বিমানের ধ্বংসাবশেষ অনুসন্ধানে নতুন আশা

Wednesday, April 9, 2014

মালয়েশিয়া এয়ারলাইনসের নিখোঁজ উড়োজাহাজের সম্ভাব্য ধ্বংসাবশেষ থেকে সাগরতলে আরও দুটি নতুন সংকেত পাওয়া গেছে। এতে নতুন আশা সঞ্চারিত হয়েছে। দিন কয়েকের মধ্যেই কিছু একটা খুঁজে পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী অনুসন্ধানকারীরা। অস্ট্রেলীয় অনুসন্ধান দলের প্রধান অ্যাংগাস হিউস্টন আজ বুধবার অনেকটা আশাবাদী কণ্ঠে এ-সংক্রান্ত ঘোষণা দেন।

এ নিয়ে শব্দতরঙ্গের মাধ্যমে সাগরতল থেকে প্রবাহিত চারটি সংকেত পাওয়ার কথা দাবি করেছে অনুসন্ধানকারী দল। এর আগে মার্কিন নৌবাহিনী দুটি সংকেত পাওয়ার দাবি করে। গতকাল মঙ্গলবার বিকেল ও রাতে আরও দুটি সংকেত পাওয়ার দাবি করেছে অস্ট্রেলীয় নৌবাহিনীর জাহাজ ওশেন শিল্ড।

ধারণা করা হচ্ছে, উড়োজাহাজটির ককপিটের তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণে ব্যবহূত ‘ব্ল্যাক বক্স’ থেকে শব্দগুলো ভেসে আসছিল। ব্ল্যাক বক্সের ব্যাটারির মেয়াদকাল এক মাস। দুর্ঘটনার পর ইতিমধ্যে এক মাস পেরিয়ে গেছে।

আজ সাংবাদিকদের হিউস্টন বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, আমরা সঠিক এলাকায় অনুসন্ধান চালাচ্ছি। আমি এখন আশাবাদী যে, আমরা ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাব। কয়েক দিনের মধ্যেই ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়ার ব্যাপারে আমরা আশাবাদী।’

বার্তা সংস্থা রয়টার্সে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়, নতুন পাওয়া ওই সংকেতের সূত্র ধরে ভারত মহাসাগরের দূরবর্তী অংশে বিমানের ধ্বংসাবশেষ শনাক্তের কাজটি সহজ হবে না বলেও সতর্ক করেছেন অস্ট্রেলিয়ার ওই কর্মকর্তা।

সংশ্লিষ্ট এলাকায় আজ ১১টি সামরিক বিমান, চারটি বেসামরিক বিমান ও ১৪টি জাহাজ অনুসন্ধানের কাজে অংশ নিচ্ছে। কুয়ালালামপুর থেকে ২৩৯ জন আরোহী নিয়ে গত ৮ মার্চ রাতে বেইজিংয়ের পথে রওনা হওয়ার পর নিখোঁজ হয় উড়োজাহাজটি।

কৃত্রিম উপগ্রহের (স্যাটেলাইট) মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে মালয়েশিয়ার সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, উড়োজাহাজটি ভারত মহাসাগরের দক্ষিণ অংশে ধ্বংস হয়েছে। দুর্ঘটনাস্থল অস্ট্রেলিয়ার পার্থ শহর থেকে কয়েক হাজার কিলোমিটার পশ্চিমে।

ভারত- হায়দরাবাদ থেকে তেলেঙ্গানা by আলী ইমাম মজুমদার

Saturday, March 1, 2014

প্রতিবেশী ভারতে শাসনকাজ সুচারুভাবে পরিচালনার জন্য মাঝেমধ্যে বিভিন্ন রাজ্য ভাঙাগড়া হয়। এ ধরনের ভাঙাগড়ায় বিপরীতমুখী স্বার্থের সংঘাত থাকে বলে ব্যাপারটি কিন্তু সহজ নয়।
অতীতের ভাঙাগড়াগুলোও সহজে হয়নি। ক্ষেত্রবিশেষে ঘটেছে সংঘাত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জনপ্রতিনিধিদের সুবিবেচনাপ্রসূত মতামতের ভিত্তিতে নিষ্পত্তি হয়েছে। ঠিক তেমনি দক্ষিণ ভারতীয় রাজ্য অন্ধ্র প্রদেশকে ভেঙে তেলেঙ্গানা নামের একটি রাজ্য গড়ার জোর দাবি ছিল দীর্ঘদিনের। এটা নিয়ে দফায় দফায় আন্দোলন হয়েছে। প্রাণহানিও ঘটেছে বেশ কিছু মানুষের। ১৯৬৯ আর ১৯৭২-এ আন্দোলনের তীব্রতা ছিল প্রকট। কিন্তু তখন আলোর মুখ দেখেনি দাবিটি। তা দেখল ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে। ভারতের ২৯তম রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রায় সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে তেলেঙ্গানার। সম্প্রতি লোকসভা ও রাজ্যসভায়ও জনপ্রতিনিধিরা যখন এটা নিষ্পত্তি করেন, তখনো কিন্তু বিষয়টি সহজসাধ্য ছিল না। তবে প্রধান দুটো দল একমত হওয়ায় অন্যদের আপত্তি ধোপে টেকেনি।

ফেডারেল সরকারব্যবস্থায় এ ধরনের রাজ্য বিভক্তির পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি থাকে। উভয় পক্ষ প্রায় ক্ষেত্রে অনড় অবস্থান নেয়। তা সত্ত্বেও জনগণের বৃহত্তর কল্যাণ বিবেচনায় রেখে একপর্যায়ে একটা সমাধান করতে হয়। আর এটাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য। আবার এ ধরনের দাবি একটি মেনে নিলে সমধর্মী দাবিও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। আর কেন্দ্রীয় সরকার ও সংশ্লিষ্ট রাজ্যও এ ধরনের দাবির পক্ষে ঢালাওভাবে অবস্থান নিতে পারে না। অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর পর্যালোচনার পরই একেকটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তবু নিজ নিজ অবস্থানে থেকে অনেকে আন্দোলন চালায়। ভারতে গত বিজেপি সরকারের সময়ে তিনটি নতুন রাজ্য গঠিত হয়েছিল। সেগুলো হচ্ছে উত্তর প্রদেশ, ওডিশা আর বিহার ভেঙে যথাক্রমে উত্তরাঞ্চল, ছত্তিশগড় আর ঝাড়খন্ড। এখনো জোর দাবি চলছে মহারাষ্ট্রের বিদর্ভ, আসামের বোড়োল্যান্ড আর পশ্চিমবঙ্গের গুর্খাল্যান্ডসহ আরও কিছু অঞ্চলে। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারকে একটি রাজ্য গঠনের সময়ে তার ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক, নৃতাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিকসহ সব দিক বিবেচনা করতে হয়। পার হতে হয় জটিল সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে।
কতগুলো দিক বিবেচনায় তেলেঙ্গানাকে প্রকৃত অর্থে সম্পূর্ণ নতুন একটি রাজ্য বলা যাবে না। এ অঞ্চল মূলত ব্রিটিশ-ভারতে হায়দরাবাদ রাজ্যের অংশবিশেষ। ১৯৪৮ সালে এর ভারতভুক্তি হয়। এর আগে ইংরেজ শাসকেরা রাজ্যটির বেড়ার নামক একটি অংশ মধ্যপ্রদেশের সঙ্গে জুড়ে দেয়। ভারতভুক্তির পরও মারাঠাভাষীর কিছু অংশ মহারাষ্ট্র আর কানাড়াভাষী কিছু অংশ কর্ণাটকের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। তেলেগুভাষী অংশটিকে ১৯৫৬ সালের রাজ্য পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকালে অন্ধ্র প্রদেশের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। সেই হায়দরাবাদ নগরই হয় অন্ধ্র প্রদেশের রাজধানী।
ভাষার সাযুজ্য থাকলেও এর একটি ঐতিহাসিক পৃথক সত্তা ছিল। ১৭২৪ সাল থেকে পৃথক দেশীয় রাজ্য হিসেবে এর শাসনভার ছিল নিজাম পরিবারের হাতে। সীমানার কিছু পরিবর্তন হলেও ব্রিটিশরা এ সত্তা বহাল রাখে। ব্রিটিশ-ভারতের ৫৫৬টি দেশীয় রাজ্যের মধ্যে এটি ছিল সর্ববৃহৎ ও সবচেয়ে সমৃদ্ধ। মূল হায়দরাবাদ রাজ্যের আয়তন ছিল দুই লাখ ১৫ হাজার বর্গকিলোমিটার। কেটে নিয়ে অন্ধ্রের সঙ্গে যেটুকু দেওয়া হয়েছে, তার আয়তন এক লাখ ১৫ হাজার বর্গকিলোমিটার। আর বর্তমান লোকসংখ্যা সাড়ে তিন কোটি। অবিভক্ত অন্ধ্র প্রদেশের আয়তন দুই লাখ ৭০ হাজার বর্গকিলোমিটার। আর লোকসংখ্যা সাড়ে আট কোটি। এর সরকারি ভাষা তেলেগু ও উর্দু। সুজলা-সুফলা এ রাজ্যকে ভারতের খাদ্যভান্ডার বলা হয়। চাল ছাড়াও চিনিসহ অন্যান্য কৃষিপণ্য ও মৎস্য উৎপাদনে অগ্রণী এ অন্ধ্র প্রদেশ।
পাশাপাশি শিল্পায়নেও অনেক অগ্রসর। মাথাপিছু গড় আয়ের দিক দিয়ে ভারতে দ্বিতীয়। অন্ধ্রের রাজধানী হায়দরাবাদের আয়তন ৬৫০ বর্গকিলোমিটার। আর জনসংখ্যা প্রায় ৮০ লাখ। ভারতের চতুর্থ জনবহুল শহর। এ নগর রাজ্যের জিডিপি আর কর প্রদানে শীর্ষে রয়েছে। রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া তথ্যানুসারে ভারতের নগরওয়ারি বিবেচনায় হায়দরাবাদ ব্যাংক আমানতে ষষ্ঠ আর ঋণ প্রদানে চতুর্থ স্থানে রয়েছে। এখানে রয়েছে প্রায় এক হাজার ৩০০টি উঁচু মানের আইটি ফার্ম। এর মধ্যে মাইক্রোসফটসহ বেশ কিছু নামজাদা বহুজাতিক কোম্পানিও আছে। অর্থাৎ ব্যাপক বিনিয়োগ হয়েছে এ নগরে। বিশ্বব্যাংকের গবেষণা অনুসারে, এটি ভারতের দ্বিতীয় ব্যবসাবান্ধব শহর। এর অর্থ ব্যাপক বিনিয়োগ, কর্মসংস্থানের পাশাপাশি এখানে সুশাসনও স্বাভাবিক মাত্রায় রয়েছে। আগামী ১০ বছর নগরটি উভয় রাজ্যের যৌথ রাজধানী থাকবে বটে। এরপর চলে যাবে তেলেঙ্গানার ভাগে।
হায়দরাবাদ তেলেঙ্গানার রাজধানী হিসেবে পাবে। তবে উল্লেখ করা যথার্থ যে তেলেঙ্গানা নামক অঞ্চলটি অন্ধ্র প্রদেশের অন্য অঞ্চল থেকে বেশ কিছুটা পিছিয়ে আছে। তাদের অভিযোগ রয়েছে সুষম উন্নয়ন না হওয়ার। যেকোনো কারণেই হোক এ অভিযোগের বাস্তবতা লক্ষণীয় হয়। যেমন গোটা অন্ধ্র প্রদেশের শাসনব্যবস্থায় তেলেঙ্গানাবাসীর সংখ্যা শতকরা ২০ জন। আর শীর্ষস্তরে এর অনুপাত শতকরা পাঁচজন। সুতরাং সূচনায় রাজ্য পরিচালনা করতে গিয়ে তারা কিছু হোঁচট খাবে। তবে রাজনৈতিক দূরদর্শিতাসম্পন্ন নেতৃত্ব থাকলে নতুনভাবে গঠনের পর্যায়ে অঞ্চলনির্বিশেষে সবার সহযোগিতা নিতে নতুন সরকার সচেষ্ট থাকবে। নিজামের শাসনকাল থেকেই এ রাজ্যের অবকাঠামো উন্নত ছিল। ব্রিটিশের সাধারণ নিয়ন্ত্রণে থাকলেও এর নিজস্ব সেনাবাহিনী, বিমান পরিবহন, টেলিযোগাযোগ, রেলওয়ে, ডাক যোগাযোগব্যবস্থা, মুদ্রা ও বেতার সম্প্রচারব্যবস্থা ছিল। অর্থনীতিও পেছনে ছিল না। এখন মাঝখানে যেটুকু পিছিয়েছে, তা থেকে বিদ্যমান অবস্থায় দ্রুত উত্তরণ সম্ভব।
নতুন রাজ্য হিসেবে তেলেঙ্গানার এ অভ্যুদয়কে ভারতের রাজনৈতিক এমনকি সিভিল সমাজ নিরঙ্কুশভাবে স্বাগত জানাচ্ছে না। এখানে একটা তীব্র দ্বিধাবিভক্তি লক্ষণীয়। একটি অংশ এ ধরনের পুনর্গঠনের পক্ষে থাকলেও অপর অংশটি সক্রিয়ভাবে বিরুদ্ধে। যারা পক্ষে তারা বলছে একটি ভূখণ্ড তার পূর্ব সত্তা ফিরে পেলে নিজদের ভাগ্য পরিবর্তনের সুযোগ পাবে। সমৃদ্ধির গতি আরও বাড়বে। পশ্চাৎপদ অঞ্চলগুলো নজরে আসবে। ক্রমান্বয়ে অবসান ঘটবে তাদের পশ্চাৎপদতার। অপর অংশটির মতে, এ সিদ্ধান্ত ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন ভাষাভাষী ও নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর মধ্যে দ্বন্দ্ব বাড়াবে। একের পর এক নতুন রাজ্য গঠনের দাবি আসতে থাকবে। তাঁরা আরও বলছেন, এ প্রবণতা ভারতকে ক্রমান্বয়ে ‘বলকানাইজেশন’-এর পথে নিতে পারে। এ ধরনের মতামত পোষণকারীদের মধ্যে কুলদীপ নায়ারের মতো প্রথিতযশা সাংবাদিকও রয়েছেন। উল্লেখ্য, ‘বলকানাইজেশন’ একটি ভূরাজনৈতিক শব্দ। একটি দেশ বা অঞ্চল পরস্পরের প্রতি বৈরীভাবাপন্ন ছোট ছোট অঞ্চলে বিভক্ত হওয়াকে ‘বলকানাইজেশন’ বলে অভিহিত করা হয়। এ শব্দটি মূলত ১৮১৭ থেকে ১৯১২ সময়কালে অটোমান সাম্রাজ্যের বলকান উপদ্বীপের অঙ্গরাজ্যগুলো বিভিন্ন রাজ্যের বিভক্তি থেকে নেওয়া হয়। ভারতের ক্ষেত্রে এ যুক্তি গ্রহণযোগ্য বলে অনেকে মনে করেন না। তাঁদের বিবেচনায় এখানে ফেডারেল সরকারব্যবস্থা থাকলেও শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার, সর্বভারতীয় রাজনৈতিক দল, সুসংগঠিত সামরিক বাহিনী ও দক্ষ আমলাতন্ত্র রয়েছে। ব্যাপকভাবে না হলেও এ ধরনের দু-একটি ক্ষেত্রে নতুন রাজ্য গঠনকে প্রয়োজনীয় বিকেন্দ্রীকরণ বলে ইতিবাচক রূপে চিহ্নিত করছেন তাঁরা।
কেবল কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা কোনো দেশের জন্য সুফল আনে না। শুরু থেকেই ভারত এ সত্য উপলব্ধি করে শক্তিশালী কেন্দ্রের অধীনেই কার্যকর রাজ্য প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করেছে। আর সময়ের প্রয়োজনে এসব রাজ্য নিয়ে কিছু ভাঙাগড়া চলতেই পারে। অন্ধ্র প্রদেশ ভাঙা নিয়ে দাবি দীর্ঘদিনের। কয়েক যুগ পর দাবিটি পূরণ হতে চলছে। কতিপয় ক্ষেত্রে সাময়িক অসুবিধা হলেও শেষাবধি তা কেটে যাবে বলে ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয়। অন্য রাজ্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। আর একে নজির রেখে নতুন রাজ্য প্রতিষ্ঠার দাবিও আসতে পারে। আসলেই সথেষ্ট যৌক্তিকতা না থাকলেও তা দেওয়া হবে এরূপ মনে করার কোনো কারণ নেই। সব আশঙ্কাকে ভুল প্রমাণিত করে ভারতের ২৯তম রাজ্য তেলেঙ্গানা সুষম উন্নয়ন ও সংহতির পথে এগিয়ে যাবে—এটিই প্রত্যাশা।

আলী ইমাম মজুমদার
: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

মিসর- কে হবেন প্রেসিডেন্ট, সিসি না সাবাহি by কামাল গাবালা

Wednesday, February 26, 2014

মিসরীয়রা এখন পড়েছে নতুন দোলাচলে। বিশেষ করে ঝানু বামপন্থী হামদিন সাবাহি নিজেকে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার পর। ২০১২ সালে যে নির্বাচনে মোহাম্মদ মুরসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন, তাতে সাবাহি অধিকার করেছিলেন তৃতীয় স্থান।
সাবাহির এই ঘোষণা এল আরেক দফা প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রাক্কালে, যে নির্বাচনে সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আবদেল ফাতাহ আল-সিসির প্রার্থী হওয়ার জোর সম্ভাবনা রয়েছে।

গত বছরের জুন মাসে মিসরজুড়ে বিক্ষোভের মুখে ইসলামপন্থী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে উচ্ছেদ করে সিসি আরবের সবচেয়ে জনবহুল দেশে বিপুল জনপ্রিয় হন।
মিসরীয়রা এখন যার যার রাজনৈতিক পক্ষ, মতামত ও আদর্শিক অবস্থান থেকে তর্ক ও আলোচনা চালাচ্ছে। সেসব আলোচনা প্রকাশ্যে উঠেও আসছে। এরই একটা উদাহরণ হলো ন্যাশনাল সালভেশন ফ্রন্ট আর তামারোদ মুভমেন্টের এক সারিতে চলে আসা। প্রথমটি গঠিত হয়েছিল ২০১২ সালের শেষে মুরসি প্রশাসনের বিরোধিতা করার জন্য আর গত বছরজুড়ে বিক্ষোভ সংঘটিত করে যাচ্ছিল তামারোদ, যার পরিণতি হলো মুরসির অপসারণ। এমনকি তাদের নামকরণও বোঝায় যে একই উদ্দেশ্যে তারা গঠিত। এবং অবশ্যই তাদের সঙ্গে ছিল নাসেরপন্থীসহ বিভিন্ন বামপন্থী গোষ্ঠী। এই বামপন্থীদের থেকেই এসেছেন সাবাহি।
মিসরের এখন প্রতিটি বাড়িতেই কান পাতলে শোনা যাবে সিসি আর সাবাহিকে নিয়ে আলোচনা। সব পরিবারই যেন একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে: এই দুজনের কে হবেন মিসরের যোগ্যতম প্রেসিডেন্ট?
এ বছরের গোড়াতেই প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের তৈরি করা সংবিধান স্থগিত করে আধুনিক, নাগরিক ও গণতান্ত্রিক মিসরের লক্ষ্যে নতুন সংবিধান পাস হয়েছে। তা ছাড়া ইসলামপন্থী আমলের অভিজ্ঞতা ফিরে আসার যে ভয় সবকিছু আচ্ছন্ন করে ছিল, তা কাটিয়ে মিসরীয়রা এখন এমন একজন সেনানায়ক চায়, যিনি তাদের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষা করবেন। এই সেনানায়ক ‘ধর্মের’ লেবাসের আড়ালে ভেসে ওঠা পুনর্জীবিত সন্ত্রাসবাদকে মোকাবিলা করছেন। ২০১১ সালে হোসনি মোবারকের বিতাড়নের পর থেকে মিসরের অর্থনীতি যে নাটকীয় দুর্দশার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তা থেকেও উঠে আসার লক্ষণমিলছে।
এখনকার মিসরে সাবাহি ও সিসির (যিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য উর্দি খুলে নামবেন বলে ভাবা হচ্ছে) মধ্যে কে ভালো হবেন তা নিয়ে দোলাচলের সঙ্গে অতীতের দোলাচলের কোনো তুলনা চলে না। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতো করে সাবাহিও একে বর্ণনা করেছেন ‘ভালো’ আর ‘উত্তমের’ মধ্যকার লড়াই বলে। গত বছরের ২৫ জানুয়ারির গণ-অভ্যুত্থান এবং তার সংশোধনে আসা ৩০ জুনের ঘটনার সমর্থক বিপ্লবীদের দৃষ্টিতে ব্যাপারটা এ রকমই। আজকের পরিস্থিতি ২০১২ সালের থেকে এখানেই আলাদা যে তখন মিসরীয়দের বেছে নিতে হচ্ছিল মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রার্থী মোহাম্মদ মুরসি বনাম মোবারকের শাসনের প্রতিনিধি আহমেদ শফিকের মধ্যে। সে রকম অবস্থায় পরিস্থিতিটা ছিল ‘খারাপ’ আর ‘নিকৃষ্টের’ মধ্যকার প্রতিযোগিতার মতো। অথবা ব্যাপারটা ছিল যেন কলেরায় মরব নাকি প্লেগে মরব; তা বাছাই করে নেওয়ার প্রশ্ন।
মিসরে চলমান বিতর্কের বিষয় দুই প্রার্থীর মধ্যকার মিল ও ভিন্নতা নিয়ে। দুজনই জনপ্রিয় হওয়ায় বেছে নেওয়াও কঠিন হয়ে গেছে ভোটারদের পক্ষে। এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে সাবাহি বিনয়ের সঙ্গে বলেছেন যে আমি সব মিসরীয় ও সিসিকে বলছি, তিনি একজন উত্তম প্রার্থী, তবে আমিও ‘উত্তম’ প্রার্থী হতে পারি।
প্রখ্যাত মিসরীয় রাজনীতিবিদ মোহামেদ সালমাওয়ি এককথায় এভাবে বলেছেন, সাবাহি ও সিসি এই অর্থে মিসরীয়দের চোখে সম্পর্কিত যে উভয়ই তাঁদের মনে করিয়ে দিচ্ছে সাবেক জাতীয়তাবাদী প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসেরের কথা। সিসি যেভাবে জনগণের ইচ্ছাকে তুলে ধরেছেন, যেভাবে তিনি আন্তর্জাতিক শক্তি ও ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর বিপরীতে জনগণের স্বার্থকে গ্রহণ করেছেন, তাতে অনেক মিসরীয়র মনেই তাঁকে নাসেরের প্রতীক বলে মনে হয়।
অন্যদিকে সাবাহি হলেন নাসেরের সরাসরি অনুসারীদের মধ্যে প্রধানতম নাসেরপন্থী নেতা। বাল্যকাল থেকেই তিনি নাসেরপন্থার সঙ্গে যুক্ত এবং তাঁরই প্রতিনিধি হিসেবে চিত্রিত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে নাসেরপন্থী হিসেবে তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০১২ সালের নির্বাচনেও তিনি নাসেরপন্থী হিসেবেই তৃতীয় স্থান অর্জন করেন, যেমন এখন তিনি সংসদে নাসেরের ধারারই নেতার ভূমিকা পালন করছেন।
সালমাওয়ি আরও বলেন যে ২০১৪ সালের নির্বাচনী দৌড়ে সিসি আর সাবাহিই হবেন প্রধান প্রতিযোগী। এর অর্থ হলো, যে নাসের তাঁর পরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার আল সাদাতের আমলে ব্যাপকভাবে আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন, সেই নাসেরের প্রত্যাবর্তন ঘটছে। এখন তাহরির স্কয়ারে নাসেরের পোস্টারের পাশে শোভা পাচ্ছে সিসির পোস্টার। আর তারা স্লোগান দিচ্ছে, ‘মুক্তি, ইনসাফ ও মানবতার সম্মান’-এর জন্য।
সাবাহি বলেছেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমার বিশ্বাস, সিসি একজন দেশপ্রেমিক ব্যক্তি এবং আমি তাঁর জন্য শুভকামনা ছাড়া অন্য কিছু বোধ করি না। কারণ, তিনি এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁকে নিরাপদ রাখার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো বর্তমানের মতোই তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রীর অবস্থানে থেকে যাওয়া।’
সাবাহি যুক্তি দেন, চারপাশে ঘিরে থাকা লোকজনের চাপে যদি সিসি প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে নির্বাচন
কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে শেষ হবে। এই বামপন্থী রাজনীতিবিদ মনে করেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে সিসির নির্বাচিত হওয়া তেমন অবধারিত নয়, যদিও গণমাধ্যম ও অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক তেমনটাই ভাবেন।
এরই মধ্যে প্রখ্যাত মিসরীয় সাংবাদিক মোহামেদ হাসানাইয়েন হেকেল নিজের অতীতের উক্তি সংশোধন করে বলেন যে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে মিসরের দরকার অলৌকিক ঘটনা। এর আগে তিনি বলেছিলেন যে সিসিই ন্যায্য প্রার্থী। তিনি আরও বলেন, সিসি যদিও অনেক জনপ্রিয়তা উপভোগ করেন, তাহলেও অন্যান্য প্রার্থীও নিজেদের মনোনীত করতে সক্ষম হবেন। আর এটা ঘটতে হবে সত্যিকার নির্বাচনী প্রক্রিয়ায়।
হেকেল বলেন, সাবাহির মনোনীত হওয়া খুবই ন্যায়সংগত। কারণ, তাঁর রাজনৈতিক মেধা রয়েছে এবং ছাত্র আন্দোলনের কর্মী হওয়া থেকে শুরু করে পরের দিকে তিনি নিজেকে জাতীয় রাজনীতির জন্য যোগ্য হিসেবে বিকশিত করেছেন। তিনি আরও বলেন, সাবাহির তেমন আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, রয়েছে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও জনপ্রিয় সমর্থন। এই সমর্থন দিচ্ছে তরুণ উৎসাহী জনতা। এ কথা বলে
তিনি ইঙ্গিত করেন ২০১২ সালের নির্বাচনের কথা, যেখানে সাবাহি পেয়েছিলেন ৫০ লাখ ভোট। ওই নির্বাচনে সাবাহির সাফল্য বিস্ময়কর ছিল। কারণ, অন্য প্রার্থীরা বিপুল অর্থ ও যোগাযোগ বিনিয়োগ করে তাঁর জন্য পরিস্থিতি কঠিন করে তুলেছিলেন।
সিসির প্রেসিডেন্ট হওয়ার আকাঙ্ক্ষার পথে হুমকি হলো মোবারকের স্বৈরাচারী শাসনের সমর্থকদের পুনরাবির্ভাব। এরা যদি সিসিকে সমর্থন দেয়, তাহলে মিসরের ভেতরে ও বাইরে তাঁর প্রতিপক্ষ সুবিধা পাবে। আর তাহলে গত বছরের ৩০ জুন মিসরীয় সেনাবাহিনী মুরসিকে উচ্ছেদ করে যে বাহবা কুড়িয়েছিল, তাতে চিড় ধরবে।

কামাল গাবালা: মিসরের আলআহরাম পত্রিকাগোষ্ঠীর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক।

মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র- মুসলমানদের সামনে দুই পথ, দেশত্যাগ অথবা মৃত্যু

Tuesday, February 25, 2014

কারনোট: মধ্য আফ্রিকান প্রজতন্ত্রের খ্রিস্টান জঙ্গিরা দেশটির একটি গির্জায় আশ্রয় গ্রহণকারী মুসলমানদের দেশত্যাগ অথবা মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে।

উগ্র খ্রিস্টানদের গণহত্যার হাত থেকে রক্ষা পেতে দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর কারনোটের একটি ক্যাথলিক গির্জায় প্রায় ৮০০ মুসলমান আশ্রয় নিয়েছেন। চলতি মাসের গোড়ার দিকে নিকটবর্তী গুয়েন গ্রামে এক গণহত্যায় অন্তত ৭০ জন মুসলমান নিহত হওয়ার পর তারা গির্জাটিতে আশ্রয় নেন।

এখন খ্রিস্টানরা বলছে, মুসলমানরা গির্জাটি থেকে বেরিয়ে দেশত্যাগ না করলে সেখানে আগুন ধরিয়ে দেবে তারা।

গত ডিসেম্বর খ্রিস্টান জঙ্গিরা সুসংগঠিতভাবে মুসলমানদের বিরুদ্ধে দাঙ্গা শুরু করে। প্রধানত মুসলমানদের নিয়ে গঠিত সেলেকা গেরিলারা ২০১৩ সালের মার্চ মাসে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের তৎকালীন সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল। ডিসেম্বরে সেলেকা সরকার পদত্যাগ করার পরপরই মুসলমানদের ওপর গণহত্যা অভিযান শুরু হয়।

হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতন থেকে রক্ষা পেতে এরইমধ্যে প্রায় ১০ লাখ মুসলমান দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। উগ্র খ্রিস্টানদের হাতে নিহত হয়েছেন অন্তত ১,০০০ মানুষ। জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে ডিসেম্বরেই ফ্রান্স দেশটিতে ১,৬০০ শান্তিরক্ষী মোতায়েন করলেও তারা দাঙ্গা বন্ধের কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে হীরকসহ আরো বেশ কিছু মূল্যবান খনিজ সম্পদ রয়েছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ফ্রান্স এসব সম্পদের লোভে দেশটিতে সেনা পাঠিয়েছে; মুসলমানদেরকে দাঙ্গাকারীদের হাত থেকে রক্ষা করতে নয়। সূত্র: আইআরআইবি

দূরদেশ- ইউক্রেনে ইতিহাসের প্রত্যাবর্তন? by আলী রীয়াজ

ইউক্রেনের গণ-আন্দোলন ও সহিংসতা এবং তাকে কেন্দ্র করে রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে যে টানাপোড়েনের সৃষ্টি হয়েছে, তা কি ইতিহাসের প্রত্যাবর্তন?
নাকি তা বৃহৎ শক্তিশালী দেশের ক্ষুদ্র প্রতিবেশীর অনিবার্য পরিণতি? ইউক্রেন কি প্রক্সি লড়াইয়ের রণক্ষেত্র, যার একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন আর অন্যদিকে রাশিয়া? নাকি গণতন্ত্রায়ণের অসম্পূর্ণতার কারণে ভঙ্গুর গণতন্ত্রের কর্তৃত্ববাদী শাসনে রূপান্তরের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদের উদাহরণ? ইউক্রেনের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এটিই কি দেশটির ভবিতব্য ছিল? রাজধানী কিয়েভে নভেম্বর থেকে সরকারবিরোধীদের অব্যাহত বিক্ষোভের ফলে অবশেষে প্রেসিডেন্ট ভিক্তর ইয়ানুকোভিচ রাজধানী থেকে পালিয়েছেন, পার্লামেন্ট তাঁকে পদচ্যুত করে স্পিকার আলেকসান্দর তুর্চিনোভকে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করেছে, আগামী ২৫ মে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে এবং কারাগারে আটক সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইউলিয়া তিমোশেনকো মুক্তিলাভ করেছেন।

গত নভেম্বরে বিক্ষোভের সূচনা হয়েছিল ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি থেকে সরে আসার ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট ইয়ানুকোভিচের সিদ্ধান্তের কারণে, কিন্তু তা পরে আর সেখানে স্থির হয়ে থাকেনি। কেননা, বিক্ষোভের সেটা ছিল উপলক্ষমাত্র। এই আন্দোলন ক্রমেই রূপান্তরিত হয়েছে ক্ষমতার এককেন্দ্রীকরণের বিরুদ্ধে। তা পরিণত হয়েছে সাংবিধানিকভাবে ক্ষমতার কাঠামো বদলের দাবিতে এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতা থেকে অপসারণের সফল লড়াইয়ে। এ সবই অভ্যন্তরীণ ঘটনাপ্রবাহ কিন্তু ইউক্রেনের এই ঘটনাপ্রবাহে গোড়া থেকেই যুক্ত হয়েছে বাইরের শক্তি ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে প্রেসিডেন্ট ইয়ানুকোভিচ যে ইউরোপের সঙ্গে আলোচনা ভেঙে দিয়ে রাশিয়ার দিকে ঝুঁকেছেন, মস্কোতে গিয়ে চুক্তি করেছেন, তাতেই বোঝা যায় যে বাইরের শক্তি এই ঘটনাপ্রবাহের বাইরে নেই, আগেও ছিল না। এ প্রসঙ্গে আরেকটু পরে আসি। তার আগে এখনকার অবস্থা ইতিহাসের প্রত্যাবর্তন কি না, সেই প্রশ্নের একটা উত্তর খোঁজা দরকার।
১৯৯১ সালে ইউক্রেন স্বাধীনতা লাভ করে। কিন্তু দেশটির মধ্যে ইতিহাসের একটা বড় দাগ থেকে গেছে। তা হলো দেশটির পূর্বাঞ্চল রুশভাষী এবং শিল্পোন্নত; অন্যদিকে পশ্চিমে আছে ক্রিমিয়া, তুলনামূলকভাবে অধিকতর জাতীয়তাবাদী। একসময় ক্রিমিয়া ছিল পোল্যান্ড ও অস্ট্রো-হাঙ্গেরির অংশ। ১৯৩৯ সালে নাৎসি জার্মানির সঙ্গে অনাক্রমণ চুক্তির আওতায় স্তালিন ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার অংশে পরিণত করেন। ক্রিমিয়ার জনগণের কোনো রকম ভূমিকা তাতে ছিল না। ক্রিমিয়ার স্থানীয় মানুষেরা ইউক্রেনে রুশভাষী কিংবা রাশিয়া-প্রভাবিত ক্ষমতাসীনদের মধ্যে স্তালিনের ছায়া দেখতে পান। কিন্তু রাশিয়া ১৯২১ সালের পর থেকে অভিবাসন-প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রুশভাষীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ করে তুলতে পেরেছে। সাংবিধানিকভাবে ক্রিমিয়া স্বশাসিত রিপাবলিক, যা ইউক্রেনের অংশ। কিন্তু সেখানে রয়েছে রাশিয়ার নৌবাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অচলাবস্থার নিরসন না ঘটলে ক্রিমিয়া বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা একেবারে কল্পনা নয়। অব্যাহত বিক্ষোভের মুখে রাজধানী কিয়েভ ত্যাগ করে প্রেসিডেন্ট ইয়ানুকোভিচ দেশের পূর্বাঞ্চলেই আশ্রয় নিয়েছেন। ইতিহাসের এক প্রায় বিস্মৃত অধ্যায় নতুন করে সবার সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে কি না, সেটা যেমন একটা প্রশ্ন, তেমনি প্রশ্ন হলো ভবিষ্যতে সে পথেই ইউক্রেন এগোবে কি না।
আমরা যদি ইতিহাসের এই প্রত্যাবর্তন নিয়ে সন্দিহানও থাকি, এ নিয়ে আমাদের সন্দিহান হওয়ার অবকাশ নেই যে ইউক্রেনে আমরা এক অর্থে গত শতকের সত্তর বা আশির দশকের স্নায়ুযুদ্ধের অবস্থা দেখতে পাচ্ছি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা যদিও বলেছেন যে এটা শীতল যুদ্ধের সময়কার দাবা খেলা নয়, যেখানে আমরা রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি কিন্তু রাশিয়া এবং বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের গত কয়েক বছরের নীতি ও কৌশলের আলোকে এ কথা মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে রাশিয়া সেভাবেই বিবেচনা করে। সে কারণে ইউক্রেনকে রাশিয়ার অনুকূলে রাখার জন্য পুতিন ইউক্রেনের ১৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণের দায় গ্রহণে পিছপা হননি। কম মূল্যে তেল সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে কাস্টমস ইউনিয়নে ইউক্রেনকে যোগ দিতে চাপ দেওয়ার কারণ আর কী থাকতে পারে?
দেশের ভৌগোলিক অবস্থানও একটা অন্যতম কারণ। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর সাবেক সোভিয়েত-প্রভাবিত দেশগুলো একে একে পশ্চিমের প্রভাবাধীন হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রভাবান্বিত দেশগুলোর সঙ্গে রাশিয়ার দেয়াল একার্থে ইউক্রেন। ফলে রাশিয়া চাইছে যে ইউক্রেন তার প্রভাবের মধ্যেই থাকুক। তার জন্য প্রয়োজনে রক্তপাতে তার দ্বিধা নেই, যে অর্থে পশ্চিমা দেশগুলো মনে করে যে এই দফায় রাশিয়াকে তারা আটকাতে না পারলে ভবিষ্যতে ইউক্রেনকে আর কখনোই রাশিয়ার প্রভাবমুক্ত করা যাবে না। এই ক্ষেত্রে দুই পক্ষই ২০০৮ সালে জর্জিয়ার অভিজ্ঞতাকে স্মরণে রেখেছে। তখন জর্জিয়া ন্যাটোর সদস্য হওয়ার চেষ্টা করলে রাশিয়ার সঙ্গে দক্ষিণ ওসেতিয়া ও আবখাজিয়া নিয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এখন ইউক্রেনকে কেন্দ্র করে আবারও এ ধরনের একটা সংকটের সূচনা হবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
এগুলো হচ্ছে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক রাজনীতি ও সামরিক কৌশলের হিসাব। কিন্তু দেশের ভেতরের পরিস্থিতি আমাদের আরও বেশি গভীরভাবে বিবেচনায় রাখতে হবে। এক বিবেচনায় এই সংকটের উৎস ২০০৪ সালেই। তখন সে সময়কার প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ভিক্তর ইয়ানুকোভিচ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল নিজের অনুকূলে নেওয়ার চেষ্টা করেন; কিন্তু তখনকার প্রেসিডেন্ট লিওনিদ কুচমা বিক্ষোভকারীদের ওপরে বল প্রয়োগে অস্বীকার করেন। এতে করে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীরা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে পারে। কিন্তু সে সময় রাশিয়া যে নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছিল, তা অনেকেরই জানা। ওই নির্বাচনের আগে ভিক্তর ইউশচেনকোকে বিষ প্রয়োগে হত্যার চেষ্টার ঘটনাও ঘটে। কিন্তু বিজয়ী ইউশচেনকো ও তাঁর প্রধানমন্ত্রী ইউলিয়া তিমোশেনকো জড়িয়ে পড়েন ক্ষমতার বিবাদে। ২০০৭ সালে প্রেসিডেন্ট ও বিরোধী দলের নিয়ন্ত্রিত পার্লামেন্ট বিবাদে জড়িয়ে পড়লে প্রেসিডেন্ট পার্লামেন্ট ভেঙে দেন। ২০১০ সালের নির্বাচনে ভিক্তর ইয়ানুকোভিচ প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হলে ক্রমাগতভাবেই পার্লামেন্টের ক্ষমতা সংকুচিত করে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বাড়িয়ে চলেন। নিয়মিত নির্বাচন ও পার্লামেন্টে ক্ষমতার হাতবদল সত্ত্বেও ইউক্রেনের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেনি। তার কারণ ক্ষমতাসীনদের দুর্নীতি, ক্ষমতার লোভ ও ক্ষমতার এককেন্দ্রীকরণ। ফলে ২০০৭ সালে দেখেছিলাম ইয়ানুকোভিচের সমর্থকদের বিক্ষোভ ও তাঁর ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন। এখন তাঁর বিরোধীরা ২০০৪ সালের মতো আবারও রাজপথের লড়াইয়ে সাফল্য লাভ করেছে।
কিন্তু এসবের মধ্যে যা ক্রমেই সুদূরপরাহত হয়েছে তা হলো প্রকৃত গণতন্ত্রায়ণ, স্বাধীন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের উদ্ভব ও বিকাশ। ইউক্রেন একার্থে ব্যতিক্রম নয়। অনেক দেশেই গণতন্ত্রের বদলে একধরনের ‘সংকর শাসন’ বা হাইব্রিড রেজিম তৈরি হয়েছে। সেসব দেশের কর্তৃত্ববাদী শাসনে ফেরার আশঙ্কাই বেশি। সেটাই ভিক্তর ইয়ানুকোভিচের শাসনে আমরা দেখতে পাই। ইউক্রেনের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই ভঙ্গুর গণতন্ত্রের সমস্যা আরও জটিল আকার নিয়েছে। শক্তিশালী বড় দেশের ক্ষুদ্র প্রতিবেশী দেশে যখন গণতন্ত্র ভঙ্গুর হয় তখন শক্তিশালী বড় দেশের জন্য তা অবশ্যই অনুকূল অবস্থার সূচনা করে এবং সে তার সুবিধা নিতে মোটেই পিছপা হবে না। হওয়ার কথাও নয়। যদি কেউ এ কথা বলেন যে বড় দেশ চাইবে তার প্রতিবেশীর গণতন্ত্র দুর্বল হোক, তার সঙ্গে দ্বিমতের সুযোগ কম। আন্তর্জাতিকভাবে কর্তৃত্ববাদী শাসনের গ্রহণযোগ্যতা এখন কম বলে সে ধরনের শাসনের ভরসা হন অন্য কর্তৃত্ববাদী শাসকেরা। রাশিয়া ও ইউক্রেনের সম্পর্ককে সেই বিবেচনার বাইরে রাখা যাবে না।
ফলে ইউক্রেনের বর্তমান রাজনীতি কেবল সে দেশের জন্যই নয়, কেবল আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির জন্যই নয়, গণতন্ত্রায়ণের বিষয়ে উৎসাহী সবার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।

আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

ভিন্নরূপী এক মেয়ে

Saturday, February 22, 2014

২৩ বছরের যুবতী হারনাম কাউর। লন্ডনে একটি স্কুলের সহকারী শিক্ষিকা। প্রতিদিন তিনি যখন স্কুলে যান, রাস্তায় বের হন, কোন ফাস্টফুডের দোকানে প্রবেশ করেন তখন সবাই তার দিকে তাকিয়ে থাকে। তাকে নিয়ে মজা করে।
হাসাহাসি করে। তাতে হারনামের কিছু এসে যায় না। তাকে নিয়ে এই হাসাহাসির কারণ, হারনাম যুবতী হলেও তার মুখভর্তি দাড়ি। কুচকুচে কালো দাড়ি দেখে তিনি যে মেয়ে তা ঠাহর করা কঠিন। হারনাম এসব মেনে নিয়েছেন। বিশ্বাস করেন, বিধাতা ইচ্ছে করে তাকে দান করেছেন দাড়ি। তা তিনি কাটবেন না। কেউ হাসাহাসি করলে তাতে তার কি! হারনাম বলেন, ঈশ্বরই আমাকে এভাবে সৃষ্টি করেছে। এতেই আমি খুশি। এগার বছর বয়স পর্যন্ত তিনি ছিলেন স্বাভাবিক একটি মেয়ে। এরপরই তার মুখে দেখা দিতে থাকে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। এক সময় বিরক্ত হয়ে যান তিনি। অন্য মেয়েদের মতো কোমল মসৃণ ত্বক রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকেন। এক পর্যায়ে মুখ শেভ করেন, ব্লিচিং করেন। সপ্তাহে দু’বার এ ধারা অব্যাহত রাখেন। কিন্তু কিছুতেই কাজ হয় না। স্কুলে সবাই তাকে ক্ষেপাতে থাকে। দাড়ির ইংরেজি বিয়ার্ড বলে অনেকে তাকে বিয়ার্ডো নামে ডাকতে থাকে। কেউ বা তাকে নারী-পুরুষ বলে ডাকতে থাকে। এতে এক সময় তিনি বিরক্ত হন। নিজেকে আটকে রাখেন ঘরের মধ্যে। নিজের সঙ্গে লড়াই করতে থাকেন। অনেকবার সিদ্ধান্ত নেন আত্মহত্যার। বয়স যখন ১৬ বছর তখন তিনি শিখ হিসেবে দীক্ষা নেন এবং দাড়ি কাটা বন্ধ করে দেন। আস্তে আস্তে তার মধ্যে আস্থা ফিরতে থাকে। হারনাম কাউর বলেন, এখন আমার মধ্যে অনেক বেশি নারীত্ব। আমার শরীরে যথেষ্ট আবেদন আছে। আমি এটা পছন্দও করি। তিনি আরও বলেন, দাড়ি নিয়ে একজন নারী হিসেবে স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে আমার কোন কষ্ট হয় না। আমি অবলীলায় নারীদের কেনাকাটার দোকানে চলে যাই। আগে ভয় পেতাম যদি মুখে দাড়ি দেখে আমাকে পুরুষ ভেবে বের করে দেয়! কিন্তু এখন আর সেই ভয় নেই। আমি স্কার্ট পরি। অন্য মেয়েদের মতো পোশাক পরি। গহনা পরি। অন্য মেয়েদের মতো আমার নখ সাজাই। তার সঙ্গে রয়েছে ১৮ বছর বয়সী ভাই। তিনি বলেন, হারনাম সুখে আছে। সে যা চায় তাই করে। করতে পারে। এটা তার জন্য অনেক ভাল বিষয়। হারনাম বলেন, আমার আসল সৌন্দর্য হলো আমার ভেতরের রূপ। আমার মুখে দাড়ি। এটা আমার বাইরের চেহারা। আমার ভিতরটা পরিষ্কার।

যৌন জীবনে অতৃপ্ত তাই!

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যের চেসনির বাসিন্দা ৫৮ বছর বয়সী এক নারীকে তার ৭২ বছর বয়সী স্বামী নিজের বোনদের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক গড়তে বলেছেন।
ওই দম্পতির পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। জরুরি নম্বর ৯১১- এ ফোন করে শেষ পর্যন্ত পুলিশি সহায়তা চেয়েছেন ওই নারী। পুলিশের কাছে তিনি বলেছেন, গত ২ বছর তাদের যৌন জীবনে কিছু সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তেমন একটা ভালো সময় পার করছিলেন না তারা। ফলে, দাম্পত্য জীবনে সেটার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। দম্পতিদের জন্য বিশেষ চিকিৎসা বা থেরাপি নেয়ার ব্যাপারে ওই নারী তার স্বামীকে প্রস্তাব দেন। তাতে রাজি না হয়ে উল্টো তার স্বামী তাকে বলেন তার বোনদের সঙ্গে রাত কাটাতে। এতে তাদের যৌন জীবন আরও উত্তেজনাময় হয়ে উঠবে বলেও মন্তব্য করেন স্বামী। স্বামীকে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তিনি সে ধরনের মানুষ নন। ক্ষুব্ধ হয়ে ৯১১ নম্বরে ফোন করে পুলিশি সহায়তা চান তিনি। ওই দম্পতির পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। একই সঙ্গে স্বামীর বোনেরা যাতে কখনও তাদের বাড়িতে ঢুকতে না পারেন এবং তাদের পারিবারিক সম্পর্কে নাক না গলান, তা নিশ্চিতেও পুলিশি সহায়তা চান ওই নারী। 

তপ্ত মরুভূমিতে একাকী ৪ বছরের শিশু...

Wednesday, February 19, 2014

সুবিশাল, তপ্ত মরুভূমিতে মাত্র ৪ বছর বয়সী একটি শিশু এদিক-সেদিক ঘুরছে। পিতামাতা, ভাইবোন বা অন্য কোন আত্মীয়-স্বজন তার সঙ্গে নেই। মারওয়ান নামে অবুঝ শিশুটির নিঃসঙ্গ মরুভূমি যাত্রার হৃদয়বিদারক এ দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করেছেন জাতিসংঘের এক কর্মী।
যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত সিরিয়া থেকে পালানোর সময় পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় সে। জর্ডান ও সিরিয়া সীমান্তের কাছে একা একটি শিশুকে দেখতে পান জাতিসংঘের কর্মীরা। তার হাতে ছিল কাপড়চোপড় ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীতে ভর্তি একটি প্লাস্টিকের ব্যাগ। জর্ডানে অবস্থিত জাতিসংঘের হাই কমিশনার ফর রেফ্যিউজিস’র (ইউএনএইচসিআর) মুখপাত্র অ্যান্ড্রু হার্পার শিশুটিকে ক্যামেরাবন্দি করেছেন। এরপর জাতিসংঘের ত্রাণকর্মীরা ছোট্ট শিশুটিকে সীমান্ত পার হয়ে জর্ডানে ঢুকতে সাহায্য করেন। এরপরই মারওয়ানের পরিবারকে পাওয়া গেছে জানিয়ে একটি টুইট করেন হার্পার। দ্বিতীয় অপর একটি ছবি টুইটারে আপলোড করেন। তাতে জাতিসংঘের এক ত্রাণকর্মীকে সীমান্ত অতিক্রমে শিশুটিকে সাহায্য করতে দেখা যায়। জর্ডান সীমান্ত অতিক্রম করার অল্প সময় পর মারওয়ান নিরাপদে তার মা ও পরিবারের বাকি সদস্যদের সঙ্গে পুুনর্মিলিত হয়েছে বলে টুইট করেন হার্পার। এ খবর দিয়েছে মেইল অনলাইন। শিশুটি পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে কবে বিচ্ছিন্ন হয়েছে, সে সম্পর্কে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। গত সোমবার সন্ধ্যার দিকে এক রিপোর্টার টুইটারে লেখেন পরিবারের সদস্যদের চেয়ে মাত্র ২০ কদম দূরে ছিল মারওয়ান। এক পর্যায়ে তারা তাকে হারিয়ে ফেলেন। মারওয়ানের ছবিটি সিরিয়া যুদ্ধে হারিয়ে যাওয়া বা পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয় ভাগ্য-বঞ্চিত শিশুদের প্রতিচ্ছবি। হার্পার গত কয়েক দিনে সিরিয়া যুদ্ধের ভয়াবহ বাস্তবতায় শিশুদের মানবেতর পরিস্থিতি ক্যামেরাবন্দি করে ব্যাপক আলোচিত হয়েছেন।

ভূরাজনীতি- চীনের কোনো বন্ধু নেই by ব্রহ্ম চেলানি

Tuesday, February 18, 2014

ভূখণ্ডগত দাবিদাওয়ার কারণে এই অঞ্চলের অনেক দেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক যখন টানাপোড়েনের মুখোমুখি পড়েছে, যখন মিয়ানমারের ওপর তার একসময়ের প্রবল প্রভাব দুর্বল হয়েছে এবং তার একসময়ের অনুগত রাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে, তখন দেখা যাচ্ছে, চীন নামক শক্তিধর রাষ্ট্রটির আশপাশে সত্যিকারের কোনো মিত্র নেই।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো এই পরিস্থিতি কাজে লাগিয়ে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু করতে এবং উত্তর-পূর্ব এশিয়ার আশঙ্কাময় ভূরাজনীতিতে পরিবর্তন সূচিত করতে সক্ষম হবে কি না।

মিয়ানমারের সঙ্গে চীনের সম্পর্কের অবনতি শুরু হয় ২০১১ সালের শেষ দিকে, যখন মিয়ানমার চীনের সহায়তায় নির্মিতব্য সর্ববৃহৎ ও সবচেয়ে বিতর্কিত প্রকল্পের কাজ স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। ইরাবতী নদীর উজানে ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়সাপেক্ষ মায়িস্টোন বাঁধ নির্মাণের সেই প্রকল্প মিয়ানমার স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিলে চীন বেশ আঘাত পায়, যে মিয়ানমারকে চীন তার মক্কেল রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে। তবে সম্পর্কে এই চিড় ধরা সত্ত্বেও দেশটির প্রতি চীনের আগ্রহ আজও ব্যাপক মাত্রায় রয়ে গেছে।
মিয়ানমারের ওই সিদ্ধান্তের ফলে চীনের সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি ঘটলেও পৃথিবীর অবশিষ্ট অংশের সঙ্গে মিয়ানমারের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি ছিল একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তার পরে একটা বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে; মিয়ানমারের ওপর পশ্চিমা দেশগুলোর বহু বছর ধরে আরোপিত অবরোধগুলো শিথিল হয়েছে এবং মিয়ানমারের কয়েক দশকের আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা ঘুচেছে।
ওদিকে উত্তর কোরিয়ার তরুণ স্বৈরশাসক কিম জং-উন চীনের সঙ্গে নিজের দূরত্ব বাড়িয়ে মিয়ানমারের পথ অবলম্বনের আগ্রহ জানান দিচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে। অবশ্য যদি এমন হয় যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার শীতল সম্পর্কের বরফ গলাতে চাইছেন, তাহলে তাঁকে অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। সাবেক আমেরিকান বাস্কেটবল তারকা ডেনিস রডম্যানকে তিনি স্বাগত জানানোর ফলে আমেরিকায় শুধু বিতর্কই সৃষ্টি হয়েছে। আর দক্ষিণ কোরিয়ার একটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, তিনি তাঁর এক সাবেক মেয়েবন্ধুকে মেশিনগানের গুলি করে হত্যা করেছেন—এতেও আমেরিকানদের কাছে তাঁর কদর কোনোভাবেই বাড়বে না।
অধিকাংশ পর্যবেক্ষক মনে করেন, কিম তাঁর চাচাশ্বশুর জ্যাং সং-থেককে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে হত্যা করার ফলে চীনের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সম্পর্কের যে অবনতি ঘটে, উত্তর কোরিয়ার খামখেয়ালিপূর্ণ ও অদ্ভুত রাজনীতিতে তার স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছে। চীনের জন্য বিষয়টি ছিল ব্যক্তিগত পর্যায়ের। উত্তর কোরিয়ার শাসকমহলের মধ্যে থেক ছিলেন চীনের কাছে সবচেয়ে মূল্যবান ব্যক্তি। তাঁর বিরুদ্ধে কিম বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ তুলেছিলেন। এগুলোর মধ্যে এমন অভিযোগও ছিল যে থেক খুব কম দামে কয়লা, জমি ও বিভিন্ন মূল্যবান ধাতু চীনের কাছে বিক্রির ষড়যন্ত্র করছিলেন।
কিন্তু চীন উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে খুব যত্নের সঙ্গে যে ‘রক্তের সম্পর্ক’ বজায় রেখে আসছিল, ২০১১ সালের শেষে কিম তাঁর পিতা কিম জং-ইলের কাছ থেকে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই তার অবনতি ঘটতে শুরু করে। চীনের তিনটি মাছ ধরার নৌকা উত্তর কোরিয়া আটক করে, সেসব নৌকায় যে ২৯ জন মানুষ ছিল, তাদের সবাইকে ১৩ দিন ধরে আটকে রাখে (খবরে প্রকাশ, ওই সময় তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়), তারপর উত্তর কোরিয়ার জলসীমার মধ্যে মাছ ধরার দায়ে চীনের কাছে এক লাখ ৯০ হাজার মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করে। চীনের প্রতি উত্তর কোরিয়ার অবাধ্যতা প্রকাশের সেটাই ছিল প্রথম লক্ষণ। তারপর উত্তর কোরিয়া তৃতীয়বারের মতো পারমাণবিক পরীক্ষা চালানোর মধ্য দিয়ে চীনের বিরাগ সৃষ্টি করে।
বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই যে কিমের এসব পদক্ষেপকে চীনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম উত্তর কোরিয়ার ‘অচীনাকরণ’ নীতি হিসেবে আখ্যায়িত করে এবং এর জন্য কিমের সমালোচনা করার মধ্য দিয়ে একটা স্বতন্ত্র অবস্থান গ্রহণ করে। কিন্তু কিমবিরোধী প্রচারণার বাইরে চীনের আর বেশি কিছু করার নেই। কারণ, উত্তর কোরিয়ায় যে বিপুল পরিমাণ লোহা, ম্যাগনেসাইট, তামা ও অন্যান্য খনিজ সম্পদের মজুত রয়েছে, সেসবের প্রতি চীনের প্রবল আগ্রহ আছে। মিয়ানমারের মতো উত্তর কোরিয়ায়ও এসব ক্ষেত্রে অভিগম্যতা অটুট রাখতে চায় চীন।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উত্তর কোরিয়ায় জ্বালানি ও খাদ্যের সরবরাহ সংকোচন করার মধ্য দিয়ে দেশটির ওপর চাপ সৃষ্টি করার উদ্যোগ যদি চীন নেয়, তাহলে সেই দেশ থেকে বিপুলসংখ্যক শরণার্থী চীনে প্রবেশ করার ঝুঁকি সৃষ্টি হবে। চীনের দিক থেকে তার চেয়েও খারাপ কথা হলো, এর ফলে উত্তর কোরিয়ায় কিম-পরিবারের শাসন ভেঙে পড়তে পারে। সে রকম কিছু ঘটলে উত্তর কোরিয়া রাষ্ট্র হিসেবেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে একীভূত হয়ে যেতে পারে। তাহলে যা দাঁড়াবে তা হলো, চীনের কাছাকাছি যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে একক কোরীয় রাষ্ট্রের উত্থান। চীনা সীমান্তের কাছাকাছি মার্কিন সেনাবাহিনীর অবস্থান চীনের জন্য ভয়াবহ এক দুঃস্বপ্ন ছাড়া আর কিছু নয়।
দুই কোরিয়া এক হলে যে একক কোরীয় রাষ্ট্রের উত্থান ঘটবে, তার সঙ্গে চীনের বেশ কিছু ভূখণ্ড ও প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে বিরোধ তীব্রতর হবে (যেমন, পিকতু পাহাড়ের গিরিখাত কোনজি হ্রদ এবং ইয়ালু ও তুমেন নদীর কয়েকটি দ্বীপ নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে চীনের ইতিমধ্যেই বিরোধ আছে)। দুই কোরিয়ার একত্রকরণ চীন মেনে নিতে পারে কেবল এই শর্তে যে একক কোরীয় রাষ্ট্রের মর্যাদা হবে ফিনল্যান্ডের মতো, যার স্থায়ী কৌশলগত ছাড় পাবে নিকটতম পরাশক্তি রাষ্ট্র।
আজকের উত্তর কোরিয়ার মতো মিয়ানমারও সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত ছিল একটি বিচ্ছিন্ন, সামরিকীকৃত রাষ্ট্র যে কি না দীর্ঘ আন্তর্জাতিক অবরোধের ফলে বেশ ভুগেছে। বস্তুত কিমের ওপর হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ার ফলে চীন গত বছর উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে জাতিসংঘের আরও এক দফা অবরোধ আরোপের উদ্যোগে সহযোগিতা করেছে।
কিন্তু মিয়ানমার ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। মিয়ানমারের সমাজ বিচিত্র জনগোষ্ঠী নিয়ে গঠিত, যেখানে বর্মি-অভিজাত শাসকগোষ্ঠী সংখ্যালঘুদের ওপর সংখ্যাগরিষ্ঠদের অত্যাচার-নির্যাতনের সমস্যা নিয়ে মুশকিলে আছে। কিন্তু উত্তর কোরিয়ার সমাজ সমগোত্রীয় বা হোমোজেনাস, কঠোর নিয়মশৃঙ্খলার নিগড়ে বাঁধা; উপরন্তু উত্তর কোরিয়া একটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। অন্য কথায়, বিশ্বের জন্য উত্তর কোরিয়া অনেক বেশি বিপজ্জনক একটি রাষ্ট্র।
চীন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যকার সম্পর্কের ভাঙন উত্তর-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতিতে একটি সম্ভাব্য মোড় পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের সূচনা ঘটানোর সুযোগটি নিতে চায়, তাহলে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে চীনের ওপর নির্ভরশীলতা ত্যাগ করতে হবে। কারণ, উত্তর কোরিয়ার জন্য চীন একটা সমস্যা, চীনের ওপর থেকে সে নির্ভরশীলতা কমাতে চাইছে।
মিয়ানমারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ফলে ২০১২ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ইয়াঙ্গুন সফর করেন। উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু করতে হলে প্রথমেই উত্তর কোরিয়াকে রাজি করাতে হবে বি-পারমাণবিকীকরণ সম্পর্কে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে। প্রশ্ন হচ্ছে, ওবামা সে রকম ঝুঁকি নিতে যাবেন কি না। কারণ, তিনি ইতিমধ্যেই শুধু অভ্যন্তরীণ অনেক সমস্যার মুখোমুখি নন, সিরিয়ার ব্যাপারে একটা শান্তি-সমঝোতায় পৌঁছানো এবং ইরানের সঙ্গে তাঁর পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কে একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি নিয়েও মুশকিলে আছেন। এমন অবস্থায় উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে একটি ঝুঁকিপূর্ণ আলোচনা শুরু করার জন্য তাঁর প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক পরিসর কিংবা ব্যক্তি আগ্রহ আছে কি না সেটাই প্রশ্ন।
ইংরেজি থেকে অনূদিত। স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

ব্রহ্ম চেলানি: অধ্যাপক, স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ, সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ, নয়াদিল্লি।

কলকাতার চিঠি- নন্দীগ্রামে মমতার অস্বস্তি by অমর সাহা

এমনটা ভাবেননি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এভাবে ধাক্কা দেবে তাঁকে নন্দীগ্রাম। বড় বিশ্বাস ছিল তাঁর নন্দীগ্রাম নিয়ে। এই নন্দীগ্রাম আর সিঙ্গুরের আশীর্বাদ নিয়ে ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের শাসনক্ষমতায় এসেছিলেন তিনি।
সেই নন্দীগ্রামের আশীর্বাদ এখন ফিকে হয়ে যাচ্ছে। দেখা দিয়েছে অভিশাপরূপে। অথচ এই নন্দীগ্রাম আর সিঙ্গুর মমতাকে ক্ষমতায় আসার পথ দেখিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসিয়েছে। সেদিনের সেই নন্দীগ্রামের জমি অধিগ্রহণবিরোধী আন্দোলন এবার অন্য এক পথের ঠিকানা দিয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই এই নন্দীগ্রামের আন্দোলন নিয়ে যে অভিযোগপত্র আদালতে পেশ করেছে গত মাসে, তা এককথায় উল্টে দিয়েছে আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি এবং মমতার অভিযোগকে। ফলে, এই নিয়ে ফের রাজনৈতিক হোঁচট খেলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর দল তৃণমূল কংগ্রেস। অথচ পশ্চিমবঙ্গের মানুষ এই আন্দোলনের জেরে সেদিন ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল ৩৪ বছর ধরে একটানা শাসনক্ষমতায় থাকা বামফ্রন্টকে। আর রাজ্যসিংহাসনে বসিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের ‘অগ্নিকন্যা’ মমতাকে।

সেদিন সেই জমি অধিগ্রহণবিরোধী আন্দোলনের জেরে রক্তাক্ত হয়েছিল সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম। সিঙ্গুরে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিল ওই আন্দোলনের অন্যতম কর্মী তাপসী মালিককে। আর নন্দীগ্রামে সেই ২০০৭ সালের ১৪ মার্চ আন্দোলনের দিনে পুলিশ গুলি করে হত্যা করেছিল ১৪ জন নিরীহ গ্রামবাসীকে। এই আন্দোলনকে অস্ত্র করে সেদিন পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মমতা। আন্দোলনে উত্তাল করে তুলেছিলেন গোটা পশ্চিমবঙ্গকে। বন্্ধ্, হরতাল আর মিছিল-মিটিংয়ে জেরবার হয়েছিল গোটা রাজ্য।
দেশজুড়ে ধিক্কার উঠেছিল। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এই ঘটনার প্রতিবাদে মাঠে নেমেছিল। মমতাও সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে জমি অধিগ্রহণের প্রতিবাদে একটানা ২৬ দিন অনশনও করেছিলেন। সেদিন রাজ্যসরকার নন্দীগ্রামের গুলিবর্ষণের ঘটনা সিআইডি দিয়ে তদন্তের উদ্যোগ নিলে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে রাজ্যজুড়ে। দাবি ওঠে, এই তদন্ত করাতে হবে ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই দিয়ে। এই দাবিতে কলকাতা হাইকোর্টে মামলাও হয়। হাইকোর্ট অবশেষে নন্দীগ্রামের ঘটনা সিবিআইকে দিয়ে তদন্ত করানোর নির্দেশ দেন।
মূলত, পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামে একটি রসায়ন শিল্পাঞ্চল গড়ার জন্য তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করলে এর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলে বিরোধী তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একইভাবে আন্দোলন চলে হুগলি জেলার সিঙ্গুরে সেই ২০০৭ সালে। সেখানে ভারতের টাটা কোম্পানিকে সস্তায় একটি মোটরগাড়ি কারখানা গড়ার জন্য ৯৯৭ একর জমি অধিগ্রহণ করে তা তুলে দেওয়া হয় টাটার হাতে। মমতা দাবি তোলেন, ৪০০ একর জমির মালিক টাটাকে জমি দিতে রাজি নয়। মমতাও ঘোষণা দেন, ক্ষমতায় এলে তিনি অনিচ্ছুক কৃষকদের সেই ৪০০ একর জমি ফিরিয়ে দেবেন। কিন্তু ক্ষমতায় আসার আড়াই বছর কেটে গেলেও সেই জমি ফিরিয়ে দিতে পারেননি মমতা এখনো। চলছে সুপ্রিম কোর্টে মামলা।
এদিকে নন্দীগ্রামেও ২০০৭ সালে ২৫ হাজার একর জমি নিয়ে একটি বৃহৎ রসায়ন শিল্পাঞ্চল গড়ার জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকার উদ্যোগ নিলেও আপত্তি তোলেন মমতা। যদিও শেষ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ সরকার নন্দীগ্রামে কোনো জমি অধিগ্রহণ করেনি। তবু নন্দীগ্রামে জমি অধিগ্রহণ সিদ্ধান্তকে সামনে এনে নন্দীগ্রামে মমতা শুরু করেন আন্দোলন। এই নন্দীগ্রামে আন্দোলনের জেরে ২০০৭ সালের ১৪ মার্চ পুলিশের গুলিবর্ষণে ১৪ জনের মৃত্যু হয়।
এরপর এই ঘটনা কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই দিয়ে তদন্তের নির্দেশ দেন কলকাতা হাইকোর্ট। সিবিআই দীর্ঘদিন পর ওই ঘটনার চার্জশিট দেয় গত মাসে। সেই চার্জশিটে বলা হয়েছে, ১৪ মার্চ কোনো গোপন অপারেশন হয়নি। পুলিশ তিন মাস ধরে অবরুদ্ধ নন্দীগ্রামের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার জন্য নন্দীগ্রামে যায়। সেখানেই পুলিশ বাধাগ্রস্ত হয় মমতাদের গড়া নন্দীগ্রামের ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির সদস্যদের দ্বারা।
পুলিশ ওই এলাকায় ঢুকতে গেলে প্রতিরোধ কমিটির অন্তত পাঁচ হাজার সদস্য প্রথমে আক্রমণ করে পুলিশের ওপর। এরপর পুলিশ লাঠিপেটা, টিয়ারগ্যাস, রাবার বুলেট নিক্ষেপ করেও পরিস্থিতি আয়ত্তে আনতে না পেরে অগত্যা শূন্যে গুলি ছোড়ে। তাতেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে কর্মরত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে গুলিবর্ষণ করে পুলিশ। এতে আটজন গ্রামবাসী নিহত হয়। বাকিরা নিহত হন ধারালো অস্ত্রের আঘাতে। চার্জশিটে যাঁদের নাম উল্লেখ করা হয় তাঁদের অধিকাংশই তৃণমূলের নেতা-কর্মী ।
এই চার্জশিটের কথা প্রচারিত হওয়ার ফলে কার্যত রাজনৈতিকভাবে ধাক্কা খায় শাসক তৃণমূল কংগ্রেস। যদিও মমতা অভিযোগ করে আসছিলেন, ওই ঘটনায় বহু গ্রামবাসীর প্রাণহানি হয়েছিল পুলিশের গুলিতে। তাদের লাশ পাচার করা হয়েছিল নৌকায় করে। বহু গ্রামবাসী নিখোঁজ হয়েছিল। কিন্তু সিবিআই এই অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পায়নি। সিবিআই ওই দিনের ঘটনাকে কোনো গোপন অপারেশনের সঙ্গে তুলনা না করে বরং চার্জশিটে বলেছে, পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য বারবার মাইকে গ্রামবাসীকে শান্ত হওয়ার আহ্বান জানালেও তাতে গ্রামবাসী সাড়া দেয়নি। পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য আইনি ব্যবস্থা নিয়েছে পুলিশ।
এই চার্জশিটের কথা প্রচারিত হওয়ার পর চরম অস্বস্তিতে পড়েন মমতা এবং তাঁর দল তৃণমূল। আর বিরোধীদলীয় নেতা সূর্যকান্ত মিশ্র চার্জশিট প্রদানের সুবাদে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেই দিয়েছেন, নন্দীগ্রাম নিয়ে মিথ্যা প্রচার ও অপপ্রচার চালিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর দল তৃণমূল কংগ্রেস। সিবিআইয়ের চার্জশিটে তারই প্রমাণ ফুটে উঠেছে। ফলে এই চার্জশিট দেওয়ার ঘটনায় ভারতের লোকসভা নির্বচনের আগে এক রাজনৈতিক ধাক্কা খেলেন মমতা এবং তাঁর দল। আগামী এপ্রিল-মে মাসে ভারতের লোকসভা নির্বাচন হওয়ার কথা।
অমর সাহা: প্রথম আলোর কলকাতা প্রতিনিধি।

ভারতের নির্বাচন- কংগ্রেস, বিজেপি না তৃতীয় জোট? by এম সাখাওয়াত হোসেন

Saturday, February 15, 2014

প্রায় দুই সপ্তাহ ভারতের দক্ষিণের তিনটি রাজ্য অন্ধ্র প্রদেশ, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু এবং আমাদের পশ্চিম সীমান্তের রাজ্য পশ্চিম বাংলায় বেড়াতে গিয়েছিলাম। নিছক বেড়ানো হলেও চেষ্টা করেছিলাম ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনের হালহকিকত বুঝতে।
কারণ, ভারতের রাজনীতি এখন সরগরম, বিশেষ করে আসন্ন ১৬তম লোকসভার নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে। যদিও ভারতের রাজনৈতিক উত্তাপ এবং আসন্ন নির্বাচনের হাওয়া বড় বড় শহর ছাড়া তেমন উপলব্ধি করা যায় না, তথাপি ছোট শহরগুলোর দেয়াল আর লাইটপোস্টগুলোতে সাঁটানো এবং ঝুলন্ত পোস্টারগুলো মনে করিয়ে দেয় যে নির্বাচন আসন্ন। দক্ষিণের রাজ্যগুলোর সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজনীতি নিয়ে মাতামাতি একেবারেই নেই। এমনকি ভোটারদের মধ্যেও আগ্রহ কম। বিগত কয়েক দশকে ভারতের সাধারণ নির্বাচনে গড় ভোটের হার ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ। প্রধান কারণ, ভারতের সাধারণ ভোটারদের কাছে দুই বৃহৎ জোট আকর্ষণ হারিয়ে ফেলেছে।

অনেকেই মনে করেন, এ কারণেই দিল্লির মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে ‘আম আদমি পার্টির মতো স্বল্পপরিচিত দল রাজ্য সরকার গঠন করতে পেরেছে। ‘আম আদমি পার্টিও (এএপি) তাদের সাফল্যের বিস্তৃতি ঘটাতে তৎপর। অপরদিকে হঠাৎ গর্জে ওঠা এই পার্টির বিস্তার ঠেকাতে উভয় জোট নানা ধরনের কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে বলে এএপি অভিযোগ তুলছে। এপিপির অভিযোগে বলা হচ্ছে যে বিজেপি দিল্লি সরকারকে উৎখাত করতে প্রায় ২০ কোটি রুপি খরচ করছে। শুধু এএপিই নয়, তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতার নেতৃত্বে সম্ভাব্য তৃতীয় জোট গঠনের আগেই বিজেপি বিরোধিতায় নেমেছে। তৃতীয় জোট গঠনে দক্ষিণের আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় দল এআইএডিএমকে ঘিরে সম্ভাবনা গড়ে উঠছে কংগ্রেস এবং বিজেপি বিরোধী জোটের। এ জোটে হয়তোবা শামিল হতে পারে উত্তর প্রদেশের শাসক দল বহুজন সমাজ পার্টি। অপরদিকে পশ্চিম বাংলার তৃণমূল কংগ্রেসের দিকেও নজর রয়েছে সম্ভাব্য এই জোটের। তবে এই জোট নির্বাচন-পূর্ব, না পরবর্তী সময় গঠিত হবে, তা নিয়ে দক্ষিণের দলগুলোর মধ্যে প্রাথমিক আলোচনা চলছে বেশ কিছুদিন ধরে। যদিও বহুজন সমাজ পার্টি নেতা মুলায়ম সিং এবং তৃণমূল কংগ্রেস নেতা বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কোনো পক্ষেই প্রকাশ্যে কোনো বক্তব্য এখন পর্যন্ত দেননি। এই জোটের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হতে পারেন জয়ললিতা, সে ক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা মুলায়ম সিং যাদব কতখানি উৎসাহ দেখাবেন, তা দেখার বিষয়। এই জোট যদি নির্বাচন-পূর্ব সময় গড়ে ওঠে, তা দুই বৃহৎ জোটের বৃহৎ শরিক বিজেপি ও কংগ্রেসের জন্য কত বড় চ্যালেঞ্জ হবে, তা হয়তো মাস খানেকের মাথায় দৃশ্যমান হবে।

দুই
আসন্ন নির্বাচন আগামী মে মাসে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে বৃহৎ দলগুলো এপ্রিল মাসে নির্বাচন করার জন্য নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ করেছে। এ বিষয়ে ভারতের নির্বাচন কমিশন মতামত দেয়নি। অঙ্কের হিসাবে আগামী লোকসভা নির্বাচনের কাউন্টডাউন শুরু হয়েছে। ক্রমেই আগাম নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা বেশ কিছুদিন থেকে মাঠে গড়িয়েছে বিভিন্ন রাজ্য ও শহরগুলোতে দুই বড় দল তথা জোটের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থীদের বিশাল বিশাল জনসভার মাধ্যমে। এতে অগ্রগামী রয়েছেন বিজেপির নেতা গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং কংগ্রেসের রাহুল গান্ধী, যদিও রাহুল গান্ধী কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী কি না, তা নিয়ে খোদ কংগ্রেসের মধ্যেই সন্দেহ রয়েছে। অপরদিকে বিজেপির তথা জোটের প্রধানমন্ত্রী পদে নরেন্দ্র মোদির সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত। যতটুকু দৃশ্যমান তাতে মনে হয়, এযাবৎ বিজেপির পাল্লাই বেশ ভারী।
যদিও ১৯৯৪ সালে ভারতের গুজরাটের দাঙ্গায় নরেন্দ্র মোদি সরকারের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত। বিষয়টি নিয়ে কংগ্রেসের অভিযোগের ও প্রচারণার জবাবে পুনর্জীবিত হয় ইন্দিরা গান্ধীর হত্যার পর ১৯৮৪ সালে শিখ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সঙ্গে কংগ্রেসের সম্পৃক্ততার অভিযোগ। ১৯৮৪ সালে সবচেয়ে বড় দাঙ্গা হয় দিল্লির রাজনগরে। আগামী নির্বাচনে ওই দাঙ্গার বিষয়টি বেশ বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভারতের গুরুত্বপূর্ণ মিডিয়াতে এই দাঙ্গা নিয়ে নতুন করে শুরু হয়েছে ব্যাপক বিতর্ক। এ বিতর্ক কংগ্রেসকে ক্রমেই কোণঠাসা করছে। এই বিতর্কে যোগ দিয়েছে দিল্লির এএপি সরকার। ইতিমধ্যে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী এবং কেবিনেট ১৯৮৪ সালের দাঙ্গার ওপরে স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম (এসআইটি) গঠনের সিদ্ধান্ত দিল্লির লে. গভর্নরের কাছে সুপারিশ আকারে পাঠিয়েছে। লে. গভর্নরের অনুমোদনের পর প্রায় এক বছর লাগবে তদন্ত সমাপ্তির। বিষয়টি এএপি এবং কংগ্রেসের মধ্যে দূরত্বের প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিজেপি শুধু পালে হাওয়া দেওয়ার পর্যায়ে রয়েছে। প্রসঙ্গত দাঙ্গা ঘটার ৩০ বছর পার হলেও বিচার হয়নি।
শুধু ১৯৮৪ সালের দাঙ্গাই নয়, কংগ্রেসকে নিয়ে নতুন করে বিতর্ক হচ্ছে ১৯৮৪ সালের ৩ থেকে ৮ জুন অমৃতসরের স্বর্ণমন্দির অভিযান ‘অপারেশন ব্লুস্টার’-এ অত্যধিক শক্তি ব্যবহারে ব্যাপক প্রাণহানি এবং ওই সামরিক অভিযানে ব্রিটেনের সম্পৃক্ততা নিয়েও স্মরণযোগ্য যে, ওই অভিযানের জের হিসেবেই ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় শিখ দেহরক্ষীদের হাতে নিহত হন। ব্রিটেন অবশ্য সক্রিয় সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করে শুধু পরামর্শের কথা বলে জানিয়েছে যে ভারত ব্রিটেনের পরামর্শ গ্রহণ না করে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করেছিল। বিষয়টি নিয়ে আলাদাভাবে আলোচনার আশা রাখি। এসব বিতর্ক কংগ্রেসকে যথেষ্ট বেকায়দায় ফেলেছে। তার ওপরে রয়েছে বিগত ১০ বছরের দুর্নীতি আর অব্যবস্থার। বিজেপি এসব বিষয়কেই তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করছে বলে অনেকেই মনে করেন।

তিন
বিজেপি এবার বেশ চাঙা অবস্থাতেই রয়েছে বলে মনে হয়। এরই প্রেক্ষাপটে নরেন্দ্র মোদি ক্রমেই আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন। নরেন্দ্র মোদি এখন বিজেপির সম্মুখ সিপাহসালার, যে কারণে মোদি সারা ভারত চষে বেড়াচ্ছেন বিভিন্ন রাজ্যের সমর্থন আদায়ের প্রয়াসে। নজর রয়েছে উত্তর প্রদেশ এবং পশ্চিম বাংলার দিকে। বিজেপির টার্গেট ২৭২ আসন অথবা ততধিক যে অঙ্কটি এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় না, আগামী নির্বাচনে ভারতের কেন্দ্রে একক দল হিসেবে কোনো দল সরকার গঠনের মতো সমর্থন পাবে। সে কারণেই কংগ্রেস ও বিজেপিকে আঞ্চলিক দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভর করতে হবে। এ কারণেই বিজেপির টার্গেট অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে লোকসভার ৪৪ আসনের পশ্চিম বাংলার দিকে।
৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি নির্বাচনের আগাম প্রচারণা হিসেবে কলকাতায় এক বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন। বিভিন্ন মিডিয়া এবং তথ্য অনুযায়ী কলকাতার ব্রিগেড ময়দানে বিজেপির জনসভায় প্রায় ১ দশমিক ৫ লাখ (এক লাখ পঞ্চাশ হাজার) লোকের সমাগম ঘটে। ওই জনসভায় মোদি বামপন্থীদের ৩৪ বছরের শাসনের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, উন্নয়নধারাকে আরও জোরদার করতে হলে কেন্দ্রে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো বাংলা-দরদি লোকের প্রয়োজন। ওই সভায় মোদি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমালোচনা করেননি, যদিও এর আগে একই স্থানে অন্য এক জনসভায় মমতা মোদিকে ইশারা করে বলেছিলেন যে তিনি দিল্লিতে ‘দাঙ্গার মুখ’ দেখতে চাইবেন না। তথাপি মমতা মোদির ভাষণের প্রতিবাদ করেননি। মোদি তাঁর ভাষণে কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে পশ্চিম বাংলাকে অবহেলা করার অভিযোগ বারবার উত্থাপন করেন। এমনও অভিযোগ করেন যে বাংলার সবচেয়ে প্রবীণ রাজনীতিবিদকেও কংগ্রেস উপেক্ষা করেছে। তিনি বলেন যে ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর কংগ্রেসের বয়োজ্যেষ্ঠ নেতা হিসেবে বর্তমান রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্যতা থাকলেও ‘দাদা’কে ওই পদ না দিয়ে বাংলার প্রতি একধরনের অন্যায় করেছে। মোদি কেন্দ্রে সরকার গঠন করতে পারলে মমতাকে সব ধরনের সহায়তা প্রদান করে বাংলার চেহারা পাল্টানোর অঙ্গীকার ওই সভায় একাধিকবার করেছেন। এত তুষ্টির পরও তৃণমূল অথবা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।
অপরদিকে বিগত বাম সরকারের কঠোর সমালোচনা করাতে সিপিএম সহজে মোদিকে গ্রহণ করছে না। সিপিএমের মতে, মোদি-মমতার কোনো ধরনের সমঝোতা হলে তাতে মমতার ক্ষতিই হবে। কারণ পশ্চিম বাংলায় প্রায় ২৪ শতাংশ ভোট রয়েছে সংখ্যালঘু মুসলিমদের। মোদির ‘দাঙ্গা মুখ’ ওই ভোটারদের মমতাবিমুখ করতে পারে। সে ক্ষেত্রে সিপিএম মমতার বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার ধুয়া উঠতে পারে। অবশ্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে দিল্লির সমীকরণে এক বড় ফ্যাক্টর, তা সব জোট বা ভারতের বড় দলগুলোর ধর্তব্যের মধ্যে রয়েছে। বাংলায় মোদির গ্রহণযোগ্যতা এবং মমতা-মোদি নির্বাচন-পূর্ব বা পরবর্তী সমীকরণ কেন্দ্রে বিজেপি সরকার গঠনের জন্য এক বড় ফ্যাক্টর হয়ে থাকবে। আর যদি তৃতীয় জোট গঠিত হয় সেখানেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হয়ে উঠবেন অপরিহার্য। যেভাবেই হোক, পশ্চিম বাংলার তৃণমূল কংগ্রেস এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আগামী সরকার গঠনে বড় ফ্যাক্টর। তাই, মমতা রয়েছেন ফুরফুরে মেজাজে।

চার
ভারতের আসন্ন লোকসভার নির্বাচন যে কংগ্রেস ও বিজেপির কাছে কত গুরুত্বপূর্ণ, তার আলামত বিভিন্নভাবে প্রতীয়মান। তবে ওই নির্বাচনে কংগ্রেসের তথা শাসক জোটের অবস্থা যে তেমন ভালো নয়, তা বেশ দৃশ্যমান। এককভাবে না হলেও বিজেপি জোটবদ্ধভাবে ভারতের পরবর্তী শাসক জোট হতে যাচ্ছে, তেমনটাই প্রতীয়মান। নরেন্দ্র মোদিই যে ভারতের ভাবী প্রধানমন্ত্রী, তা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেন না অনেকেই। মোদি তাই তাঁর অতীত ছবি পরিবর্তনে সংখ্যালঘুদের ভোট অর্জনের সব চেষ্টা করেছেন। ব্রিগেড ময়দানের ভাষণে মোদি তথাকথিত অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের ভারত থেকে বিতাড়িত করবেন বলে যে মন্তব্য করেছেন, তা অবশ্যই আমাদের জন্য চিন্তার বিষয়।
মোদির এ দাবি বাস্তবায়ন করতে হলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থানে যে পরিবর্তন হবে, তাতে সন্দেহ নেই।
শুধু এ কারণেই নয়, বহুবিধ কারণে বাংলাদেশের কাছে ভারতের আগামী নির্বাচন যথেষ্ট তাৎপর্য বহন করে।

এম সাখাওয়াত হোসেন (অব.): অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক।
hhintlbd@yahoo.com

দক্ষিণ এশিয়া- কবে নাগরিকদের জন্য উন্মুক্ত হবে? by মহিউদ্দিন আহমদ

Tuesday, February 11, 2014

ফেব্রুয়ারির পয়লা সপ্তাহে নেপালের কারভে জেলার পাহাড়ের ঢালে একটা পান্থনিবাসে দক্ষিণ এশিয়ার নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের একটা সভা অনুষ্ঠিত হলো।
এঁরা সবাই ‘দক্ষিণ এশিয়ার দারিদ্র্য বিমোচন জোট’-এর সদস্য। এ অঞ্চলে এ ধরনের অনেক সংগঠন বা নেটওয়ার্ক আছে। প্রত্যেকেই তাদের নিজস্ব ম্যান্ডেট নিয়ে কাজ করে। উল্লিখিত জোটটির মূল লক্ষ্য হলো দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য অনুকূল রাজনীতির প্লাটফর্ম তৈরিতে সাহায্য করা। এর সদস্যরা এসেছেন সমাজের বিভিন্ন স্রোতোধারা থেকে। তবে যে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এঁরা ১২ বছর ধরে এ জোটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আছেন তার মূল প্রতিপাদ্য হলো উগ্র জাতীয়তাবাদ ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকা, সমাজের অবহেলিত অংশের প্রতি দায়িত্ববোধ ও তাদের সহযাত্রী হওয়া এবং নয়া উদারবাদী অর্থনীতির বিরুদ্ধে এককাট্টা হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলা।

এবারের আলোচনায় যা প্রাধান্য পেয়েছে তা হলো আফগানিস্তানে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ, পাকিস্তানে ধর্মীয় উগ্রবাদ, মালদ্বীপে বিবদমান দুই গোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, যা কিনা দুই আঞ্চলিক পরাশক্তির পারস্পরিক লড়াইয়ের একটা নতুন ক্ষেত্র, শ্রীলঙ্কায় উগ্র সিংহলি জাতীয়তাবাদ, নেপালে ক্ষমতার লড়াই এবং সংবিধান প্রণয়নে অনিশ্চয়তা, ভুটানে রাজকীয় গণতন্ত্রের আড়ালে নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘুদের দেশছাড়া করা, ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদের পুনরুত্থান এবং বাংলাদেশে ভোটারবিহীন নির্বাচন। এ ধরনের সভায় ‘দেশপ্রেমিক’ হয়ে নিজেদের ‘কালো’ বিষয়গুলো ‘সাদা’ করে দেখানোর কোনো সুযোগ নেই। সেই সুযোগটা থাকে সাধারণত আমলা ও রাজনীতিকদের মধ্যে। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা এখানে নিজেদের বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। এখানে সবাই দক্ষিণ এশীয়। তাই ধর্মীয় ও আঞ্চলিক উগ্রবাদের মোড়কে একজন ইমরান খান কিংবা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অথবা উগ্র জাতীয়তাবাদের মোড়কে একজন রাজাপক্ষে কিংবা খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ব্যবচ্ছেদ হয় আধুনিক বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। নেপালে একটা টেকসই সংবিধান তৈরির ব্যাপারে টালবাহানা থেকে একজন নেপালির সঙ্গে সঙ্গে একজন আফগান বা একজন বাঙালিও মনে কষ্ট পান। আবার ‘আম আদমি পার্টি’র আপাত সাফল্য দেখে এবং একজন অখ্যাত অরবিন্দ কেজরিওয়াল প্রথাগত রাজনীতিতে সামন্ত নেতাদের যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন, তাতে সবাই আনন্দিত হন এবং একই সঙ্গে হন আশাবাদী।
নাগরিক সমাজের এ ধরনের সভা ও আলোচনার সঙ্গে যাঁরা পরিচিত নন, তাঁদের পক্ষে কল্পনা করাও কঠিন যে মুক্তমনের আধুনিক ও সংস্কৃতিমান মানুষ এ অঞ্চলের দেশগুলোতে আছেন অনেক। তাঁরা নিজেদের নিছক পাকিস্তানি, বাংলাদেশি কিংবা ভারতীয় অথবা হিন্দু, মুসলমান কিংবা বৌদ্ধ হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করেন না। একজন ব্যক্তির বহুমাত্রিক পরিচয় থাকতে পারে। তিনি একই সঙ্গে একজন বাঙালি কিংবা তামিল, অথবা হিন্দু কিংবা মুসলমান, অথবা দলিত কিংবা ভূস্বামী, অথবা নারী কিংবা পুরুষ। সব ছাপিয়ে তিনি একজন মানুষ। আর মানুষে মানুষে ভেদরেখা টানা অন্যায় ও অনৈতিক।
দুঃখজনক হলেও এটা সত্য যে এ অঞ্চলে এ ধরনের ‘আইডেন্টিটি পলিটিকস’ চলে আসছে দশকের পর দশক। এখানে সামন্ত প্রভুরা গণতন্ত্রের উর্দি পরে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য কিংবা ক্ষমতায় চিরস্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার জন্য মানুষকে বিভক্ত করেন, তাঁদের নিয়ে দলাদলি করেন, বিভিন্ন নামের তন্ত্রমন্ত্র দিয়ে মানুষকে উত্তেজিত করেন এবং অবশেষে তাদের ব্যালট পেপারটি নিজের আঁচলে কিংবা পকেটে পুরে জনগণের কাঁধে সিন্দবাদের দৈত্যের মতো চেপে বসেন। এই একই গল্প টেকনাফ থেকে হিরাটে, লাদাখ থেকে মালে পর্যন্ত।
কয়েক দশক ধরে আমরা একটা কথা শুনে আসছি: ‘ট্রান্স-বর্ডার ডেমোক্রেসি’। মোদ্দা কথা হচ্ছে, গণতন্ত্র এমন একটা চলমান প্রক্রিয়া, যা সীমানা মানে না। অথবা বিষয়টা এমন করে ব্যাখ্যা করা যায়: একটা নির্দিষ্ট সীমারেখার মধ্যে গণতন্ত্র পুরোপুরি বিকশিত হয় না, তা ডালপালা মেলে বড় হতে পারে না। এখানে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক শর্তগুলো পরস্পরের ওপর অভিঘাত ফেলে। একটি দেশে যদি গণতন্ত্রের বিকাশ হতে থাকে, তা তার পাশের দেশের অবিকশিত গণতন্ত্রকে নানাভাবে সাহায্য করতে পারে। এ আন্তসীমান্ত গণতন্ত্রায়ণ আমরা ইদানীং লক্ষ করছি লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে। এতে নাগরিক সমাজের অবদান অনেক।
এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে ২০০১ সাল থেকে বিশ্ব সামাজিক সম্মেলন বা ‘ওয়ার্ল্ড সোশ্যাল ফোরাম’ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। প্রথম তিন বছর এটা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ব্রাজিলের বন্দরনগর পোর্তো এলেগ্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে। এটা হলো নাগরিক সমাজের বৈশ্বিক সম্মেলন। পরপর দুই বছরের সম্মেলনের পরে দেখা গেল লাতিন আমেরিকাজুড়ে নাগরিক আন্দোলনের উল্লম্ফন। এর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হলো ব্রাজিলের রাজনীতিতে। প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হলেন ট্রেড ইউনিয়ন নেতা লুলা ডি সিলভা। সেই থেকে শুরু। একে একে কলম্বিয়া, ভেনেজুয়েলা, পেরু ও আর্জেন্টিনায় নির্বাচিত হলো জনগণের সরকার। নতুন সরকারগুলো জানিয়ে দিল, ‘বানানা রিপাবলিকের’ দিন শেষ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তর্জনী দেখে কেউ আর আগের মতো ভয়ে গুটিসুটি হয়ে যায় না।
দক্ষিণ এশিয়ার অবস্থা একটু আলাদা। দীর্ঘদিন উপনিবেশ থাকার কারণে এখানে ‘জাতীয়তাবাদ’ বেশ চড়া মেজাজের। নানাভাবে এ জাতীয়তাবাদের চারাগাছে জল ছিটানো হয়েছে। এর অনুষঙ্গ হিসেবে মনের মধ্যে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছে বায়বীয় দেশপ্রেম, যা সীমান্তের অপর দিকের মানুষকে শত্রু হিসেবে ঘৃণা করতে শেখায়। এসব দেশে সুস্থ ও বিবেকবান মানুষের অভাব নেই। তাঁদের একদিকে নিজ নিজ দেশের সরকারের ও সামন্ত রাজনীতিকদের কাছে শুনতে হয় তাঁরা নাকি বিদেশি এজেন্ট! অন্যদিকে তাঁদের নিজেদের মধ্যে রয়েছে যোগাযোগের অভাব। বর্তমান রাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং রাষ্ট্র আরোপিত নানা রকম প্রতিবন্ধকতা ডিঙিয়ে পরস্পরের সঙ্গে বিবেক ও মননের লেনদেন করা সহজ নয়। সেই কাজটি করা খুবই জরুরি।
নেপালের পরিবেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলো থেকে একটু আলাদা। এটাই এই অঞ্চলের একমাত্র দেশ, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার যেকোনো দেশের নাগরিক আগাম ভিসা না নিয়ে প্রবেশাধিকার পান। তাই নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা তাঁদের আঞ্চলিক সভাগুলো করার জন্য এই দেশটিকেই বেছে নেন। হিমালয়ের গৌরীশঙ্কর পর্বতচূড়ার পাদদেশে দক্ষিণ এশীয় দারিদ্র্য বিমোচন জোটের সভায় বসে অংশগ্রহণকারীরা এটাই ভাবছিলেন, কবে পুরো অঞ্চলটি তাঁদের নাগরিকদের জন্য উন্মুক্ত হবে? কাঁটাতার আর বর্ডার গার্ড দিয়ে মানুষকে আর কত দিন অবরুদ্ধ করে রাখা হবে?
মহিউদ্দিন আহমদ: লেখক ও গবেষক।

দিল্লির চিঠি- ভারতের দৃষ্টিতে সরকারের এক মাস by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

Friday, February 7, 2014

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশে যে তুলকালাম হয়ে গেল, দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সম্ভবত তা নজিরবিহীন। প্রায় একতরফা নির্বাচন ঠেকাতে বিরোধীদের যাবতীয় কৌশল ব্যর্থ হওয়ার পর দেশের বিরোধী রাজনীতি এ মুহূর্তে একটু থমকে গেছে।
গত কয়েক মাসের তুমুল আন্দোলন ও আন্দোলনের নামে জোটবদ্ধ সহিংসতা শেষে এ মুহূর্তের বাংলাদেশ আপাতত হাঁপাতে হাঁপাতে জিরিয়ে নিচ্ছে।

নির্বাচনের পর একটা মাস দেখতে দেখতে কেটে গেল। এই এক মাসে নির্বাচন নিয়ে দেশ ও বিদেশে কম হইচই হলো না। ভোট সাঙ্গ হওয়ার পরপরই ভারতের প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশ সরকারকে আশ্বস্ত করল। ভারত এ নির্বাচনকে ‘সাংবিধানিক ও বৈধ’ বলার পাশাপাশি স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেয়, হিংসা কখনো নির্ণায়ক হতে পারে না। সব রাজনৈতিক দল বা অধিকাংশের যোগদানের মধ্য দিয়ে দ্রুত আরেকটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের যে দাবি পশ্চিমা দুনিয়া থেকে উঠেছে, ভারত তেমন কোনো অভিপ্রায় প্রকাশ করেনি। শুধু বলেছে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে তার মতো করে চলতে দেওয়া দরকার এবং বাংলাদেশের জনগণই সে দেশের নির্ণায়ক ভূমিকায় থাকবেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আশ্বস্ত করে ভারতের মতোই তাঁর সরকারের পাশে সমর্থন উজাড় করে একে একে দাঁড়িয়ে পড়ল রাশিয়া ও চীন। দক্ষিণ এশিয়ায় যে তিন বৃহৎ শক্তির প্রভাব ও স্বার্থ অন্য সবার চেয়ে বেশি, সেই তিন শক্তির সমর্থন সদ্য নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে স্বস্তিই শুধু এনে দেয়নি, তাঁর বিরুদ্ধ-শক্তিদেরও বেশ কিছুটা হতোদ্যম করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘ আরেকটা নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে ঠিকই, কিন্তু শেষ বিচারে তারাও কিন্তু লাগামছাড়া সহিংসতাকে সমর্থন করতে পারেনি। তাদের দাবি বিরোধীদের ভেঙে যাওয়া মনোবল বাড়াতেও বেশ ব্যর্থ। নির্বাচন ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়া যদি বিরোধীদের প্রথম হার হয়ে থাকে, দ্বিতীয় হোঁচট তাহলে কূটনৈতিক লড়াইয়ে। সব মিলিয়ে দুই রাউন্ড লড়াই শেষে শাসকগোষ্ঠী বিরোধীদের চেয়ে দুই কদম এগিয়ে গেছে।
সাধারণ নির্বাচনের রেশ থাকতে থাকতেই বেজে উঠেছে দেশের উপজেলা নির্বাচনের প্রথম পর্বের দামামা। এই নির্বাচনের দিকে অতীব আগ্রহে তাকিয়ে রয়েছে ভারত। কারণ, ভারত মনে করছে, বাংলাদেশের আগামী দিনের রাজনীতির গতি কোন খাতে বইবে, কয়েক দফার এই নির্বাচন তা ঠিক করে দিতে পারে। ভারতের যাঁরা বাংলাদেশের রাজনীতিকে গভীরভাবে নিরীক্ষণ করেন, যাঁরা নীতি নির্ধারণে সহায়ক হন, তাঁদের ধারণাও এমন যে, ভোট বর্জন করে বিএনপি নিজেদেরই বিপদের মধ্যে ফেলে দিয়েছে এবং ভবিষ্যতের সমস্যাও সৃষ্টি করেছে। বিএনপি অতিমাত্রায় পশ্চিমা দুনিয়ার ওপর ভরসা করেছিল। ভেবেছিল, তারা বাংলাদেশ সরকারকে বাধ্য করাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে ভোটে যেতে। এ অন্ধ নির্ভরতা তাদের পক্ষে যে সহায়ক হয়নি, নির্বাচন কেটে যাওয়ার পর এখন তা বোধগম্য হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নবনির্বাচিত সরকারের কূটনৈতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্তি ঠেকানো যায়নি। আরও একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবি তোলা সত্ত্বেও পশ্চিমা দুনিয়া এ কথা জানিয়ে দেয় যে তারা এই সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে। দ্রুত নির্বাচনের দাবিও ক্রমে আবছা হয়ে আসছে। ফলে দল রাখতে শেষ পর্যন্ত উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত একরকম বাধ্য হয়েই বিএনপিকে নিতে হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তই কিন্তু বুঝিয়ে দিচ্ছে, বিরোধীদের ভোট বর্জনের আগের সিদ্ধান্তটি কত বড় ভুল ছিল। কারণ, এক মাস আগের পরিস্থিতির সঙ্গে আজকের অবস্থার মৌলিক কোনো পরিবর্তন কিন্তু ঘটেনি। এক মাস আগে নবম সংসদের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শেখ হাসিনা, দশম সংসদের প্রধানমন্ত্রীও তিনি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি হাসিনা মানেননি, সংশোধিত সংবিধান অনুযায়ী তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বেই ভোট হয়েছিল, এবারও উপজেলা নির্বাচন হবে তাঁরই শাসনামলে। বিএনপি যে যুক্তিতে সাধারণ নির্বাচন বর্জন করেছিল, অবস্থা অপরিবর্তিত থাকায় সেই একই যুক্তিতে উপজেলার ভোটও তাদের বর্জন করা উচিত। কিন্তু তা না করায় প্রশ্ন উঠতেই পারে, বিএনপির কোন অবস্থানটা ঠিক আর কোনটা ভুল। আগেরটা ঠিক হলে এবারেরটা ভুল, নয়তো আগেরটা ভুল হলে এবারেরটা ঠিক।
দ্বিতীয় প্রশ্নটিও এরই পিঠাপিঠি এসে পড়ছে। উপজেলা নির্বাচন শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও অবাধ হলে সরকার বা নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতিত্বের আশঙ্কা বা অভিযোগ আর ধোপে টিকবে না। সে ক্ষেত্রে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে দ্রুত আরও একটি নির্বাচনের দাবির যৌক্তিকতাও ফিকে হয়ে যাবে। ওই দাবিতে আন্দোলন অযৌক্তিক হয়ে পড়বে।
উপজেলার ভোট শান্তিপূর্ণ হলে একরকম, না হলে অন্য রকম। বাংলাদেশের রাজনীতির পরবর্তী প্রবাহ অনেকটাই নির্ভর করছে ভোট কেমন হয় তার ওপর। ভারতের নজরও সেদিকে। ভোট-পরবর্তী এই এক মাসে ভারতের নজরে বেশ কয়েকটি বিষয় এসেছে। যেমন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের মধ্য দিয়ে পূর্বতন সরকারের ওপর সাধারণ মানুষের ক্ষোভে প্রলেপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। দুর্নীতিগ্রস্তদের বেশির ভাগকে বাদ দিয়ে স্বচ্ছ ভাবমূর্তির মানুষদের তিনি দায়িত্বে এনেছেন। সবচেয়ে বড় কথা, বিরোধীদের হতোদ্যম করে কথায় কথায় হরতালের ডাক দেওয়ার মারাত্মক প্রবণতা বন্ধ করেছেন। এতে সাধারণ মানুষ হাঁফ ছেড়ে বাঁচছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিকে নজর দেওয়ায় রাজনৈতিক-অসামাজিক অপকর্মের হার কমছে।
ভারত খুব আগ্রহের সঙ্গে নজর রাখছে বিএনপি-জামায়াত সম্পর্কের গতি-প্রকৃতির ওপর। জামায়াতের সহিংসতা বন্ধে সরকারের কঠোর মনোভাব কত দিন বজায় থাকে এবং বিএনপিও কত দিন তাদের আগের মতো গুরুত্ব দেয়, তার ওপরও দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি অনেকখানি নির্ভর করবে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার-প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়া ও তাদের শাস্তিদান নতুন সরকারের অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকার থেকে সরকারকে সরাতে চাপ সৃষ্টির শেষ নেই। পাকিস্তান ইতিমধ্যেই নানাভাবে চাপ দিতে শুরু করেছে। ভারতও তার মতো করে সচেষ্ট। জামায়াতকে কোনো রকম রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসর হাসিনা সরকার দিক, এটা ভারতের কাম্য নয়। জামায়াত দমনে হাসিনা সরকারের পাশে থাকার বিষয়ে ভারতের বিন্দুমাত্র দোলাচল নেই। জামায়াত দমন কর্মসূচি ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার-প্রক্রিয়া চালু রাখা সত্ত্বেও ইসলামি দেশগুলোর সংগঠন অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কান্ট্রিজ (ওআইসি) শেখ হাসিনার সরকারকে অভিনন্দন জানিয়েছে। ভারত মনে করছে, নতুন সরকারের এটাও একটা বড় কূটনৈতিক সাফল্য।
গণতন্ত্রে মানুষের আস্থা অর্জনই প্রথম ও শেষ কথা। সেই আস্থা অর্জনের প্রথম ধাপ হলো বিশ্বাসযোগ্য ও ভরসাযোগ্য একটা সরকার গঠন। হাসিনা একেবারে প্রাথমিক এ কাজে সফল বলে ভারত মনে করছে। তাঁর দ্বিতীয় কাজ হওয়া উচিত আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি। ভোটে জেতার পর হাসিনা দেশের সংখ্যালঘুদের স্বার্থরক্ষায় যেভাবে তৎপর হয়েছেন ও এ প্রবণতা বন্ধে যে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বার্তা দিয়েছেন, ভারত তাতে খুশি। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশিই চলে আসে সুপ্রশাসনের প্রশ্ন। এই সুপ্রশাসন নিশ্চিত করতে গিয়ে তাঁকে ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলকেও শাসন করতে হবে। ভারত মনে করে, যে যে বিষয়ে হাসিনাকে প্রশ্নবিদ্ধ হতে হয়েছে, সেগুলোর অন্যতম হলো এত দিন নিজের দলের বিভিন্ন সংগঠনে লাগাম না টানা। দীর্ঘ মেয়াদে মানুষের মন জেতার জন্য এই দিকে তাঁর নজর দেওয়া আবশ্যিক। মন্ত্রিসভায় যা করেছেন, সংগঠনেও তা করা প্রয়োজন।
প্রশাসনিক এসব অবশ্য কর্তব্যের মধ্য দিয়েই প্রধানমন্ত্রীকে উজ্জ্বল করে তুলতে হবে দেশের অর্থনীতির চালচিত্রটা। দেশের স্বাধীন ‘থিঙ্ক ট্যাঙ্ক’ সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের হিসাব অনুযায়ী লাগাতার রাজনৈতিক অসন্তোষের দরুন গত বছরে আনুমানিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। বিদেশ থেকে টাকা পাঠানোর পরিমাণও নানা কারণে কমে গেছে। বিদেশে কর্মসংস্থানের সংখ্যাও কমেছে। লাগাতার আন্দোলনের ডাক, আন্দোলনের নামে সহিংসতা, মানুষ খুন, হরতাল, সম্পত্তি নষ্ট দেশের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হারে কোপ মেরেছে। প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কমে ৫ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়াবে বলে অনুমান। হাসিনাকে এই দক্ষিণমুখী প্রবাহকে রুখে উত্তরমুখী করে তুলতে হবে। কাজটা কঠিন কিন্তু অসম্ভব নয় বলেই ভারত মনে করে। নির্বাচনের পর গত এক মাসে দেশ আবার স্বাভাবিক হওয়ার দিকে অনেকখানি এগিয়েছে। এই গতি অব্যাহত রাখাই হাসিনার প্রথম ও প্রধান কাজ হওয়া উচিত বলে ভারত মনে করছে।
তাহলে বেশির ভাগ দলের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে দেশের সংসদের পরবর্তী নির্বাচনের পশ্চিমা ও প্রধান বিরোধী দলের সম্মিলিত দাবি কত দ্রুত পূরণ হতে পারে? সরকারের প্রথম মাসপূর্তির প্রাক্কালে ভারত মনে করে, একমাত্র বাংলাদেশের মানুষই তা ঠিক করবেন।

সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়: প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি।

ভারত- রাষ্ট্রপতি মুখার্জিকে ভাবতে হবে by কুলদীপ নায়ার

Tuesday, February 4, 2014

প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের পরে প্রণব মুখার্জিরই তাঁর উত্তরাধিকারী হওয়ার কথা। মূলত এ কারণেই ব্যাপক যোগাযোগ থাকা সত্ত্বেও তাঁকে ঠেলে ওপরে পাঠানো হয়।
সোনিয়া গান্ধী তাঁর সন্তান রাহুল গান্ধীকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বানাতে বদ্ধপরিকর। রাহুল গান্ধীই ছিলেন প্রণব মুখার্জির রাজনৈতিক অভিলাষের পথের বাধা।

রাষ্ট্রপতি পদ গ্রহণ করা না-করার সিদ্ধান্ত প্রণব মুখার্জির ওপরই নির্ভর করে। কিন্তু যেই তিনি ঘোষণা করলেন যে ২০১৪ সালের নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হচ্ছেন না, সেই পরিষ্কার হয়ে গেল, সাজঘরে অপেক্ষা করতে করতে তিনি ক্লান্ত হয়ে গেছেন। সোনিয়া গান্ধীও সঙ্গে সঙ্গে এই ঘোষণা মেনে নিলেন, প্রণব তো রাহুলের জন্যই পথ ছেড়ে দিলেন। প্রণব মুখার্জি কংগ্রেসের খারাপ সময়ে যেভাবে উদ্ধারকর্মীর ভূমিকায় নেমেছিলেন, তাতে তাঁর ধারণা হয়েছিল নেহরুর রাজবংশকে তিনি যেমন নিরবচ্ছিন্নভাবে সেবা দিয়েছেন, তাতে তাঁকে কখনো উপেক্ষা করা হবে না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, প্রণব নিজেকে রাষ্ট্রপতির পদের জন্য তৈরি করেননি। রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি যা বলতে পারেন, রাষ্ট্রপতি হিসেবে তেমন মন্তব্য করা থেকে নিজেকে বিরত রাখা উচিত ছিল তাঁর।
কিন্তু কেজরিওয়াল তাঁর আইনমন্ত্রীর পক্ষ নিয়ে যা করলেন তাতে বাজে নজির তৈরি হলো। তাঁর উচিত ছিল, দুই পুলিশের ‘ঔদ্ধত্যের’ প্রতিকারের দায়িত্ব রাজ্যের মুখ্য সচিবকেই দেওয়া। তাঁর যুক্তি হলো, তিনি তো সংবিধান লঙ্ঘন করেননি। এটা এক অদ্ভুত যুক্তি, কেননা তিনি সেই সংবিধানের ভাষা ও চেতনার কথা বলছেন, যা সব ক্ষমতা দিয়েছে নির্বাহী বিভাগকে আর মুখ্যমন্ত্রীকে বানিয়ে রেখেছে নামমাত্র সরকারপ্রধান।
মুখ্যমন্ত্রীর এই ধরনা অসাংবিধানিক নয় এমনতর যুক্তি ধোপে টিকবে না। তিনি উপলব্ধি করতে পারেননি, যে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ভেতরে তাঁর দুর্গ, তারা মুখ্যমন্ত্রীর তরফে ধরনা জাতীয় কর্মসূচি চায় না, তারা চায় নিয়মতান্ত্রিক প্রশাসন। কিন্তু কেন রাজনৈতিক বিষয়ে প্রণব মুখার্জি মন্তব্য করলেন, তা আমার কাছে বোধগম্য নয়। রাষ্ট্রপতি হওয়ার প্রথম দিন থেকেই তিনি রাজনীতি মেশানো বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। দেশের সামনে উপস্থিত হওয়া সমস্যাগুলো নিয়ে তিনি এমনভাবে মন্তব্য করে যাচ্ছেন, যেন তিনি দেশ চালানোর সভার সভাপতি। প্রজাতন্ত্র দিবসের বক্তৃতায় তিনি আগের সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছেন এবং অনেকের মুখ থেকে বের করেছেন রাগত প্রতিক্রিয়া। কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়াসহ (সিপিআই) কয়েকটি রাজনৈতিক দল তাঁর ওই বক্তব্যকে রাজনৈতিক বলে চিহ্নিত করেছে।
রাষ্ট্রপতি মুখার্জি যা বলেছেন তা সাধারণভাবে সঠিক। যেমন, জনপ্রিয় প্রতিবাদ কখনো দেশ পরিচালনকার্যের বিকল্প নয় কিংবা বলেছেন, লোকচক্ষুর সামনে হাজির করা ভাবমূর্তির মধ্যে অনেক শঠতা থাকে। কিন্তু তিনি ভুলে গেছেন যে তিনি নিছকই সাংবিধানিক প্রধান। নির্বাচিত সংসদ এবং রাষ্ট্রের আইনসভা রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তির কাছ থেকে অন্য এ রকম মন্তব্য কেউ আশা করে না।
রাষ্ট্রপতি মুখার্জি সাধারণভাবে যা বলেছেন তা যে সঠিক, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। রাজনীতিকে তিনি পরিচিত বিচরণভূমি ভেবেছিলেন, কিন্তু রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে তিনি সেই ভূমি ছেড়ে দিলেন। সোনিয়া গান্ধীর দ্বারা তাঁর বঞ্চনা হয়তো নিখাদ।
‘সরকার দাতব্য দোকান নয়’ বলেছেন রাষ্ট্রপতি মুখার্জি। নির্বাচনের আগে জনসমর্থন কাড়ার জন্য সরকারের নানা রকম প্রতিশ্রুতির সমালোচনা করে তিনি এটা বলেন। সব রাজনৈতিক দলই এটা করে। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী যখন ‘গরিবি হটাও’ স্লোগান তুলেছিলেন, সেই মন্ত্রিসভায়ও মুখার্জি ছিলেন। ডিএমকে পার্টির সমর্থন ধরে রাখতে মনমোহন সিং সরকার তাদের বেশ কিছু সুবিধা দিয়েছিল।
সবাই জানে, কীভাবে মুলায়ম সিং যাদবের দলের সমর্থন পেতে তাঁর বিরুদ্ধে করা সিবিআইয়ের মামলাটি তুলে নেওয়া হয়েছিল। অনাস্থা ভোটে মনমোহন সিং সরকারের পতন ঠেকাতে যে ‘দেওয়া-নেওয়া’ হয়েছিল, মুখার্জিও তার অংশ ছিলেন। মুখার্জি যদি এসবের এতই বিরুদ্ধে, যা তাঁর এখনকার
মন্তব্য থেকে মনে হচ্ছে, তাহলে কেন তিনি মুখ খুললেন না? তাঁর বিরোধিতা নিশ্চয়ই গণ্য হতো, কারণ তিনি জ্যেষ্ঠ নেতা।
যে সময় মিসেস গান্ধী পাঞ্জাব বিষয়ে রাষ্ট্রপতি জ্ঞানী জৈল সিংয়ের সঙ্গে মতবিরোধের জেরে তাঁর কাছে সরকারি কাগজপত্র পাঠানো বন্ধ করলেন, সে সময়ও মুখার্জি মন্ত্রী ছিলেন। মিসেস গান্ধী সরাসরি সংবিধান লঙ্ঘন করেছিলেন। পারতেন মুখার্জি সে সময় প্রতিবাদ করতে! রাষ্ট্রপতির দপ্তর এমন এক প্রতিষ্ঠান, যাকে হেয় করা উচিত নয়। তার পরও রাজনীতিবিদেরা তা করে থাকেন। মুখার্জিও যদি সেটা করেন, তাহলে সেটা হবে তাঁর মতো বিচক্ষণ মানুষের জন্য দুঃখজনক উদাহরণ।
মুখার্জির নীরবতার আরেকটি বড় উদাহরণ হলো, ১৯৭৫ সালে ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থা জারির ঘটনা। তিনি সে সময় তাঁর বাবা জওহরলাল নেহরুর তৈরি করা সংবিধানের ওপর মারাত্মক আঘাত হেনেছিলেন। মুখার্জি সে সময় ইন্দিরাপুত্র সঞ্জয় গান্ধীর অসাংবিধানিক ক্ষমতাকেন্দ্রের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। সেই জরুরি অবস্থার সবচেয়ে ন্যক্কারজনক ফল হলো, রাজনীতি থেকে নৈতিকতার বিদায় নেওয়া। সেটা এমন এক ভয়ের সময়, যখন রাষ্ট্রপতি ফকরুদ্দিন আলি আহমেদ মন্ত্রিসভায় পাস হওয়ার আগেই সরকারি ঘোষণায় সই করে ফেলতেন।
আমার অভিজ্ঞতা হলো, প্রধানমন্ত্রীরা রাষ্ট্রপতির কথায় কমই মনোযোগ দেন। যাঁরা রাষ্ট্রপতিশাসিত পদ্ধতির জায়গায় সংসদীয় পদ্ধতিকে পছন্দ করেছিলেন, সংবিধানের সেই কাঠামোকারেরা ঠিক করে দিয়েছেন যে রাষ্ট্রপতি কী করতে পারেন। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে কংগ্রেস রাষ্ট্রপতির পদকে অবান্তর করে দিয়েছে।
ঠিক-বেঠিক, নৈতিক-অনৈতিকের মধ্যে একটা সূক্ষ্ম পার্থক্যরেখা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব হলো সেই রেখাটা বজায় রাখা। বক্তৃতামঞ্চ থেকে বলা সহজ যে দেশের জন্য কোনটা বিপজ্জনক আর কোনটা তা নয়। রাষ্ট্রপতি মুখার্জি যতই সঠিক হয়ে থাকুন না কেন, তাঁর উচিত ফিরে দেখা যে মন্ত্রী থাকাকালে যা যা করেছেন তার কতটা সঠিক ছিল। কেবল আইনি বিচারেই নয়, নৈতিক বিচারেও। বল এখন তাঁর কোর্টে।

ইংরেজি থেকে অনূদিত
কুলদীপ নায়ার: ভারতীয় সাংবাদিক।

‘তালেবানদের হয়ে অজুহাত দেয়া বন্ধ করুন’- বিলাওয়াল ভূট্টো জারদারি

তালেবানদের সহিংস কর্মকান্ডের জন্য অজুহাত দেয়া বন্ধ করতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিলাওয়াল ভূট্টো জারদারি।
প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ এবং পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ এর প্রধান ইমরান খানের সমালোচনা করে তিনি বলেন, তালেবানদের বিরুদ্ধে শক্ত সামরিক ব্যবস্থা না নিয়ে দেশের মানুষকে হতাশ করছে তারা। যারা দেশের নাগরিকদের হত্যা করছে, স্বসস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের হত্যা করছে এবং হামলার দায় স্বীকার করছে তাদের সহিংস কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তথাকথিত জাতীয় নেতাদের কথা না বলার কোন কারণ দেখি না বলে মন্তব্য করেন তিনি। প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভূট্টো এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারির ছেলে বিলাওয়াল রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশের পর থেকেই জঙ্গীবাদ ও সামরিক ইস্যুতে স্পষ্টভাষী হিসেবে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করেছেন। এধরনের মন্তব্যে নিজের সে অবস্থানকেই আরও জোরালো করলেন তিনি। সংসদ সদস্য না হলেও পিপিপি’তে (পাকিস্তান পিপলস পার্টি) গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব আছে বিলাওয়ালের। ২০১২ সালে নারী শিক্ষাকর্মী মালালা ইউসুফজাইয়ের উপর তালেবান হামলার ঘটনাটি টেনে এনে তিনি বলেন, মালালার মত মানুষেরা হামলার স্বীকার হয় কেননা দেশের তথাকথিত নেতাদের অন্যায়ের প্রতিবাদ করার সাহস নেই; অথচ ১৬ বছরের একটি স্কুলছাত্রীর সে মনোবল ছিল। আমরা সবাই যদি একসুরে কথা বলি তাহলে তারা সবাইকে তো মেরে ফেলতে পারবেনা। তিনি আরও বলেন, আমি আমার মাকে হারিয়েছি তালেবানদের হাতে- আমার জন্য অনেক নিরাপত্তা ব্যবস্থা আছে, এটা অন্যতম কারণ যে আমি তালেবানদের বিরুদ্ধে খোলামেলা কথা বলতে পারি। কিন্তু ইমরান খান, প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ, পাঞ্জাবের মূখ্যমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ তাদের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা তো আমার তুলনায় বেশি। কাজেই তালেবানদের সহিংস কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে কথা না বলার তাদের কোন কারণ নেই। তালেবানদের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে তেমন কোন অগ্রগতি না হওয়ায় সম্প্রতি মনে হয়েছিল নওয়াজ শরীফ আলোচনা প্রক্রিয়া বন্ধের ঘোষণা দিতে পারেন। বরং তিনি মধ্যস্ততাকারীদের শেষবারের মতো আরেকটি সুযোগ দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তেহরিক-ই-তালেবানের সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা করতে মধ্যস্ততাকারীদের কমিশন গঠন করা হয় তড়িঘড়ি করে। এমন ঘোষণায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন বলে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন বিলাওয়াল। তিনি বলেন, এটা চরম হতাশাব্যঞ্জক। শুধু তাদের জন্যই নয় যাদের জীবন নিয়ত হুমকির মুখে থাকে বরং তাদের জন্যও হতাশাব্যঞ্জক যারা প্রতিদিন প্রাণ হারায়।

যুক্তরাষ্ট্র- ‘বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসীদের’ নিয়ে উদ্বেগ by রাহীদ এজাজ

Friday, January 31, 2014

টুইন টাওয়ারে হামলার (৯/১১) পর গোয়েন্দা সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট মার্কিন সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বেড়েছে। জোরদার হয়েছে সন্ত্রাসবাদবিরোধী আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও।
আর ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুর পর ৯/১১-এর মতো তাণ্ডব চালানোর সামর্থ্য এখন আর আল-কায়েদার নেই বলেই ধারণা নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের। এর পরও স্বস্তিতে নেই যুক্তরাষ্ট্র। কারণ, দেশটির অভ্যন্তরের বিচ্ছিন্ন বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী গজিয়ে উঠেছে। গত এক দশকে দেশের নানা প্রান্তে বিচ্ছিন্নভাবে বেড়ে ওঠা এসব গোষ্ঠীকেই নিয়েই এখন উদ্বেগ মার্কিন প্রশাসনের। সন্ত্রাস আর জঙ্গি তৎপরতা থেকে দেশকে মুক্ত রাখতে মার্কিন নিরাপত্তা বাহিনী ও গোয়েন্দাদের নজরদারি বেড়েছে। নিউইয়র্কে এ নজরদারিটা অভিবাসী এশীয় ও মুসলিমদের ওপর বেশি এবং খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই এর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

নজরদারি নিয়ে লস অ্যাঞ্জেলেসের ছবিটা নিউইয়র্কের ঠিক উল্টো। লস অ্যাঞ্জেলেসের পুলিশ বিভাগের (এলএপিডি) উপপ্রধান মাইকেল ডাউনিং জানান, অভিবাসী লোকজনের ওপর নজরদারি নয়, তাদের সঙ্গে সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মাধ্যমে সন্ত্রাস ও জঙ্গি দমনে সফল হতে হবে। এরই অংশ হিসেবে এলএপিডির কর্মকর্তারা বিভিন্ন দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসা লোকজনের ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান আয়োজনে যুক্ত থাকেন।
সামগ্রিকভাবে গত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের ঝুঁকি অনেকখানি কমেছে। এ জন্য দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর সহযোগিতাকে গুরুত্ব দিচ্ছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি এজেন্সি, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (এফবিআই), জাতিসংঘের সন্ত্রাসবাদ দমন কমিটি, উইলসন সেন্টার, ব্রুকিংস ও র‌্যান্ডের মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এ অভিমত পাওয়া গেছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ফরেন প্রেস সেন্টার এ মাসের শুরুতে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের গণমাধ্যমকর্মীদের সন্ত্রাসবাদ দমনবিষয়ক এক সফরের আয়োজন করে। এ সফরের অংশ হিসেবে আমরা দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী ওয়াশিংটন, নিউইয়র্ক ও লস অ্যাঞ্জেলেস সফর করি।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ দমন বিভাগের উপ-সমন্বয়কারী জাস্টিন সিবেরেল মনে করেন, আল-কায়েদার প্রভাববলয় গুঁড়িয়ে দেওয়া গেলেও ভৌগোলিকভাবে এর মতাদর্শ ছড়িয়ে পড়েছে। মার্কিন স্থাপনায় হামলার ক্ষমতা হয়তো তাদের নেই। তবে ওসামা বিন লাদেনের জিহাদি আদর্শে তরুণদের প্রলুব্ধ করার ক্ষমতা আছে।
লস অ্যাঞ্জেলেসভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান র‌্যান্ড করপোরেশনের নীতিমালাবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক এন্ড্রু লিয়েপমেনের মতে, লিবিয়ার বেনগাজিতে মার্কিন দূতাবাসে হামলা ও বোস্টন ম্যারাথনে বোমা হামলা সন্ত্রাসবাদ দমন নিয়ে নতুন করে ভাবনা জাগায়। তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে তো বটেই বিশ্বের নানা প্রান্তে ওসামা বিন লাদেনের আদর্শকে ধারণ করে অনেক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এসব গোষ্ঠীর এজেন্ডাগুলো বৈশ্বিক না হয়ে আঞ্চলিক হয়ে পড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যে এরা খেলাফত প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করছে। তাই সামগ্রিকভাবে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জয় হয়েছে বলাটা কঠিন।
র‌্যান্ড করপোরেশনের প্রেসিডেন্টের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ব্রায়ান মাইকেল জেনকিন্স লাদেনের মতাদর্শের ভিত্তিতে দেশের নানা প্রান্তে বেড়ে ওঠা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে বিচ্ছিন্ন নেকড়ে হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর মতে, বিচ্ছিন্ন হলেও এসব গোষ্ঠী লক্ষ্যবস্তুতে হামলায় নিজেদের পারঙ্গম করে তুলছে। তবে মার্কিন সেনাবাহিনীর বিশেষ বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ব্রায়ানের ভয়টা আগামী দিনগুলো নিয়ে। কারণ, গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের নানা প্রান্তের প্রায় দেড় হাজার মানুষ সিরিয়া যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে, তাদের মধ্যে ৭০ জনেরও বেশি মার্কিন নাগরিক যুদ্ধ শেষে দেশে ফিরলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কতটা হুমকি সৃষ্টি করবে, তা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন।
লস অ্যাঞ্জেলেস শেরিফের দপ্তরের জরুরি ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচালক জেফ রিব জানান, বিচ্ছিন্নভাবে দেশের নানা প্রান্তে এসব সন্ত্রাসী সংগঠন গড়ে উঠছে। বিশেষ করে, কারাগারে যাওয়ার পর চিরকুট বিনিময়সহ নানাভাবে যোগাযোগের মাধ্যমে এই সন্ত্রাসীরা পারস্পরিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে। দেশের ভেতরেই সন্ত্রাসীরা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে, বিচ্ছিন্নভাবে এসব গোষ্ঠী বিকশিত হচ্ছে—এমন উদ্বেগ থেকেই নিরাপত্তা বাহিনীর সন্দেহ ও নজরদারি বেড়েছে।
নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের লিবার্টি অ্যান্ড ন্যাশনাল সিকিউরিটি প্রোগ্রামের সহপরিচালক ফাইজা প্যাটেলের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনীকে অনেক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। সন্ত্রাসবাদ বা অপরাধমূলক কাজ করতে পারে—এমন সন্দেহের দৃষ্টি পড়ছে এশীয় ও মুসলমানদের ওপর। তাই মুসলমান তরুণেরা কখন, কোথায় যায় এবং মসজিদে ইমাম কী বলেন, সেদিকে তীক্ষ নজর রাখা হচ্ছে।
সন্দেহের বশবর্তী হয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মুখোমুখি হওয়া বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক মার্কিন তরুণের সঙ্গে দেখা হয়েছিল নিউইয়র্কে। প্রায় দেড় দশক আগে মা-বাবাসহ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ওই তরুণ পাড়ি দেন যুক্তরাষ্ট্রে। তাঁর কাছে জানা গেল মাস চারেক আগে এক ভোরে এফবিআই কর্মকর্তারা হাজির তাঁর বাড়ির দুয়ারে। এফবিআই কর্মকর্তাদের দেখে সংগত কারণেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন তরুণের বাড়ির লোকজন। পরে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গোয়েন্দারা তাঁকে সঙ্গে নিয়ে দপ্তরে যান। নিরাপত্তা সংস্থার লোকজনের প্রশ্ন শুনে তরুণটি বুঝে ফেলেন, বেশ কিছুদিন ধরেই তিনি গোয়েন্দাদের নজরদারিতে ছিলেন। তিনি মুসলিম কি না, তাঁরা জানতে চান। নিরাপত্তা কর্মকর্তারা তাঁকে বলেন, মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজনের মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু দেখলে তিনি যেন তাঁদের অবহিত করেন।
মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আন্তদেশীয় সহযোগিতার পাশাপাশি নিজেদের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সহযোগিতা বাড়ার কারণে নিরাপত্তার ঝুঁকি আগের চেয়ে কমেছে। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি এজেন্সির ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস) শাখার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা জানান, বিদেশি শত্রুদের বিরুদ্ধে আন্তসরকার সহযোগিতা করাই তাদের মূল কাজ। অজ্ঞাতপরিচয় সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করে তাদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ ঠেকানো, যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং সন্ত্রাসবিরোধী উদ্যোগকে মাথায় রেখে অভিবাসন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে সহায়তা করাও তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। শুধু মানুষ নয়, পণ্য চলাচলের ওপরও দৃষ্টি রাখে ওই বিভাগ।
সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অর্ধেকটাই প্রচার মাধ্যমকেন্দ্রিক বলে মনে করে মার্কিন প্রশাসন। তাই সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পাল্টা প্রচারণাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। জঙ্গিদের বার্তা ব্যবহার করেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের কাজের সমালোচনার মাধ্যমে জঙ্গিদের চরিত্র উন্মোচিত করার দাবি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তাদের।
ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক কাউন্টার টেররিজম কমিউনিকেশনসের (সিএসসিসি) সমন্বয়ক আলবার্তো ফার্নান্দেজ জানালেন, ২০১১ সাল থেকে তাঁর দপ্তর প্রচারমাধ্যমে জঙ্গিদের এভাবেই প্রতিহত করছে।
আলবার্তো বলেন, ‘আমরা গত ডিসেম্বরে ইয়েমেনের রাজধানী সানার হাসপাতালে আল-কায়েদার নৃশংস হত্যাযজ্ঞের ভিডিও প্রচার করেছি। এরপর ওই ভিডিওতে প্রশ্ন তুলেছি ইসলাম ও শান্তির ডাক যারা দিচ্ছে, তারা কি আসলেই শান্তি চায়? এতে জনসমক্ষে তারা হেয়প্রতিপন্ন হয়েছে। ফলে ওই হামলার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করে বিবৃতি দিতে বাধ্য হয়েছে আল-কায়েদা। এ থেকেই লোকজন বুঝতে পারছে এদের স্বরূপ।’
শুরুতে সিএসসিসি প্রচারণা কার্যক্রমের বড় অংশটাই ছিল আরবিতে। এ ছাড়া সোমালি ভাষায়ও হয়। সম্প্রতি পাঞ্জাবি ও উর্দুর পাশাপাশি ইংরেজিতেও এ প্রচারণা শুরু হয়েছে। এমনকি জঙ্গিদের প্রতিটি ভিডিও বার্তা কিংবা প্রতিদিন ফেসবুক, টুইটারের প্রতিটি পোস্টের পাল্টা জবাব দেওয়া হয়।
তবে আল-কায়েদার মতো জঙ্গি সংগঠন মোকাবিলায় নিজেদের সাফল্য নিয়ে আত্মতুষ্টি থাকলেও আলবার্তো ফার্নান্দেজ প্রতিপক্ষের দক্ষতা স্বীকার করতে ভোলেননি। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি জঙ্গি সংগঠনেরও মানসম্পন্ন প্রচারযন্ত্র রয়েছে, যাদের কর্মীরা যথেষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন। তাদের প্রচারযন্ত্র যথেষ্ট দক্ষ, বৈচিত্র্যপূর্ণ ও আগ্রাসী মনোভাবসম্পন্ন। তাই তাদের বিরুদ্ধে আমাদেরও আক্রমণাত্মক হয়েই লড়তে হচ্ছে।’
এর পরও সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ঝুঁকি আছে বলে মত দেন সাবেক সিআইএ কর্মকর্তা পল আর পিলার। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ব্রুকিংসে কর্মরত পল মনে করেন, অনেক উদ্যোগের পরও যুক্তরাষ্ট্রের এখনো অনেক মৌলিক ঝুঁকি রয়ে গেছে। নতুন করে বড় ধরনের কোনো সন্ত্রাসী হামলা ঘটলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

রাহীদ এজাজ: সাংবাদিক।

ফিলিপাইনে বিদ্রোহের অবসান হচ্ছে? by নওয়াজ ফারহিন

অবশেষে ফিলিপাইনের সরকার ও দেশটির সবচেয়ে বড় মুসলিম বিদ্রোহী গোষ্ঠী মরো ইসলামিক লিবারেশন ফ্রন্টের মধ্যে (এমআইএলএফ) একটি শান্তিচুক্তি হতে যাচ্ছে।
গত শনিবার মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে এ ব্যাপারে দুই পক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা হয়। অনেকে আশা করছেন, এর মধ্য দিয়ে অবসান হতে যাচ্ছে ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলে ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা সহিংসতার।

এমআইএলএফ ছাড়াও বেশ কয়েকটি মুসলিম বিদ্রোহী গোষ্ঠী দক্ষিণাঞ্চলের মিন্দানাও দ্বীপসহ দক্ষিণাঞ্চলের বেশ কয়েকটি এলাকায় ম্যানিলার শাসনের বিরুদ্ধে এবং স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে লড়াই চালিয়ে আসছে। গত কয়েক দশকের লড়াইয়ে প্রায় দেড় লাখ মানুষ নিহত হয়েছে, ঘরছাড়া হয়েছে ২০ লাখ মানুষ এবং চরম দারিদ্র্যের কবলে পড়ে দেশটির দক্ষিণাঞ্চল। পাশাপাশি এই সহিংসতা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়তে সহায়তা করেছে ইসলামি চরমপন্থা।
এই সমঝোতাকে ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট বেনিগনো নয়নয় অ্যাকুইনোর বড় অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০১২ সালের অক্টোবর মাস থেকে ফিলিপাইন সরকার ও এমআইএলএফের মধ্যে এই শান্তিচুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়। চুক্তিতে কী কী থাকবে, সে ব্যাপারে তারা এত দিন আলোচনা করেছে। গত শনিবার চূড়ান্ত পর্বের আলোচনা শেষে সমঝোতাপত্র সই হয়। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি সই হবে বলে ফিলিপাইন সরকার সূত্র জানিয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, ফিলিপাইন সরকার মিন্দানাওসহ দক্ষিণের বেশ কয়েকটি এলাকায় স্বায়ত্তশাসন দেবে। বিনিময়ে এমআইএলএফের ১১ হাজার যোদ্ধার একটি বড় অংশ সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীতে যোগ দেবে এবং অন্যরা পর্যায়ক্রমে তাদের অস্ত্র সমর্পণ করবে। এই সমর্পণের কাজ পর্যবেক্ষণ করবে তৃতীয় একটি পক্ষ। এ ছাড়া স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলগুলোর বিভিন্ন খনি থেকে প্রাপ্ত রাজস্বের ৭৫ শতাংশ মিন্দানাওতে থাকবে। জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে পাওয়া করের অর্ধেক সেখানকার স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
এমন একটি শান্তিচুক্তির সম্ভাবনায় ফিলিপাইনের অনেকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে। অ্যাটেনিও ডি ম্যানিলা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক রিচার্ড জাভাদ হেদারিয়ান বলেন, মিন্দানাও দ্বীপের সহিংসতার অবসানে কয়েক দশক ধরে কূটনীতিকেরা যে কষ্টকর চেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন, এই চুক্তির মাধ্যমে এর অবসান ঘটবে। এই চুক্তি বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা লড়াইয়ের অবসানের এক অপূর্ব সুযোগ এনে দেবে।
তবে এই শান্তিচুক্তির সফলতা নির্ভর করবে এমআইএলএফের সক্ষমতার ওপর। স্বায়ত্তশাসিত এলাকার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার রক্ষার দায়িত্ব তাদের হাতে থাকবে। অন্যান্য জঙ্গি গোষ্ঠীর সহিংসতা দমন করাই হবে তাদের প্রধান কাজ। এটা করতে না পারলে শান্তি আসবে না।
১৯৯৬ সালে আরেকটি বড় জঙ্গি গোষ্ঠী মরো ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্টের সঙ্গে ফিলিপাইন সরকারের শান্তিচুক্তি হয়েছিল। তবে ওই চুক্তিতে বিদ্রোহীদের হাতে অস্ত্র রাখার অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। এ কারণে শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন হয়নি।

এমআইএলএফ সরকারের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করতে রাজি হলেও আল-কায়েদা-সংশ্লিষ্ট জঙ্গি গোষ্ঠী আবু সায়াফ, এমআইএলএফসহ বাকি লড়াইরত জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো জানিয়ে দিয়েছে, তারা এই চুক্তিতে যোগ দেবে না। আর এ কারণে অনেকে শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মধ্যে একজন হলেন দ্য ফিলিপাইন স্টার পত্রিকার কলামিস্ট ববিট আভিলা। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট অ্যাকুইনোর প্রশাসন চুক্তিটি করার জন্য খুব ব্যতিব্যস্ত। তারাই শান্তিচুক্তি করতে পেরেছে—এমন একটি কৃতিত্ব নিতে চাইছে। কিন্তু এই শান্তিচুক্তি শান্তি আনবে না, যতক্ষণ না পর্যন্ত দক্ষিণাঞ্চলের সব সশস্ত্র গোষ্ঠী এই চুক্তিতে না যোগ দেবে।
আভিলা বলেন, ‘বিশ্বের যেকোনো মুসলিম দেশে আমি ভয় ছাড়াই ঘুরতে পারি। কিন্তু মিন্দানাওয়ে আমি সেটা পারব না। হয় আমি খুন হব, নয়তো অপহূত হব। শান্তিচুক্তি এই অবস্থার কোনো পরিবর্তন ঘটাতে পারবে না।’
সরকার ও বিদ্রোহী—উভয় পক্ষই স্বীকার করেছে যে, দেশের দক্ষিণাঞ্চলে রাতারাতি সহিংসতার অবসান ঘটবে না। কেননা, সেখানে এখনো গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব অব্যাহত রয়েছে, রয়েছে বিপুলসংখ্যক অবৈধ অস্ত্র ও দুর্বল আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা।
নওয়াজ ফারহিন
সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ, এএফপি ও বিবিসি

মিসর ও তিউনিসিয়া- এক যাত্রা পৃথক ফল by রোকেয়া রহমান

মিসর ও তিউনিসিয়া—আরব বিশ্বের দুটি দেশ। তাদের মধ্যে যোজন যোজন দূরত্ব তৈরি করেছে লিবিয়া। এই দূরত্ব সত্ত্বেও দেশ দুটির মধ্যে কত-না মিল ছিল।
দেশ দুটি দীর্ঘদিন স্বৈরশাসকদের শাসনে ছিল। ধর্মীয় কট্টরপন্থা যাতে সে দেশের শাসনব্যবস্থায় গেড়ে না বসতে পারে, এ জন্য মিসর ও তিউনিসিয়ার শাসকেরা ছিলেন নির্দয়। কিন্তু তলে তলে দেশ দুটিতে কট্টর ইসলামপন্থীদের সক্রিয় হয়ে ওঠা ও ক্ষমতা দখল—দুটোই কঠিন বাস্তব।

কিন্তু এই বাস্তবতা মোকাবিলায় দেশ দুটি আবার ভিন্ন পথে হেঁটেছে। একজন বেছে নিয়েছে আলোচনার পথ, অন্যজন বলপ্রয়োগের। অথচ ‘কথিত’ আরব বসন্তের সূত্রপাত করেছিল এই মিসর ও তিউনিসিয়া। এখন দুই বিপরীতমুখী ধারার সম্মিলন গোটা আরব বিশ্বকে বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে দিয়েছে বলা যায়।
১৯৫৬ সালে ফ্রান্সের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পর থেকে তিউনিসিয়া সাংবিধানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবেই পরিচিত ছিল। নামে গণতন্ত্র হলেও ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বৈরাচার ও অনাচার দেশটিকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে। শেষমেশ ২০১১ সালের জানুয়ারিতে এক গণ-অভ্যুত্থানে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বেন আলী। এরপর অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে সংবিধান পরিষদ নির্বাচিত হয়। ১৫ জানুয়ারি এই সংবিধান পরিষদ ঐকমত্যের ভিত্তিতে নতুন সংবিধান গ্রহণ করেছে, যা আরব বিশ্বে এখনো পর্যন্ত সবচেয়ে উদার সংবিধানই বলা যায়। তিউনিসিয়ার পার্লামেন্ট গত রোববার দেশটির নতুন সংবিধান অনুমোদন দিয়েছে। সংবিধানে অনুমোদনের পক্ষে ২১৬ ভোটের মধ্যে ২০০টি ভোট পড়ে। গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে এই সংবিধানে শব্দ চয়ন করা হয়েছে এমনভাবে, যাতে শাসক ইসলামপন্থী দল ও এর বিরোধী ধর্মনিরপেক্ষ দলের কাছে তা গ্রহণযোগ্য বলেই মনে হয়েছে। সামাজিক জীবনে ইসলামের ভূমিকা ঠিক কী হবে, এই কঠিন প্রশ্নে দল দুটি মতৈক্যে আসতে পেরেছে, যা আপস বা সমন্বয়ের এক বিরল নিদর্শন।
তিউনিসিয়ার নতুন সংবিধানে বলা হয়েছে, ‘তিউনিসিয়া হবে মুক্ত, স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ; ইসলাম এর ধর্মীয় পরিচয়; আরবি এর ভাষা এবং এর শাসনব্যবস্থা প্রজাতান্ত্রিক।’ এতে আরও বলা হয়েছে, ‘তিউনিসিয়া হবে নাগরিক রাষ্ট্র, যা জনমতের ইচ্ছায় গড়ে উঠবে এবং এখানে আইনই সর্বোচ্চ।’ ভবিষ্যতে কোনো দল যত গরিষ্ঠতা নিয়েই ক্ষমতায় আসুক না কেন, সংবিধানের এই দুই মৌলিক বিষয়কে তারা কখনো সংশোধন করতে পারবে না।
তিউনিসিয়ার পার্লামেন্ট গত বুধবার একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের বিষয়টি অনুমোদন করে। নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত এই সরকার দেশ পরিচালনা করবে।
অন্যদিকে, পিরামিডখ্যাত মিসরকে দেখুন। উত্তাল তাহরির স্কয়ারের কথা এ দেশের পাঠকের কে না জানে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে সংগঠিত আন্দোলন ও হাজারো তরুণের আত্মত্যাগ স্বৈরশাসকবিরোধী এ আন্দোলনকে স্মরণীয় করে রেখেছে। ২০১১ সালের জানুয়ারির সেই হোসনি মোবারকবিরোধী আন্দোলন ও ফেব্রুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট মোবারকের পতন মিসরবাসীকে নতুন স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছিল।
কিন্তু তারুণ্যের এই আত্মত্যাগের ফসল তুলল মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুড। ২০১১ সালের ২৮ নভেম্বর দেশের প্রথম সংসদ নির্বাচনে জয় ছিনিয়ে নিয়ে প্রেসিডেন্ট হলেন ব্রাদারহুডের নেতা মোহাম্মদ মুরসি। চলতে শুরু করলেন নিজের পথে, নিজের মতো করে। এক বছরের মধ্যে নতুন সংবিধান অনুমোদনের জন্য গণভোটের ব্যবস্থা করলেন। বিরোধী রাজনীতিকেরা শুরু থেকে ব্রাদারহুডের বিপক্ষে অবস্থান নেন। বুদ্ধিমান মুরসি তাঁদের কাছে আলোচনার প্রস্তাব দিলেও নিজের উদ্দেশ্য পূরণে অটল থাকলেন; যার ফলে গত বছরের মাঝামাঝি মিসরজুড়ে শুরু হয় মুরসিবিরোধী আন্দোলন।
জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবের আইনকানুনের ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ নাথান ব্রাউন বলছেন, প্রথমত, বিরোধীরা এটা জানত যে পরের নির্বাচনেও তারা কোনোভাবেই জিততে পারবে না। দ্বিতীয়ত, সেনাবাহিনী সেখানে ছিল। কার্যক্ষেত্রে হলোও তা-ই।
ঘরে-বাইরে মুরসিবিরোধী তীব্র মনোভাবের সুযোগ নিল সে দেশের সেনাবাহিনী, যারা ১৯৫২ সাল থেকে একটানা ৬০ বছর মিসরের শাসন পরিচালনা করেছে। ক্ষমতা হারালেন মুরসি। সেনাশাসনকে পাকাপোক্ত করতে কোনো ধরনের মতৈক্য ছাড়াই আয়োজিত গণভোটে রায় এল ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে এবং বিপুলভাবে। আসলে ‘না’ যে বলা যাবে, এটাই বহু ভোটার জানতেন না। মিসরের নতুন শাসকেরা ব্রাদারহুডকে ‘সন্ত্রাসী’ তকমা দিয়ে নিষিদ্ধ করেছেন, কারাগারে পাঠিয়েছেন এ দলের নেতাদের, জব্দ করেছেন সম্পদ। ইজিপশিয়ান ইনিশিয়েটিভ ফর পার্সোনাল রাইটসের প্রতিষ্ঠাতা হোসাম বাঘাতের ভাষায়, এই শাসকেরা মোবারকের জামানাকেও হার মানিয়েছে। উল্লেখ্য, হোসনি মোবারক নিজেও সেনাবাহিনী থেকে এসে প্রায় ৪০ বছর মিসর শাসন করে গেছেন।
সামরিক বাহিনী ক্ষমতায় আসার মিসরের উদারপন্থীরা খুশি। তাদের সেই খুশি ঝরে পড়ছে সেনাশাসক সিসির প্রতি আপ্লুত ভাবাবেগে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেনাবাহিনী কি শেষ পর্যন্ত দেশটিতে শান্তি আনতে পারবে? নাকি এখানেও দুই পক্ষের মধ্যে একটা সমঝোতার দরকার ছিল, যে পথ ইতিমধ্যে তিউনিসিয়া দেখিয়ে দিয়েছে। কায়রোর আইনজ্ঞ জায়েদ আল-আলীর কথায়, ‘তিউনিসিয়ায় পুরো পাতাটাই উল্টানো হয়েছে এবং তাই তুমি বুঝতে পারবে যে সেখানে বিপ্লব এসেছিল। কিন্তু মিসরের ক্ষেত্রে তা (বিপ্লব/আরব বসন্ত) তা বিতর্কিতই থেকে গেল।’
২০১১ সালের একই সময়ে একই পথে যাত্রা করে আরব বিশ্বের দুটি দেশের যাত্রা কেন বিপরীতমুখী হয়ে গেল, তা হয়তো ভবিষ্যতের গবেষকদের জন্য তোলা থাকবে। তত দিনে নীল নদের তীরের এই দেশে আর কত রক্তপাত হবে কে জানে!
ইন্টারন্যাশনাল নিউইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে

দক্ষিণ এশিয়া- কংগ্রেসের হাতে ভারতের অবক্ষয় by যশবন্ত সিং

Sunday, January 26, 2014

মনমোহন সিং ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন ২০০৪ সাল থেকে। তাঁর চলতি দ্বিতীয় মেয়াদ যখন দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, তখন তিনি দ্বিতীয়বারের মতো একটি সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেছেন সম্প্রতি।
সেখানে সমবেত সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা যেভাবে তাঁর শাসনামলের মূল্যায়ন করেন, ইতিহাস তার থেকে বেশি সদয়ভাবে সেটা করবে বলে তিনি আশা করেন।

কিন্তু সে রকম সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয় না। বরং মনমোহন সিংয়ের দল, একসময়ের মহান কংগ্রেস দল এখন এক রাজনৈতিক কানাগলিতে ঘুরপাক খাচ্ছে। দলটি তার ধ্বংসাত্মক পরিবারতান্ত্রিক নেতৃত্ব থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারলেই কেবল এই কানাগলি থেকে বেরোবার পথ খুঁজে পেতে পারে। একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে ভারত ইতিমধ্যে অর্ধশতকের বেশি সময় পেরিয়ে এসেছে। এই সময়ের অধিকাংশটাই সরকারের দায়িত্বে ছিল কংগ্রেস দল। এখন মনে হচ্ছে, কংগ্রেসের এই আধিপত্যের যুগ শেষ হতে চলেছে।
দলটির অবক্ষয়ের সবচেয়ে পরিষ্কার লক্ষণটি ফুটে উঠেছে গত ডিসেম্বরে, যখন ভারতের চারটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের ভরাডুবি ঘটেছে। রাজস্থানে কংগ্রেস পেয়েছে মাত্র ২১টি আসন, আর ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) জিতেছে ১৬২টি আসন। অথচ ২০০৮ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস সেখানে পেয়েছিল ৯৬টি আর বিজেপি পেয়েছিল ৭৮টি আসন।
একইভাবে দিল্লিতে টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর কংগ্রেস এবার ৭০টি আসনের মধ্যে পেয়েছে মাত্র আটটি; এমনকি দলটির যে নেত্রী সবচেয়ে লম্বা সময় ধরে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন, সেই শিলা দীক্ষিতও আসন হারিয়েছেন এমন এক ব্যক্তির কাছে, যিনি রাজনীতিতে নবাগত। উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ছোট্ট রাজ্য মিজোরামেই শুধু কংগ্রেস তার সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পেরেছে।
এটা কংগ্রেসের জন্য এক নজিরবিহীন ভরাডুবি। আগামী জাতীয় সাধারণ নির্বাচনে দলটির জন্য ভালো কিছুর পূর্বাভাস এতে নেই। কেন এ রকম হলো এবং কংগ্রেস নিজের ক্ষয় ঠেকাতে পারবে কি না, এসব বুঝতে হলে বিজেপির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমেক্রেটিক অ্যালায়েন্সের (এনডিএ) হাত থেকে ২০০৪ সালে কংগ্রেস জাতীয় নেতৃত্ব ফিরে পাওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত কী ঘটেছে, তা বুঝতে হবে।
ভারতের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে কংগ্রেস ২০০৪ সালে নবনির্বাচিত ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্সের (ইউপিএ) কেন্দ্রীয় শক্তিতে পরিণত হয়। কিন্তু অবাক ব্যাপার হলো, দলটির প্রধান নেতা সোনিয়া গান্ধী প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিতে সম্মত হলেন না, তিনি এই পদের জন্য ইউপিএর প্রার্থী হিসেবে প্রস্তাব করলেন মনমোহন সিংয়ের নাম। মনমোহন সিং একজন অধ্যাপক ও আমলা, যাঁর কোনো নির্বাচনী অভিজ্ঞতা ছিল না। প্রায় ৪০ দিন নানা নাটকীয়তার পর মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন, যদিও কোনো নির্বাচনী এলাকায় তাঁর প্রতি কোনো প্রত্যক্ষ ভোটার-সমর্থন ছিল না।
এই অস্বাভাবিক বন্দোবস্ত তাৎক্ষণিকভাবে নানা রকমের তিক্ত মন্তব্য-সমালোচনার কারণ ঘটায়। একজন পর্যবেক্ষক বিচক্ষণতার সঙ্গে মন্তব্য করেছিলেন, ‘যেখানে কর্তৃত্ব আছে, সেখানে যোগ্যতা নেই; কিন্তু যেখানে কিছুটা যোগ্যতা আছে, সেখানে কোনো কর্তৃত্ব নেই।’ মনমোহন সিংয়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও ভারতের শীর্ষ রাজনৈতিক পদে তাঁর কর্তৃত্বের সম্ভাবনা ছিল অত্যন্ত সীমিত। যতই দিন গড়িয়েছে, ততই পরিষ্কার হয়ে উঠেছে যে, মনমোহন সিংয়ের সরকার একেবারেই অকার্যকর। তাঁর ব্যর্থতাই ছিল অবধারিত, কারণ মনমোহন সিংয়ের যা কিছু শক্তি-সামর্থ্য ছিল, তা একজন অনুগত ও সামর্থ্যবান অধস্তন কর্মকর্তা হিসেবে; কার্যসূচি নির্ধারণ করে দৃঢ়তার সঙ্গে কাজ করার মতো নেতৃত্বের গুণ তাঁর ছিল না।
১৯৯০-এর দশকে মনমোহন সিং যখন ভারতের অর্থমন্ত্রী ছিলেন, তখন দেশটির অর্থনৈতিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপক হিসেবে তাঁর ভূমিকার কথা বিবেচনা করে দেখা যাক। অর্থনৈতিক রূপান্তরের উদ্যোগকে তাঁর সমর্থকেরা তাঁর দূরদৃষ্টি ও যোগ্যতা-সক্ষমতার দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রায়ই উল্লেখ করতেন। গত বছর সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী নটবর সিং হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিয়েছেন যে, ভারতের অর্থনৈতিক সংস্কার ও পুনর্গঠনের উদ্যোগটি আসলে ছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাওয়ের, যিনি ছিলেন কংগ্রেসের একজন চতুর ও বর্ষীয়ান নেতা। প্রয়োজনীয় কাজ করার ক্ষেত্রে মনমোহন সিংয়ের অনাগ্রহ ছিল; নরসীমা রাও ক্ষেত্র প্রস্তুত করে না দিলে এবং সংস্কারের পক্ষে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সমর্থন সংগঠিত না করলে মনমোহন তেমন কিছুই অর্জন করতে পারতেন না। সরকারের এজেন্ডা অনুসারে কাজ করতেও মনমোহনের অনীহা ছিল। আগে এমন বলাবলি হতো যে, রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তাঁর যোগ্যতাকে খাটো করে দেখা যেমন উচিত নয়, তেমনি অর্থনীতির ব্যবস্থাপক হিসেবে তাঁর দক্ষতার অতিমূল্যায়ন করাও ঠিক হবে না।
কিন্তু নরসীমা রাওয়ের ভূমিকা উন্মোচিত হওয়ার আগেই একজন নেতা হিসেবে মনমোহন সিংয়ের অযোগ্যতা-অদক্ষতা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি শুধু যে স্থবির হয়ে গেছে তা-ই নয়, তিনি সোনিয়া গান্ধীর সব কথা মান্য করে গেছেন, সেগুলো বৈধ হোক বা না হোক। ফলে শাসনব্যবস্থা ও অর্থনীতির অবস্থা ক্রমেই খারাপ হয়েছে। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) সমন্বয়ে গঠিত একটি সংবিধানবহির্ভূত প্রতিষ্ঠানের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে ভারত; সেই সংস্থার নাম ন্যাশনাল অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল (এনএসি), সোনিয়া গান্ধী যার সভানেত্রী। মন্ত্রিসভা হয়ে পড়েছে অর্থহীন, ইউরোপীয় কল্যাণরাষ্ট্রের অপুষ্ট ধারণার দ্বারা অনুপ্রাণিত এনএসির ফরমানগুলোই হয়ে উঠেছে সরকারি নীতি।
ফলে মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বে অর্থনীতির অবস্থা ভীষণ খারাপ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে, বিশেষত খাদ্যদ্রব্যের দাম। এ ছাড়া ২০০৪ সাল থেকে কংগ্রেসের শাসনামলে রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি ও অর্থসংক্রান্ত কেলেঙ্কারি বেড়েছে, বিস্তার ঘটেছে নানা রকমের অপরাধবৃত্তি। ইউপিএ শাসকগোষ্ঠী দক্ষতার সঙ্গে লুটপাট চালিয়েছে; ব্যাপক দুর্নীতি ও জবাবদিহির অভাবে এই জোটের প্রধান শরিক দল কংগ্রেসের গ্রহণযোগ্যতা নিঃশেষিত হয়েছে। এসব কিছু ঘটেছে অর্থনীতিতে আপাত-শিক্ষিত মনমোহন সিংয়ের নীরব দর্শকের ভূমিকায়; তিনি শুধু দায়িত্বশীলতা দেখাতেই অস্বীকৃতি জানিয়েছেন আর রাজনৈতিক অঙ্গনের বাইরের অবস্থান থেকে তুচ্ছ মন্তব্য ছুড়ে দিয়েছেন। মনমোহন সিং কংগ্রেস দলের যে ক্ষতির কারণ ঘটিয়েছেন, সেটা পূরণ করার কাজ দলটিরই। আর তাঁর নির্লিপ্ততার কারণে প্রধানমন্ত্রী নামের প্রতিষ্ঠানটির যে ক্ষতি হয়েছে, সেটা ভারতের সব মানুষের সমস্যা। মনমোহন সিংয়ের বিপর্যয়কর নেতৃত্বের এক দশকের বৈশিষ্ট্য হলো দুর্বলতা ও ক্ষয়। এর পরিণামে সামনের অনেক বছর ধরে ভারতকে ভুগতে হবে। তাঁর কাজের ন্যায্যতা প্রতিপাদন দূরে থাক, ইতিহাসবিদেরা জানবেন, নিশ্চিতভাবে কাকে দায়ী করতে হবে।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
যশবন্ত সিং: ভারতের অর্থমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন। জিন্না: ইন্ডিয়া-পার্টিশন—ইনডিপেনডেন্স গ্রন্থের লেখক।
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

ভারতে কংগ্রেস যুগের অবসান ঘটতে চলেছে?

আগামী মে মাসে ভারতের লোকসভা নির্বাচন নিয়ে এখন থেকেই জনমত সমীক্ষায় যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে তাতে ভারতে কংগ্রেস যুগের অবসান ঘটতে চলেছে। উত্থান হওয়ার সম্ভাবনা হিন্দুত্ববাদী শক্তি বিজেপির।
ভারতীয় গণমাধ্যমের বিভিন্ন সমীক্ষায় জানানো হয়েছে, কংগ্রেসের প্রতি মানুষের আস্থা তলানিতে ঠেকেছে এবং একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে উঠে আসছে বিজেপি। জনমত সমীক্ষার ইঙ্গিত সব সময় যে মিলে যায় তা মোটেই নয়। বরং নানা সমীকরণের অঙ্কে অনেক কিছুরই বদল ঘটতে পারে শেষ মুহূর্তে। তবে এখন পর্যন্ত সমীক্ষার ফলাফলে বিজেপি শিবিরে খুশির হওয়া। বিজেপির নেতৃত্বাধীন জোট জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট এনডিএ পেতে পারে সর্বোচ্চ ২৩১টি আসন ও সর্বনিম্ন ২০৭টি আসন। অন্যদিকে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন জোট ইউপিএ জোট অনেক কষ্টে পৌঁছতে পারে ১০০টিতে। সর্বোচ্চ পেতে পারে ১২৭টি আসন। কংগ্রেসের পক্ষে যে দুই অঙ্ক পেরোনো সম্ভব নয়- তা ফুটে উঠেছে সব ক’টি সমীক্ষাতেই। তবে তাৎপর্যপূর্ণভাবে আগামী লোকসভায় তৃতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে উঠে আসতে পারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস। সমীক্ষাগুলোর অনুমান, তৃতীয় বৃহত্তম দল হওয়ার দৌড়ে জয়ললিতার এআইডিএমকে, মায়াবতীর বিএসপি ও মুলায়মের সমাজবাদী পার্টিকে পেছনে ফেলে দিতে পারেন মমতা। লোকসভা নির্বাচনে দিল্লির বাইরে উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা, চন্ডীগড় ও মহারাষ্ট্রের মতো রাজ্যে কয়েকটি করে আসন পেলেও অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টি দেশজুড়ে তেমন প্রভাব ফেলতে পারবে না। আইবিএন-সিএসডিএস-এর সমীক্ষা যেখানে এনডিএ জোটের সম্ভাব্য আসন হিসেবে জানানো হয়েছে ২১১ থেকে ২৩১, সেখানে ইন্ডিয়া টুডে-সি ভোটার জানাচ্ছে, এই জোট পেতে পারে ২০৭ থেকে ২১৭টি আসন। আর এবিপি আনন্দ-এসি নিয়েলসেনের সমীক্ষা বলছে, এনডিএ জোট পেতে পারে ২২৬টি আসন। এর মধ্যে বিজেপি একাই পেতে পারে ২১০টি আসন। অন্য দিকে কংগ্রেস-সহ ইউপিএ জোটকে আইবিএন-সিএসডিএস-এর সমীক্ষা ১০৭ থেকে ১২৭টি আসন দিলেও ইন্ডিয়া টুডে-সি ভোটার দিয়েছে ৯৮ থেকে ১০৮টি আসন। আর এবিপি আনন্দ-এসি নিয়েলসেনের বক্তব্য, ইউপিএ জোট পেতে পারে মাত্র ১০১টি আসন। এবিপি আনন্দ-এসি নিয়েলসেনের দাবি, তৃণমূল কংগ্রেস পেতে পারে ২৬টি আসন। বামরা সব মিলিয়ে ৩০টি আসন জিততে পারে। এবিপি আনন্দ-এসি নিয়েলসেনের সমীক্ষায় ৫৩ শতাংশই জানিয়েছেন, তারা মোদীকে প্রধানমন্ত্রীর গদিতে চাইছেন। রাহুলকে চাইছেন মাত্র ১৫ শতাংশ মানুষ। ৫ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, তারা অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান। তবে, রাজধানী দিল্লিতে ৪১ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, তারা কেজরিওয়ালকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান। তিনটি সমীক্ষার ফলে আসন সংখ্যায় কম-বেশি ফারাক থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট যে, বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে প্রায় ১০০টি আসনের ফারাক থাকতে পারে। কিন্তু ভারতে কে সরকার গঠন করবে? লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ২৭২-এর ম্যাজিক সংখ্যা। বর্তমান চেহারার এনডিএ এতগুলো আসন পাবে বলে কোন সমীক্ষাই মনে করছে না। যা থেকে স্পষ্ট, পাঁচ বছরের জন্য স্থায়ী সরকার গঠন করতে হলে বিজেপিকে নতুন শরিকের সন্ধানে নামতেই হবে। সেক্ষেত্রে, বিজেপি যদি এনডিএ জোটের পুরনো শরিকদের ফিরিয়ে আনতে পারে এবং টিআরএস-এর মতো নতুন শরিকদের কাছে টানতে পারে, তা হলে মোদীর প্রধানমন্ত্রীর গদিতে বসা হয়তো কঠিন হবে না। তবে এবারের লোকসভা নির্বাচনের পরে সরকার গঠনে আঞ্চলিক দলগুলোর ভূমিকা যে বিশেষ গুরুত্ব পাবে- সেটা এক প্রকার নিশ্চিত।
 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. XNews2X - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু