খালেদা, প্রণব এবং ওরা তিন জন by অমিত রহমান

Wednesday, February 12, 2014

খালেদা জিয়া জানার চেষ্টা করছেন। কেন তার ঘনিষ্ঠ ‘তিনজন’ প্রণব মুখার্জির সঙ্গে সাক্ষাতে বারণ করেছিলেন। কি ছিল তাদের উদ্দেশ্য। তারা কি দলের স্বার্থে না অন্যদের স্বার্থে খেলছিলেন তা-ও খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন।
সময় যত যাচ্ছে ততই তার মধ্যে সন্দেহ জাগছে, এটা হয়তো কোন ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারে। দলের লোক, দেশী-বিদেশী শুভার্থীরা বলছেন, এটা ছিল অশোভন, অগ্রহণযোগ্য। শিষ্টাচারবহির্ভূত। তাদের যুক্তি হচ্ছে, খালেদা ভারত সফরে গেলেন। সম্পর্ক উন্নয়নের নয়া দিগন্তের সূচনা হলো। নজিরবিহীন না হলেও অভূতপূর্ব সংবর্ধনা দেয়া হলো। খালেদা নিজেও বিস্মিত হলেন। ঘনিষ্ঠদের বললেন, তার ধারণার বাইরে সৌজন্য দেখালো ভারত। তিনি নিজেই ভারতের প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জিকে আমন্ত্রণ জানালেন ঢাকা সফরের জন্য। প্রণব এলেন। কিন্তু খালেদা নেই। অকার্যকর এক হরতালের অজুহাতে নির্ধারিত সৌজন্য বৈঠক বাতিল করলেন এক ই-মেইল বার্তা পাঠিয়ে। কি কারণ ছিল তা নিয়ে অনেকদিন গবেষণা করে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। ঝুঁটি বাঁধেন এমন দু’জন তাত্ত্বিক এবং একজন পেশাজীবী এক সকালে গিয়ে বললেন, ম্যাডাম সর্বনাশ হয়ে যাবে। প্রণব বাবুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাবেন না। গেলেই বিপদে পড়বেন। হরতালের মধ্যে অন্য কোন শক্তি হামলা চালিয়ে আপনার যাত্রাপথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। প্রাণনাশের ঘটনাও ঘটে যেতে পারে। তাছাড়া ১৮ দলের শরিক জামায়াতের হরতালের মধ্যে আপনি যদি সোনারগাঁও হোটেলে যান তখন সরকার বলবে হরতাল ভঙ্গ করে আপনি ভারতের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তাদের আরও যুক্তি, ভারত আপনাকে চায় না। এর পেছনে যে মানুষটি সক্রিয় ভূমিকায় তিনি হচ্ছেন প্রণব মুখার্জি। বাংলাদেশ বিষয়ে সব নীতি তিনিই গ্রহণ করেন। সুতরাং, তাকে বোঝানো উচিত বাংলাদেশ একচেটিয়া তার বা তাদের পক্ষে নয়। এখানেও ভিন্নমত রয়েছে। খালেদা গিলে ফেললেন প্রস্তাবটি। উল্লিখিত তিনজন এমনভাবে কথা বলেন, মনে হবে তারা ছাড়া বিএনপির পক্ষে আর কেউ নেই। যুক্তিতে তারা পারদর্শী। এর মধ্যে একজন তাত্ত্বিক। হালে চরম দক্ষিণপন্থি। নানা লেনদেনের সঙ্গেও জড়িত। টেলিভিশন টকশোর একটি মন্তব্য নিয়ে মাঝখানে তাকে নিয়ে শোরগোল তুললেন শাসক সমর্থিত নাগরিক সমাজের কেউ কেউ। গ্রেপ্তারের দাবিও তুললেন। কিন্তু এক রহস্যজনক কারণে তা থেমে গেল। হেফাজতের সমাবেশের আগে খালেদা জিয়ার আলটিমেটাম দেয়ার ক্ষেত্রেও এই ভদ্রলোকের অবদান ছিল। ভিন্ন এক বিশ্লেষণ দাঁড় করিয়ে খালেদাকে দিয়ে বাজিমাত করতে চেয়েছিলেন তিনি। বিএনপি মহলেই এ নিয়ে ভিন্ন মূল্যায়ন চালু আছে মেলাকাল থেকে। আরেক ভদ্রলোক অপেক্ষাকৃত তরুণ। বামপন্থি ছিলেন শুরুতে। এখন জাতীয়তাবাদী ভূমিকায়। চাঞ্চল্যকর সব খবর দেন ঘনিষ্ঠ মহলে। বলেন, তার সঙ্গে নাকি ‘উত্তরে’র ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। কাল হবে, পরশু হবে, দিন-তারিখও বলেন এমনভাবে শুনে যে কেউ চমকে উঠতে পারেন। খালেদা জিয়ার কাছেও মাঝেমধ্যে পৌঁছে যান। অথবা দূত মারফত এমন খবর দেন, দরকার নেই আন্দোলন বেগবান করার। এমনিতেই আন্দোলন গতি পেয়ে যাবে। শাসকেরা হাওয়ায় মিইয়ে যাবে। আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন দু’দিন কর্মীদের সহায়তা বন্ধ করেছিলেন খালেদা জিয়া। তাকে বলা হয়েছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র। এখন খালেদা নিজেই ঘনিষ্ঠদের বলছেন, ওরা আসলে অনুপ্রবেশকারী। হেফাজতের সঙ্গেও ওরা যোগাযোগ স্থাপন করে ভিন্ন বার্তা দিয়েছে। যে কারণে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহার আর মাদরাসার আর্থিক সহায়তার টোপ দিয়ে সরকার মাঝপথে থামিয়ে দেয় হেফাজতের কাফেলা। হেফাজত প্রধানের ছেলের ভূমিকাও বেশ রহস্যজনক। খালেদার তৃতীয় ব্যক্তি বেশ শক্তিশালী। চার দেয়ালে বন্দি থাকার পরও প্রভাব অনেক বেশি। তিনি কিছু বললে বারণ করতে পারেন না খালেদা। এমনকি নিজের স্বার্থও না। উল্লিখিত তিনজন কাদের পরামর্শে খালেদা জিয়াকে সোনারগাঁও হোটেলে না যেতে বলেছিলেন তা নিয়ে দলের মধ্যে নানারকম মুখরোচক খবর চালু আছে। পাঠকদের মনে রাখার কথা, যে সময়টায় প্রণব মুখার্জির সঙ্গে খালেদার সাক্ষাৎ করতে আসার কথা ছিল, প্রায় একই সময় হোটেলের উত্তর পাশে একটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটেছিল। যে খবর ভারতীয় মিডিয়া দ্রুত প্রচার করেছিল। এটা যে পূর্ব পরিকল্পিত ছিল এখন বিএনপি নেতারা বুঝলেও তখন আমলেই নেননি। এমন কি দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা শমসের মবিন চৌধুরীও কূটনৈতিক শিষ্টাচারের প্রশ্ন না তুলে ই-মেইল বার্তা টাইপ করেছিলেন। সম্পর্ক মেরামতে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. ওসমান ফারুকের নেতৃত্বে দুই সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল দিল্লি গিয়েছিল প্রণবকে বোঝাতে। দুঃখ প্রকাশও করা হয় তাদের পক্ষ থেকে। তখন পানি অনেক দূর গড়িয়ে গেছে। প্রণব বাবু সহজে নিলেও ভারতীয় নীতিনির্ধারকরা এটাকে অপমান বলেই দেখেছেন। ভারতীয় প্রেসিডেন্ট যখন দিল্লিগামী প্লেনে ওঠেন তখন সফরসঙ্গী ভারতীয় সাংবাদিকরা তাকে সরাসরি প্রশ্ন করেন। বলেন, প্রণব বাবুকে নয়- গোটা ভারতবাসীকে অপমান করলেন বিরোধী নেত্রী। ধীরস্থির প্রণব বাবু কূটনৈতিক জবাব দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনি নিজেও উপলব্ধি করেন এটা এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। ভারতের নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ বরাবরই বিএনপির ঘোর বিরোধী। তারা সুযোগ খুঁজছিলেন। তাদের হাতে অস্ত্রটা তুলে দেন খালেদা নিজেই। জামায়াতের সঙ্গে প্রেম দেখাতে গিয়ে নিজেকে অসহায় করে তোলেন। তার ক্ষমতা দখলের স্বপ্ন হাতছাড়া হয়ে যায়। এরপরও সুযোগ এসেছিল। সময়মতো পদক্ষেপ নেননি। যে কারণে ভারত একতরফাভাবে আওয়ামী লীগের পক্ষে চলে যায়। অনেকে অবশ্য বলেন, খালেদা সাক্ষাৎ করলেও ক্ষমতা পেতেন না। নানা কারণে ভারত খালেদাকে আস্থায় নিতে পারে না। তারপরও সাধারণ ভদ্রতা বলে কথা। খালেদা সব সময় সিদ্ধান্ত নেন বিলম্বে। পেট্রল বোমা আর গানপাউডার দিয়ে মানুষ কতল করা হচ্ছে অথচ খালেদা নীরব। একবারও নিন্দা জানালেন না। পাগলও জানে কারা এগুলো করেছে। যখন বিএনপি মহাসচিব কথা বললেন, এটা তাদের কাজ নয়, তখন দুনিয়াব্যাপী চাউর হয়ে গেছে আন্দোলনের নামে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে পরিকল্পিতভাবে। মনে রাখতে হবে এটা হাসিনার শাসন। তিনি ফুলটাইম রাজনীতি করেন। আর খালেদা করেন মাত্র চার ঘণ্টা। পৃথিবীতে অনেক বড় বড় কাজ হয়েছে সকাল আটটা থেকে বেলা ২টার মধ্যে। এই সময়টা ঘুমিয়ে কাটালে ফল যা পাওয়ার তা-ই পাওয়া যাবে। বাড়তি যা পাওয়ার তা বোনাস। মানুষ সরকারের ওপর বিরক্ত। শত ভুলের মধ্যেও মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে এখনও আকুতি করছে। তাছাড়া সবাইকে অবিশ্বাসের পাল্লায় তুলে বিচার করলে কোনকালেই ভাল কিছু পাওয়া যায় না। শেখ হাসিনা একদিন যাদের অবিশ্বাস করতেন, দল ও মন্ত্রিসভায় স্থান দেননি, তারা এখন মূল শক্তি। মতিয়া চৌধুরীরা দূরে বসে ভাবছেন এ কি হলো। এটাই তো রাজনীতির খেলা। ভারতও এক সময় সংস্কারপন্থিদের সমর্থন দিয়েছিল জরুরি জমানায়। পরিণতিতে শেখ হাসিনা বিরক্ত হয়ে সংস্কারপন্থিদের ক্ষমতার বাইরে রেখেছিলেন। প্রণব বাবু নিজে অন্তত তিনবার অনুরোধ করে হাসিনার মন গলাতে পারেননি। বিরোধীদের আন্দোলনে শেখ হাসিনার সাজানো সংসার যখন ভেঙে পড়ছিল তখন প্রণব বাবুর পরামর্শে চিহ্নিত সংস্কারপন্থি আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমদ, মোহাম্মদ নাসিম, আসাদুজ্জামান নূরকে দলে ফিরিয়ে নেন। এরাই এখন হাসিনার প্রথম সারির সৈনিক। আর খালেদা এখনও সন্দেহ আর অবিশ্বাস থেকে বের হতে পারেননি। রাজনীতি কি এতটাই সহজ!

নয়া গণতন্ত্র এবং... by অমিত রহমান

Monday, January 27, 2014

নয়া এক গণতন্ত্র আমরা পেয়েছি বিতর্কিত ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের পর। বিশ্বের কোথাও এ ধরনের গণতন্ত্র এ মুহূর্তে চালু নেই। পশ্চিমা গণতন্ত্রের জন্মদাতারা বেঁচে থাকলে হয়তো তারা বড্ড বেশি লজ্জা পেতেন।
কারণ, প্রচলিত ধারার গণতন্ত্রের সংজ্ঞার সঙ্গে বাংলাদেশী গণতন্ত্রের কোন মিল নেই। অদ্ভুত কিসিমের এই গণতন্ত্রে কোন ভোটের প্রয়োজন হয় না। সংসদেরও দরকার হয় না বিরোধী দলের। বিরোধী নেত্রী আছেন। আছেন তার দলের মন্ত্রীরা। দলের প্রধান সরকারের বিশেষ দূতও। সরকার আর বিরোধীদলকে আলাদা করে দেখার কোন সুযোগ নেই। বলা হচ্ছে, জটিল এক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আমরা এটা অর্জন করেছি। পশ্চিমা গণতন্ত্রের প্রতি আমাদের অবিচল আনুগত্য আর নেই। কারণ, আমরা নিজেরা নয়া এক মডেল তৈরি করেছি। এখন সংবিধান সংশোধন করে নিলেই সব মামলা চুকে যায়। বুদ্ধিজীবীরা সমানেই টিভির টকশোতে নয়া সব তত্ত্ব হাজির করছেন। বলছেন এটাই গণতন্ত্র। কে ভোট দিতে গেল আর না গেল তা দেখার সুযোগ বা সময় কোথায়? ভোটের বাক্স ছিল। দাওয়াতও দেয়া হয়েছিল ভোটারদের। নিরাপত্তাও ছিল। কেউ যায়নি তাতে কি?

শাসন কায়েম হয়ে গেছে। বিদেশ থেকে স্বীকৃতিও এসে গেছে। তাই আসুন আমরা সবাই যোগ দেই গার্ডেন উৎসবে। যদিও সবার জন্য দরজা খোলা নয় এই উৎসবে। যারা সহযাত্রী তারাই যোগ দেবেন বা দিয়েছেন। আগে ব্যতিক্রম থাকতেন যারা তারাও কোরাসে যোগ দিয়েছেন। খানাপিনায় অংশ নিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলেছেন। বলেছেন, বাড়তি মজা দেখছি। আগে আমাদেরকে কেন দূরে ঠেলে রাখা হতো? এটাই তো ভাল। সবাই মিলেমিশে এক পতাকাতলে যোগ দিলে দেশে শান্তি আসবে। ভিন্নমতের কি প্রয়োজন? ওরা তো গাড়ি পোড়ায়, রাস্তা অবরোধ করে। কথায় কথায় হরতাল ডাকে। জ্বালাও পোড়াও ছাড়া ওদের যেন আর কোন কাজ নেই। একদা আমজনতার আওয়াজ অন্য স্রোতে বেশি ছিল। এখন ঠিক হয়ে যাবে। আমরা ওদেরকে ঘুম পাড়িয়ে রাখার ওষুধ পেয়ে গেছি। দেখছেন না জেলায় জেলায় থানায় থানায় কিভাবে নতুন শব্দে ঘুম ভাঙে। কেউ জাগে, কেউ চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে যায়।
নয়া মডেল দরকার। জয়তু সরকার প্রধান। তিনি নয়া মডেল দিয়েছেন। আসাদরা গাদ্দাফিরা কোন মডেল দিতে পারেনি। তারা বন্দুকের জোরে ক্ষমতা টিকেছিলেন বা আছেন। এখানে তো সংসদ বহাল। বিরোধীদলও থাকছে। একটু অন্যরকম আর কি! সরকার আর বিরোধীদল একযোগে কাজ করবে। বিরোধী মতের কি প্রয়োজন? অযথা বাড়তি টেনশন। কথার যুদ্ধ। জনগণকে উসকে দিয়ে ফায়দা নেয়ার চেষ্টা। বাংলাদেশী নতুন মডেলে এর কোন জায়গা নেই। ধীরে ধীরে এই জঞ্জাল সাফ করতে হবে। বিরোধী মতের আপাতত কোন দরকার নেই। ভবিষ্যতে দেখা যাবে। পশ্চিমা দুনিয়ার কয়েকজন চেঁচামেচি করবে। পরে ঠিক হয়ে যাবে। আর ওরা কি চায়? ব্যবসা, সুযোগ সুবিধা। সবই তারা পাবে। দেখলেন না চীন কিভাবে রাতারাতি পাল্টে গেল। আরও বড় শক্তি? অপেক্ষা করুন। দেখবেন সেটাও ম্যানেজ হয়ে গেছে। বিরোধীরা যে কেন ভোটে এলো না, তা আমি বুঝতে পারি না। তারা এলেই অনেক কিছু পেতো। আমি তো সবাইকেই দিয়েছি।
গোলমালটা হচ্ছে ইউরোপীয় একটি শক্তিকে নিয়ে। তারা ওয়েস্টমিনস্টার ধারণার অন্য ব্যাখ্যা মানতে চায় না। তাই তারা আপত্তি করেছে। সংসদে প্রস্তাবও পাস করেছে। আপাতত বৈরী। পরশু সকালে দেখবেন বিলকুল ঠিক। বিরোধীরাও চুপ হয়ে যাবে। সামনে কত যে খেলা অপেক্ষা করছে। উপজেলা যাক না- দেখবেন হিসাব মেলাতে পারছে না। রাজনীতি চার দেয়ালের মধ্যেই বন্দি হয়ে যাবে। মিডিয়া তো কাবু হয়েই গেছে। আমাদের কিছু করতে হয়নি। নিজেরাই ম্যানেজ হয়ে গেছে। নতুন আইন করতে যাচ্ছি তাতে ওয়েব দুনিয়াও ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। ক’জনের সাহস আছে আইন অমান্য করে বিপ্লবে যোগ দেয়ার? তার মানে কি? মানে খুবই সোজা। এক নেতা, এক দেশ, স্লোগানটি একসময় শুনতে ভাল লাগতো। মাঝখানে অরুচি ছিল। এখন নয়া মোড়কে মোড়ানো হচ্ছে। ভাল লাগতেও পারে। না লাগলে চলে যান অন্য দেশে। কার কি আপত্তি। কেউ আপত্তি জানাবে না। নিরাপত্তার জন্য, সুশাসনের জন্য প্রজারা নানা সময় নানা কিছু করেছেন। এই ভূখণ্ডেও তা-ই দেখা গেছে। প্রজারা রাজাকে বসান। আবার হটিয়েও দেন। রাজতন্ত্র আর গণতন্ত্রের মিল খুঁজতে গিয়ে অযথা বাড়তি চিন্তা করছেন কেন? সময় শেষ হয়ে যায়নি। অপেক্ষা করুন, দেখুন। নয়া কিছুর জন্য কষ্ট করতে হয়। রূপকথার গল্প শেষে সব সময় বলা হয়, এরপর তারা সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে লাগলো। এটা রূপকথা কিনা তা নিয়ে আপনি বিতর্ক করতে পারেন। আমি অন্তত করছি না।

নয়া গণতন্ত্রের পথে বাংলাদেশ by অমিত রহমান

Sunday, January 5, 2014

বাংলাদেশে ভোট কলঙ্কিত হয় বরাবরই। মাঝখানে চারটি নির্বাচন তুলনামূলকভাবে কলঙ্কমুক্ত ছিল। নব্বই দশকের পর ’৯৬ সালে ভোট হয়েছিল একতরফা এবং গায়েবি।
যে নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী বয়কট করেছিল। এ অবস্থায় ভোট পড়েছিল ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ। ভোটের ইতিহাসে উপস্থিতি ছিল সবচেয়ে কম। কাল যে ভোট হতে যাচ্ছে সেখানে কত ভাগ ভোট পড়বে। বিভিন্ন জেলা থেকে যেসব খবরাখবর আসছে তাতে মনে হয় ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। বেশিও হতে পারে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে শাসক দলের একজন দায়িত্বশীল নেতা বলেন, ভোটার আনার জন্য প্রয়োজনে টাকা খরচ করতে বলা হয়েছে। দলীয় নেতাকর্মীদের বলা হয়েছে ভোটকেন্দ্রে হাজির হয়ে ব্যালটের প্রতি সুবিচার করতে। শাসক দলের এমপি শেখ আফিলউদ্দিন তো প্রকাশ্যেই ঘোষণা দিয়েছেন ভোটারের দরকার নেই। ১০০ কর্মী পর্যায়ক্রমে ভোটকেন্দ্রের সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে। বাকি কাজটা নির্বাচনী এজেন্টরা সেরে ফেলবে। এরকমই কিছু ঘটতে যাচ্ছে ৫ই জানুয়ারির ভোটে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নেই এই নির্বাচনে। জামায়াতে ইসলামীও নেই। এরশাদের জাতীয় পার্টি আছে এবং নেই। প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে সরে গেছেন এরশাদ। পরিণতিতে হাসপাতাল নামক আধুনিক জেলখানায়। খাঁচায় বন্দি থেকেও গলফ খেলে দুনিয়াকে দেখাচ্ছেন ভোট বয়কট করাটা কত বিপজ্জনক। খালেদা বন্দি ৭৯, গুলশানে। ইকোনমিস্টের ভাষায়, এটাই হচ্ছে বাংলাদেশী গণতন্ত্রের নমুনা। খালেদা সহসা মুক্তি পাবেন এমনটা মনে করার কোন কারণ নেই। যদিও আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে সরকারের ওপর। তবে আন্তর্জাতিক চাপে সরকার টলবে না। নির্বাচন বাতিলে আন্তর্জাতিক চাপ ছিল। সরকার কি তা শুনেছে? ভবিষ্যতেও শুনবে না। ইউরোপীয় ইউনিয়ন অবরোধ দিলেও কাজ হবে না। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যদি বিষয়টি উত্থাপন করে তখনও ভাববে এমনটা এখন কেউ আর বিশ্বাস করতে পারছেন না। দুনিয়া কি বললো, দেশের মানুষ কি বললো, তাতে কি যায় আসে! ক্ষমতায় আছি, ক্ষমতায় থাকবো, এটাই শেষ কথা। ৫ই জানুয়ারি থেকে ২৪শে জানুয়ারি, এই ১৯ দিন বাংলাদেশী রাজনীতির জন্য নতুন কোন ইতিহাস লেখা হতে পারে। সন্ত্রাস দমনের নামে ভয়ঙ্কর দমন-পীড়ন হতে পারে। এমন একটা ছকের কথা পরিবেশমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ জানিয়েছেন। বলেছেন, দুই সপ্তাহের মধ্যে সন্ত্রাস নির্মূল করা হবে। সেনাবাহিনীকে আরও দীর্ঘসময় মাঠে রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আগে কথা ছিল ৯ই জানুয়ারি পর্যন্ত। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে নানারকম কথাবার্তা চালু রয়েছে শাসক মহলে। যত কথাই বলা হোক না কেন, ৫ই জানুয়ারি নির্বাচনী ফল দিয়ে শেখ হাসিনা দেশ শাসন করতে চাইবেন। আরেকটি নির্বাচন খুব দ্রুত হবে এমন আশা যারা করছেন তারা হতাশ হবেন অল্পদিন পরেই। বিএনপিকে ভাঙার চেষ্টা হবে। জামায়াত নির্মূল হবে। মিডিয়া নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। প্রশাসন আরও দলীয়করণে আবদ্ধ হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ভিন্ন দায়িত্ব পাবে। বাকশাল কায়েম হবে অন্য এক মোড়কে। সর্বোপরি মানবাধিকারের সংজ্ঞা পরিবর্তন হবে। গণতন্ত্র বন্দি হয়ে যাবে চার দেয়ালে। অবিশ্বাস্য বা নাটকীয় কিছু ঘটলে হয়তো অন্ধকার থেকে আলো আসবে। তা না হলে বাংলাদেশীরা একপর্যায়ে আত্মসমর্পণ করবেন অন্য শক্তির কাছে। কোনদিন টের পেলেও শুধু আফসোস করা ছাড়া কিছুই থাকবে না। অনেকেই বলছেন, খালেদার নির্বাচনে যাওয়া উচিত ছিল। নির্বাচনে কিভাবে যেতেন খালেদা? শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যেতে রাজি হলেও নির্বাচন হতো কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় ছিল এবং আছে। কারণ, শাসক দল গোড়া থেকেই বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে চায়নি। তারা জানে যেনতেন নির্বাচনেও হেরে যেতে হবে। তাই খালেদাকে নির্বাচনমুখী করতে দেয়নি তারা। তত্ত্বাবধায়ক বাতিলের চিন্তা গত নির্বাচনের পরপরই নেয়া হয়। বিশেষ কমিটির আলোচনা ছিল লোকদেখানো। আদালতের রায় শেখ হাসিনাকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। বিচারপতি খায়রুল হক জানতেন ভবিষ্যৎ কর্মপন্থার কথা। সে কারণে রায় লেখার সময় তিনি বড্ড বেশি কৌশলী ছিলেন। খালেদা ভুল করেছেন, না শুদ্ধ করেছেন তা এখনই হয়তো মূল্যায়ন করা যাবে না। তবে তার সংলাপে যাওয়া উচিত ছিল। প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে দেশবাসীকে বলতে পারতেন আলোচনা অর্থহীন। সরকার বিরোধী দলকে চায় না সেটা আরও স্পষ্ট করে বলতে পারতেন। তা না করে আবেগ আর জেদ দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে চেয়েছেন। জামায়াত-নির্ভর হওয়া যে মস্ত বড় ভুল হয়েছে সেটা বোধ করি তিনি এখন বুঝতে পারছেন। লাভের মধ্যে লাভ হয়েছে সন্ত্রাসী দল হিসেবে জামায়াত দুনিয়াব্যাপী স্বীকৃতি পেয়েছে। কিছুটা হলেও আঁচ লেগেছে বিএনপি’র গায়ে। সরকার এখানে ভূমিকা রেখেছে এতে কোন সন্দেহ নেই। প্রশ্ন হলো, বিএনপি নেত্রী কেন বুঝতে পারলেন না এতে তার দলের মডারেট অবস্থার পরিবর্তন হয়ে যাবে। তত্ত্বাবধায়ক প্রশ্নে ৭০ ভাগ মানুষের সমর্থনপুষ্ট একটি দলের চেহারা এরকম হবে কেন? রাস্তায় জনগণকে শামিল করা গেল না কেন? তার সঙ্গে যেমন আন্তর্জাতিক শক্তি আছে, তেমনি সরকারের সঙ্গেও রয়েছে আন্তর্জাতিক শক্তি। খালেদার পক্ষের শক্তিরা হতাশা আর উদ্বেগ প্রকাশ করেই দায়িত্ব শেষ করেছে। আর সরকারের পক্ষের শক্তিরা সরব ছিল অ্যাকশনে। লবিও করেছে আন্তর্জাতিক মহলে। এখনও তারা সোচ্চার। বৃহৎ শক্তিগুলোর দাবার ঘুঁটিতে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। খেলাটা কি তা খুব দ্রুত পরিষ্কার হয়ে যাবে। তবে সেটা যে বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থের পরিপন্থি হবে তা বলা যায় অনায়াসে।

খালেদা বাড়িতে এরশাদ হাসপাতালে by অমিত রহমান

Wednesday, January 1, 2014

বাড়িতে বন্দি খালেদা। এরশাদ বন্দি হাসপাতালে। হাজার হাজার বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী কারাগারে। দেশের সর্বোচ্চ আদালত কলঙ্কিত।
ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের ভাষায় জানাজা পাঠ হয়ে গেছে। সাংবাদিকদের মিলনস্থল জাতীয় প্রেস ক্লাবের গায়ে কলঙ্ক লেপে দেয়া হয়েছে। সেখানে জঙ্গিরা আছেন সে খবর নাকি পুলিশ কমিশনারের কাছে পৌঁছেছে গোয়েন্দা রিপোর্টে। প্রেস ক্লাব কর্তৃপক্ষকে অবশ্য আরও সজাগ ও একপেশে রাজনীতি থেকে দূরে থাকা জরুরি বলে মনে করছি। প্রেস ক্লাবকে রাখা উচিত রাজনীতির ঊর্ধ্বে। বাংলাদেশের বিদেশী বন্ধুরা হঠাৎ চুপ হয়ে গেছেন। বড়দিন আর নববর্ষের কারণে ছুটি- এটাই কি প্রধান কারণ, নাকি তারা বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। বৃটিশ হাইকমিশনার রবার্ট গিবসনের হঠাৎ দৌড়ঝাঁপ কিছুটা আশারও সঞ্চার করেছে। যদিও তার সঙ্গে কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে বিএনপি নেতা শমসের মবিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে অবশ্য ছেড়ে দেয়া হয় আন্তর্জাতিক চাপে। খালেদার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজিনা জানিয়েছেন তার উদ্বেগের কথা। এখন বড় এক চ্যালেঞ্জ খালেদার সামনে। দলকে এক রাখতে সক্ষম হয়েছেন শত প্রলোভনের মুখে- এটাকে তার সাফল্য হিসেবে দেখা যেতে পারে। কিন্তু নীতিকৌশল প্রণয়নে মুন্সিয়ানায় যে ঘাটতি ছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করার মধ্যে বড় ধরনের রাজনৈতিক কৌশল ছিল। এখনই তা হয়তো খোলাসা করে বলা ঠিক হবে না। সময়েই তা পরিষ্কার হয়ে যাবে। বিএনপি যাতে কখনও নির্বাচনমুখী না হয় সেটা ছিল সরকারি কৌশল। কেননা, সরকার জানে বিএনপি যেনতেন ব্যবস্থায় নির্বাচনে গেলেও জয় পেয়ে যাবে। মানুষ পরিবর্তন চায়। পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায় তারা ভোট দেয়ার জন্য উদগ্রীব। এর মধ্যে পাঁচ পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন খালেদার ভাগ্য বিপর্যয় ঘটায়। শাসকরা তখন নিশ্চিত হয়ে যান নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার অর্থ হচ্ছে পরাজয় মেনে নেয়া। নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারার শামিল। তাই তারা এমন এক কৌশল নেন তাতে বিএনপির নির্বাচনে অংশ নেয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। খালেদা টের পেয়ে পথ খুঁজছিলেন। প্রেসিডেন্টের কাছেও গিয়েছিলেন। হাসিনাকে বাদ দিয়ে শাসক দলের যে কাউকে অন্তর্বর্তী সরকারে নেয়া হলে সে নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিতো। অন্তত বিদেশী কূটনীতিকদের কাছে বিএনপি এই আগ্রহের কথা জানিয়েছিল একাধিকবার। সে চেষ্টাও ব্যর্থ হয় শেখ হাসিনার কড়া মনোভাবের কারণে। তিনি নিজে প্রেসিডেন্টের কাছে গিয়ে বলে এসেছেন এমন কোন তৎপরতায় যেন লিপ্ত না হন। যদিও একপর্যায়ে প্রেসিডেন্ট যাতে বিএনপির সঙ্গে সমঝোতার একটি উদ্যোগ নেন সে জন্য অন্যপক্ষের মাধ্যমে বার্তা পাঠিয়েছিলেন। সর্বজনশ্রদ্ধেয় বর্ষীয়ান সাংবাদিক এবিএম মূসার কাছে যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে পাঠিয়েছিলেন। ওবায়দুল কাদের যখন প্রস্তাবটি নিয়ে এবিএম মূসার কাছে যান তখন তিনি জানতে চেয়েছিলেন এটা কি তার প্রস্তাব, নাকি প্রধানমন্ত্রীর? কাদের তখন বলেন, আমাকে নেত্রী পাঠিয়েছেন। সড়ক ভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠক থেকে বের হয়ে এবিএম মূসা সরাসরি প্রেসিডেন্ট হাউসে ফোন করে সময় চান। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে সময় দেয়া হয়। প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পুরো বিষয়টি তাকে অবহিত করেন। এর আগে তিনি বিএনপির সঙ্গে কথা বলেন। মির্জা ফখরুল বলেন, তারা রাজি। বলাবলি আছে প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে সবুজ সঙ্কেত পাওয়ার পর খালেদা জিয়া তার ১৮ দলের সঙ্গীদের নিয়ে বঙ্গভবনে যান। এই যখন অবস্থা তখন প্রধানমন্ত্রী তার সিদ্ধান্ত স্থগিত করে নয়া কৌশল নেন। মাঝখানেই থেমে যায় আবদুল হামিদের সমঝোতা প্রচেষ্টা। শোনা কথা, বিএনপি যদি প্রেসিডেন্টের আন্ডারে কোন নির্বাচনে রাজি হয়ে যায় তখন সর্বনাশ হয়ে যাবে এমন যুক্তিতেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়। এর কয়েকদিন পর প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে প্রধানমন্ত্রী ভিন্ন এক প্রস্তাব দেন। এতে প্রেসিডেন্ট সায় দেননি। তখন সরকার একদম মরিয়া। যেনতেন প্রকারে নির্বাচন করতে হবে। তাদের কাছে খবর ছিল খালেদা নির্বাচনমুখী নন। এরশাদও দোটানায়। একপর্যায়ে এরশাদকে রাজি করানো হলো। তবে সংশয় ছিল গোড়া থেকেই। এরশাদ যে কোন সময় বেঁকে বসতে পারেন। হঠাৎ করেই এরশাদ বদলে যান। নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। এরপর এরশাদকে নানাভাবে চাপ দেয়া হয়। এরশাদ সিদ্ধান্তে অনড় থাকলে তাকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসার নামে কেবিনবন্দি করা হয়। শীর্ষস্থানীয় একজন চিকিৎসকের অধীনে এরশাদকে মানসিক রোগের চিকিৎসার জন্য রেফার করা হয়। রাখা হয় কম গুরুত্বপূর্ণ এক কেবিনে। কিন্তু এরশাদ কৌশল আঁটতে থাকেন। একদিন তিনি কর্তব্যরতদের রাজি করিয়ে গলফ খেলতে চলে যান। এ থেকে জাতির সামনে এই বার্তাই দেন যে, তিনি সুস্থ মানুষ। খালি খালি তাকে আটকে রাখা হয়েছে। এরশাদ এতটা সাহস কিভাবে করলেন তা নিয়ে অনেকেই অনেক অঙ্ক মেলাচ্ছেন। ওদিকে তার দলকে তিন টুকরো করে আরেক দফা চাপ সৃষ্টি করা হয়। কিন্তু এরশাদ তার সিদ্ধান্তে অনড়। বিভিন্নভাবে বার্তা পাঠিয়ে বলছেন, জেলে ছিলাম। আবার যাবো। তবুও সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবো না। এরশাদ মনে করেন, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন এক তামাশা। এই নির্বাচন বাংলাদেশকে, গণতন্ত্রকে কলঙ্কিত করবে। গৃহবন্দি খালেদা কি করবেন? দলের সক্রিয় নেতারা জেলখানায়। একের পর এক অবরোধ-হরতাল দিয়ে কাজ হচ্ছে না। সরকার টলছে না। তারা যেভাবেই হোক ক্ষমতায় থাকতে চায়। দেশের অর্থনীতি পঙ্গু। বিনিয়োগ বন্ধ। প্রায় ৫শ’ গার্মেন্ট কারখানায় তালা। জনদুর্ভোগ চরমে। অবরোধে সরকারের নড়া তো দূরের কথা, তারা নিজেরাই অবরোধ পরিস্থিতি তৈরি করে দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে। ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির এ এক বীভৎস রূপ। আদালত প্রাঙ্গণের ঘটনা থেকে এটা বোধকরি কারও বুঝতে অসুবিধা থাকার কথা নয়। একজন মহিলা আইনজীবীর ওপর যেভাবে লাল ঘোড়া দাবড়ানোর মতো লাঠি পড়েছে, তাতে বাংলাদেশ কেন, বিশ্ববাসী চমকে উঠেছেন। ১৩৭টি দেশে এই ছবিটি ছাপা হয়েছে বার্তা সংস্থাগুলোর বদৌলতে। লাখ লাখ অনলাইনে এটা স্থান পেয়েছে শীর্ষ ছবি হিসেবে। ধীরস্থির খালেদা এখন হঠাৎ করেই মেজাজ খারাপ করছেন। এটা তার চরিত্রের সঙ্গে একদম বেমানান। বন্দিদশায় মিডিয়ার মুখোমুখি হয়ে একটি জেলার প্রতি তার রাগ দেখানোটা ঠিক হয়নি। এটা সবাই জানেন, বিশেষ জেলার প্রতি বর্তমান শাসকদের বড্ড বেশি টান। মনে হয় অন্য কোন জেলার লোকজনের প্রতি তেমন আস্থা রাখতে পারছেন না। এটা ভাল না মন্দ আখেরেই তা প্রমাণিত হবে। খালেদাকে উত্ত্যক্ত করা হয়েছিল এতে কোন সন্দেহ নেই। এতে তিনি উত্তেজিত হবেন কেন? যা-ই হোক, বাংলাদেশের রাজনীতি এখন অন্য পথে। আমরা সবাই জানি নৈরাজ্য আর রাজনৈতিক শূন্যতা থেকে দেশে দেশে একনায়কতন্ত্রের জন্ম হয়েছে। বাংলাদেশ সে পথে অনেক আগে থেকেই হাঁটতে শুরু করেছে। সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে একপক্ষীয় শাসনের যাত্রা চূড়ান্ত করা হয়েছিল। কিন্তু এরশাদ কি বুঝে হিসাব নিকাশ পাল্টে দিয়েছেন। এরপর কি? এখনও স্পষ্ট নয়। তবে সামনে যে ঘোর অন্ধকার তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন হয়ে গেলে অন্য এক বাংলাদেশ আমরা দেখতে পাবো। অন্য এক মডেলের গণতন্ত্র উকিঝুঁকি মারছে। যে গণতন্ত্রে ভিন্নমতের স্থান হয়তো হবে না। হলেও তা হবে একদম নিয়ন্ত্রিত। আর স্বাধীন গণমাধ্যম! তা নিয়ে পরে আলোচনা করবো। যদি সুযোগ থাকে।

হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকলে কি করতেন? by অমিত রহমান

Saturday, December 28, 2013

প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকলে এখন কি করতেন। পাঠকরা হয়তো বলবেন এখন এই প্রশ্ন তুলছি কেন?
তিনি তো চলেই গেছেন। এখন তো তিনি ধরাছোঁয়ার বাইরে। চাইলেও তাকে পাওয়া যাবে না। তাই তাকে নিয়ে ভাববার কি আছে। আমি বলবো অবশ্যই ভাববার আছে। হিমুর হাতে কয়েকটি নীল পদ্ম কেন লিখেছিলেন সতেরো বছর আগে। তার ভাবনার মধ্যে কি ছিল? সমাজ, রাষ্ট্র নিয়ে কেন ভেবেছিলেন? লেখক হিসেবে সমাজ বিজ্ঞানী হিসেবে তিনি ভাবতেই পারেন। দেশ যখন জ্বলছে তিনি তো নীরোর মতো বাঁশি বাজাতে পারেন না। সমাজের ছবি আঁকতে গিয়ে দীর্ঘ হোঁচট যে তিনি খেয়েছিলেন তা তো স্পষ্ট। তিনি ২০০৯ সালে দেশ নিয়ে রাজনীতি নিয়ে এবং দুই নেত্রীকে নিয়ে ভেবেছিলেন। ব্যক্তিগত মতামত তুলে ধরেছিলেন। লিখেছিলেন ‘আমার ধারণা নিম্নশ্রেণীর পশুপাখি মানুষের কথা বোঝে। অতি উচ্চশ্রেণীর প্রাণী মানুষই শুধু একে অন্যের কথা বোঝে না। বেগম খালেদা জিয়া কী বলছেন তা শেখ হাসিনা বুঝতে পারছেন না। আবার শেখ হাসিনা কী বলছেন তা বেগম খালেদা জিয়া বুঝতে পারছেন না। আমরা দেশের মানুষ কী বলছি সেটা তারা বুঝতে পারছে না। তারা কী বলছেন তাও আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়।’ এখন দেশ জ্বলছে। মানুষ পুড়ছে। পতাকা রক্তে লাল হচ্ছে। সঙ্কটে পড়েছে গোটা দেশ। মানুষ উদ্বিগ্ন, দিশাহারা। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে বন্ধু রাষ্ট্রগুলো চিন্তিত। চোখের সামনে শিল্প কারখানা পুড়ে ছাই হচ্ছে- কেউ বলতে পারছে না কারা পোড়ালো। মানুষ তা জানে এবং বুঝে কিন্তু এক অজানা ভয়ে তারা মুখ খুলছে না। সঙ্কট গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। জেদ আর অহমিকাকে পুঁজি করে দুই নেত্রী একে অপরকে মোকাবিলার চেষ্টা করছেন। কিন্তু ১৬ কোটি মানুষ? তারা কি ভাবছে। আসলে তারা কিছুই ভাবতে পারছে না। কারণ, হুমায়ূন আহমেদ যা লিখে গেছেন তাতো শতকরা একশ’ ভাগ সত্যি। দুই নেত্রী একে অপরকে বুঝেন না। তারা শুধু বুঝেন ক্ষমতা। দেশ গোল্লায় যাক, তাতে কি? আমার গাড়িতে তো পতাকা উঠবে। ক্ষমতায় না থাকলেও ক্ষতি নেই। মাঝে মধ্যে ব্যতিক্রম। এতো দেখছি হীরক রাজার দেশে আছি আমরা। জনগণ যা ভাবে আমাদের নেত্রীরা তা ভাবেন না। এ মুহূর্তে দেশের মানুষ ভাবছে একটা সমঝোতার কথা। আমাদের নেত্রীরা কি তা ভাবছেন! কেউ কি তাদের কাছে গিয়ে বলতে পারবে নেত্রী বা ম্যাডাম অনেক হয়েছে। এবার আসুন জনতার কথা ভাবা যাক। সর্বনাশ এ সাহস দেখাবে কে? মন্ত্রীত্ব যাবে, নেতৃত্ব যাবে, এমপি হওয়ার স্বপ্ন যাবে, জানও যেতে পারে। অজানা নয় জানা ভয়ে তারা তটস্থ। তাই তারা অসহায় আত্মসমর্পণ করে বসে আছেন। দেশ নয়, নিজের কথা ভাবতে ভাবতে তারা কোরাস সুরে গান গাইছেন। বলছেন- আমরা আছি, আমরা থাকবো। দেশ নিয়ে ভেবে কি লাভ। যারা ভাবে তারা বোকা। এ বোকাদের দলে আমরা নেই।
পাগলও জানে ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন কোন নির্বাচনের সংজ্ঞায় পড়ে না। কিন্তু সরকার প্রধান এটাকে আটকে ধরে থাকতে চান। তাই তিনি বলছেন পৃথিবীর কোন শক্তি এ নির্বাচন বানচাল করতে পারবে না। পুলিশ, মিলিটিারি নামিয়ে দিয়েছেন জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে। জনগণ কি চায় একবারও তা দেখার চেষ্টা করেননি। তারা যে ক্রমাগত একই বার্তা দিয়ে যাচ্ছে, এ ধরনের নির্বাচনে তাদের সায় নেই- এটা বুঝবার ক্ষমতা কি আছে গণতন্ত্রের মানস কন্যার। নাকি তিনি ক্ষমতার মোহে নিকষ কালো অন্ধকারকে আলিঙ্গন করেছেন। যেখান থেকে পৃথিবীর কোন স্বৈরশাসক ফিরে আসতে পারেননি। মিলিটারি পুলিশ দিয়ে সাময়িক স্বস্তি পাওয়া যায়। কিন্তু শান্তি পাওয়া যায় না। গাদ্দাফি কি ভাবতে পেরেছিলেন তার এ রকম পরিণতি হবে। হোসনি মোবারকের পরিণতি কি তাও আমরা দেখছি। সাদ্দাম তো জান দিয়ে প্রমাণ রেখে গেছেন বন্দুক দিয়ে জনগণের মন জয় করা যায় না। তাই যদি হতো তাহলে তাবৎ দুনিয়ায় বন্দুকের শাসন কায়েম হয়ে যেতো। যদিও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলে গেছেন বন্দুকের কোন সুনির্দিষ্ট দিক নেই। নিজের দিকেও ঘুরে যায় কখনও কখনও। একটা সমাজ বা রাষ্ট্রের অন্যতম চালিকা শক্তি তার নাগরিক সমাজ। সরকার যখন বেপথে হাঁটার চেষ্টা করে তখন নাগরিকরা সোচ্চার হন। রাজপথে নেমে আসেন। জনগণকে কাছে টেনে এনে ব্যারিকেড তৈরি করেন। বাংলাদেশে এর বিপরীত চিত্র। দেশ ডুবছে, মানুষের স্বপ্ন ভেঙে খান খান হয়ে যাচ্ছে তখনও নাগরিক সমাজ মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন। কোন কোন ক্ষেত্রে রসদ যোগাচ্ছেন। বিভাজনের স্রোতে শামিল হয়ে আওয়াজ তুলছেন- আসুন চেতনা রক্ষা করি। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে নৈরাজ্য। কে না জানে নৈরাজ্য থেকে রাজনৈতিক-শূন্যতার সৃষ্টি হয়। আর শূন্যতার ফলে স্বৈরশাসকের জন্ম হয়। আমাদের নাগরিক নেতারা কি ভাবছেন। এখনও কি তারা ঘুমিয়ে থাকবেন।
 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. XNews2X - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু