অজানা গন্তব্যের পথে বাংলাদেশ by কাউসার মুমিন

Wednesday, February 12, 2014

বাংলাদেশের বর্তমান সরকার দেশটির গত দু’ দশকের অর্থনৈতিক ও গণতান্ত্রিক অর্জনকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়ে এক অজানা গন্তব্যের পথে হাঁটছে। বাংলাদেশ নিয়ে যথেষ্ট শংকিত হওয়ার কারণ রয়েছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন  ছিল মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ, বিতর্কিত।
এখানে গণতন্ত্র ও সুশাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠায় যতদ্রুত সম্ভব একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও বাংলাদেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য নতুন নির্বাচন প্রয়োজন। গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে বাংলাদেশের ওপর শুনানিতে এসব কথা বলা হয়েছে। পাঁচ ইস্যুতে অনুষ্ঠিত হয়েছে শুনানি। এগুলো হলো: একটি নতুন নির্বাচন, জিএসপি প্রসঙ্গ, বিচারবহির্ভুত হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গ্রামীণ ব্যাংক ও ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস। পররাষ্ট্র বিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট কমিটিতে ওই শুনানি অনুষ্ঠিত হয় সিনেটর মেনেন্দেজের সভাপতিত্বে। এতে প্যানেল সদস্যরা বলেন, বাংলাদেশে ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন ছিল মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ। এতে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটেনি। যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য নতুন একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি সমঝোতাপূর্ণ সংলাপ আয়োজনে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে আরও বেশী চাপ দিতে ওবামা প্রশাসনকে আহ্বান জানায় সিনেট। জিএসপি সুবিধা প্রসঙ্গে বলা হয়, জিএসপি সুবিধা স্থগিত করে বাংলাদেশকে যেসব শর্ত পূরণ করতে দেয়া হয়েছিল তার মধ্যে কিছুটা অর্জিত হয়েছে। তবে তাদেরকে এখনও অনেক কিছু করতে হবে। শ্রমিকের অবস্থা উন্নয়নে প্রতিশ্রুতির অনেকটাই এখনও পূরণ হয় নি। ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে সরিয়ে দেয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এটা লাখ লাখ নিরপরাধ মানুষকে শাস্তি দেয়ার শামিল। সিনেটর ডারবিন বলেন, আমরা জানি এ সরকার মুহাম্মদ ইউনূস ও গ্রামীন ব্যাংকের সঙ্গে কি করেছে। এটা যে অন্যায় সেটা প্রধানমন্ত্রীকে বুঝানোর জন্য আমরা কি করতে পারি? এটা তার দেশের জন্য ভুল, ওই মানুষটির প্রতি অন্যায়, যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশের মধ্যকার পারস্পরিক সুসম্পর্কের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

শুনানিতে বলা হয়, বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়ে এসেছে। তবে তাদের হারানোরও আছে অনেক। গতকালের শুনানি প্রসঙ্গে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল বলেন, বাংলাদেশ একটি সঙ্কটজনক অবস্থানে। তাই এই শুনানি সময়োপযোগী এবং এর মাধ্যমে একটি শক্তিশালী বার্তা দেয়া হবে যে, বাংলাদেশ যেদিকে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেস। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় গতকাল সকাল ১০টায় এ শুনানি হয়। দু’পর্বে শুনানি হয়। প্রথম পর্বে প্যানেল সদস্য ছিলেন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক এসোসিয়েট ডেপুটি আন্ডারসেক্রেটারি এরিক আর বিয়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম বিষয়ক বাণিজ্য সহকারী লুইস কারেশ। এছাড়া শুনানিতে অংশ নেন সিনেটর ডারবিন। নিশা দেশাই তার শুনানিতে বলেন, আমরা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলছি। বাংলাদেশের রয়েছে একটি সাফল্যের কাহিনী। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা যে মূল তিনটি বিষয়কে প্রাধান্য দিয়েছেন তা হলো বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য, বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন ও ভবিষ্যতের খাদ্য। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, উন্নয়ন করেছে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় কাজ করেছে। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এক কান্তিদায়ক রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে। ৫ই জানুয়ারি যে নির্বাচন হয়েছে তা ছিল মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ। এতে প্রধান দু’ রাজনৈতিক দলের একটি অংশ নেয় নি। ফলে জাতীয় সংসদে ৩০০ আসনের মধ্যে অর্ধেকের বেশি প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। বাকিরা নামমাত্র বিরোধিতা মোকাবিলা করেছেন। এ নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষের ইচ্ছার বিশ্বাসযোগ্য প্রকাশ ঘটেনি। এতে বাংলাদেশ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে। নিশা দেশাই বলেন, দীর্ঘ দিন ধরে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের নির্বাচনকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যরা কড়া উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা সরকারি বিবৃতি দিয়েছে। বেসরকারি পর্যায়ে সরকারি ও বিরোধী নেতাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। সহকারী পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে আমি প্রথম ওই অঞ্চল সফরে যাই নভেম্বরে। তখন আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়াকে বিশ্বাসযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচনের পন্থা বের করার আহ্বান জানাই। এক্ষেত্রে জাতিসংঘ যে ভূমিকা গ্রহণ করে তাতে আমরা সমর্থন দিয়েছি। কিন্তু দুঃখজনক হলো সে উদ্যোগ সফল হয় নি। নির্বাচনের পর পরই আমরা কড়া বিবৃতি দিয়ে জানিয়ে দিই যে, এ নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য নয়। কারণ, এতে জনগণের মতের কোন প্রতিফলন ঘটেনি। একই সঙ্গে নতুন একটি নির্বাচনের জন্য সংলাপের আহ্বান জানাই। তিনি বলেন, নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের হাতে সমপ্রতি বিচারবহির্ভুত হত্যাকাণ্ড ও গুমের যেসব রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে তাতে আমরা উদ্বিগ্ন। অবিলম্বে এসব নির্যাতন অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। আমরা সহিংসতার নিন্দা জানাই। গণতন্ত্রে এটা কোন কৌশল হতে পারে না। ঢাকায় অবস্থানরত মার্কিন কর্মকর্তা, স্টাফ, নাগরিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি সরকার তদারক করছে। তিনি বলেন, আমরা আশা করি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ ও ক্রমবর্ধমান অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে সঠিক পদক্ষেপ নেবেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নেতৃবৃন্দ। শুনানিতে সিনেটর ডারবিন বলেন, ২০ বছর আগে আমি প্রথম বাংলাদেশ সফর করি। তারপর অনেকবার গেছি। আমি যা দেখেছি তাতে আমি অভিভুত হয়েছি। আমি এমন একজন ব্যক্তির সঙ্গে পরিচিত হই যিনি আমার ঘনিষ্ট বন্ধু হয়ে ওঠেন। আমার দেখা মতে তিনি সব থেকে বেশি অনুপ্রেরণা সঞ্চারকারী ব্যক্তিত্ব। আমি বলছি মুহাম্মদ ইউনুসের কথা, যিনি গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা। ুদ্র ঋণ তার প্রাথমিক ধারণা ছিল না। কিন্তু তিনি দরিদ্র থেকে হত দরিদ্রদের মাঝে ঋণ পৌঁছে দিয়েছেন। তার এ প্রচেষ্টাকে তিনি যে উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তা বিশ্বে কোথাও দেখা যায়নি। তিনি তার এ উদ্যোগের জন্য শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার পান।  সিনেটের পক্ষ থেকে তাকে কংগ্রেশনাল মেডেল প্রদানের অংশ হতে পেরে আমি খুশি। আমার বিশ্বাস এ পদক পাওয়া তিনি প্রথম মুসলিম। পদক দেয়ার সময় হলভর্তি সমর্থক উপস্থিত ছিলেন। নানা ধর্ম বর্ণের। গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে যে ঘটনা ঘটেছে তাতে আমি উদ্বিগ্ন। তাকে গ্রামীণ ব্যাংকের নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া এবং গ্রামীণ ব্যাংককে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্তর্ভূক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। আমার কাছে মনে হয়, এটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাকে কোন না কোনভাবে শাস্তি দেয়া- দুঃখজনক হলেও যা লক্ষ লক্ষ নিরপরাধ মানুষকে শাস্তি দেয়ার সামিল। যারা জীবনধারনের জন্য এ ব্যাংকের উপর নির্ভরশীল। আশাহত নারীদের মধ্যে আশা জাগিয়েছে গ্রামীণ ব্যাংক।
এ বিষয়ে তিনি প্রশ্ন রাখেন নিশা দেশাইয়ের কাছে। জবাবে নিশা দেশাই বলেন, আপনি যেভাবে আপনার স্পষ্ট অনুভূতি উপস্থাপন করেছেন আমি তার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করতে চাই। যতবারই আমার তার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হয়েছে, এটা সত্যিকার অর্থে অনুপ্রেরণাদায়ক অভিজ্ঞতা ছিল। মানবতার প্রতি তার নিষ্ঠা বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে গেছে। গ্রামীণ ব্যাংকের সক্ষমতা এবং স্থিতিশীলতার ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।  এটা বাংলাদেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ অর্জন। তারপরও বাংলাদেশে এটা এখন হুমকির মুখে। বিশ্বব্যাপী গ্রামীণ ব্যাংকের পরিসর দিনে দিনে বৃদ্ধি এবং আরও শক্তিশালী করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউএসএআইডি প্রফেসর ইউনূসের সঙ্গে একযোগে কাজ করেছে। এর আগে ইউএসএআইডিতে কর্মরত থাকাকালীন আমার ড. ইউনূসের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। গ্রামীণ সামাজিক ব্যবসা প্রকল্প আরও শক্তিশালী করে এবং বিশ্বব্যাপী লক্ষ লক্ষ নারীদের কাছে গ্রামীণ ব্যাংকের সেবা পৌছে দেয়ার সক্ষমতা দৃঢ় করে তোলার লক্ষ্যে আমরা কাজ করেছিলাম। আমি মনে করি গ্রামীণ ব্যাংক বিশ্বব্যাপী একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং আমরা গ্রামীণ ব্যাংককে সমর্থন এবং তাদের সঙ্গে একযোগে কাজ করা অব্যাহত রেখেছি। যেটা আমার কাছে হুমকিস্বরূপ মনে হয় সেটা হলো, গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া এবং লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশী নারীদের সাহায্য অব্যাহত রাখার সক্ষমতা।
বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দলবিহীন ৫ জানুয়ারীর নির্বাচন এবং নির্বাচনোত্তর চলমান রাজনৈতিক অচলাবস্থার অবসানে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণের ল্যে গতকাল মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চক সিনেটের ‘সিনেট কমিটি অন ফরেন রিলেশনস’ আয়োজিত বাংলাদেশ বিষয়ক এক শুনানিতে অংশ নিয়ে বিভিন্ন যুক্তিতর্কের মাধ্যমে ফরেন রিলেশনস কমিটির সদস্যগণ তাদের সিদ্ধান্তের কথা জানান। এতে বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি বিশেষ করে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের সীমাবদ্ধ সুযোগ, বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড, গুম, শ্রমিক অধিকার ও শ্রমিক নিরাপত্তার সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। এই সকল ইস্যুতে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের অনুসৃত নীতি কতটা কার্যকর এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা রাখার পরও এখনও কেন বাংলাদেশে এই সকল ইস্যুতে গ্রহণযোগ্য উন্নতি হচ্ছে না, এতে যুক্তরাষ্ট্র কিভাবে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে সে বিষয়ে সিনেট সদস্যগণ শুনানিতে অংশ নেয়া প্রত্যেকের নিকট পৃথক পৃথকভাবে বিস্তারিত জানতে চান। এ ছাড়া শ্রমিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করণের পথে বাংলাদেশকে এখনো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে উল্লেখ করে বাংলাদেশের জিএসপি ইস্যুতে আগামী মে মাসে একটি শুনানি অনুষ্ঠিত হবে বলে জানানো হয়েছে। সিনেটর মেনেন্দেজ বাংলাদেশে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান বিষয়ে কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে তার ব্যক্তিগত ভূমিকা, বাংলাদেশের উভয় নেত্রীর নিকট সংলাপের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে চিঠি, সংলাপ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উপর্যুপরি আহ্বান ইত্যাদি উল্লেখ করে সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাইয়ের কাছে জানতে চান ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্রের গন্তব্য কোথায়?’ সিনেট শুনানির দ্বিতীয় প্যানেলে আলোচনায় অংশ নেন ওয়ার্কার্স রাইটস কনসোর্টিয়াম মি. স্কট নোভা, বাংলাদেশ শ্রমিক নিরাপত্তা জোট-এর বোর্ড অব ডিরেক্টর্স-এর চেয়ারম্যান এলেন ট্যাশার এবং বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার সলিডারিটির নির্বাহী পরিচালক কল্পনা আক্তার।

নয়া নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির তাগিদ যুক্তরাষ্ট্রের by কাউসার মুমিন

Wednesday, January 29, 2014

বাংলাদেশে ৫ই জানুয়ারির একপাক্ষিক নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠনের পর এই প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিশালের সঙ্গে বৈঠক করলেন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আকরামুল কাদের।
আর প্রথম বৈঠকেই বাংলাদেশের বিতর্কিত নির্বাচন বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এবং সরকারের আশু করণীয় সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থানের এক ‘তেতো স্বাদ’ নিতে হলো রাষ্ট্রদূতকে। বৈঠকে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কথা বলে রাষ্ট্রদূত যত বেশি এই নির্বাচনের পক্ষে যুক্তি দেখাচ্ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়ার মাত্রাটাও তত বেশি হচ্ছিল। বাংলাদেশের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার স্বার্থে নয়া সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়মিত কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়ে আলাপ-আলোচনা অব্যাহত থাকলেও নির্বাচন বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সাফ জানিয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশে যথাশিগগির নয়া নির্বাচন দিতে হবে। রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশে একটি ইনক্লুসিভ ও ক্রেডিবল নির্বাচন অনুষ্ঠানের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির পরামর্শ দেয়া হয়েছে সরকারকে।

কিন্তু বৈঠক শেষে রাষ্ট্রদূত নিজে মিডিয়াকে ঠিক বিপরীত তথ্য দিয়েছেন। রাষ্ট্রদূত আকরামুল কাদেরকে উদ্ধৃত করে সেদিনই বাংলাদেশের বিভিন্ন মিডিয়ায় সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে ‘হাসিনা সরকারকে বৈধতা দিলো যুক্তরাষ্ট্র’; ‘যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে পুনঃনির্বাচনের কথা বলছে না’। এ বিষয়ে গতকাল প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক মুখপাত্র এমিলি হর্ন গতকাল দুপুরে এ প্রতিনিধিকে বলেন, মিডিয়ায় প্রকাশিত বক্তব্য যদি রাষ্ট্রদূতের নিজস্ব বক্তব্য হয়ে থাকে, তবে তা রাষ্ট্রদূত আকরামুল কাদেরের সঙ্গে বৈঠকে সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আলোচ্য বিষয়বস্তুর সঠিক প্রতিফলন নয়, বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের সম্পূর্ণ বিপরীত। কেননা, সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিশালের সঙ্গে রাষ্ট্রদূত আকরামুল কাদেরের বৈঠকে অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় বিষয়াবলীর সঙ্গে বাংলাদেশে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তাগাদার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে দেশটিতে নতুন নির্বাচনের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির তাগাদা দিয়েছে।
উল্লেখ্য, বিগত ২৪শে জানুয়ারি সকাল ১০টায় ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিশালের সঙ্গে বৈঠক করেন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আকরামুল কাদের। এটি একটি নিয়মিত বৈঠক। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিবেচনায় এ বৈঠকটি ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বৈঠকের পর ওই দিনই বাংলাদেশের একটি অনলাইন বার্তা সংস্থা তার নিউ ইয়র্ক প্রতিনিধির বরাতে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আকরামুল কাদেরকে উদ্ধৃত করে ‘হাসিনা সরকারকে বৈধতা দিলো যুক্তরাষ্ট্র’ বলে সংবাদ প্রকাশ করে। প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়, নিশা দেশাই বিশালের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পর রাষ্ট্রদূত আকরামুল কাদের জানিয়েছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে পুনঃনির্বাচনের কথা বলছে না’, বরং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপের তাগিদ দেয়াটা যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক অবস্থান মাত্র। এই সংবাদ ওই দিনই বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি জাতীয় দৈনিকেও ফলাও করে প্রকাশিত হয়।
এরপর যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি বাংলা মিডিয়ার পক্ষ থেকে রাষ্ট্রদূত আকরামুল কাদেরের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও কোনভাবেই রাষ্ট্রদূতকে পাওয়া যায়নি। আর মিডিয়ায় প্রকাশিত সংবাদে যেহেতু রাষ্ট্রদূতকে উদ্ধৃত করা হয়েছে সেহেতু দূতাবাসের অন্য কোন কর্মকর্তা এ বিষয়ে কোন রকম মন্তব্য করতে রাজি হননি। এমনকি এই সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার তিনদিন পরও এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত দূতাবাসের পক্ষ থেকে মিডিয়ায় প্রকাশিত রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যকে অস্বীকার করা হয়নি।
এরই প্রেক্ষিতে গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরে যোগাযোগ করা হলে স্টেট ডিপার্টমেন্টের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক মুখপাত্র এমিলি হর্ন এক লিখিত বার্তায় এই প্রতিনিধিকে বলেন, ২৪শে জানুয়ারি রাষ্ট্রদূত কাদেরের সঙ্গে বৈঠকে সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিশাল বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত উদ্বেগের কথা আবারও পুনর্ব্যক্ত করেছেন। বৈঠকে সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিশাল বাংলাদেশ সরকারকে একটি নতুন নির্বাচনের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন। এই উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের মানুষের দৃষ্টিতে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, ‘ইনক্লুসিভ’ ও ‘ক্রেডিবল’ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে প্রধান প্রধান দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক সংলাপ শুরুর আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
এদিকে বাংলাদেশে খুব দ্রুত একটি নয়া নির্বাচন বিষয়ে দেশটিতে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনার উপর্যুপরি আহ্বান নিয়ে বাংলাদেশের প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার একটি অংশে বিতর্ক চলছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা কি তার ‘ব্যক্তিগত অতি উৎসাহ’ থেকে এমন অবস্থান নিয়েছেন না কি সত্যি সত্যি তিনি স্টেট ডিপার্টমেন্টের নীতি বাস্তবায়ন করছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মুখপাত্র এমিলি হর্ন পৃথক এক লিখিত বার্তায় এই প্রতিনিধিকে বলেন, বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধ করা এবং একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের গুরুত্ব বিষয়ে স্টেট ডিপার্টমেন্ট ধারাবাহিক ভাবে নির্দিষ্ট অবস্থানে থেকে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের কথা অব্যাহতভাবে জানিয়ে আসছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনার ভিন্নরকম অবস্থানের সুযোগ নেই। মুখপাত্র বলেন, ‘সকলেরই সুস্পষ্ট ভাবে জানা উচিত, রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা বাংলাদেশে তার ব্যক্তিগত নীতি নয়, প্রেসিডেন্ট ওবামার নীতি বাস্তবায়ন করেন।’
 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. XNews2X - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু