ইসলামীর সশস্ত্র ক্যাডাররা রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেয় কেবল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহায়তা করতেই। গোলাম আযম বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে রাজাকার, আলবদর এবং আল-শামসের মতো বাহিনী গঠনে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সাহায্য করেন। ১৯৭১ সালের এপ্রিলে বর্বর জেনারেল টিক্কা খানের সঙ্গে তাকে দেখা যায়। অধ্যাপক আযমকে লিবিয়ায় একটি সম্মেলনে যোগ দিতেও দেখা যায়। সেখানে তিনি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দিতে ইসলামী পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের প্রতি আবেদন জানান। মুজিব সরকার গোলাম আযমসহ ৩৮ জনকে তাই বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে অযোগ্য ঘোষণা করে।
মওদুদ আহমদ তথ্য প্রকাশ করেন যে, ‘জামায়াতে ইসলামীর আমীর হিসেবে গোলাম আযমের নিয়োগ এবং তার নাগরিকত্ব ফেরত দান ছিল সমঝোতার শর্ত। মওদুদ আহমদ পরোক্ষ মন্তব্য করেন যে, সেদিন প্রকারান্তরে জামায়াতের সঙ্গে বিশ্বাস ভঙ্গ করা হয়েছিল। নাগরিকত্ব ও আমীরত্ব না দিয়ে বরং তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। গোলাম আযম কারাগারে ছিলেন পুরো রমজান মাস।
এরশাদ ও জাপা: মওদুদ মনে করেন, ১৯৯০ সালের ৬ই ডিসেম্বরের পর জেনারেল এরশাদের জাতীয় পার্টি ও তার নেতাকর্মীদের প্রতি বিএনপি প্রতিহিংসার রাজনীতি অনুসরণ করে। তার ভাষায়, ‘অভিযোগ রয়েছে যে জামায়াতে ইসলামীর মতোই জাতীয় পার্টির বিরুদ্ধেও বিএনপি প্রতিহিংসামূলক নীতির আশ্রয় নিয়েছিল। আর তাতে আওয়ামী লীগ অনেকটাই উস্কানি দিয়েছিল। এর ফলে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের সঙ্গে দেশের প্রধান ধারার দল এবং শক্তিশালী মিত্রদের সঙ্গে তার দূরত্ব সৃষ্টি করে।’
মওদুদ আহমদ স্মৃতিচারণ করেন যে, ‘সংসদে দাঁড়িয়ে শেখ হাসিনা বলেছিলেন যে, এরশাদ কেন কূটনৈতিক এলাকার বিলাসবহুল বাড়িতে থাকবেন? এরপরই খালেদা জিয়া তাকে কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠান। আবার গোলাম আযমের ক্ষেত্রেও দলটি একই সুর তোলে। বলে যে, বাংলাদেশের নাগরিক না হওয়া সত্ত্বেও গোলাম আযম কেন আইন লঙ্ঘন করে বাংলাদেশে থাকবেন? দেশের একটি রাজনৈতিক দলের আমীর হবেন? তখন বিএনপি সরকার অমনি তাকে দ্রুত দেশের বাইরে পাঠাতে তোড়জোড় শুরু করে। অথচ সময় গড়ালে দেখা গেল জামায়াত ও জাতীয় পার্টি সেই আওয়ামী লীগের সঙ্গেই হাত মিলিয়ে ১৯৯৬ সালে বিএনপি সরকারের অসম্মানজনক গদিচ্যুতি নিশ্চিত করেছিল।’

ঘুরে দাঁড়াতে বিএনপির কৌশল by কাফি কামাল

রাজনীতি ও আন্দোলনে ঘুরে দাঁড়াতে তিন লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছে বিএনপি। সারা দেশে সাংগঠনিক ভিত্তি সুসংহত, স্থানীয় নির্বাচন ও জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে জনমত জোরদার করতে চায় দলটি।
৫ই জানুয়ারি একতরফা নির্বাচনের পর নতুন উদ্যমে পথ চলতেই এ প্রস্তুতি চলছে বিএনপিতে। স্থানীয় নির্বাচনের ফলাফল ও কাউন্সিলে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মতামতের ভিত্তিতেই নির্ধারণ করা হবে পরবর্তী আন্দোলন কর্মসূচি। ফলে এ মুহূর্তে সর্বাধিক গুরুত্ব পাচ্ছে কাউন্সিল ও স্থানীয় নির্বাচন। বিরোধী জোটের নেতারা মনে করেন, একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বর্তমান সরকার এক বছরের বেশি সময় স্থায়ী হতে পারবে না। ২৩শে জানুয়ারি চিকিৎসক প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে খোদ বিরোধী জোটের শীর্ষ নেতা খালেদা জিয়া এমন মন্তব্য করেছেন। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের আমলে নানা ইস্যুতে আন্দোলন করেছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮দল। এক পর্যায়ে নির্দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের একক দাবিতে পরিচালিত হয় তাদের চূড়ান্ত আন্দোলন। এ দাবিকে সফল করতে সারা দেশে রোড মার্চসহ অন্তত দুইবার সফর করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। চারদলীয় জোটের পরিধি বেড়ে ১৮দলীয় হয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে পেয়েছে সাফল্য। সরকারের কঠোর অবস্থানের মুখে শেষ সময়ে আন্দোলনের মাঠে দাঁড়াতেই পারেনি বিরোধী নেতাকর্মীরা। বিএনপি নেতারা জানান, বিরোধী দলের অবস্থান থেকে দেশে ইতিবাচক রাজনীতি প্রতিষ্ঠার একটি প্রচেষ্টা ছিল বিএনপির। কিন্তু সরকার বিরোধী দলসহ দেশের বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, পেশাজীবীসহ সাধারণ মানুষের মতামতের তোয়াক্কা করেনি। এমনকি বন্ধু রাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের উদ্যোগেও ইতিবাচক সাড়া দেয়নি সরকার। বিরোধী নেতাদের গ্রেপ্তার, হত্যা ও দমন-পীড়নের মাধ্যমে একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করে এখন তারা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। বিএনপি নেতারা বলেন, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের পর বিএনপির নেতৃত্বে ১৮দলের আন্দোলনের সাফল্য-ব্যর্থতা ও ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে পর্যালোচনা চলছে। ইতিমধ্যে পেশাজীবী নেতাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে সে সব ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে কথা বলেছেন খালেদা জিয়া। ২০১৩ সালের শেষদিকে সারা দেশের মানুষের জনসমর্থনের জোয়ার, আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের উদ্যোগ ও আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি ছিল পুরোটাই সরকারের বিপক্ষে। কিন্তু চূড়ান্ত সাফল্য আসেনি বিরোধী জোটের। কেন এমনটি হলো তা নিয়ে এখন চুলচেরা বিশ্লেষণের পাশাপাশি তা থেকে উত্তরণের নানা কৌশল প্রণয়ন করছে বিএনপির নীতিনির্ধারক মহল। বিএনপির নীতি-নির্ধারক মহল নীতিগতভাবে একমত হয়েছেন জনসমর্থন জোরালো থাকলেও পাশাপাশি দুর্বলতা ছিল সাংগঠনিকভাবে। মামলা-হামলা নিয়ে সরকারের কঠোর পদক্ষেপে একপর্যায়ে আত্মগোপনে যান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা আলমগীরসহ দলের স্থায়ী কমিটি, ভাইস চেয়ারম্যান ও যুগ্ম মহাসচিবদের বড় অংশটিই। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের এমন আত্মরক্ষামূলক অবস্থানের সুযোগকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছে সরকার। কেন্দ্রীয় নেতাদের বড় অংশটিই গা বাঁচিয়ে চলেছে পুরো সময়। অন্যদিকে ঢাকা মহানগরসহ দেশের অনেক জেলা ও উপজেলা কমিটি এখনও অপূর্ণাঙ্গ। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সেখানে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারেনি। মূল্যায়ন বঞ্চিত নেতাকর্মীদের একাংশও ছিল নিষ্ক্রিয়। এছাড়া অব্যাহতভাবে দমন-পীড়নের শিকার তৃণমূল নেতৃত্ব হয়ে পড়ে বিপর্যস্ত। বিএনপির নীতিনির্ধারক নেতারা জানান, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে দলের ৬ষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। সে কাউন্সিলে কাউন্সিলরদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নেতৃত্বের প্রতিটি ধাপে উল্লেখযোগ্য একটি পরিবর্তন আনতে চান শীর্ষ নেতা খালেদা জিয়া। নিষ্ক্রিয়দের সরিয়ে ত্যাগী ও নির্যাতিতদের মূল্যায়নের মাধ্যমে তৃণমূলকে চাঙ্গা ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রতি আস্থার সৃষ্টি করা হবে। এছাড়া আন্দোলনে ব্যর্থতার বড় একটি কারণ ছিল জোটের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। জোটের শরিক দল জামায়াতের প্রতি সরকারের চূড়ান্ত আক্রোশের শিকার হয়েছে বিএনপি। নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলার দায় চাপানো হয়েছে বিএনপির ঘাড়ে। জামায়াতের সঙ্গে দূরত্ব রক্ষার মাধ্যমে জোটগত রাজনীতি করার কৌশল নিতে চায় বিএনপি। সেক্ষেত্রে আন্দোলনের মাঠ দখলে রাখার জন্য সাংগঠনিক পুনর্গঠনের বিকল্প দেখছেন না শীর্ষ নেতৃত্ব। এছাড়া সাংগঠনিক ভিত মজবুত করতে শিগগিরই বিভিন্ন জেলা সফর করবেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। কয়েকজন সিনিয়র নেতা জেলা সফর শুরু করেছেন। বিএনপি নেতারা জানান, সার্বিক দিক বিবেচনা করলে ১৮দলের নির্দলীয় সরকার আন্দোলন ব্যর্থ হয়নি। স্বাধীনতার পর আর কোন ইস্যুতে এত বেশি জনসমর্থন সৃষ্টি হয়নি। কোন আন্দোলনে সারা দেশের মানুষ এভাবে সমর্থন দেয়নি। কোন আন্দোলনই সারা দেশে এভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে- বিরোধী দলের আহ্বানে সাড়া দিয়ে দেশের ৯০ ভাগ মানুষ ৫ই জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনে অংশ নেয়নি। বিএনপি নেতারা বলেন, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ইতিহাসে দুইটি বড় ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। এতদিন ছিল বাকশাল আর এবার ৫ই জানুয়ারির একতরফা নির্বাচন। দীর্ঘ মেয়াদি রাজনীতিতে এটি বিএনপির পক্ষেই গেছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় কৌশল ঠিক না করলে দূরবর্তী সে সাফল্য হাতছাড়া হতে পারে। কারণ জনমত ধরে রাখা অনেক কঠিন বিষয়। তাই বর্তমান সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে দ্রুত সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন দিতে বাধ্য করতে জনসমর্থন আরও জোরালো করার কোন বিকল্প নেই। আর জনসমর্থনের পালে নতুন করে হাওয়া বইয়ে দিতেই স্থানীয় নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে বিএনপি। একক প্রার্থী সমর্থন দিতে দলের সিনিয়র নেতাদের সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোতে দায়িত্ব দিয়েছেন খালেদা জিয়া। ইতিমধ্যে দলীয় সমর্থন নিয়ে প্রার্থীর আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করেছেন। স্থানীয় নির্বাচনের ফলাফল অনুকূলে এনে সরকারকে আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে চায় জনসমর্থন বিএনপির পক্ষেই। বিএনপি নেতারা জানান, জনসমর্থন জোরালো করার প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত সহিংসতার ঘটনা তদন্তের পেশাজীবীদের সমন্বয়ে উচ্চ পর্যায়ের চারটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। আর আগামী জুনে সরকারের নতুন বাজেটকে কেন্দ্র করেই শুরু হবে মূল আন্দোলন। বিরোধী নেতা মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজেট প্রণয়ন ও সেটা বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত অর্থের সংস্থান করতে পারবে না সরকার। বাজেটের ঘাটতি, কর বৃদ্ধি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মতো জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে শুরু হবে সে আন্দোলন। তবে কর্মসূচি প্রণয়নে তৃণমূলের মতামতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হবে। বিশেষ করে আঞ্চলিক ইস্যুগুলোতে জোর দেয়া হবে। তারই প্রস্তুতি হিসাবে শিগগিরই সারা দেশে ধারাবাহিক জেলা সফর শুরু করবেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।

ডেটলাইন ২৯শে ডিসেম্বর- যেভাবে নেমে আসে অন্ধকার by মনির হায়দার

কর্মী-সমর্থকদের উৎসাহ ছিল একেবারে তুঙ্গে। ছিল সব রকম প্রস্তুতিও। গণজোয়ার সৃষ্টি হবে ঢাকার রাজপথে। সেই জোয়ারের তোড়ে ভেসে যাবে একতরফা নির্বাচনের সব আয়োজন। সরকার বাধ্য হবে সমঝোতা করতে।
সকলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হবে। অবসান ঘটবে অনিশ্চয়তার। দূর হবে সব রকম শঙ্কা আর আতঙ্ক। বন্ধ হবে খুনোখুনি আর পেট্রল বোমার সন্ত্রাস। নিরাপদ ও স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসবে দেশজুড়ে। এমন স্বপ্ন বুকে নিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন বিরোধীরা। ভয়-বিপত্তি তুচ্ছ করে নানা কৌশলে মফস্বল থেকে ঢাকায় পৌঁছে যান বহু মানুষ। কিন্তু নেতাদের গা বাঁচানো কৌশল আর চালাকিতে ধুলিসাৎ হয়ে যায় সব পরিকল্পনা।

একদিকে ঘটনার দু’দিন আগেই বিরোধী দলের পুরো পরিকল্পনা পৌঁছে যায় সরকারের হাতে। অন্যদিকে মহানগর বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের ভয় দেখানো হয়, রাস্তায় নামলেই সরাসরি গুলি করা হবে। চুল পরিমাণ ছাড়ও দেয়া হবে না। আর তাতেই আঁতকে ওঠেন নেতারা। শীর্ষমহলকে কিছু না জানিয়েই যে যার মতো পালিয়ে বাঁচার কৌশল নেন। এমনকি মোবাইল ফোন বন্ধ করে দিয়ে চলে যান যোগাযোগের একেবারে বাইরে। এ কারণে ঘটনার দিন কাউকেই আর খুঁজে পাওয়া যায়নি কোথাও। কর্মসূচি সফল করার দায়িত্বে থাকা নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি একবারের জন্যও। এছাড়া সরকারের পক্ষে কিছু নেতার ‘ম্যানেজ’ হয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অপরদিকে জামায়াতের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশ ছিল, বিএনপি রাস্তায় না নামলে জামায়াত-শিবিরও নামবে না। শেষ পর্যন্ত তা-ই হলো। বিএনপিকে রাস্তায় দেখা যায়নি। সে কারণে নামেনি জামায়াত-শিবির। স্বাভাবিকভাবেই নামেনি নগরবাসীও। আর এসব কারণেই কার্যত ব্যর্থ হয় ব্যাপক উত্তাপ ছড়ানো ২৯শে ডিসেম্বরের ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচি।
নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন চলে আসছিল প্রায় তিন বছর ধরে। এ ব্যবস্থা সংবিধান থেকে মুছে দেয়া হয় ২০১১ সালের ৩০শে জুন। এরপর থেকেই ব্যবস্থাটি সংবিধানে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে বিরোধী দল। দাবি আদায়ে দফায় দফায় প্রায় ৭৫ দিন হরতাল পালন করা হয়। হরতালের পর শুরু হয় অবরোধ। নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে শুরুর পর নতুন বছরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত একাধিক দফায় প্রায় ৩৫ দিনের অবরোধ কর্মসূচি পালন করে বিরোধী দল। এতে অচল হয়ে পড়ে গোটা দেশ। স্থবির হয়ে যায় জনজীবন। পুরোপুরি ভেঙে পড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা। ব্যাপক নাশকতার কারণে প্রথমবারের মতো মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে ট্রেন চলাচল। ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে যায় শিল্প-কারখানা ও ব্যবসা-বাণিজ্য। অভিজ্ঞজনেরা বলেছেন, স্বাধীন বাংলাদেশে এতটা কড়া আন্দোলন আর কখনও দেখা যায়নি। কিন্তু তাতেও কাজ হলো না। সরকার পাত্তা দেয়নি কোন কিছুকে। নিজেরা যা ভেবেছে, তা করে গেছে নিঃসংকোচে। মহাজোটের সরকারই খুশিমতো প্রথমে সর্বদলীয় সরকার ঘোষণা করেছে। পরক্ষণেই আবার বলেছে, না এটি সর্বদলীয় নয়, নির্বাচনকালীন সরকার। সরকারের ইচ্ছার সঙ্গে তালমিলিয়ে চলে নির্বাচন কমিশনও। বিরোধী দলগুলোর দাবি-দাওয়ার প্রতি ফিরেও তাকায়নি কাজী রকিবউদ্দিনের কমিশন।
এমন পরিস্থিতিতে হরতাল-অবরোধের বাইরে ভিন্নতর আন্দোলনের পথে হাঁটেন খালেদা জিয়া। ২৪ ডিসেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা দেন নতুন কর্মসূচি ‘রোড ফর ডেমোক্রেসি’। একতরফা নির্বাচন প্রতিহত করতে ২৯শে ডিসেম্বর দলে দলে ঢাকার রাজপথে নেমে আসার আহবান জানান দেশবাসীর প্রতি। এই কর্মসূচিকে ঘিরে উত্তাপ-উত্তেজনা তুঙ্গে ওঠে। ঢাকাসহ সারাদেশে বিরোধী দলের নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা ব্যাপক প্রস্তুতি নেন। অন্যদেকি কর্মসূচি ঠেকাতে সরকারও হয়ে ওঠে মরিয়া। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বলে বসলেন, একটি পিঁপড়াও যেন ঢাকায় ঢুকতে না পারে। পুলিশ, বিজিবি ও র‌্যাবসহ প্রশাসনের সর্বশক্তি লাগানো হয় কাজে। রাজধানীতে জড়ো করা হয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ৪০ হাজারেরও বেশি সদস্যকে। বিরোধী দলের অবরোধ ভাঙার চেষ্টা বাদ দিয়ে সরকার নিজেই অবতীর্ণ হয় অবরোধকারীর ভূমিকায়। সব ধরনের পরিবহন-যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়া হয় ২৭শে ডিসেম্বর থেকে। শুরু হয় অঘোষিত সরকারি অবরোধ। কাউকে সন্দেহ হওয়া মাত্রই গ্রেফতার। রাজধানীতে বিভিন্ন থানা ও গোয়েন্দা পুলিশের হাজতখানায় তিল ধরণের ঠাঁই ছিল না। নিদারুণ মানবেতর পরিস্থিতি তৈরি হয় প্রতিটি হাজতে। সর্বত্র দেখা দেয় সীমাহীন আতঙ্ক।
অন্যদিকে বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার গুলশানের বাড়ির সামনে চলে আরেক নাটকীয়তা। শ’ শ’ পুলিশ দিয়ে ঘিরে ফেলা হয় বাড়িটি। সেই সঙ্গে বাড়ির প্রবেশমুখে ফেলে রাখা হয় বালুভর্তি দু’টি ট্রাক। অদ্ভুত এই কাণ্ড নিয়ে ভীতি-আতঙ্কের মধ্যেও সর্বত্র সৃষ্টি হয় হাস্যরস। এই ঘটনায় বিরূপ প্রতিক্রিয়া জানান বিশিষ্টজনরাও। কিন্তু কোন কিছুই বিচলিত কিংবা বিব্রত করেনি সরকারকে।
এমন উত্তাপ-আতঙ্কের মধ্যেই চলে আসে ২৯শে ডিসেম্বর। সর্বত্র টান টান উত্তেজনা। সকাল গড়িয়ে দুপুর। এরপর দুপুর গড়িয়ে বিকেল। দিনের শেষে এক সময় নেমে আসে রাতের আঁধার। কিন্তু সুপ্রিমকোর্ট আঙিনায় বিএনপি-জামায়াত সমর্থক আইনজীবী, জাতীয় প্রেস ক্লাবে সাংবাদিক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নেতৃবৃন্দের বিক্ষোভ ছাড়া রাজধানীর আর কোথাও উল্লেখ করার মতো কোন জনস্রোতের খবর পাওয়া যায়নি। অবশ্য মালিবাগ বাজার এলাকায় জামায়াত-শিবিরের একটি মিছিল বের হওয়া মাত্রই পুলিশ গুলি শুরু করে। তাতে ঘটনাস্থলেই মারা যায় এক শিবির কর্মী। তারপর আর কেউ রাস্তায় নামার সাহস পায়নি।
ওয়াকিবহাল সূত্রগুলো জানিয়েছে, ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ সফল করার লক্ষ্যে বিরোধী পক্ষ যে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছিল, সেটি সরকারের হাতে পৌঁছে যায় ২৭ তারিখেই। নগর বিএনপির নেতাদের মধ্যে কে কোন এলাকায় নেতৃত্ব দেবেন, কোন্‌ দিক থেকে মিছিল আসবে, পল্টনে যেতে না দেয়া হলে বিকল্প জমায়েত কোথায় হবে - সবকিছুই জেনে যায় সরকার। সেভাবেই নেয়া হয় মোকাবেলার সব রকম ব্যবস্থা। কর্মসূচি সফল করার দায়িত্বে থাকা নেতাদেরকে পরিষ্কার জানিয়ে দেয়া হয়, ২৯ তারিখে রাস্তায় নামলেই সরাসরি গুলি করা হবে। এক চুলও ছাড় দেয়া হবে না। আর তাতেই ভয় পেয়ে যান বিএনপির এসব নেতা। শীর্ষ নেতৃত্বকে কিছু না জানিয়ে আগের রাতেই যে যার মতো সটকে পড়েন। বন্ধ করে দেন মোবাইল ফোন। এ কারণে কর্মসূচির দিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তাদের কারও সঙ্গেই আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া কোন কোন নেতাকে বিশেষ ব্যবস্থায় ‘ম্যানেজ’ করার খবরও রয়েছে।
নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, ২৯ তারিখে বেগম খালেদা জিয়াকে যে বাড়ি থেকে বের হতে দেয়া হবে না-  তা আগেই বুঝতে পেরেছিলেন তিনি। এ কারণে আগের দিনের ভিডিও বার্তায় তিনি সেটার ইঙ্গিতও দেন। কিন্তু তাঁর অনুপস্থিতিতে ময়দানে কর্মসূচি সফল করার মূল নেতৃত্ব কে দেবেন তা ঠিক করা ছিল না। এছাড়া গোটা কর্মসূচির কার্যকর কোন সমন্বয়ও ছিল না। এ কারণে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বহু মানুষ মিছিল নিয়ে বের হওয়ার জন্য নির্দ্দিষ্ট স্থানে জড়ো হলেও তাদের দিক-নির্দেশনা দেবার কেউ ছিল না। একই ভাবে মফস্বলের যে হাজার হাজার মানুষ ২-৩ দিন আগেই রাজধানীতে চলে আসেন, তারা রাস্তায় ঘুরেছেন এতিমের মতো। এলোমেলো ঘুরতে থাকায় সন্দেহবশত তাদের অনেককে পুলিশ গ্রেফতার করে হাজতে নিয়ে যায়। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলামের বিপুল সংখ্যক নেতা-কর্মীও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তাদের পূর্বনির্ধারিত স্থানগুলোতে জড়ো হন। কিন্তু তাদের অপেক্ষা করাই সার। বিএনপি নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারায় শেষ পর্যন্ত তারা রাস্তায় নামেননি। কেবলমাত্র মালিবাগ বাজার এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে জামায়াত-শিবিরের একটি মিছিল হঠাৎ রাস্তায় নেমে আসে। সঙ্গে সঙ্গেই গুলি শুরু করে দেয় পুলিশ। তাতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায় এক শিবির কর্মী। আহত হয় অনেকে। এই খবর চাউর হওয়ার পর অন্য কোথাও আর রাস্তায় নামেনি জামায়াত-শিবির। সূত্র জানিয়েছে, জামায়াতের কেন্দ্র থেকে নির্দেশ ছিল, বিএনপি যদি আগে রাস্তায় না নামে, তাহলে জামায়াত-শিবিরও নামবে না। এমন পরিস্থিতিতে বিকল্প কোন কর্মকৌশল বা পরিকল্পনা ছাড়াই বেগম খালেদা জিয়া ঘোষণা দেন, ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ চলবে পরদিনও। কিন্তু দেখা গেল একই দৃশ্যপট। অন্ধকারে মুখ থুবড়ে পড়ে গণতন্ত্রের আন্দোলন, সংগ্রাম।

রাষ্ট্র ও রাজনীতি- বিএনপির ঘাড়ে সিন্দবাদের বুড়ো by আবদুল মান্নান

Wednesday, January 22, 2014

আরব্য রজনীর গল্পে আছে, সিন্দবাদ সাতটি সমুদ্রযাত্রা করেছিল। প্রতিটি যাত্রায় তার যত সব রোমহর্ষক অভিজ্ঞতা। সিন্দবাদের পঞ্চম যাত্রার গল্পে আছে, তার কাঁধে এক বুড়ো সওয়ার হয়েছিল।
বুড়ো আবার কাঁধে এমন প্যাঁচ কষে বসেছিল যে সিন্দবাদ বস্তুতপক্ষে বুড়োর ক্রীতদাসে পরিণত হয়েছিল। শেষে সিন্দবাদ বিশেষ সুরা তৈরি করে বুড়োকে পান করিয়ে তাকে হত্যা করে। সিন্দবাদ তো বুড়ো থেকে নিস্তার পেতে একটা উপায় বের করেছিল। কারণ, সে বুড়োর জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু বিএনপির ঘাড়ে জামায়াত নামের যে বুড়ো বা দৈত্যটি গেড়ে বসেছে, সবার প্রশ্ন, তার কী হবে? কারণ, বিএনপি নামের সিন্দবাদ তো এই দৈত্যটিকে বধ করতে নারাজ।

বিএনপি-জামায়াতের বর্তমান সম্পর্ক অনেকটা দুজন দুজনার মতো। অবশ্য এর আগে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছিলেন, বিএনপি-জামায়াত একই মায়ের পেটের দুই ভাই। এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে সাম্প্রতিক কালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপির যে রাজনৈতিক বিপর্যয়, তার প্রধান কারণ জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসনির্ভর রাজনীতি আর দেশ ও সম্পদ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড, যা দেড় বছর ধরে চলে আসছে। আন্দোলনের নামে তাদের মানুষ পুড়িয়ে মারার মতো ভয়ানক অমানবিক কর্মকাণ্ড বিএনপির অনেক গোঁড়া সমর্থককেও বিএনপিবিমুখ করেছে।

কদিন আগে দায়িত্বশীল বিএনপি ঘরানার এক সরকারি কর্মকর্তা আমাকে বলেছেন, জামায়াতের খপ্পরে পড়ে বিএনপি নিজের পাকা ধানে মই দিয়েছে। নির্বাচনের আগে অনেকে তাদের ধারণা দিয়েছিল, নির্বাচনে অংশ নিলে ভালো করবে, এমনকি হয়তো সরকারও গঠন করতে পারে। কিন্তু জামায়াত নির্বাচনে যাওয়া থেকে বিএনপিকে বিরত রাখতে পেরেছে। কারণ, বিএনপির ‘আন্দোলন’ আর জামায়াতের ‘আন্দোলন’ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্দেশ্যে। বিএনপি চাইছিল, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে দশম সংসদ নির্বাচন আর জামায়াতের উদ্দেশ্য ছিল যেকোনো উপায়ে মহাজোট সরকারকে উৎখাত করে বিএনপির সঙ্গে পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতায় গিয়ে যুদ্ধাপরাধের বিচারকে বানচাল করা। এই দুটি দলই আওয়ামী লীগের ক্ষমতাকে সঠিকভাবে বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে।

আওয়ামী লীগের অনেক অক্ষমতা আর দুর্বলতা আছে, কিন্তু আওয়ামী লীগের এখনো একটি রাজনৈতিক চরিত্র আছে আর আছেন তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীরা। অনেকেই আওয়ামী লীগের মতাদর্শের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করতে পারেন, কিন্তু এই দুই দলের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে, বিএনপির তেমন রাজনৈতিক মতাদর্শ নেই। তারা বুঝতে পারে না, সাধারণ মানুষ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন অনেক বেশি সচেতন। লক্ষ করলে, বেগম জিয়ার চারপাশে, যাঁরা তাঁকে সব সময় ঘিরে থাকেন, তাঁরা প্রায় সবাই সাবেক সামরিক-বেসামরিক আমলা। তাঁরা গুলশানের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষের আলো-আঁধারে বিদেশিদের সঙ্গে কথা বলতে পছন্দ করেন। কিছু ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। বিএনপির এই নেতারা মিডিয়ার সামনে এলে, আধো ইংরেজি আধো বাংলায়, যা জনমানুষের কাছে দুর্ভেদ্য, তেমন ভাষায় কথা বলেন। আর সরকার অফেন্সিভে গেলে আত্মগোপন করেন। নির্বাচনের আগে তাঁরা ভিডিওবার্তার সাহায্যে আন্দোলন পরিচালনা করার নতুন সংস্কৃতি চালু করেছেন। শুধু দেশের ভেতর থেকেই আন্দোলনের এমন আহ্বান আসছে, তা-ই নয়, দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডন থেকেও আন্দোলনের এমন বার্তা পাঠাচ্ছেন। যে রাজনৈতিক দল এমন নেতাদের ওপর ভর করে সরকারবিরোধী রাজনীতি করতে চায়, তারা বোকার স্বর্গে বাস করে।

রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির সমালোচকেরা তাদের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ উত্থাপন করেন, কিন্তু তারা যে একটি সন্ত্রাসী দল, তেমন অভিযোগ একটাও নেই। মিছিল করে যাওয়ার সময় তারা দু-চারটি গাড়িতে আগুন দেয়, পুলিশের সঙ্গে মারদাঙ্গায় লিপ্ত হয় অথবা কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু ছাত্রশিবিরের মতো বলা যাবে না তারা গণহারে প্রতিপক্ষের রগ কাটে, গলা কেটে মানুষ হত্যা করে অথবা নির্বিচারে সংখ্যালঘু আর আওয়ামী লীগের সমর্থকদের বাড়ি বা গ্রামে আগুন দেয়।

এযাবৎ ছাত্রশিবির যত সংঘাতে লিপ্ত হয়েছে, তার অধিকাংশই ছিল ছাত্রদলের সঙ্গে। আমার আগের কর্মক্ষেত্রে জিয়া পরিষদের সভাপতি ড. এনামুল হকের ছেলে মুসাকে তো ওরা পিটিয়েই মেরে ফেলেছিল। ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত আবদুল হামিদ ছাত্রদল ছেড়ে এরশাদের ছাত্রসমাজে যোগ দিয়েছিল। তাঁর হাতের কবজি কেটে কিরিচের মাথায় গেঁথে শিবির ভরদুপুরে ক্যাম্পাসে মিছিল করেছিল। তাঁর অপরাধ ছিল, তিনি শিবিরের রাজনীতির একজন বড় বিরুদ্ধবাদী ছিলেন। ড. কাজী আহম্মদ নবী মনেপ্রাণে জিয়ার আদর্শে বিশ্বাসী। তাঁর একমাত্র ছেলে মুসফিক প্রগতিশীল রাজনীতিতে নতুন দীক্ষা নিয়েছেন। এক গুলিতেই তাঁকে শেষ করে দিল শিবিরের সন্ত্রাসীরা। হেলালি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। ছাত্রদলের নেতা। তাঁকে ১০ জনে টেবিলের ওপর চেপে ধরে চোখ তুলে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। সময়মতো শিক্ষকেরা সেখানে হাজির না হলে হেলালি এখন অন্ধ হয়ে হয়তো বেঁচে থাকতেন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে তিনি বিএনপির মনোনয়নে সংসদ নির্বাচন করেছেন। ১৯৯৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আর রাজশাহী মেডিকেল কলেজে যখন শিবির ছাত্রদলের ওপর হামলা করে নারকীয় তাণ্ডব চালিয়েছিল, তখন ক্ষমতায় বেগম জিয়া। তিনি কিন্তু তাঁর দলের আহত সদস্যদের একবারও দেখতে যাননি, গিয়েছিলেন সে সময়কার সংসদে বিরোধী দলের নেত্রী শেখ হাসিনা। দুই নেত্রীর মধ্যে এটাই তফাত।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বেগম জিয়ার অনেক সমর্থক আর উপদেষ্টা তাঁকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। সংবাদপত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি শক্তিশালী দেশের এক কূটনীতিককে বাংলাদেশে তাঁদের রাজনৈতিক চালের বিপর্যয়ের কারণে নিজ দেশ ফিরিয়ে নিচ্ছে। ২০০৬ সালেও ঠিক তেমনটি ঘটেছিল। বিদেশিরা এখন বলছে, বেগম জিয়াকে জামায়াতের সংস্পর্শ ছাড়তে হবে। এত দিনে তারা উপলব্ধি করেছে, জামায়াত একটি সন্ত্রাসী সংগঠন, কোনো রাজনৈতিক দল নয়। এই দেশগুলোই দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছিল, ‘জামায়াত একটি উদারপন্থী রাজনৈতিক দল’। কিন্তু তারা বললেই তো আর বেগম জিয়া বা বিএনপি জামায়াতকে ছাড়তে পারবে না। অদৃশ্য কারণে বিএনপির রাজনীতি জামায়াতের কাছে বাঁধা রয়েছে বলে বিশ্বাস।

সোমবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপি তাদের প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়ার জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে জনসভা করল। প্রথমে শোনা গিয়েছিল, এটি ১৮ দলের জনসভা। পরে জানা গেল, এটি বিএনপির জনসভা। জামায়াতকে নাকি সভায় আসতে নিষেধও করা হয়েছিল। জামায়াত এসেছিল, কিন্তু ব্যানার ছাড়া। সঙ্গে ছিলেন হেফাজতের কয়েক হাজার নেতা-কর্মী। মঞ্চেও জামায়াতের নেতারা ছাড়া শরিক দলগুলোর নেতারা উপস্থিত ছিলেন। চট্টগ্রামেও অনুরূপ একটি সমাবেশ হয়েছিল এবং সেখানে মঞ্চে জামায়াতের নেতারা বক্তব্য দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক মঞ্চে জামায়াতকে দেখে আর মঞ্চে ওঠেননি। নিচে বসে তাঁর ছাত্রদের বলেছেন, এখনো যদি বিএনপির বোধোদয় না হয়, তাহলে তাদের ভবিষ্যতে ভালো তো কিছু দেখি না।

বেগম জিয়ার সব উপদেষ্টা হিসেবে সামরিক-বেসামরিক আমলা ছাড়াও আছেন বেশ কিছু আইনজীবী নতুবা বাস্তব জীবন-জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু বুদ্ধিজীবী আর সুশীল ব্যক্তি। একজন আইনজীবী সেদিন জানান, সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধ করলে শতভাগ লাভ বিএনপির। কারণ, জামায়াতের সবাই কাতারবন্দী হয়ে বিএনপিতে যোগ দেবে। এই না হলে উপদেষ্টা। তিনি বুঝতে পারেননি অথবা বুঝতে চাননি, জামায়াত হচ্ছে একটি ভাইরাস। দেহে প্রবেশ করলে দেহটাকে ধ্বংস করে দেবে। জামায়াত যদি বিএনপির সঙ্গে একীভূত হয়, তাহলে বিএনপিও যে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হয়ে উঠবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায়।

কোনো কোনো বিএনপি-সমর্থক পেশাজীবী বিএনপিকে বাহবা দিচ্ছেন এই বলে, তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে নাকি মানুষ ৫ জানুয়ারি ভোট দিতে যাননি। তাঁরাও বিএনপির ৫ শতাংশ ভোট-তত্ত্বে বিশ্বাস করেন। ৫ জানুয়ারি অনেক কেন্দ্রে ভোট কম পড়েছে সত্য, কিন্তু তা স্রেফ বেগম জিয়া বা বিএনপির আহ্বানে সাড়া দিয়ে ঘটেছে, তা বিশ্বাস করা চরম আহাম্মকি। যে মাত্রায় সহিংসতা নির্বাচনের আগের কয়েক দিন হয়েছে, তাতে স্বাভাবিকভাবে মানুষ ভোট দিতে যাবে, তা তো আশা করা যায় না। বেগম জিয়ার এসব সর্বনাশা সমর্থক গোষ্ঠী তাঁকে মনে করিয়ে দেয়নি, নির্বাচনের আগের রাতে যদি ২০০ স্কুল, মাদ্রাসা আর কলেজ ভোটকেন্দ্র হওয়ার ‘অপরাধে’ জামায়াত-বিএনপির দুর্বৃত্তরা আগুন লাগিয়ে জ্বালিয়ে দেয়, তাহলে সেসব কেন্দ্রে কোন ভরসায় ভোটাররা ভোট দিতে যাবেন? ২০০৮ সালের নির্বাচনে দল হিসেবে আওয়ামী লীগ এককভাবে ৪২ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। নির্দয়ভাবে এখান থেকে ৫ থেকে ৭ শতাংশ ভোট ছাঁটাই করলেও আওয়ামী লীগের একেবারে ‘দলকানা’ ভোটার ৩২ থেকে ৩৫ শতাংশ। নির্বাচন ঠেকানোর নামে বিএনপি-জামায়াতের ক্যাডাররা সারা দেশে এই ভয়াবহ তাণ্ডব না চালালে আওয়ামী লীগ কমপক্ষে এই ভোটগুলো তো পেত।

যদি নির্বাচন কমিশনের দেওয়া ৪০ শতাংশ হিসাব বিশ্বাস না করেন, তাই বলে ৫ শতাংশ বিশ্বাস করতে হবে কেন? বিএনপির কাঁধ থেকে জামায়াত নামের সিন্দবাদের সেই দৈত্য বা বুড়োটাকে তারা নামাবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত এককভাবে তাদের। কিন্তু দেশে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ধারা বজায় রাখতে হলে দেশে একাধিক সুস্থধারার রাজনৈতিক দল প্রয়োজন। তেমনই একটি দল হিসেবে বিএনপি নিজেকে গড়ে তোলার চেষ্টা করতে পারে। তাদের উপলব্ধি করতে হবে, এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগকে পাঁচ বছরের আগে ক্ষমতাচ্যুত করার ক্ষমতা তাদের নেই। আওয়ামী লীগ অন্য চিন্তা করলে ভিন্ন কথা। বাস্তববাদী হওয়া মঙ্গল।

আবদুল মান্নান: সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

রাজনীতিতে নয়া সমীকরণ by সাজেদুল হক

আপাতত রাজনীতি নেই এ কথা সত্য। তবে ৫ই জানুয়ারি পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেশ কিছু নতুন সমীকরণের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
বিএনপির সঙ্গে জামায়াত এবং অন্যান্য ইসলামপন্থী দলের সম্পর্ক নতুন করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদের জন্য বিএনপির ওপর দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক চাপ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এরই পটভূমিতে সর্বশেষ ২০শে জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিরোধী জোটের সমাবেশে জামায়াত, ইসলামী ঐক্যজোট, খেলাফত আন্দোলন এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতাদের দেখা যায়নি। যদিও জোটভুক্ত অন্যান্য দলের নেতারা মঞ্চে ছিলেন। এ সমাবেশের পরই ১৮ দলীয় জোটে ভাঙনের কথা ছড়িয়ে পড়ে। একাধিক সূত্রে জানা যাচ্ছে, এখনই এ জোট ভাঙার ঘোষণা না দিলেও কৌশলগত কারণেই জোটের ভবিষ্যৎ অনেকটা অনিশ্চিত। কারণ বিএনপি ও জামায়াতের বুদ্ধিদাতা হিসেবে পরিচিত অনেকেই মনে করেন, বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় ইসলাম যুক্ত আছে এমন কোন রাজনৈতিক দলের ক্ষমতায় অংশীদারিত্বের সম্ভাবনা খুবই কম। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বর্তমানে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ একেবারেই স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো প্রতিনিয়ত খোলামেলাভাবেই কথা বলছে বাংলাদেশ নিয়ে। বর্তমান সরকারের দায়িত্ব নেয়ার পর বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়াতেও বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। ভারত, চীন, রাশিয়াসহ সাবেক বাম বলয়ের দেশগুলো এরই মধ্যে বাংলাদেশ সরকারকে অভিনন্দন জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেনসহ অনেক দেশ সরকারকে অভিনন্দিত না করলেও সরকারের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে। যদিও এসব দেশ সবার অংশগ্রহণে নতুন নির্বাচনের জন্য সংলাপের ওপর গুরুত্বারোপ করছে। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী তিনটি পার্লামেন্টে সম্প্রতি বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এসব আলোচনায় সরকারের অবস্থান পরিবর্তনের কোন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না। বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এরই মধ্যে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, সরকার ৫ বছর মেয়াদ পূর্ণ করবে। কোন সংলাপও হবে না।

এ অবস্থায় নিজেদের রাজনীতি রিভিউ করছে বিরোধী জোট। জামায়াত এবং অন্যান্য ইসলামপন্থী দলের সঙ্গে সম্পর্কের ধরন পরিবর্তন নিয়ে চলছে আলোচনা। মূলত ভোটের পাটিগণিতের হিসাবেই ১৯৯৯ সালের ৩০শে নভেম্বর চারদলীয় জোট গঠন করা হয়। বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াত এবং ইসলামী ঐক্যজোট নিয়ে এ জোট গঠিত হয়েছিল। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি পরে জোট থেকে বেরিয়ে গেলেও নাজিউর রহমান মঞ্জুরের নেতৃত্বে দলের একটি অংশ জোটে থেকে যায়। ২০০১ সালে এ জোট নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করলেও ২০০৮ সালের নির্বাচনে জোটের ভরাডুবি ঘটে। এর পরও এ জোটে আরও কয়েকটি দলকে নিয়ে গঠন করা হয় ১৮ দলীয় জোট। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলনও করে জোটবদ্ধভাবে। এ আন্দোলনের দাবির যৌক্তিকতা বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলো স্বীকার করলেও আন্দোলনে সহিংসতারও সমান তালে নিন্দা জানান তারা। মিডিয়া এবং পর্যবেক্ষকদের অনেকে এ সহিংসতার জন্য জামায়াতকেই দায়ী করেন। যদিও চিন্তাবিদ ফরহাদ মজহার এ জন্য সরকারকেই দায়ী করেছেন। তিনি লিখেছেন, গণ-আন্দোলন অহিংস নাকি সহিংস হবে তার ট্রিগার সব সময়ই সরকারেরই হাতে থাকে। রাজনৈতিক বিরোধ সহিংস বলপ্রয়োগের মধ্য দিয়ে দমন এবং তার পালটা প্রতিক্রিয়া থেকে রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের সরকারি আচরণ থেকেই এখনকার সহিংসতার জন্ম। এ পরিস্থিতিতে একতরফা গণ-আন্দোলনের ধরন বিশেষত সহিংসতাকে নিন্দা করার একটাই অর্থ : ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার পক্ষে দাঁড়ানো, সাফাই গাওয়া। এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পার্লামেন্টের প্রস্তাবেও সহিংসতায় জড়িত সংগঠন নিষিদ্ধের জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে জামায়াত-হেফাজতের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখার জন্য বিএনপির প্রতি আহ্বান জানানো হয়। যদিও ওই প্রস্তাবের মূল বিষয় ছিল বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক আগাম নির্বাচন। সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান ইউরোপীয় ইউনিয়নের সংসদের জামায়াত এবং হেফাজতকে একসঙ্গে ব্র্যাকেটবন্দি করা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি লিখেছেন, এটা কৌতূহল উদ্দীপক যে, ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রস্তাবে জামায়াত-হেফাজতকে একই কাতারে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু হেফাজত কোন ধরনের সহিংসতায় জড়িত থাকার কথা আমি শুনিনি এবং বিরোধী দলের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাদের জড়িত থাকার কথাও শোনা যায়নি। কিছু আদর্শগত মিল থাকা সত্ত্বেও জামায়াত ও হেফাজত রাজনৈতিক মিত্র নয়। তাদের একসঙ্গে উল্লেখ করা হয়তো ইউরোপীয় পার্লামেন্টের তথ্যগত ভুল।
নির্বাচন পরবর্তি সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপিকে সংলাপের পূর্ব-শর্ত হিসেবে জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগের কথা বলেছেন। অন্যদিকে, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ককে বর্ণনা করেছেন, কৌশলগত হিসেবে। এ অবস্থায় বিএনপির সঙ্গে জামায়াত ও অন্যান্য ইসলামপন্থী দলগুলোর সম্পর্ক নিয়ে চলছে নতুন পর্যালোচনা। জামায়াতের পরামর্শদাতা হিসেবে পরিচিত একজন সাবেক সচিবের মতে, জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ বিএনপির জন্য ক্ষতির কারণই হবে। যদিও অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, বিএনপি সবসময়ই একটি মধ্যপন্থী দল হিসেবে পরিচিত। এছাড়া জামায়াতের প্রায় সব শীর্ষ নেতাই যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত। এ অবস্থায় জোটের বাইরে যুগপৎ আন্দোলনই বিএনপির জন্য সুফল বয়ে আনবে। যদিও ইসলামপন্থীদের ভোট ব্যাংকের বিষয়টিও বিএনপিকে বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে।

দায়মোচন- বিএনপির নাজুক গোড়ালি by ফারুক ওয়াসিফ

সরকারেও নেই, সংসদেও নেই। বিএনপি তাহলে কোথায় আছে? রাষ্ট্রে যা নেই, তা সমাজে থাকতে পারে। ক্ষমতার লড়াইয়ে জয়ের জন্য স্প্রিংয়ের মতো বিস্তারশীল সংগঠন লাগে, জনগণের অধিকাংশকে ধারণ করার মতো আদর্শ লাগে।
দুটো ক্ষেত্রেই বিএনপি মোটামুটি ব্যর্থ। এ কারণে মহাজোট সরকারের অজনপ্রিয়তা থেকে তারা ফায়দা তুলতে পারেনি। ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ নামক রাজনৈতিক যুদ্ধে বিএনপি সব সময়ই দুর্বল থেকেছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি যখনই দেশে প্রবল হয়েছে—প্রথমবার জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গণ-আদালতের সময়, দ্বিতীয়বার ২০০৬ সালের পর—তখনই বিএনপি পিছু হটেছে। দলের শীর্ষনেতাদের অনেকের মুক্তিযুদ্ধে অবদান থাকা সত্ত্বেও বিএনপি কেন মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে বেকায়দায় থাকে, তার উত্তর দলটির কর্মী-সমর্থকদেরই খুঁজতে হবে।

বিএনপির সাংগঠনিক ও মতাদর্শিক দুর্বলতার সুযোগ জামায়াতও নিয়েছে, আওয়ামী লীগও নিয়েছে। বিএনপি জামায়াত হয়ে গেছে বলে আওয়ামী লীগ যতই রব তোলে, বিএনপি যেন ততই জামায়াতের ওপর নির্ভরশীল হয়। বিএনপির দুর্বলতা হলো জামায়াত। বিভিন্ন নির্বাচনের ফল প্রমাণ করে, জামায়াত ছাড়াই বিএনপি এককভাবে আওয়ামী লীগের চেয়ে বেশি জনসমর্থন ভোগ করে। তার পরও জামায়াতকে তাদের লাগবে কেন? যুক্তরাষ্ট্র ‘মডারেট মুসলিম দলকে’ চায় বলে? সাংগঠনিক ও আদর্শিক টনিকের দরকারে? ইসলামি ভোট পাওয়ার আশায়? কার্যত, এগুলো বিএনপির জন্য হিতে বিপরীত। এসব কারণেই বিপুল জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও দলটি বারবার নাজুক অবস্থায় পড়ে। এ যেন কবিতার ভাষায়, এ শুধু জানালার লোভে বেচে দিলাম ঘর-দরজা।
যে দলটি একাত্তরে তাদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত নয়, কোনো দিন ক্ষমা চাওয়ার চিন্তাও যারা করেনি, তাদের আগ বাড়িয়ে কে ক্ষমা করবে, কে ছাড় দেবে? কিন্তু খালেদা জিয়া এখনো ‘কৌশলগত কারণে’ জামায়াতকে ছাড়ছেন না। অথচ দেখা যাচ্ছে, ‘কৌশল’ নিয়েছে নীতির জায়গা আর লেজুড় জামায়াত হয়েছে বিএনপির ভরকেন্দ্র। এটাই হলো লেজ হয়ে দেহ নাড়ানোর উদ্ভট কেচ্ছা। বিএনপিকে এখন ভাবতে হবে, জামায়াতের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগির সরকারে এবং তাদের ওপর নির্ভরশীল আন্দোলন থেকে তারা আসলে কী অর্জন করেছিল। বিএনপির প্রতিপক্ষ মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে যে বিএনপি-জামায়াত সরকারে থাকা মানে জঙ্গিবাদের উত্থান; গ্রেনেড হামলা, ১০ ট্রাক অস্ত্র; বিএনপি-জামায়াতের আন্দোলন মানে আগুনে মানুষের মৃত্যু। এই অভিযোগ খণ্ডনে ব্যর্থ বিএনপির ‘হূদয় খুঁড়ে’ সন্ধান করা উচিত, কোথায় কোথায় তারা ভুল করেছিল।

২.
ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণী আকারে ও প্রভাবে অনেক বেড়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আধুনিকতায় দীক্ষিত বিরাট তরুণ জনগোষ্ঠী। এদের বেশির ভাগের জীবনের কল্পনার সঙ্গে জামায়াত-যুদ্ধাপরাধী-হেফাজতের জীবনদর্শন মেলে না। মুক্তিযুদ্ধ এদের কাছে কেবল ইতিহাস নয়, আত্মপরিচয়ের সূত্র, বিশ্বায়িত দুনিয়ায় বলার মতো গর্ব। গত ১০ বছরে বাংলাদেশে এই মধ্যবিত্ত শ্রেণী ও তার তরুণ শাখা-প্রশাখার প্রভাব অনেক বেড়েছে। এদের কাছে টানার মতো, কোটি কোটি নতুন ভোটারকে আশাবাদী ও আশ্বস্ত করার জন্য কী করেছে বিএনপি?
মিসরের ঘটনাবলি দেখায়, তরুণ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ওপর শক্ত প্রভাব ছাড়া নির্বাচন-জয় সম্ভব, ক্ষমতা ধরে রাখা বা আঘাত মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এবং এই প্রভাব লাগবে মধ্যবিত্ত দুর্গ তথা রাজধানীতে। গ্রাম-মফস্বলে বিএনপি-জামায়াতের প্রতিপত্তি যতটাই বেশি, রাজধানীতে ততটাই কম। ঔপনিবেশিক আমলে রাজধানীই ছিল সব ক্ষমতার কেন্দ্র আর প্রান্তিক এলাকাগুলো ছিল বিদ্রোহ-বিক্ষোভের ঘাঁটি। রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় কেন্দ্রীয় ক্ষমতা সারা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। তার পরও সেসব বিদ্রোহের পরাজয় অবধারিত ছিল, কারণ রাজধানীকে কাবু করতে না পারা, কারণ মধ্যবিত্তমহল ছিল ক্ষমতাসীনদের পক্ষে। বাংলাদেশেও মধ্যবিত্তদের প্রধান আবাস ঢাকা। সেই ঢাকাকে আলোড়িত করতে না পারাও বিএনপিকে ব্যর্থ করেছে।
এটা নিছক সাংগঠনিক ব্যর্থতা নয়, এর সঙ্গে আদর্শিক দুর্বলতাও সরাসরি জড়িত। অতীতের ব্যাপারে বিএনপির বয়ান পরিষ্কার নয়। যুদ্ধাপরাধের বিচার ও একাত্তরের মুক্তিসংগ্রাম প্রশ্নে ধরি মাছ না ছুঁই পানি খেলা বিএনপির প্রতি সন্দেহ বাড়িয়েছে। অনেকেই তাদের গত আমলের মতো যুদ্ধাপরাধীদের জয়জয়কারের দুঃসহ পুনরাবৃত্তির ভয়ে ভীত। তাদের নাশকতাপন্থী কর্মসূচি মনে করায় জেএমবি নামক ত্রাসের কথা। বিএনপিকে উঠে দাঁড়াতে হলে এই অসাধু উত্তরাধিকার ছাড়তেই হবে।
বাংলাদেশ আর কোনোভাবেই ২০১৩ সালের আগে ফিরে যাবে না। যেতে পারবে না। এ কথা বলার যথেষ্ট ভিত্তি তৈরি হয়েছে সমাজে ও রাষ্ট্রে। যুদ্ধাপরাধের বিচারের পক্ষে গড়ে ওঠা জনমতকে উপেক্ষা করা হবে দলটির জন্য আত্মঘাতী। উন্নয়ন ও শান্তির স্বার্থে ‘পুরোনো কাসুন্দি’ না ঘাঁটার ওকালতি কেউ কেউ করে থাকেন। কিন্তু অমীমাংসিত অতীত স্মৃতি হতে অস্বীকার করে। তা মানুষের মনে জ্যান্ত হয়ে পাওনা দাবি করে। আওয়ামী লীগ এবং তার দেশি-বিদেশি শরিকেরা একাত্তরের সেই পাওনাই যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবির আকারে ফিরিয়ে এনেছে এবং সেয়ানার মতো কাজেও লাগিয়েছে। জামায়াত ও যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের অঘোষিত আঁতাত ছাপিয়ে উঠেছে একাত্তরের পরাজিত শক্তিকে আবারও পরাজিত করার ডাক।
এটা এমন এক অবস্থান, যার বিরোধিতা করার নৈতিক ভিত্তি বিএনপির নেই। ১৯৯২-৯৩ সালেও জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে আন্দোলনের চাপে এ রকম অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল। তখন, এমনকি সংসদীয় আলোচনায় বিএনপি বিচারের পক্ষে মৌখিক সম্মতি জানাতে বাধ্যও হয়েছিল। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বিশ্বাসযোগ্যভাবে এগিয়ে নেওয়ার অকপট অঙ্গীকার এবং জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ার মুহূর্ত আবারও হাজির। মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে তাদের ঘোলাটে অতীতকে শুধরে নেওয়ার এই সুযোগকে কাজে লাগানোর ওপরই নির্ভর করবে দলটির ভবিষ্যৎ। আওয়ামী লীগের দেশি-বিদেশি জোটের কাছে পরাজয়ের অসুবিধাকে এভাবেই বিএনপি সুবিধায় পরিণত করতে পারে। মুসলিম লীগ হওয়া থেকে রক্ষারও এটাই উপায়।
মুক্তিযুদ্ধ আওয়ামী লীগের জন্য মেডুসার মাথা, যতই কাটা হোক নতুন করে গজাবেই। মুক্তিযুদ্ধ; তার ইতিহাস, তার আত্মত্যাগ, তার বীরত্ব ও অশ্রুগাথা বাংলাদেশের জনগণের পরম সম্পদ। বিপুল রাজনৈতিক শক্তি এর মধ্যে মজুত রয়েছে। আন্তরিকভাবে যে চাইবে, সেই এই খনি থেকে শক্তি ও সমর্থন পাবে। তা না করা বিএনপির গোড়ার গলদ বা একিলিসের গোড়ালি। গ্রিক পুরাণকথার একিলিসকে তার মা মন্ত্রপূত পানিতে চুবিয়ে অমরত্ব দিতে চেয়েছিলেন। তাহলেও ছোট্ট একটি জায়গায় পানি লাগে না। পায়ের গোড়ালির যে জায়গাটি ধরে শিশু একিলিসকে মা পানিতে চুবিয়েছিলেন, সেই জায়গাটি অরক্ষিতই রয়ে গেল। একিলিসের মৃত্যু হয় সেই গোড়ালিতেই তিরবিদ্ধ হয়ে। জামায়াত হলো বিএনপির একিলিসের গোড়ালি।
মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার দাবি করার অধিকার বিএনপিরও রয়েছে। কিন্তু সেটা ততক্ষণ পর্যন্ত বৈধতা পাবে না, যতক্ষণ না একাত্তরকে তারাও তাদের রাজনীতির ভিত্তিমূলে স্থাপন করবে। একাত্তর সম্পর্কে বিমনা থাকলে বিএনপির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বুলি দাম পাবে না। একাত্তর প্রশ্নে রাজনীতি ও সমাজে সমঝোতা হতে পারে বাকি সব সমঝোতার পূর্বশর্ত।
জামায়াত যে কারণে বিচার না মানতে বাধ্য, বিএনপির তো তেমন নিরুপায় দশা ছিল না! ঐতিহাসিক ভুলের খেসারত হিসেবে বিএনপি যে ‘কলঙ্কের’ বোঝা বইছে, সেই বোঝা এখন নামাতে হবে। যুদ্ধাপরাধের বিচার কোনো না-কোনো দিন হতোই। হতেই হতো। রাষ্ট্র হিসেবে শত্রু-মিত্র নির্ধারণ এবং তার সাপেক্ষে আত্মপরিচয়ের পুনর্গঠনও বকেয়া হয়ে আছে। এই কাজে বিএনপি যদি এগিয়ে না আসতে পারে, তাহলে বিএনপি হয়তো আবারও ক্ষমতায় যাবে, কিন্তু তার রাজনীতি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়াতে পারবে না। ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে বিএনপিকে বদলাতে হবে। অদূরভবিষ্যতে কোনো পরাশক্তির আধিপত্যের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী জাগরণ যদি অনিবার্য হয়ে পড়ে, তা ধারণের কী প্রস্তুতি আছে বিএনপির? কেবল ইসলাম দিয়ে এই শূন্যতা পূরণ করতে চাওয়া মানে সাম্প্রদায়িক ও অগণতান্ত্রিক শক্তির খপ্পরে পড়া। এভাবে যে হবে না, পাকিস্তান তার উদাহরণ।
বাংলাদেশের মানুষ মধ্যপন্থী। মধ্যেই থাকে ভরকেন্দ্র। বিএনপি ক্রমাগত ডানে সরলে মধ্যপন্থী বাংলাদেশে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়বে। নিজের স্বার্থে এবং দেশের স্বার্থে বিএনপির সংশোধন জরুরি। দলটির সমর্থকদের রাজনৈতিকভাবে এগিয়ে নেওয়ার এই দায় বিএনপি অস্বীকার করতে পারে না।

ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com

অস্ত্রের জোরে ক্ষমতায় থাকা যাবে না: খালেদা জিয়া

Monday, January 20, 2014

বর্তমান সরকার জনগণের সরকার নয় দাবি করে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, তারা জনগণের সরকার নয় বলেই দেশের মানুষের ওপর নির্বিচারে অত্যাচার নির্যাতন চালাচ্ছে।
এই সরকার একটি দুর্নীতিবাজ সরকার। গত পাঁচ বছরে তারা জনগণের সম্পদ লুট করেছে। তিনি বলেন, সরকারের ক্ষমতার মেয়াদ অতি অল্প দিনের। অল্প দিনেই তাদের বিদায় নিতে হবে। অস্ত্রের জোরে ক্ষমতায় থাকা যাবে না। বিকালে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপি আয়োজিত গণসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

খালেদা জিয়া বলেন, এই দুর্নীতিবাজ সরকার দেশের কল্যাণ করতে পারবে না। তারা সবচেয়ে বেশি ভয় পায় দেশের জনগণকে। ২৯শে ডিসেম্বর মার্চ ফর ডেমোক্রেসি আহবান করেছিলাম। জাতীয় পতাকা নিয়ে মানুষ আসবে। কিন্তু দুই দিন আগে আমাকে গৃহবন্দি করেছে। সারা দেশে তারা অবরোধ করেছে। এই হল সরকার। যদি জনগণের সরকার হতো তাহলে তারা তা করতে পারতো না। আমরা ক্ষমতায় ছিলাম। আমরা যখন ক্ষমতায় ছিলাম তখন কোন দিন এভাবে কর্মসূচিতে বাধা দেইনি। তিনি বলেন, জনগণ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অনাস্থা দিয়েছে। তারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়নি। তারা সম্পূর্ণ অবৈধ সরকার। খালেদা জিয়া বলেন, অস্ত্রের জোরে ক্ষমতায় থাকা যায় না। বেশি দিন থাকা যাবে না।
সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার কথা উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেন, কারা হামলা করছে সরকার তা বের করতে পারছে না। কিন্তু দায় চাপাচ্ছে বিরোধী দলের ওপর। সরকার মানুষের নিরাপত্তা দিতে পারছে না। এর দায় সরকারকেই নিতে হবে।
সাতক্ষীরায় সরকারি বাহিনী সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, সেখানে এমন অত্যাচার নির্যাতন চালাচ্ছে যে মানুষের বিশ্বাস হচ্ছে না দেশের আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এতো নির্মম কাজ করছে। এ নিয়ে মানুষের মধ্যে সন্দেহ আছে। তিনি বলেন, স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম। স্বাধীনতার ৪২বছর পর আবার আমরা স্বাধীনতা হারাতে যাচ্ছি। তাই আবার আমাদের দেশ রক্ষার জন্য যুদ্ধ করতে হবে। খালেদা জিয়া বলেন, মানুষ নির্বাচনে সরকারকে প্রত্যাখ্যান করেছে। মানুষ ভোট দিতে যায়নি। এটি কোন নির্বাচন নয়। অবিলম্বে নির্বাচন দিন। জনপ্রিয়তা যাচাই করুন।
সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, মনে করে থাকেন গায়ের জোরে ক্ষমতায় থাকবেন এটা হবে না। অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা চাই না। শান্তি চাই। অবিলম্বে নির্বাচনের জন্য আলোচনার পরিবেশ তৈরি করুন। আমরা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি সারা দেশে চালিয়ে যেতে চাই।
পেশাজীবীদের ওপর অত্যাচার নির্যাতন হচ্ছে উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেন, আইনজীবীদের ওপর হামলা হচ্ছে। তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। সাংবাদিকদের ওপর হত্যা নির্যাতন চালানো হচ্ছে। জেলে নেয়া হচ্ছে। এভাবে গুন্ডা বাহিনী দিয়ে শেষ রক্ষা হবে না। এই সরকার সন্ত্রাসীদের ছেড়ে দিচ্ছে উল্লেখ করে তিনি একটি পত্রিকার কপি তুলে ধরে বলেন, এই সরকার সন্ত্রাসীদের সরকার।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন আজ্ঞাবহ ও মেরুদণ্ডহীন নির্বাচন কমিশন। এই কমিশন দিয়ে কোন নির্বাচন স্ষ্টুুভাবে করা যাবে না। সরকারের বাইরে তারা যেতে পারে না। কথা বলার কোন সাহস রাখে না। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে ভোট পড়েনি। কিন্তু ফল ঘোষণার জন্য তিন দিন সময় নিয়ে নির্লজ্জভাবে ৪০ ভাগ ভোট দেখিয়েছে।
বেলা দুইটা থেকে শুরু হওয়া সমাবেশে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিএনপি ও ১৮ দলের কেন্দ্রীয় নেতারা বক্তব্য রাখেন।

সংলাপ-সমঝোতার বিকল্প নেই- শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ডাক

Friday, January 17, 2014

১৮-দলীয় জোটের প্রধান নেতা ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আর কোনো হরতাল-অবরোধের কর্মসূচি ঘোষণা করেননি। এ জন্য তাঁকে ধন্যবাদ দিতে হয়। কারণ, কয়েক মাস ধরে এই নেতিবাচক কর্মসূচির ফলে বাংলাদেশের জনগণ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে; আন্দোলনের নামে মানুষের প্রাণহানি, ধ্বংসযজ্ঞ, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অচলাবস্থা ও জনজীবনে নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টির এই ধারা আর চলতে দেওয়া উচিত নয়।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নয় দিন পর গত বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়া নতুন সরকারকে ‘অবৈধ সরকার’ আখ্যা দিলেও এ সরকারের সঙ্গে সংলাপ ও সমঝোতার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন—এটাকেও আমরা ইতিবাচক হিসেবে বিবেচনা করতে চাই। কারণ, সংলাপ-সমঝোতা ছাড়া চলমান রাজনৈতিক সমস্যা থেকে উত্তরণের কোনো বিকল্প নেই। সরকারের ‘বৈধতা’র প্রশ্নটির থেকে এখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দুই পক্ষের মধ্যে কার্যকর রাজনৈতিক সম্পর্কের সূচনা ঘটানো। শুধু সংলাপের মাধ্যমেই সেটির সূচনা ঘটানো সম্ভব, যেখানে সমঝোতার মানসিকতা অপরিহার্য।
হরতাল-অবরোধের মতো সহিংস কর্মসূচির উল্লেখ না করে খালেদা জিয়া ‘গণতন্ত্রের জন্য শান্তিপূর্ণ আন্দোলন অব্যাহত’ রাখার যে ঘোষণা দিয়েছেন, তাতে আমাদের পরিপূর্ণ স্বস্তি বোধ হয় না। কারণ, তাঁর ভাষায় যে ‘শান্তিপূর্ণ আন্দোলন’ এত দিন চলে এসেছে, তা ‘অব্যাহত’ রাখা হলে জনজীবনে শান্তি ফিরে আসবে না। সবকিছুর আগে এই সহিংস ও ধ্বংসাত্মক আন্দোলনের ধারা বন্ধ করতে হবে। মুখে ‘শান্তিপূর্ণ’ আন্দোলনের কথা বলা আর কার্যত জবরদস্তিমূলক, সহিংস, আতঙ্ক সৃষ্টিকারী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়ে জনজীবনে অচলাবস্থা সৃষ্টি করা স্ববিরোধিতা। বিরোধী জোটের কর্মসূচিগুলোতে যেসব সহিংসতা ঘটেছে, সেগুলোর দায়দায়িত্ব সরকারের ওপর চাপিয়ে বিরোধী জোট দায়মুক্ত থাকতে পারে না। উপর্যুপরি সহিংস কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জনসাধারণের সঙ্গে বিরোধী জোটের যে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হয়েছে, তা দূর করতে বিরোধী জোটের এযাবৎকালের আন্দোলনের ধারা ‘অব্যাহত’ রাখার ভাবনাটি বাদ দিয়ে ‘শান্তিপূর্ণ আন্দোলন’ কথাটির প্রতি আন্তরিকতার প্রকাশ ঘটাতে হবে বাস্তব ক্ষেত্রে।
সরকারকেও দমন-পীড়নের কৌশল পরিত্যাগ করে বিরোধী দলগুলোর সংবিধানপ্রদত্ত অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার অজুহাতে বিরোধী জোটকে গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো থেকে বঞ্চিত করা এবং তাদেরকে সম্পূর্ণ কোণঠাসা করে রাখার কৌশল বজায় রেখে সরকার সুষ্ঠুভাবে দেশ পরিচালনা করতে পারবে না। অর্ধেকের বেশি আসনে একেবারেই ভোট না হওয়া এবং অবশিষ্ট আসনগুলোতে প্রধান বিরোধী দলের অংশগ্রহণ না থাকায় নতুন সরকারের রাজনৈতিক বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তি দুর্বল। এই প্রেক্ষাপট স্বীকার করে নিয়ে সরকারকে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক সদাচরণের নীতি গ্রহণ করে সামগ্রিক সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রয়াস নিতে হবে; সর্বোপরি সমঝোতার মানসিকতা নিয়ে সংলাপ শুরু করতে হবে। বিরোধী জোটকে রাজনৈতিক আন্দোলনে বাধা না দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে তা পালনে সহযোগিতা করা সরকারের দায়িত্ব বৈকি।

খালেদা জিয়ার পুরো বক্তব্য @১৫ জানুয়ারি ২০১৪

Wednesday, January 15, 2014

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,
আসসালামু আলাইকুম।

শীতের এই পড়ন্ত বিকেলে আমি আপনাদের স্বাগত: জানাচ্ছি।
ইংরেজি ২০১৪ সালের সূচনায় গত ৫ জানুয়ারি আমাদের দেশে গণতন্ত্র আরেকবার নিহত হয়েছে। বাংলাদেশে গণতন্ত্র এখন মৃত। এদেশের মানুষ তাদের রাষ্ট্রপরিচালনার পদ্ধতি হিসেবে গণতন্ত্রকে বেছে নিলেও বারবার এখানে গণতন্ত্রকে হত্যা করা হয়েছে। জনগণ আবার সম্মিলিত লড়াই-সংগ্রামে গণতন্ত্রকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু ৫ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশ আবার পিছিয়ে পড়লো। পুরোপুরি গণতন্ত্রহীন হয়ে পড়লো। তাই আবার নতুন করে শুরু হয়েছে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।
এই সংগ্রামে বাংলাদেশের জনগণের পরাজয়ের ইতিহাস নেই। তাই অনিবার্যভাবে গণতন্ত্র আবারো পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে। মানুষ আবারো ফিরে পাবে তাদের ভোটের অধিকার। কারসাজি, সন্ত্রাস, অন্তর্ঘাত ও অপপ্রচার Ñ এই চার অস্ত্রে গণতন্ত্রকে হত্যা করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে প্রলম্বিত করা হয়েছে। এগুলো শিগগিরই অকার্যকর হয়ে পড়বে। জনগণের ভোটে জনগণের সরকার কায়েম হবে ইনশাআল্লাহ্।
ক্ষমা, মহত্ব, ঔদার্য, সংযম, যুক্তিবাদিতা ও সমঝোতার জন্য আমরা বারবার আহ্বান জানিয়েছি। রাজনীতিকে সুন্দর ও গণতন্ত্রকে সুরক্ষার মাধ্যমে বৈচিত্রের মধ্যে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার কথা বলেছি। একদলীয় স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠার অপপ্রয়াসের কাছে আমাদের সে আহ্বান সাড়া জাগাতে পারেনি। এখনো শুনতে হচ্ছে বিনাভোটের সরকারের নির্লজ্জ দম্ভোক্তি।
কারসাজির মাধ্যমে জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়ে ক্ষমতাকে প্রলম্বিত করার এই প্রহসনকে বাংলাদেশ ও সারা দুনিয়ার গণতন্ত্রকামী মানুষ মেনে নেয়নি। তারা জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা ও মতামতের প্রতিফলন ঘটে এমন একটি নির্বাচন আয়োজনের কথা বারবার বলছেন। তার জবাবে বলা হচ্ছে, কারো কাছে মাথা নত করবো না। এই উক্তি স্পর্ধার। এই উক্তি হঠকারি স্বৈরশাসকের। ইতিহাস সাক্ষী, এ ধরণের উক্তির ফলাফল ও পরিণাম কখনো শুভ হয় না।
কেবল বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট নয়। শাসক দল ও তাদের মুষ্টিমেয় দোসরদের বাইরে উল্লেখযোগ্য কোনো রাজনৈতিক দলই নির্বাচনের নামে আওয়ামী প্রহসনে শরিক হয়নি। দেশের মানুষও এই প্রহসনকে বর্জন করেছে। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে কোথাও ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যায়নি। গড়ে সারাদেশে শতকরা ৫ শতাংশ ভোটও পড়েনি।
অথচ আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশন মারফত প্রায় ৪০ শতাংশ ভোট পড়ার ঘোষণা দেয়ানো হয়েছে। সকলের চোখের সামনে এতোবড় জালিয়াতি করেও তারা এখনো চড়া গলায় কথা বলছে।  প্রতারণা করে, সন্ত্রাস চালিয়ে জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়ে প্রহসনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতাকে যারা প্রলম্বিত করেছে, তারা বেশি দিন গায়ের জোরে ক্ষমতায় থাকতে পারবে না। জনগণ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ও জনগণের দ্বারা পুরোপুরি বর্জিত হয়ে এখন তাদের আচরণ ও ভাষা সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক, অশালীন ও বেসামাল হয়ে পড়েছে। গণতন্ত্র হত্যা করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি। তারা এখন রাজনীতিকেও সম্পূর্ণ কলুষিত করে ফেলছে।
সাংবাদিক বন্ধুগণ,
নির্বাচনের নামে গত ৫ জানুয়ারির আওয়ামী প্রহসন হাতে-কলমে প্রমাণ করেছে, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি কতটা যৌক্তিক। প্রমাণ হয়েছে, দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ হতে পারে না।
প্রমাণ হয়েছে, আওয়ামী লীগ তরুণ নতুন ভোটারসহ সারা দেশের মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছে। প্রমাণ হয়েছে, বর্তমান নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ অযোগ্য, ব্যর্থ ও আজ্ঞাবহ। প্রমাণ হয়েছে, কারসাজির এই নির্বাচনী প্রহসন দেশে-বিদেশে কারো কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। সর্বোপরি বাংলাদেশের জনগণ প্রমাণ করেছে যে, তারা এই সরকারকে চান না। তারা নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের পছন্দের প্রতিনিধিদের নির্বাচিত করতে চান। এজন্য আমি আমার প্রিয় দেশবাসীকে আবারো অকুণ্ঠ ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানাই। তারা অন্যায়, অবিচার, ভোটাধিকার হরণ ও গণতন্ত্র হত্যাকারী সরকারের বিরুদ্ধে গত ৫ জানুয়ারি নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছেন। এরজন্য বাংলাদেশের মানুষকে আগামী ২০ জানুয়ারি সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানাবো আমরা। জনগণকে ধন্যবাদ জানাবার জন্য  ওই দিন সারাদেশে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা সদরে গণসমাবেশ ও শোভাযাত্রা হবে। ঢাকায় কেন্দ্রীয় সমাবেশ হবে  সোহরাওরার্দী উদ্যানে। এর আগে ১৮ জানুয়ারি শনিবার মহান স্বাধীনতার ঘোষক, বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠাতা, আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জন্মদিন পালিত হবে সারাদেশে। ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে হবে আলোচনা সভা। গণতন্ত্র হত্যা ও জনগণের ভোটাধিকার হরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে আগামী ২৯ জানুয়ারি বুধবার সারাদেশে বিক্ষোভ দিবস পালন করা হবে। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ঐদিন কালো পতাকা মিছিল হবে।
আমাদের নেতৃবৃন্দ এবং আমি নিজেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চল সফর করবো।
প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,
আমরা সহিংসতা, হানাহানিতে বিশ্বাস করি না। আমরা শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক ধারায় রাজনীতি করতে চাই।
সেই পথ বন্ধ করলে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তার দায় ক্ষমতাসীন ছাড়া আর কারো নয়। আমরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক পন্থায় আমাদের আন্দোলন অব্যাহত রাখতে বদ্ধপরিকর। এ আন্দোলন ক্ষমতার জন্য নয়, গণতন্ত্রের জন্য। মানুষের ভোটের অধিকার ও অন্যান্য মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে আনার জন্য। এ আন্দোলন নাগরিকদের স্বাধীনতা এবং সর্বস্তরে শান্তি ও সৌহার্দ্য ফিরিয়ে আনার জন্য। বাংলাদেশের এবং সারা দুনিয়ার গণতন্ত্রকামী মানুষ আমাদের সঙ্গে আছে। কাজেই আল্লাহ্র ওপর ভরসা রেখে আস্থার সঙ্গে বলতে চাই যে, ন্যায়, সত্য ও গণতন্ত্রের এ আন্দোলনের বিজয় অনিবার্য ও সময়ের ব্যাপার মাত্র।
ইতোমধ্যে জনগণের গণতান্ত্রিক আন্দোলন তার বিজয়ের প্রথম ধাপ অতিক্রম করেছে। ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতায় থেকে নির্বাচনের জেদ এক হাস্যকর প্রহসনে পর্যবসিত হয়েছে।
১৫৩ আসনে কোনো নির্বাচনই করতে পারেনি তারা। বাকী আসনগুলোতে ভোটারবর্জিত জঘণ্য কারসাজি ও জালিয়াতি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে তারা কতটা জনবিচ্ছিন্ন। বাংলাদেশের জনগণ বহুমুখী শত অপপ্রচারেও বিভ্রান্ত হয়নি। তারা ওই প্রহসন বর্জন করে সরকারকে সম্পূর্ণ অবৈধ করে দিয়েছে। এখনকার সরকার অগণতান্ত্রিক, জনগণের অনুমোদনহীন এবং কারসাজি ও গায়ের জোরের এক অবৈধ সরকার। এটাই আমাদের আন্দোলনের এক বিরাট সাফল্য।
উপস্থিত সাংবাদিকবৃন্দ,
ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরশাসন-বিরোধী কোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলনই ত্যাগ-তিতিক্ষা ছাড়া সফল হয়না। এ আন্দোলনেও জনগণ এবং রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা সীমাহীন ত্যাগ স্বীকার করেছেন।
নির্বাচনের নামে তামাশার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে ৫ জানুয়ারিতেই অন্তত: ২২ জন নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। প্রহসনের একতরফা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে প্রায় দু’শো মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। আন্দোলনে অন্তর্ঘাত সৃষ্টির উদ্দেশ্যে সরকারি এজেন্টদের পরিকল্পিত নাশকতায় আরো অনেক নিরীহ নিরপরাধ মানুষ জীবন দিয়েছেন। পাঁচ বছরে প্রায় ২২ হাজার মানুষকে খুন করা হয়েছে। গুম করা হয়েছে কয়েকশ’ রাজনৈতিক নেতা-কর্মীকে। চালানো হয়েছে সীমাহীন জুলুম-নির্যাতন। জনগণের ভোটের অধিকার রক্ষার দাবিতে আন্দোলন করার দায়ে বিরোধী দলের সিনিয়র নেতৃবৃন্দসহ হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে মিথ্যা মামলায় আটক করে কারাগারগুলো ভরে ফেলা হয়েছে। অঘোষিতভাবে রাজনৈতিক তৎপরতা কার্যত: নিষিদ্ধ করে রাখা হয়েছে। সভা-সমাবেশ-মিছিল করতে গেলেও চালানো হচ্ছে গুলি। যৌথবাহিনীর অভিযানের নামে শাসকদলের সন্ত্রাসীদের সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের বাসস্থানে হামলা চালানো হচ্ছে। তাদের ঘর-বাড়ি ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে, মালামাল লুট করা হচ্ছে। আত্মীয়-স্বজন ও মহিলাদেরকেও ধরে নিয়ে যাচ্ছে। এখনো অনেককে গুম করা হচ্ছে। স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ এভাবেই মানুষের উপর অত্যাচার করেছে। বিচার বিভাগ, সংবাদপত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ করেছে। জনগণের সমস্ত অধিকার কেড়ে নিয়ে একদলীয় শাসন চাপিয়ে দিয়েছে। গণতন্ত্র হত্যা করেছে। সব প্রতিবাদ অস্ত্রের ভাষায় স্তব্ধ করে দিয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সর্বজন শ্রদ্ধেয় মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে পর্যন্ত গৃহবন্দী করতেও তারা কুণ্ঠিত হয়নি। আওয়ামী লীগ এবারো একই অপরাধ ও অপকর্ম করে যাচ্ছে একটু ভিন্ন পন্থায়। এবার তারা মুখে গণতন্ত্রের কথা বলে বিরোধী দলীয় নেতাকে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই গৃহবন্দী করেছে।

প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,
এতো কিছু সত্বেও আজ আমি আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসীকে আবারো কথা দিচ্ছি, আমরা কখনো আওয়ামী লীগের এসব অপকর্মের পুনরাবৃত্তি বা অনুসরণ করবো না। আমি নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করি যে, বঞ্চিত ও উৎপীড়িত দেশবাসী অচিরেই তাদের ভোটাধিকার ফিরে পাবে। দেশে গণতন্ত্র ফিরে আসবে এবং ভোটের মাধ্যমে তারা তাদের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে।
সেই আস্থা থেকেই আমি আগামী দিনে আমাদের কর্মসূচির একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা আজ আবারো তুলে ধরতে চাই :
*    বাংলাদেশের মুসলমান - হিন্দু - বৌদ্ধ - খৃষ্টান, পাহাড়ের মানুষ সমতলের মানুষ, ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলে মিলে আমরা গড়ে তুলবো জাতীয় ঐক্য, অখ- জাতীয় সত্ত্বা।
*    নির্ভেজাল গণতন্ত্রই হবে আমাদের রাষ্ট্রপরিচালনার পদ্ধতি। সকলের অংশগ্রহণে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ পন্থায় ক্ষমতা হস্তান্তরের একটা স্থায়ী রূপরেখা নির্ণয় করা হবে।
*    সন্ত্রাস, জঙ্গীবাদ, সাম্প্রদায়িকতা কঠোর হাতে দমন করা হবে।
*    দুর্নীতি, দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতির ধারা সম্পূর্ণ বন্ধ করা হবে। মেধা ও যোগ্যতাই হবে মূল্যায়নের মাপকাঠি
*    নির্বাচন পদ্ধতির যুগোপযোগী সংস্কার এবং সংসদে শ্রেণী ও পেশার প্রতিনিধিত্ব এবং মেধাবী, যোগ্য ও দক্ষ নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেয়া হবে।
*    বিরোধী দলকে যথাযথ গুরুত্ব ও মর্যাদা দেয়া হবে।
*    ক্ষমা, ঔদার্য, মহানুভবতা ও যুক্তিশীলতা দিয়ে নির্ধারিত হবে বিরোধী দলের প্রতি আচরণ।
*    সমঝোতার ভিত্তিতে হানাহানি ও সংঘাতের রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনা হবে।
*    দেশের সকল মতের কৃতি ও মেধাবী নাগরিকদের রাজনীতি, সরকার পরিচালনা ও জাতীয় ক্ষেত্রে অবদান রাখার সুযোগ সৃষ্টি ও এর জন্য উপযুক্ত কাঠামো গড়ে তোলা হবে।
*    সকল দেশের বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা ও বন্ধুত্ব আরো জোরদার করা হবে।
*    জাতীয় ও আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতি ও নিরাপত্তা জোরদার করার নীতি ও কৌশল গ্রহণ করা হবে।
*    বিচার বিভাগ ও সংবাদ-মাধ্যমের স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করা হবে।
*    জনপ্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসমূহকে দলীয়করণমুক্ত করে দক্ষ ও কার্যকর করা হবে।
*    সুশাসন  ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা হবে।
*    স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে কার্যকর ও শক্তিশালী করা হবে।
*    পরিকল্পিত ও কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হবে।
*    নারী শিক্ষা, নারী অধিকার ও নারীর ক্ষমতায়নকে আরো প্রসারিত করা হবে।
*   ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম জোরদার করা হবে। গ্রামীণ ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত থাকবে। একমাত্র নোবেল বিজয়ী বাংলাদেশী প্রফেসর ড. মুহম্মদ ইউনূসকে যথাযথ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করা হবে।
*    সকলের মিলিত চেষ্টায়, তরুণদের কর্মশক্তিকে কাজে লাগিয়ে দারিদ্র ও বেকারত্ব হ্রাস করে গড়ে তোলা হবে একটি কর্মমুখর সমাজ।
*    বিদ্যুৎ, জ্বালানি, খনিজ সম্পদ, প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি, শিল্প-বাণিজ্য, সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে আমাদের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা আগামীতে আমরা নির্বাচনী ইশতেহারে বিশদভাবে তুলে ধরবো।
প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,
বাংলাদেশে আমরা কেবল গণতন্ত্রই হারাইনি। সব দিক দিয়েই অনেক পিছিয়ে পড়েছি। জাতীয় প্রবৃদ্ধির হার আমাদের সময়ের তুলনায় কমে গেছে। মানুষ আরো গরীব হয়েছে। দুর্নীতি, লুণ্ঠন, চাঁদাবাজির কারণে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ শূন্যের কোঠায়। ব্যাংকগুলো লুঠপাট হয়েছে। শেয়ারবাজার লুণ্ঠন করে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে প্রায় প্রায় লক্ষ কোটি টাকা। জিনিষপত্রের দাম নাগরিকদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা, শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং শিল্পায়ন ও উন্নয়নের ধারা বজায় রাখতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। ঘৃণায়, বিদ্বেষে, বিভেদে, হানাহানিতে সারা দেশ আজ অশান্ত ও অস্থির। সাধারণ মানুষ, ধর্মপ্রাণ মানুষ, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী কেউ আজ শান্তিতে স্বস্তিতে নেই। তবুও কেবলই চলছে একতরফা প্রচার ও অত্যাচার। এই অবস্থা থেকে দেশকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে। শান্তি, স্বস্তি, সহঅবস্থান এবং সুস্থ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। সকলের আগে প্রয়োজন, দুর্বল জনগোষ্ঠী বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা বিধান।
প্রহসনের নির্বাচন থেকে জনগণ ও বিশ্ববাসীর দৃষ্টি ফেরাতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সন্ত্রাসী হামলা শুরু করা হয়েছে। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই। এ ব্যাপারে আমরা আগে থেকেই বারবার সতর্ক করে আসছিলাম। কিন্তু সরকারের ইঙ্গিতে প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নির্বিকার ভূমিকায় ইতিমধ্যে অনেক জায়গায় নির্মম ও ন্যক্কারজনক হামলার ঘটনা ঘটে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে বিরোধী দলকে দায়ী করে অপপ্রচার শুরু এবং নিরপরাধ নেতা-কর্মীদের ওপর অত্যাচারের মাত্রা বাড়ানো হয়েছে।  অথচ আক্রান্তদের বক্তব্য ও সংবাদ-মাধ্যমে প্রচারিত তথ্য থেকেই জানা যাচ্ছে যে, শাসকদলের লোকজনই এসব হামলায় জড়িত। আমি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত প্রতিটি এলাকায় আমাদের নেতা-কর্মী ও নাগরিকদের এই ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িক হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছি। এই সব জঘণ্য ও সুপরিকল্পিত হামলার ঘটনাকে পুঁজি করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের অপচেষ্টা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাচ্ছি। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে হামলার সঙ্গে জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তি, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ এবং এ ধরণের ন্যক্কারজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ও বিস্তার রোধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি করছি। এখন যদি এসব পদক্ষেপ নেয়া না হয়, তাহলে আগামীতে বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং প্রয়োজনবোধে জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থাকে সম্পৃক্ত করে উপযুক্ত তদন্তের মাধ্যমে সকল অপরাধীকে চিহ্নিতকরণ ও শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা করা হবে। সকলে মিলেমিশে শান্তিতে বসবাস এবং অসাম্প্রদায়িকতার ঐতিহ্য আমাদের গৌরব। একে আমরা ভুলুণ্ঠিত হতে দেব না।
সাংবাদিক ভাই-বোনেরা,
বাংলাদেশের মানুষ গণতন্ত্রের জন্য, ভোটের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করছে। এই সংগ্রামের পাশাপাশি আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনে আমাদের আহ্বান অব্যাহত রয়েছে।
নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সকলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই।
এ ছাড়া দেশে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। আমি আজ আবারো অবিলম্বে সেই লক্ষ্যে সংলাপের উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।
সংলাপ ও সমাঝোতার পরিবেশ সৃষ্টির জন্য অবিলম্বে:
*   সকল রাজনৈতিক নেতা-কর্মীর মুক্তি ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার,
*    গ্রেফতার, নির্যাতন, হামলা, মামলা বন্ধ,
*    বিএনপি সদর দফতরসহ বিরোধী দলের সকল অফিস খুলে দিয়ে স্বাভাবিক তৎপরতার সুযোগ দেয়া,
*    শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির ওপর থেকে অলিখিত বিধিনিষেধ তুলে নিয়ে সভা-সমাবেশ, মিছিল-শোভাযাত্রা ও প্রচারাভিযানে হামলা, হুমকি, বাধা দেয়া বন্ধ করা,     এবং
*    সকল বন্ধ গণমাধ্যমে খুলে দিয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানাচ্ছি।
প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,
বর্তমান সংসদ জনপ্রতিনিধিত্বহীন এবং দেশ পরিচালনার ব্যাপারে সরকারের পেছনে জনগণের কোনো অনুমোদন নেই। যে সংবিধানের দোহাই দিয়ে এবং ক্ষমতার স্বার্থে সংবিধানের অপব্যাখ্যা ও অপব্যবহার করে এই নির্বাচনী প্রহসন আওয়ামী লীগ করেছে, তারা নিজেরাই প্রতিপদক্ষেপে সেই সংবিধান লঙ্ঘন করে চলেছে।
কাজেই এ সরকার বৈধ সরকার নয়। একটি অবৈধ সরকারের কোনো দায়িত্ববোধ থাকে না জনগণের প্রতি। এমন একটি সরকার দীর্ঘায়িত হওয়া খুবই বিপজ্জনক।
তাই অনতিবিলম্বে এই বিপজ্জনক সরকারকে সরিয়ে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়ে একটি জনগণের সরকার, একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে পুনরায় সমঝোতা ও সংলাপের আহ্বান জানিয়ে আমার বক্তব্য আজকের মতো এখানেই শেষ করছি।
আপনাদের সকলকে ধন্যবাদ।
আল্লাহ্ হাফেজ, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।

দেখবো কতোদিন আটকে রাখতে পারেন - বেগম খালেদা জিয়া

Sunday, December 29, 2013

বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের খুন এবং তাকে বাধা দেয়ার পরিণত শুভ হবে না বলে হুশিয়ারী উচ্চারণ করেছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্যে করে তিনি বলেছেন, আপনার পিতাও ৩০ হাজার মানুষ হত্যা করেছিল। তার পরিণতি ভালো হয়নি। এবারও পরিণতি ভালো হবেনা। এসবের পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ ও কঠিন। শেখ হাসিনা রক্তগঙ্গা বইয়ে দিচ্ছেন। রক্তের সাগর পাড়ি দিয়ে নৌকা গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে না। নিজ বাসার সামনে খালেদা জিয়া সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, দেখি কতদিন আটকিয়ে রাখতে পারেন। যতদিন এরকম করবেন ততদিন কর্মসূচি চলবে। শেখ হাসিনা রক্তের গঙ্গা বইয়ে দিচ্ছেন। এই রক্তের গঙ্গার ওপর দিয়ে তিনি তার নৌকা দিয়ে ক্ষমতায় যাবেন। এই ক্ষমতা দুরাশা। সেটা ভুলে যেতে বলেন। ক্ষমতা। দেখবো কতোদিন আটকে রাখতে পারেন। কর্মসূচি চলবে যতোদিন এরকম করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ভুলে যাননি সেই দিনগুলোর কথা। আজকে সারা দেশকে কি অবস্থা করে রেখেছেন। সাহস থাকলে ছেড়ে দিতেন। দেখতেন যে কিভাবে জনগণ রাস্তায় নেমে আসে। মা-বোন, ভাই, কৃষক শ্রমিক মেহনতি জনতা রাস্তায় নামতো। আপনারা জাতীয় পতাকার অবমাননা করেছেন। দেশের প্রতিটি মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করেছেন। আজকে আমি রাজ পথে যেতে চাই। কিন্তু কেন বাধা দেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, তাদেরতো রাজপথে নামার সাহস নেই। দুনিয়ার সিকিউরিটি নিয়ে চলেন, আর মানুষ মারেন। মানুষ গুম করেন। মানুষ খুন করেন। সারা দুনিয়া জেনে গেছে যে হাসিনা কতো মানুষ খুন করেছে। কতো মানুষ গুম করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এই পুলিশ বাহিনী, র‌্যাব বাহিনী। আর কতো মানুষ মারবেন? তাও দেখবো। এর আগেওতো মেরেছেন। তার পিতা ক্ষমতায় থেকে ৩৫ হাজার লোক মেরেছেন। আর এখন আরও মারছেন। মারেন। এর পরিণতিযে শুভ হবে না তা তারা জেনে গেছেন। এর পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ ও কঠিন। জবাবদিহী করার জন্য প্রস্তুুত থাকেন। সরকারের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আপনারা আইনজীবীদের ওপর আক্রমন করেন, গ্রেপ্তার করেন, সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছেন, মা-বোনদের ওপর নির্যাতন করছেন। আপনারা (প্রধানমন্ত্রী) মহিলা। আপনাদের মহিলাদের প্রতি এতোটুকু সম্মান নেই।

অবরুদ্ধ নয়াপল্টন by কাফি কামাল

নয়াপল্টনের প্রবেশমুখ নাইটিঙ্গেল মোড়ে কাটাতারের বেড়া। কয়েক স্তরে সতর্ক প্রহরায় পুলিশ। সাধারণ মানুষের প্রবেশে মানা। ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে উল্টোপথে।
তল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়া নয়াপল্টন ভিআইপি সড়কটি ঢুকতে পারছেন না গণমাধ্যমকর্মীরা। একই দৃশ্য ফকিরাপুল মোড়েও। কাটাতারের বেড়া দিয়ে আটকে দেয়া হয়েছে নয়াপল্টনের প্রতিটির গলিমুখ। সেখানে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা। আশপাশের প্রতিটি বিল্ডিংয়ের ছাদে দূরবীন হাতে অবস্থান নিয়েছে পুলিশ। নয়াপল্টনে ঢোকার সব পথে অবস্থান নিয়েছে পুলিশ। কাউকে কোথাও দাঁড়াতে দেয়া হচ্ছে না। ভিআইপি সড়কটির সকল প্রতিষ্ঠান তালাবদ্ধ। জনশূন্য নয়াপল্টনে টহল দিচ্ছে পুলিশের ছোট ছোট টিম। ছুটোছুটি করছে এপিসি, জলকামান। সবখানে সাদা পোশাকধারী গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের আনাগোনা। দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের কলাপসিবল গেটে আগের মতোই ঝুলছে তালা। সেখানে বসে আছে পুলিশ। মাঝে মধ্যে কার্যালয়ের দায়িত্বরত কর্মচারীরা কলাপসিবল গেটের ভেতরে দাঁড়িয়ে উঁকি মারছেন। কার্যালয়ের সামনের রাস্তায় অলস সময় পার করছেন গণমাধ্যমকর্মীরা। সবমিলিয়ে ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’কে কেন্দ্র করে নয়াপল্টন পরিণত হয়েছে রীতিমতো নিষিদ্ধ এলাকায়। সুনসান নয়াপল্টনে কেবল পুলিশের টহল। নয়া পল্টনে শুধুই পুলিশ। ১৮দলের ঘোষণা অনুযায়ী সকাল থেকে হাজার-হাজার নেতাকর্মীর স্লোগান ও পদভারে মুখরিত হওয়ার কথা নয়াপল্টন। কিন্তু ঠিক উল্টো পরিস্থিতি সেখানে। নয়াপল্টনের শতভাগ নিয়ন্ত্রন র‌্যাব-পুলিশ-গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের হাতে। ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচি ঠেকাতে গতরাত থেকে রাজধানী জুড়ে চলছে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর কড়া তৎপরতা। কাটাতারের বেড়া ও বালুভর্তি ট্রাক দিয়ে ব্যারিকেড সৃষ্টির মাধ্যমে ঘেরাও করে রাখা হয়েছে গুলশানে বিরোধী নেতা খালেদা জিয়ার বাসভবন। রাজধানীতে ঘুরছে না গণপরিবহনের চাকা। রাস্তার মোড়ে মোড়ে রিক্সা থেকে শুরু করে প্রতিটি হালকাযান তল্লাশি করছে পুলিশ। পাহারা বসিয়েছে সরকার দলীয় নেতাকর্মীরা। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতি পেরিয়ে নয়াপল্টন অভিমুখে নেই কোন বিরোধীদলের মিছিল। এমনকি কয়েকজন একত্রিত হয়েও চলাচলও করতে পারছেন না। তবুও নয়াপল্টনে সদাসতর্ক আইনশৃঙ্খলাবাহিনী। এদিকে নয়াপল্টনসহ পুরো পল্টন এলাকা ঘিরে রেখেছে র‌্যাব-পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার নিরাপত্তার জাল। চলছে কঠোর নজরদারি। এমনকি নয়াপল্টনের গলিগুলোতেও দেয়া হয়েছে একাধিক কাটাতারের ব্যারিকেড। ওদিকে সোয়া ১টার সময় গলিপথে নয়াপল্টন যাবার পথে পুরনো পল্টন রাস্তা থেকে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক কূটনীতিক ইনাম আহমেদ চৌধুরীকে আটক করে পুলিশ। তারপরই তাকে ডিবি কার্যালয়ে নেয়া হয়। এর আগে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পুলিশের সতর্ক দৃষ্টি গলিয়ে নয়াপল্টনে ঢুকে পড়েছিলেন বিরোধী দলের কয়েকজন কর্মী ও সাধারণ মানুষ। ৫ মিনিটের মধ্যেই ১১টা ৩৫ মিনিটে নয়াপল্টনের ভিআইপি সড়ক থেকে তাদের আটক করে পুলিশ। তাদের মধ্যে সাবেক এমপি রওশন আরা ফরিদ, মহিলা দলের নেত্রী সাদিয়া হক, জান্নাতুল ফেরদৌস, এলিজা জামান, শিরিন আখতার রীনা, নয়াপল্টনের দোকান কর্মচারী জামসেদ আলী, ফকরুল ইসলাম মুন্সি, সাইদুল ইসলাম, আবু তাহের, ইসমাইল, বিআরটিসি বাসের স্টাফ বাদল, দুই ছাত্র আশিক ও রুবেল। সবমিলিয়ে নয়াপল্টন ও ফকিরাপুল থেকে আটক করা হয় ১২ জনকে। তাদের সবাইকে পল্টন মডেল থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। ওদিকে পাঁচদফা টানা অবরোধের পর রাজধানী অভিমুখে গণতন্ত্রের অভিযাত্রা কর্মসুচি ঘোষণা করেছিলেন বিরোধী নেতা খালেদা জিয়া। সারা দেশ থেকে সে কর্মসুচিতে অংশ নিয়ে আজ অভিযাত্রার শেষ গন্তব্য ছিল নয়াপল্টন। যে কোন মূল্যে কর্মসুচি সফল করার ঘোষণা দিয়ে বিএনপির তরফে গতকাল জানানো হয়েছিল প্রতিকূলতা পেরিয়ে কর্মসুচিতে অংশ নেবেন খালেদা জিয়া। তবে সকাল থেকে নয়াপল্টনমুখী হননি বিএনপিসহ ১৮দলের কোন শীর্ষস্থানীয় নেতা। কোন দৃশ্যমান তৎপরতা চালাতে পারেনি তারা। বিএনপি নেতারা জানিয়েছেন, নয়া পল্টনের কাছাকাছি এলাকায় নেতা-কর্মীরা বিক্ষিপ্তভাবে অবস্থান করছেন। পুলিশি বাধার কারণে তারা সমাবেশস্থলে উপস্থিত হতে পারছেন না। পুলিশের কর্মকর্তারা বলেছেন, অনুমতি না থাকায় সমাবেশ হতে দেয়া হবে না।

তারা দেশকে কোথায় নিয়ে যেতে চায়?- দুই পক্ষের কঠোর অবস্থান

Thursday, December 26, 2013

বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোটের ঢাকা অভিমুখী ‘গণতন্ত্রের অভিযাত্রা’ করতে দেওয়া হবে না বলে সরকার দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। ২৯ ডিসেম্বর বিরোধী দলের লোকজনকে কোথাও জড়ো হতে দেবে না সরকার।
আগামী ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে অন্তত এক সপ্তাহ সরকার দেশে কোনো রাজনৈতিক গোলযোগ হতে দিতে চায় না। মঙ্গলবার রাজধানীর বাংলামোটরে পেট্রলবোমায় পুলিশের সদস্য হত্যা মামলায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিরোধীদলীয় জোটের ১৮ জন নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরের পেছনেও ওই একই উদ্দেশ্য।

নাশকতা ও ককটেল-পেট্রলবোমার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা সরকারের মুখে সব সময় শোনা যাচ্ছে। এবার
২৯ ডিসেম্বর ‘গণতন্ত্রের অভিযাত্রা’ ঠেকাতেও কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি শোনা যাচ্ছে। কিন্তু সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আর
বাকি রেখেছে কি? যেকোনো নাশকতায় দু-চারজনের নাম দিয়ে শত শত বা হাজার হাজার ‘অজ্ঞাত’ ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় যৌথ বাহিনীর অভিযানে জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে সংঘর্ষে অনেকে মারা যাচ্ছেন। আর কত কঠোর হবে সরকার?

অন্যদিকে বিএনপির চেয়ারপারসন বলেছেন, ২৯ ডিসেম্বর তাঁদের কর্মসূচিতে বাধা দিলে পরিণতি হবে ভয়াবহ। তাঁদের ‘গণতন্ত্রের অভিযাত্রা’ কর্মসূচি পালনে বাধা দিলে পরিণতি কঠিন ও করুণ হবে বলেও তিনি সরকারকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন।

প্রশ্ন হলো, বিরোধী দল যেভাবে বাসে পেট্রলবোমা মেরে, ককটেল ফাটিয়ে মানুষ হত্যা করছে, অবরোধের নামে রেলের ফিশপ্লেট খুলে যাত্রী হত্যা, গাছ কেটে ‘জলবায়ু-অপরাধ’ সাধন, এমনকি বোমা মেরে গরু পুড়িয়ে মারার মতো ঘৃণ্য অপরাধ করে চলেছে, এরপর আর কত ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে চায় ওরা? বিরোধী দল কি সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করছে?

আর কত হত্যা, রেললাইন উপড়ে ফেলা, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া, বাসে পেট্রলবোমা মারার পর বিরোধী দল বলবে,
যথেষ্ট কঠোর পরিণতি ডেকে আনা হয়েছে?  আর সরকারই বা আর কত জেল-জুলুম-নির্বিচার গুলি চালিয়ে বলবে, তারা যথেষ্ট কঠোর হয়েছে?

স্বাভাবিক বিচার-বিবেচনা থাকলে কোনো দায়িত্বশীল দল রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে বা কোনো সরকার বিরোধী দলের কর্মসূচি দমনের নামে এত নির্মম আচরণ করতে পারে না। রাজনীতি মানুষের জন্যই। তাই রাজনীতির জন্য যেন একজন নাগরিকের প্রাণও বিপন্ন না হয়, তা দেখা প্রতিটি রাজনৈতিক দলের কর্তব্য। যাঁরা সরকারের আছেন, তাঁদের দায়িত্ব আরও বেশি। কারণ, সুষ্ঠুভাবে দেশ পরিচালনার জন্যই তাঁদের জনগণ নির্বাচিত করেছে।

২৯ ডিসেম্বর ঘিরে দেশে সৃষ্ট অনিশ্চিত পরিস্থিতির অবসান হোক। সরকার ও বিরোধী পক্ষ আরও দায়িত্বশীল আচরণ করুক। মানুষ শান্তিতে থাকতে চায়। তাদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার অবসান ঘটানোর উদ্যোগ নেওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ।

কার্যালয়ে খালেদার একাকী একঘণ্টা

পুলিশী বাধার কারণে নেতাকর্মীদের অনুপস্থিতিতে গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ঘণ্টাব্যাপী একাকী সময় কেটেছে বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়ার। গতরাতে এমন ঘটনা ঘটেছে।
রাত ৯টার দিকে গুলশানের বাসভবন থেকে বেরিয়ে নিজের রাজনৈতিক কার্যালয়ে যান বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া। আগে থেকেই সেখানে পুলিশ ছিল সতর্ক অবস্থানে। কার্যালয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের ঢুকতে দেয়নি পুলিশ। খালেদার বাড়ি থেকে তার সঙ্গে থাকা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরীন সুলতানাই কেবল ঢোকার সুযোগ পান কার্যালয়ে। ফলে নিজ কার্যালয়ে একাকী বসেছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন। এর মধ্যেই রাত ১০টার দিকে গুলশানের ওই কার্যালয়ে যান সাংবাদিক নেতারা। কার্যালয়ের সামনে অবস্থানরত পুলিশ সদস্যরা তাদের প্রথমে আটকালেও সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে ভেতরে ঢুকতে দেয়। ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের সভাপতি রুহুল আমিন গাজীর নেতৃত্বে বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া সাংবাদিকদের মধ্যে ছিলেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমেদ, ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের যুগ্ম মহাসচিব এম আবদুল্লাহ, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খান, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সদস্য খোরশেদ আলম ও বাসির জামাল। পরে রাত ১২টার দিকে তিনি কার্যালয় থেকে গুলশানের বাসায় ফিরে যান। এর আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় অভিযাত্রা কর্মসূচি ঘোষণার পর বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশানের বাসভবন ও রাজনৈতিক কার্যালয়ের সামনে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো হয়। এক পর্যায়ে দুই ভবনের ফটকের সামনে বেষ্টনি তৈরি করে পুলিশ। এরপর থেকে দুই ভবনে বিএনপি নেতাকর্মীদের ঢুকতে বাধা দেয়ার পাশাপাশি গ্রেপ্তার করা হয় বেশ কয়েকজনকে। এমন কি দলের কয়েকজন প্রবীণ নেতাকে আটকের পর বাসায় পৌছে দেয়া হয়। তারই ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয়দিনের মতো গতকালও কড়াকড়ি বজায় রাখে পুলিশ। বিএনপি চেয়ারপারসন কার্যালয়ে যাওয়ার পর সেখানে যান দলের ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান ও ঢাকা মহানগর মহিলা দলের সভাপতি সুলতানা আহমেদ। তারা কার্যালয়ে ঢুকতে চাইলে বাধা দেয় পুলিশ। এমনকি অফিসকর্মীদেরও যাতায়াতে বাধা দেয়া হয়। তখন তারা সেখানে অবস্থান নিতে চাইলে পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, আপনারা চলে যান অন্যথায় আমরা আপনাদের গ্রেপ্তার করতে বাধ্য হবো। পরে তারা চলে যায়। এদিকে বার্তা সংস্থা এএফপি’কে এক সাক্ষাৎকারে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী অভিযোগ করে বলেছেন, বিরোধী দল বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কার্যত গৃহবন্দি। এখন বিরোধী দলের কোন নেতাকর্মীকে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে দেয়া হচ্ছে না। আগামী মাসের জাতীয় সংসদ নির্বাচন বানচালের জন্য তিনি যে আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন তার প্রেক্ষিতে তাকে কার্যত গৃহবন্দি করা হয়েছে। পুলিশের বক্তব্য, বিএনপি চেয়ারপারসনের নিরাপত্তার স্বার্থেই পাহারা জোরদার করা হয়েছে।

খালেদা জিয়ার পুরো বক্তব্য @২৪ ডিসেম্বর ২০১৩

Tuesday, December 24, 2013

বিস্মিল্লাহির রাহ্মানির রাহিম
প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,
আসসালামু আলাইকুম।

ভয়ংকর রাষ্ট্রীয়-সন্ত্রাস কবলিত দেশ। প্রতিদিন রক্ত ঝরছে। বিনাবিচারে নাগরিকদের জীবন কেড়ে নেয়া হচ্ছে। ঘরে ঘরে কান্নার রোল। শহরের সীমানা ছাড়িয়ে নিভৃত পল্লীতেও ছড়িয়ে পড়েছে আতংক। সকলের চোখে অনিশ্চয়তার ছায়া। নির্বিকার শুধু সরকার। তাদের লক্ষ্য একটাই, যে-কোনো মূল্যে ক্ষমতাকে কুক্ষিগত রাখা। তাই তারা ভিনদেশী হানাদারদের মতো ‘পোড়ামাটি নীতি’ অবলম্বন করে চলেছে। এমন পরিস্থিতি আমরা কখনো চাইনি। এই দেশের প্রতি আমাদের অঙ্গীকার আছে। এ দেশের জনগণের প্রতি আমাদের মমতা আছে। তাই আমরা বরাবর সমঝোতার কথা বলেছি। শুধু মুখে বলা নয়, আমরা সমঝোতার জন্য সব রকমের চেষ্টা করছি। সকল দলের অংশগ্রহনে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে আমরা প্রস্তাব দিয়েছি। সে প্রস্তাব আমাদের পক্ষ থেকে পার্লামেন্টেও পেশ করা হয়েছে। আমরা বলেছি, আসুন, এই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করে একটা ঐক্যমতে পৌঁছাই।  সরকার তাতেও রাজি হয়নি। তারা অনড় অবস্থান নিলেন। ক্ষমতায় থেকে, পার্লামেন্ট বহাল রেখেই তারা নির্বাচন করবেন। আমরা চাইলে তাদের সরকারে কয়েকজন মন্ত্রী দিতে পারবো শুধু। এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে একটি দল কীÑধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতির শিকার হয়েছে, তা আজ দেশবাসীর সামনে পরিস্কার। আমরা একটা সমঝোতার উদ্যোগ নেয়ার জন্য রাষ্ট্রপতিকেও অনুরোধ জানিয়েছিলাম। রাষ্ট্রপতির পক্ষে তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়া সম্ভব হয়নি। তবে দেশবাসী এর মাধ্যমে সমঝোতার ব্যাপারে আমাদের আগ্রহ ও আন্তরিকতার প্রমাণ পেয়েছে।  জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি-মুনের বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো এসে সরকারের সঙ্গে বিরোধী দলের বৈঠকের উদ্যোগ নেন। আমরা তাতেও সাড়া দিয়েছি। যদিও মিথ্যা মামলায় কারাগারে আটক আমাদের নেতা-কর্মীদের মুক্তি দেয়া হয়নি। বিরোধী দলের ওপর নির্যাতন বন্ধ হয়নি। এমনকি, একতরফা নির্বাচনের ঘোষিত তফসিল পর্যন্ত স্থগিত করা হয়নি। অর্থাৎ, আলোচনার একট সুষ্ঠু পরিবেশ সরকারের তরফ থেকে সৃষ্টি করা হয়নি। তা সত্ত্বেও আলোচনার মাধ্যমে সংকট সুরাহা করার ব্যাপারে আন্তরিকতার সর্বোচ্চ প্রমাণ আমরা দিয়েছি। দু:খের বিষয়, তিন দফা আলোচনা সত্ত্বেও সরকারের অনড় মনোভাবের কারণে কোনো সমঝোতায় পৌঁছা সম্ভব হয়নি। তারা সকল দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন চায়নি। ক্ষমতায় থেকে নির্বাচনের নামে কী-ধরণের প্রহসন করা তাদের উদ্দেশ্য, তা সকলের সামনে এর মধেই স্পষ্ট হয়ে গেছে।  আসলে কেবল লোক দেখানোর জন্য তারা আলোচনায় এসেছিলেন। এটা ছিল সময় ক্ষেপণে তাদের এক প্রতারণাপূর্ণ কৌশল। এর আড়ালে তারা তাদের অসৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পথেই এগিয়ে গেছে। আপনারা জানেন, তৃতীয় দফা বৈঠকে আমাদের দেয়া প্রস্তাব নিয়ে সরকারী দল তাদের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করে আবার ফিরে আসার অঙ্গীকার করেছিল। তারা সে কথাও রাখেনি। আমাদেরকে আর কিছু জানানোও হয়নি। সংবাদ-মাধ্যম থেকে আমরা জেনেছি যে, তারা বলেছে, দশম সংসদ নির্বাচন নিয়ে আলোচনার আর কোনো অবকাশ নেই। নির্বাচনের নামে একতরফা এক নজীরবিহীন প্রহসনের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে তারা।

উপস্থিত সাংবাদিক বন্ধুগণ,
সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন প্রশ্নে ১৯৯৫-৯৬ সালে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় পার্টিকে সঙ্গী করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের দাবিতে আন্দোলনের নামে দেশজুড়ে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল আওয়ামী লীগ। হত্যাকান্ড, ধ্বংসযজ্ঞ ও অর্থনৈতিক বিনাশই ছিল তাদের আন্দোলনের পন্থা। গান পাউডার দিয়ে যানবাহন জ্বালিয়ে তারা নিরপরাধ নাগরিকদের হত্যা করেছে। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর তারা দীর্ঘদিন অচল করে রেখেছে। সে সময় বিএনপি সরকার দেশ পরিচালনা করছিল। আমরা বিভিন্ন প্রস্তাব দিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করেছিলাম। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বন্ধুরাও মধ্যস্থতার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের অনমনীয়তা ও সন্ত্রাস-আশ্রয়ী কার্যকলাপের কারণে কোনো উদ্যোগই সফল হয়নি।  আমরা প্রথম দিকে তাদের দাবির সঙ্গে একমত ছিলাম না। কিন্তু সকলের অংশগ্রহনে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের স্বার্থে আমরা তাদের দাবি পূরণে সম্মত হই। তবে তার আগেই আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতের সব সদস্য জাতীয় সংসদ থেকে পদত্যাগ করে। তখন সংবিধান সংশোধন করার মতো দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিএনপি’র ছিলনা। তাই কেবলমাত্র সংবিধান সংশোধনের জন্য পার্লামেন্ট ভেঙ্গে দিয়ে একটি স্বল্পমেয়াদী জাতীয় সংসদ গঠনের জন্য আমরা নতুন নির্বাচন দিই। আমরা ঘোষনা করি, এটি একটি নিয়ম-রক্ষার নির্বাচন এবং এই নির্বাচনে জিতলে আমরা দেশ পরিচালনা করবো না। আমরা সে কথা রেখেছিলাম। সংবিধান সংশোধন করে জাতীয় নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের পর আমরা সংসদ ভেঙ্গে দিই এবং সরকার পদত্যাগ করে। সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা তুলে দিয়ে, ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করার হীন উদ্দেশ্যে আওয়ামী লীগ একতরফাভাবে সংবিধানের বিতর্কিত পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করেছে। সে কারণেই আজকের সংকটের সূত্রপাত ঘটেছে। এই হঠকারিতার কারণে দেশে যা-কিছু ঘটছে, তার দায়-দায়িত্ব আওয়ামী লীগের নেতাদেরকেই বহন করতে হবে। আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা হচ্ছে, দুই প্রধান রাজনৈতিক পক্ষের মধ্যে একটি ঐক্যমত ও সমঝোতা ছাড়া শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং সকলের অংশগ্রহনে একটি সুষ্ঠ, অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়। এটা জানা সত্ত্বেও, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থেকে, প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে, তাদের ক্ষমতাকে প্রলম্বিত করার যে কূটকৌশল গ্রহন করেছে, তার বিষময় কুফল আজ দেশবাসী পাচ্ছে।

সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা,
আওয়ামী লীগের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায়ই বলে থাকেন যে, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তিনি জনগণের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করেছেন। কিন্তু সংবিধানের এই বিতর্কিত সংশোধনীর আওতায় তিনি আজ নির্বাচনের নামে যে প্রহসন পরিচালনা করছেন তাতে জনগণের ভোট ছাড়াই ১৫৪ জন এমপি হয়ে যাচ্ছেন। অর্থাৎ সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য তাদের জনগণের ভোটের কোনো প্রয়োজন হয়নি। দেশের মোট ভোটারের শতকরা প্রায় ৫৩ জনের ভোটের অধিকার এই প্রক্রিয়ায় কেড়ে নেয়া হয়েছে। বাকী আসনগুলোতেও যারা প্রার্থী আছেন তাদেরও কোনো উপযুক্ত ও যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। সেখানেও ভোটাররা বঞ্চিত হচ্ছেন তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে। কারণ শুধু বিএনপি নয়, দেশের উল্লেখযোগ্য সকল বিরোধী দলই এই নির্বাচনী প্রহসন বর্জন করেছে। শুধু আওয়ামী লীগ এবং তাদের জোটের একাংশ এই একতরফা প্রহসনে শামিল হয়েছে। এই নির্বাচনী তামাশা কোনো ইলেকশন নয়, এটা নির্লজ্জ সিলেকশন। জনগণের  ভোটাধিকার হরণের এমন জঘণ্য প্রহসন আমাদের জাতীয় ইতিহাসে এক ঘৃণ্য কলঙ্কের অধ্যায় হয়ে থাকবে। শাসকদলের এই অপকৌশলের কথা আমরা বিগত কয়েক বছর ধরেই বারবার বলে আসছিলাম। দেশ পরিচালনায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ এই চরম অত্যাচারী ও অযোগ্য সরকার জনগণ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তাই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ কোনো নির্বাচনে জনগণের ভোটে নিজেদের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের সাহস তাদের নেই।  নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের জন্য আমাদের দাবি গণদাবি ও জাতীয় আকাঙ্খায় পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা গেছে শতকরা ৮০ জনেরও বেশি মানুষ নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন করার পক্ষে। যখন সারাদেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ আমাদের সঙ্গে রাজপথে নেমে শান্তিপূর্ণভাবে এই দাবির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষনা করছিলেন, তখন সরকার শান্তিপূর্ণ সমাবেশের সকল অধিকার কেড়ে নিয়েছে। দুনিয়ার সব গণতান্ত্রিক দেশে জনগণের ও বিরোধী দলের রাজপথে নেমে শান্তিপূর্ণ পন্থায় তাদের দাবি তুলে ধরার অধিকার থাকলেও বাংলাদেশে তা নেই। এখানে কেবল সরকারের সমর্থকরা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ছত্রছায়ায় রাজপথে সশস্ত্র মহড়া দিতে পারে। অথচ আমাদের সংবিধানে সকলকেই শান্তিপূর্ণ সমাবেশ অনুষ্ঠানের অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে। বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের দিয়ে কারাগারগুলো ভরে ফেলা হয়েছে। আমাদের সদর দফতর ও শাখা কার্যালয়গুলো অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। নির্বিচারে  চলছে হত্যা, গুম, নির্যাতন, গুলি, কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ, লাঠিচার্জ, গ্রেফতার ও অপহরণ। সুপরিকল্পিতভাবে এই সন্ত্রাসী পরিবেশ তৈরি করে দেশের জনগণ ও বিরোধী দলকে আতংকিত ও পলায়নপর রেখে সরকার তাদের নির্বাচনী প্রহসনের নীল-নক্শার বাস্তবায়ন শুরু করেছে।

প্রিয় বন্ধুরা,
এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুটি গুরুতর কথা বলেছেন।
এক. সমঝোতার মাধ্যমে আসনগুলো ভাগাভাগি করেছেন তারা। ফলে ১৫৪ আসন ভোট ছাড়াই তারা পেয়ে গেছেন। বিএনপি অংশ নিলে এভাবেই আমাদেরকেও আসন দেয়া হতো।
দুই. বিরোধী দল নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় একদিক থেকে ভালোই হয়েছে। জনগণকে আর বিরোধী দলকে ভোট দিতে হলো না। এতে জাতি অভিশাপমুক্ত হয়েছে।
তার কথাতেই পরিস্কার হয়েছে, নির্বাচন নয়, জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে আসন ভাগাভাগির প্রহসনই তিনি চেয়েছেন এবং এটাও প্রমাণিত হয়েছে যে, যদি বিরোধীদল এতে অংশ নিতো তবুও তিনি একই রকম প্রহসনের চেষ্টাই করতেন।
দ্বিতীয়ত: বিরোধীদলহীন নির্বাচনই তাঁর কাম্য। একদলীয় ব্যবস্থাতেই তিনি বিশ্বাসী। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি এমন ব্যবস্থা করেছেন, যাতে জনগণ বিরোধী দলকে ভোট দেয়ার কোনো সুযোগ না পায়। এতে তিনি পরিতৃপ্তিবোধ করছেন।
আমি প্রধানমন্ত্রীকে বলতে চাই যে, আসন ভাগাভাগি করার আপনি কেউ নন। এটা জনগণের অধিকার। তারাই ভোট দিয়ে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবে। সেই অধিকার আপনি কেড়ে নিয়েছেন। আমরা সকলেই জানি যে, কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তি নয়, জনগণই প্রজাতন্ত্রের মালিক এবং সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস। তারা একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, বিশ্বাসযোগ্য, সুষ্ঠু নির্বাচনে ভোট দিয়ে পছন্দের প্রার্থীদের তাদের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত করেন। সেই প্রতিনিধিদের সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তে সরকার গঠন ও রাষ্ট্র পরিচালনার অধিকার অর্জিত হয়।   এটাই গণতন্ত্রের বিধান। এই বিধানের অন্যথা হলে গণতন্ত্র থাকেনা। সেটা হয়ে দাঁড়ায় অবৈধ  স্বৈরাচার। আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রের পথ ছেড়ে সেই অবৈধ স্বৈরাচারের পথেই পা দিয়েছে। ইতিহাসের অমোঘ বিধানে এই পা চোরাবালিতে আটকে যেতে বাধ্য। আমরা পরিস্কার ভাষায় বলতে চাই, ভোট ও কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়া ১৫৪ জন এবং কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়া বাকী যাদেরকেই আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশন সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত ঘোষণা করবে, তারা কেউই বৈধ জনপ্রতিনিধি হবে না। কেননা, জনগণ তাদেরকে ভোট দিয়ে কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনে প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত করছে না। কাজেই তাদের সমর্থনে গঠিত সরকার হবে সম্পূর্ণ অবৈধ, অগণতান্ত্রিক ও জনপ্রতিনিধিত্বহীন। তেমন একটি অবৈধ সরকারের আদেশ নির্দেশ মান্য করতে প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং জনগণের  কোনো বাধ্যবাধকতা থাকেনা। নৈতিক ও জনসমর্থনের দিক বিবেচনায় নিলে এবং বারবার সংবিধানের বেপরোয়া লঙ্ঘণের কারণে এই সরকার অনেক আগেই দেশ পরিচালনার অধিকার ও বৈধতা হারিয়েছে। তবুও সাংবিধানিক সংকট ও শূণ্যতা চাইনি বলেই এখনো সরকারের কর্তৃত্ব ও অস্তিত্বের প্রতি আমাদের স্বীকৃতি অব্যহত রয়েছে। সংসদ বহাল রেখে নির্বাচনী প্রহসন করতে গিয়ে তারা নজীরবিহীন এক চরম জটিলতা সৃষ্টি করেছে। যে আসন শূণ্য হয়নি, সেখানে নতুন করে  জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের প্রশ্ন অবান্তর। বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যের এক নিকৃষ্ট নজীর সৃষ্টি করেছে প্রতিটি আসনে এই দ্বৈত প্রতিনিধিত্ব। এই পরিস্থিতি যারা সৃষ্টি করেছে তাদেরকেই এর নিরসনের দায়িত্ব নিতে হবে।

সাংবাদিক বন্ধুগণ,
১৯৭৫ সালে এই আওয়ামী লীগ গণতন্ত্র হত্যা করেছিল। নিজেদের লুন্ঠন ও শাসন-ক্ষমতা পাকাপোক্ত রাখতে সমাজতন্ত্রের নামে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিল। সব দল নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। সংবাদপত্র ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং জনগণের সকল মৌলিক ও মানবিক অধিকার কেড়ে নিয়েছিল। বিনা ভোটে সরকারের মেয়াদ বাড়িয়ে দিয়েছিল। নির্বাচন ছাড়াই তাদের নেতাকে রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত করে ঘোষণা করেছিল: ‘যেন তিনি নির্বাচিত।’ প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণের সম্মতি ছাড়াই এই অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপগুলো তারা গ্রহন করেছিল পার্লামেন্টারী ক্যু’র মাধ্যমে। রাষ্ট্রশক্তির নিপীড়ন চালিয়ে এবং পেশীশক্তির প্রয়োগে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনগণের সকল প্রতিবাদ-বিক্ষোভকে স্তব্ধ করে দেয়া হয়েছিল। আজ আবারো আওয়ামী লীগ সেই কলঙ্কিত ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে একটু ভিন্ন আদলে। জনগণের অধিকার হরণকারী চতুর্থ সংশোধনীর মতো এবারের বিতর্কিত পঞ্চদশ সংশোধনী তারা একতরফাভাবে ব্রুট মেজরিটির জোরে সংসদে পাস করেছে। এরপর তারা ধাপে ধাপে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে গণতন্ত্র হত্যার পথে। প্রহসন ও কারসাজির মাধ্যমে  নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করার ক্ষেত্রে সর্বশেষ উদ্যোগের মাধ্যমে তারা গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকছে। বর্তমান অবস্থায় প্রাচীন একটি ফরাসী প্রবাদের অনুকরণে আমি আজ দেশবাসীর উদ্দেশ্যে একটি বাক্য উচ্চারণ করতে চাই: ‘ডেমোক্রেসি ইজ ডেড, লং লিভ ডেমোক্রেসি।’

সমবেত সাংবাদিকবৃন্দ,
দেশে এখন নির্বাচনের নামে সরকারের ক্ষমতার মেয়াদ বাড়িয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে ন্যক্কারজনক যে তামাশা চলছে তাতে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বৃটিশ সাময়িকী ‘ইকোনমিস্ট’ তাদের প্রতিবেদনের শিরোনাম করেছে, ‘শাসকেরা জিতবে, হারবে বাংলাদেশ’। শুধু শাসক দল আওয়ামী লীগ জিতলে কথা ছিলনা। যে বিজয়ের অর্থই হচ্ছে দেশের পরাজয়, বাংলাদেশের হেরে যাওয়া, সেটি আমরা মেনে নিতে পারি না। এদেশের জনগণ জীবন দিয়ে, রক্ত দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধ করে যে-দেশ সৃষ্টি করেছে, তারা সেই দেশের পরাজয় মেনে নেবে না। অনেক ত্যাগের বিনিময়ে এদেশের মানুষ যে গণতন্ত্র এনেছে, সেই গণতন্ত্রকেও তারা কেড়ে নিতে, পরাজিত হতে দিবে না। এদেশের মানুষ তাদের ভোটের অধিকার আদায় করবেই। বাংলাদেশের জনগণ শান্তি, নিরাপত্তা, নিশ্চয়তা ও সুুষ্ঠু অর্থনৈতিক তৎপরতার উপযোগী পরিবেশ চান। দীর্ঘ মেয়াদে যাতে বাংলাদেশ অশান্ত, অনিরাপদ ও অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ছেয়ে না যায়, তার জন্যই গ্রামে গঞ্জে, শহরে বন্দরে, পাড়ায় মহল্লায় মানুষ আজ লড়াইয়ে নেমেছে। এ লড়াই গণতন্ত্র রক্ষার, অধিকার প্রতিষ্ঠার, জীবন রক্ষার, দেশ বাঁচাবার, শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবার। জনগণের বিজয় অর্জন পর্যন্ত এই লড়াই চলতে থাকবে এবং আমরা জনগণের সঙ্গেই থাকবো ইনশাআল্লাহ্।
গণবিচ্ছিন্ন, সন্ত্রাসী, গণহত্যাকারী ও মহালুটেরা সরকার জানতো, তাদের এই কারসাজির বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে উঠবেই। তাই তারা খুবই সুকৌশলে পরিকল্পিত পন্থায় প্রহসনের নির্বাচনের প্রক্রিয়া এবং মানবতাবিরোধী ট্রাইব্যুনালের বিচারের রায়ের বাস্তবায়নকে একই সময়সীমায় এনে দাঁড় করিয়েছে। জনগণের শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অন্তর্ঘাত সৃষ্টির মাধ্যমে নিরীহ নিরপরাধ মানুষকে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করে, আগুনে ঝলসিয়ে দিয়ে তারা এর দায় বিরোধী দলের ওপর চাপাতে চাইছে। ২০০৬ সালে যারা প্রকাশ্য রাজপথে লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে বহু মানুষকে হত্যা করে মৃতদেহের উপর পৈশাচিক উল্লাস করেছে সেই আওয়ামী লীগ আজ মানবতা ও শান্তির বাণী শোনাচ্ছে। অপরদিকে জনগণের ভোটাধিকার রক্ষার গণতান্ত্রিক আন্দোলনের উদ্দেশ্য নিয়ে চালাচ্ছে অপপ্রচার। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে সংঘঠিত হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজের বিচার আমরাও চাই। তবে বিএনপি বারবার মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে না জড়িয়ে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় আইনগত মানদন্ড বজায় রেখে পরিচালনার পক্ষে অবস্থান ব্যক্ত করেছে। আমাদের পরামর্শ মেনে সরকার যদি বিষয়টিকে নিয়ে অতি-রাজনীতি না করতো, তাহলে আজ দেশে-বিদেশে এ নিয়ে এতো সংশয় সৃষ্টি ও প্রশ্ন উত্থাপিত হতো না। বাংলাদেশের অনেক বন্ধু রাষ্ট্র, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, এমনকি জাতিসংঘ পর্যন্ত বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও মান নিয়ে যে আপত্তি তুলছে, তাতে আমাদের অনেক বেশী সতর্ক ও সচেতন হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। তবে এ বিষয়ে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ যে-প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে, তা স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমাদেরকে মর্মাহত করেছে। পাকিস্তানের ভেতরই দায়িত্বশীল মহল থেকে এর প্রতিবাদ করা হচ্ছে। বিএনপির তরফ থেকে এ বিষয়ে আগেই আমাদের প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। আজ আমি আবারো বলছি, ১৯৭১ সালে আমরা যুদ্ধ করে স্বাধীনতা এনেছি। পাকিস্তান এখন সহ¯্র মাইল দূরবর্তী এক পৃথক রাষ্ট্র। ১৯৭৪ সালে আওয়ামী লীগের সরকারই ত্রিদেশীয় চুক্তি সই করেছিল।  সেই চুক্তিতে পাকিস্তানী যুদ্ধ অপরাধীদের বিচার না করার এবং অতীত তিক্ততা ভুলে সামনে অগ্রসর হবার অঙ্গীকার তারাই করেছিলো। এরপর কোনো ইস্যু নিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি হলে তা কূটনৈতিকভাবেই নিরসন করা উচিত। কূটনৈতিকভাবে ব্যর্থ হয়ে সরকার এই প্রসঙ্গকে পুঁজি করে দেশের ভেতরে নোংরা রাজনীতি করার চেষ্টা করছে। এই রাজনৈতিক খেলা বন্ধ করুন।

সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা,
জনগণের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চলছে। আমি বারবার বলেছি, আজ আবারো বলছি, নির্দোষ সাধারণ মানুষের জানমালের যেন কোনো ক্ষতি না হয় সে দিকে সকলের সচেতন দৃষ্টি রাখতে হবে। একদিকে হত্যা, নির্যাতন, গুম অপরদিকে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অন্তর্ঘাত সৃষ্টির অপকৌশল সরকার নিয়েছে। বিচারপতির বাড়িতে বোমা হামলা ও হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ি পুড়িয়ে দেয়ার সময় শাসক দলের লোকেরা ধরা পড়লেও বিচার হচ্ছে না। দোষ দেয়া হচ্ছে বিরোধী দলের ওপর। কাজেই সকলকে খুব বেশি সজাগ ও সচেতন থাকতে হবে। বাংলাদেশের জনগণই আমাদের শক্তির উৎস। তাদের জন্য এবং তাদেরকে নিয়েই আমাদের সংগ্রাম। প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের জীবন ও সম্পদের উপর হামলার প্রকাশ্য উস্কানি দিয়েছেন। জনপ্রতিরোধ গড়ে তুলেই এ ধরনের হামলার মোকাবিলা করতে হবে। সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে গণপ্রহরার ব্যবস্থা করতে হবে। বাংলাদেশের জনগণের অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্য ক্ষুন্ন হতে দেয়া যাবে না। এ প্রসঙ্গে আমি গত ২১ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলনে দেয়া আমার বক্তব্যের পুনরুল্লেখ করে বলতে চাই কোন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ হামলার শিকার হলে আগামীতে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে অপরাধীদের চিহ্নিত ও শাস্তিবিধান নিশ্চিত করা হবে। দেশব্যাপী সন্ত্রাস, নাশকতা, হানাহানি উস্কে দিয়ে, অন্তর্ঘাত সৃষ্টি করে সরকার প্রহসনের নির্বাচনকে আড়াল করার যে অপকৌশল নিয়েছে এবং স্বাধীনতার চেতনা বাস্তবায়নের নামে তারা তাদের অপশাসন ও নিষ্ঠুর লুন্ঠনকে দীর্ঘায়িত করার যে নীল-নক্শা প্রনয়ণ করেছে, তা ব্যর্থ করে দিতে হবে জনগণের সম্মিলিত প্রতিরোধ সৃষ্টি করে। দেশে আজ ভয়ংকর অনিশ্চিত এক নৈরাজ্যকর অবস্থা সৃষ্টি করেছে সরকার। বিরোধী দলের নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষকে রাজপথে গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে। এখন শুরু হয়েছে ঘরে ঢুকে হত্যা। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার নামে যৌথবাহিনী গঠন করে তাদেরকে চরমভাবে অপব্যবহার করছে সরকার। তালিকা করে বেছে বেছে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের হত্যা, গ্রেফতার, অপহরণ, নির্যাতন করা হচ্ছে। জনগণের বিরুদ্ধে পরিচালিত এই বেআইনী ও নৃশংস অভিযানে দেশের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের নিয়োজিত করার অপচেষ্টাও শুরু হয়েছে। পিলখানা হত্যাযজ্ঞ ও শাপলা চত্ত্বরে রক্তপাতের খলনায়কেরা দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীকে দেশবাসীর মুখোমুখি দাঁড় করাবার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। জনগণের সম্পদ দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনীকে প্রহসনের নির্বাচনে জড়িত করে বিতর্কিত না করার জন্য আমি সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। সরকারের নির্দেশে যৌথবাহিনীর অভিযানে শাসকদলের সশস্ত্র ক্যাডাররাও অংশ নিচ্ছে। তারা বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজন ও মহিলাদের পর্যন্ত আটক করে নিয়ে গিয়ে অমানুষিক নির্যাতন চালাচ্ছে। অনেকের হত্যার পর লাশ গুম করা হচ্ছে। তাদের ঘর-বাড়ি লুটপাট, বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া এবং আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। সেই সঙ্গে চলছে গুপ্তহত্যা ও গুম করা। এ ধরণের  পৈশাচিকতার তুলনা কেবল ভিনদেশী হানাদার বাহিনীর বর্বরতার সঙ্গেই করা চলে। আজ লক্ষীপুর, মেহেরপুর, সিরাজগঞ্জ, নীলফামারী, বগুড়া, জয়পুরহাট, সীতাকুন্ড, বাগেরহাট, সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলছে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের তান্ডব। প্রধানমন্ত্রী ও শাসক দলের প্রকাশ্য হুমকির পর তা’ আরো বিস্তৃত ও নৃশংস হয়ে উঠেছে। এর দায়-দায়িত্ব উস্কানি ও নির্দেশদাতা সরকার ও নির্বাচন কমিশনকেই নিতে হবে। আমি আইন ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘণ করে দেশের নাগরিকদের ওপর এই নির্মম দমন-অভিযানের প্রতি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা সমূহের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এই হত্যাযজ্ঞ ও নিপীড়ন বন্ধে সকলকে সোচ্চার হবার এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহবান জানাচ্ছি। বাংলাদেশের বিরাজমান সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ ও নিরসনের উদ্যোগ গ্রহণের জন্য আমি জাতিসংঘকে আবারো ধন্যবাদ জানাই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার, সংসদ, রাজনৈতিক দল, বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দ, সংবাদ মাধ্যম, মানবাধিকার সংস্থা সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের অধিকার সুরক্ষায় যেভাবে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন, তার জন্য আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি।
আমি আশা করি, বাংলাদেশে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, শান্তি-স্থিতি, আইনের শাসন ও জনগণের অধিকার রক্ষায় তারা আরো কার্যকর ভূমিকা রাখবেন এবং পরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার জনগণের পক্ষে বলিষ্ঠভাবে দাঁড়াবেন। দেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী ব্যক্তিত্ব প্রফেসর ড. মুহম্মদ ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক নারীর ক্ষমতায়ন ও ক্ষুদ্রঋণ আন্দোলনের মাধ্যমে দারিদ্রমোচনের ক্ষেত্রে  অর্জিত অগ্রগতিকে রক্ষার জন্য লড়াই করে যাচ্ছেন। আমি এই আন্দোলনকেও জনগণের অধিকার রক্ষার গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অংশ বলেই মনে করি।       আমি তাদের ধন্যবাদ জানাই। দেশের প্রায় সকল রাজনৈতিক দল প্রহসনের নির্বাচনকে বর্জন করে মানুষের ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র রক্ষার দাবিতে আজ অটল ভূমিকা পালন করছে। আমি তাদেরকে ধন্যবাদ জানাই। সকলের প্রতি আমার আহবান, নিজ নিজ রাজনৈতিক বিশ্বাস, কর্মসূচি ও আদর্শ অক্ষুন্ন রেখেই আসুন, দেশ বাঁচাতে, মানুষ বাঁচাতে, মানবাধিকার ও গণতন্ত্র রক্ষায়, বহুদলীয় গণতন্ত্র থেকে একদলীয় স্বৈরশাসনের দিকে যাত্রাকে রুখে দিতে আমরা এক হয়ে লড়াই করি। এই সংগ্রামে বিজয়ের পর আমরা সকলে মিলে গড়ে তুলবো অখন্ড জাতীয় সত্ত্বা। দূর করবো হানাহানির অন্ধকার। কায়েম করবো সুশাসন। ফিরিয়ে আনবো আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার। সমঝোতার ভিত্তিতে প্রধান জাতীয় সমস্যা ও বিরোধীয় ইস্যুগুলোর নিষ্পত্তি করবো। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করবো। বাংলাদেশকে উৎপাদন ও কর্মমুখর করে সামনের দিকে এগিয়ে  নেবো। দেশের সিভিল সমাজ ও ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার সংগঠনকে আমি ধন্যবাদ জানাই শান্তি, সমঝোতা ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতির পক্ষে সোচ্চার হবার জন্য। আমি সাংবাদিক বন্ধুদেরকেও ধন্যবাদ জানাই। গণমাধ্যম আজ শৃঙ্খলিত ও রাষ্ট্রীয় ভীতির শিকার। এর মধ্যেও আপনারা সাহস করে অনেক সত্য তুলে ধরছেন। দেশবাসী সংবাদ-মাধ্যম থেকেই জানতে পেরেছেন কী সীমাহীন লুন্ঠন ও দুর্নীতি করে শাসকদলের নেতা-মন্ত্রী-এমপি ও তাদের নিকটজনেরা অঢেল সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। তাদের নিজেদের দেয়া হিসেব থেকেই জানা গেছে যে, গত পাঁচ বছরে তাদের সম্পদের পরিমাণ সোয়া দুই হাজার গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। শেয়ারবাজার ও রাষ্ট্রয়াত্ত্ব ব্যাংকগুলো তারা নির্মমভাবে লুটে নিয়েছে। কারসাজি ও অত্যাচার চালিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার ব্যাপারে তাদের যে উদগ্র বাসনা, তার অন্যতম কারণ হচ্ছে, লুটপাটের এই অবারিত সুযোগ। এ সুযোগ তারা যে কোনো মূল্যে অব্যাহত রাখতে চায়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীর সদস্যদের প্রতি আমি আবারো আহবান জানাচ্ছি, সরকার কিংবা দলবাজ কিছু মুষ্টিমেয় কর্মকর্তার নির্দেশে আপনারা বেআইনি ও অন্যায় কোনো তৎপরতায় লিপ্ত হবেন না। আপনারা বিরোধীদল বা জনগণের প্রতিপক্ষ নন। সরকারি দলের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল এবং হত্যা, গুম, নির্যাতন চালাবার হাতিয়ার হিসেবে আপনারা ব্যবহৃত হতে পারেন না। মনে রাখবেন, আপনারা সরকারের নন, জনগণের কর্মচারি। এখন সময় এসে গেছে, আপনাদেরকে জনগণের পক্ষেই দাঁড়াতে হবে। এই স্বৈরশাসনের সময় ফুরিয়ে এসেছে। কাজেই তাদের ক্রীড়নক হয়ে নিজ নিজ বাহিনীর সুনাম ও ঐতিহ্য ক্ষুন্নকারী তৎপরতা থেকে আপনারা বিরত থাকবেন, এ আমার আহবান। সরকারকে বলবো, নিজেরা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন। এখন বাংলাদেশকে সারা দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে বিপদে ফেলবেন না। এই দেশ, এ দেশের মানুষ আপনাদেরকে অনেক দিয়েছে। তাদের প্রতি প্রতিশোধপ্রবণ হয়ে দেশটাকে ধ্বংস করে ফেলবেন না। অনমনীয়তা ও হঠকারিতা পরিহার করে বাস্তবের দিকে ফিরে তাকান।  প্রধানমন্ত্রী এখনো প্রহসনের নির্বাচন করার ব্যাপারে অনড়। তিনি বলেছেন, দশম সংসদ নিয়ে কোনো আলোচনা নয়। পরে একাদশ সংসদ নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এটা যুক্তির নয়, জেদের কথা। এটা বাস্তবসম্মত নয়, অপকৌশলের কথা। আমি তাকে অনুরোধ করি, একগুঁয়েমি পরিহার করুন। গণতান্ত্রিক রাজনীতি হচ্ছে ‘আর্ট অব কমপ্রোমাইজ’। সমঝোতা স্থাপন করলে কেউ ছোট হয়ে যায়না। ১৯৯৬ সালে আমরা আপনাদের দাবি মেনে নিয়ে সমঝোতা স্থাপন করেছিলাম। এখন আপনারা ক্ষমতায় আছেন। জনগণের দাবি মেনে নিয়ে সমঝোতায় আসুন। এখনো সময় শেষ হয়ে যায়নি। প্রহসনের নির্বাচনের তফসিল বাতিল করুন। আলোচনা শুরু করুন। আমরাও আলোচনায় বসতে রাজি আছি। জনগণের অর্থের অপচয় করে ভোটবিহীন, প্রার্থীবিহীন, প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন একটা অর্থহীন প্রহসনের নির্বাচন করার প্রয়োজন নেই। এতে শুধু আপনারাই কলংকিত হবেন না, গণতন্ত্রও ধ্বংস হবে। আওয়ামী লীগের ভেতরে বিবেকবান, গণতন্ত্রমনা ও দেশপ্রেমিক মানুষ যারা আছেন তাদের প্রতিও আমার আহ্বান, এই দেশ এবং এ দেশের মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন না। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ, জনগণের প্রত্যাশা ও তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারের পক্ষে আপনারাও অবস্থান নিন। স্বৈরশাসন ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন। জনগণের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করুন। নানা বাধাবিঘœ পেরিয়ে ১৯৯১ সাল থেকে এদেশে গণতান্ত্রিক যে বিধি-ব্যবস্থা চলে আসছিলো, এবার আওয়ামী লীগের হাতে তার অপমৃত্যু ঘটতে যাচ্ছে। এই গণতন্ত্র বিনাশের ক্ষেত্রে দোসর হয়েছে মেরুদন্ডহীন ও আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশন। সংবিধানের দোহাই দিয়ে ভোট, ভোটার ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন এক কারসাজির মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী এবং গণতন্ত্রকে পরাজিত ও জনগণের ভোটাধিকার হরণের ঘৃন্য প্রক্রিয়া তারা চালাচ্ছে।  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর কথা প্রায়ই বলেন। এবার দেশের মানুষ তার ন্যক্কারজনক প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছে। এটা ইলেকশন নয়, সিলেকশন। এখানে জনগণ ও প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এই নির্বাচন ও এর মাধ্যমে গঠিত সরকার ‘বাই দ্য পিপল, ফর দ্য পিপল, অফ দ্য পিপল’ হবে না। এটা হবে : ‘বাই দ্য ইলেকশন কমিশন, ফর দ্য আওয়ামী লীগ, অফ দ্য আওয়ামী লীগ’। এই গণবিরোধী প্রক্রিয়া বন্ধ করার সাধ্য না থাকলে ইলেকশন কমিশনের অন্তত: পদত্যাগ করা উচিত। ইতিমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কমনওয়েলথ ও যুক্তরাষ্ট্র এই প্রহসনে পর্যবেক্ষক না পাঠাবার কথা জানিয়েছে। অন্যরাও জনগণের অধিকার হরণের এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হবার বদলে গণতন্ত্র ও বাংলাদেশের মানুষের ভোটাধিকারের পক্ষে অবস্থান নেয়ার ইংগিত দিয়েছে। অর্থাৎ শুধু দেশে নয়, বিশ্বসমাজও এই নির্বাচনী প্রহসনকে বৈধতা দিতে রাজি নয়।  বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র এবং জনগণের ভোটাধিকারের পক্ষে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই দৃঢ় অবস্থানকে আমি সাধুবাদ জানাই। এই প্রহসন ঘৃনাভরে বর্জনের জন্য আমি বাংলাদেশের নাগরিক ও ভোটারদের প্রতি আহবান জানাই। যে প্রহসনকে সারা দুনিয়ার কেউ বৈধতা দিতে রাজি নয়, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যাতে শামিল হচ্ছে না, সেই প্রক্রিয়ায় জড়িত না হবার জন্যও আমি সংশ্লিষ্ট সকলকে অনুরোধ করছি।

প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,
গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের গুলিতে এবং শাসক দলের পরিকল্পিত অন্তর্ঘাত ও নাশকতায় যারা জীবন দিয়েছেন, আমি তাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করি। তাদের শোকার্ত স্বজনদের প্রতি সমবেদনা জানাই। যারা নির্যাতিত, ক্ষতিগ্রস্ত ও পঙ্গু হয়েছেন তাদের প্রতিও জানাচ্ছি গভীর সহানুভূতি। সারা দেশের জনগণ যেভাবে এই আন্দোলনে একাত্ম হয়ে নিভৃত পল্লীতে পর্যন্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন, সে জন্য তাদেরকে অভিনন্দন জানাই। আমাদের এই আন্দোলন সফল হবেই ইনশাআল্লাহ্। জনগণের বিজয় অনিবার্য।
আমি এখন চলমান আন্দোলনে চার দফা করণীয় ও নীতি-কৌশল তুলে ধরছি:
১। ভোটাধিকার হরণকারী ও মানবাধিকার লঙ্ঘণকারী সরকারের বিরুদ্ধে প্রাণক্ষয়ী লড়াইয়ে যারা শরিক আছেন এবং হচ্ছেন তাদের মধ্যে সমন্বয়, সমঝোতা ও ঐক্য গড়ে তুলুন।
২। বিভক্তি ও বিভাজনের বিষাক্ত রাজনীতির চিরঅবসান ঘটানোর জন্য জনগণের ইচ্ছা ও অভিপ্রায়কে মূল্য দিন। জাতীয় ক্ষেত্রে বিতর্কিত বিষয়সমূহ অবাধ ও শান্তিপূর্ণভাবে আলাপ আলোচনা এবং গণভোটের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক পন্থায় মীমাংসার রাজনৈতিক সংকল্পকে জোরদার করুন। সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষ যা চায় না দেশের সংবিধানে তা থাকতে পারে না।
৩। ভোটকেন্দ্র ভিত্তিক সংগ্রাম কমিটিগুলোর পাশাপাশি দেশ ও গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনরত সকল পক্ষকে নিয়ে অবিলম্বে জেলা, উপজেলা ও শহরে ‘সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষা সংগ্রাম কমিটি’ গঠন করে পাঁচ জানুয়ারি নির্বাচনী তামাশা প্রতিহত করুন। প্রতিটি জেলার প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখুন এবং জনগণের জান, মাল ও জীবীকার নিরাপত্তা বিধানের ক্ষেত্রে স্ব স্ব নাগরিক দায়িত্ব পালন করুন।
৪। গণতন্ত্রের এই সংগ্রামে সংখ্যালঘু ধর্মাবলম্বী, সম্প্রদায় ও জাতিগোষ্ঠির মানুষদের যুক্ত করার পাশাপাশি তাদের জান-মালের নিরাপত্তা লংঘণের সরকারি ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখুন, সজাগ থাকুন। কোন প্রকার সাম্প্রদায়িকতাকে বরদাশত করবেন না।
এই আন্দোলনকে আরো বিস্তৃত, ব্যাপক ও পরবর্তী ধাপে উন্নীত করার লক্ষ্যে আমি আগামী ২৯ ডিসেম্বর  রোজ  রোববার সারা দেশ থেকে দলমত, শ্রেণী-পেশা, ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সক্ষম নাগরিকদেরকে রাজধানী ঢাকা অভিমুখে অভিযাত্রা করার আহবান জানাচ্ছি। এই অভিযাত্রা হবে নির্বাচনী প্রহসনকে ‘না’ বলতে, গণতন্ত্রকে ‘হ্যাঁ’ বলতে। এই অভিযাত্রা হবে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অর্থবহ নির্বাচনের দাবিতে। এই অভিযাত্রা হবে শান্তি, গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকারের পক্ষে। এই অভিযাত্রা হবে ঐতিহাসিক। আমরা এই অভিযাত্রার নাম দিয়েছি: ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’, গণতন্ত্রের অভিযাত্রা।
আমার আহবান, বিজয়ের মাসে লাল-সবুজের জাতীয় পতাকা হাতে সকলেই ঢাকায় আসুন। ঢাকায় এসে সকলে পল্টনে বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে মিলিত হবেন।
আমার আহ্বান এই অভিযাত্রায় ব্যবসায়ীরা আসুন, সিভিল সমাজ আসুন, ছাত্র-যুবকেরাও দলে দলে যোগ দাও।
মা-বোনেরা আসুন, কৃষক-শ্রমিক ভাই-বোনেরা আসুন, কর্মজীবী-পেশাজীবীরা আসুন, আলেমরা আসুন, সব ধর্মের নাগরিকেরা আসুন, পাহাড়ের মানুষেরাও আসুন। যে যেভাবে পারেন, বাসে, ট্রেনে, লঞ্চে, অন্যান্য যানবাহনে করে ঢাকায় আসুন। রাজধানী অভিমুখী জন¯্রােতে শামিল হোন।
একই সঙ্গে যারা রাজধানীতে আছেন, তাদের প্রতিও আমার আহ্বান, আপনারাও সেদিন পথে নামুন। যারা গণতন্ত্র চান, ভোটাধিকার রক্ষা করতে চান, যারা শান্তি চান, যারা গত পাঁচ বছরে নানাভাবে নির্যাতিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, শেয়ারবাজারে ফতুর হয়েছেন সকলেই পথে নামুন।
জনতার এ অভিযাত্রায় কোনো বাঁধা না দেয়ার জন্য আমি সরকারকে আহবান জানাচ্ছি। যানবাহন, হোটেল-রেস্তোরাঁ বন্ধ করবেন না। নির্যাতন, গ্রেফতার, হয়রানির অপচেষ্টা করবেন না। প্রজাতন্ত্রের সংবিধান নাগরিকদের শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হবার অধিকার দিয়েছে। সেই সংবিধান রক্ষার শপথ আপনারা নিয়েছেন। কাজেই সংবিধান ও শপথ লঙ্ঘণ করবেন না।
শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনে বাঁধা এলে জনগণ তা মোকাবিলা করবে। পরবর্তীতে কঠোর কর্মসূচি দেয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা থাকবে না।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে বলছি, দেশবাসীর এই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি সফল করতে প্রয়োজনীয় সহায়তা আপনারা দেবেন।
এই কর্মসূচির সাফল্যের জন্য আমি পরম করুণাময় আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের সাহায্য কামনা করি।
আজ এ পর্যন্তই। আপনাদের সকলকে ধন্যবাদ।

আল্লাহ হাফেজ। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।

 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. XNews2X - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু